একই বিছানায়, তবু কত দূরে—যে কথাগুলো সঙ্গীকে বলা হয় না


একই বিছানায়, তবু কত দূরে—যে কথাগুলো সঙ্গীকে বলা হয় না


"অনুভূতি অনেকটা সুড়ঙ্গের মতো। আলোয় পৌঁছাতে হলে অন্ধকারের ভেতর দিয়েই যেতে হয়।" কথাগুলো বলেছেন যৌনতা ও সম্পর্কবিষয়ক গবেষক এমিলি ন্যাগোস্কি। আমাদের নারীরা কখনও কখনও সেই অন্ধকারে ডুবে থাকেন দিনের পর দিন। নারী যাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, অনেক সময় তাকেই একটু একটু করে হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। 


ধরা যাক, রাত হয়েছে। দিনের সব কাজ শেষ। ঘর নিস্তব্ধ। পাশেই শুয়ে আছেন আপনার সবচেয়ে কাছের মানুষটি। অথচ মনে হচ্ছে, মাঝখানে অনেকটা দূরত্ব। হয়তো একসময় এই মানুষটির একটি স্পর্শের জন্য অপেক্ষা করতেন। কাছে এলে ভালো লাগত। ছোট্ট আদর, একটু জড়িয়ে ধরা, চোখে চোখ রাখা—এসবের মধ্যেই ছিল অন্য রকম উষ্ণতা।


এখনো হয়তো ইচ্ছে করে। কিন্তু বলেন না। কারণ, কোথা থেকে শুরু করবেন, সেটাই জানেন না। বলবেন, ‘আমাকে একটু জড়িয়ে ধরো’? নাকি বলবেন, ‘শুধু প্রয়োজনের সময় নয়, অন্য সময়ও আমার কাছে এসো’? কিংবা বহুদিন ধরে জমে থাকা কথাটি—‘তুমি কি কখনো জানতে চেয়েছ, আমার কী ভালো লাগে?’ শেষ পর্যন্ত কিছুই বলা হয় না। আপনি পাশ ফিরে শুয়ে পড়েন। সঙ্গী হয়তো ভাবেন, আপনি ক্লান্ত। আপনি ভাবেন, তিনি বুঝলেন না।


এভাবেই কখনো কখনো একটি সম্পর্কের দূরত্ব শুরু হয়। বড় কোনো ঝগড়া দিয়ে নয়, না-বলা ছোট ছোট চাওয়া দিয়ে। ‘ও তো আমার সঙ্গী, ওর বুঝতে পারার কথা’


এই অভিমান খুব পরিচিত। এত বছর একসঙ্গে থাকার পরও আমাকে বলতে হবে? আমার মন খারাপ বোঝে না? আমার কখন কাছে পেতে ইচ্ছে করে, সেটুকুও বুঝতে পারে না?


কিন্তু ভালোবাসার মানুষও সব সময় মনের কথা বুঝতে পারেন না। হয়তো আপনার কাছে ঘনিষ্ঠতা মানে শুধু যৌন সম্পর্ক নয়। দিনের শেষে কয়েক মিনিট কথা বলা, হঠাৎ হাতটা ধরে রাখা, কপালে চুমু দেওয়া, পাশে বসে থাকা কিংবা কোনো প্রত্যাশা ছাড়াই জড়িয়ে ধরা—এসবও আপনার কাছে ঘনিষ্ঠতা।


কিন্তু আপনার সঙ্গীর কাছে তার সংজ্ঞা অন্য রকম হতে পারে। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন দুজনেই নিজের ভাষায় ভালোবাসেন, অথচ কেউ কাউকে সেই ভাষাটা শেখান না। বলতে ইচ্ছে করে, তবু বলা হয় না


বিশেষ করে অনেক নারীর জন্য নিজের যৌন চাওয়া মুখে বলা সহজ নয়। আমাদের সমাজ মেয়েদের অনেক কিছু শিখিয়েছে—সংসার করতে, মানিয়ে নিতে, অন্যের প্রয়োজন বুঝতে, নিজের অস্বস্তি গোপন রাখতে। কিন্তু নিজের শরীরের অনুভূতি, ভালো লাগা বা ঘনিষ্ঠতার প্রত্যাশা নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে কতজন শিখেছেন?


একজন নারী হয়তো বছরের পর বছর দাম্পত্যে থেকেও বলতে পারেননি—


‘এভাবে আমার ভালো লাগে না।’


‘আমার একটু সময় দরকার।’


‘আজ আমার ইচ্ছে নেই।’


আবার উল্টো কথাটিও হয়তো বলতে পারেননি—


‘আজ তোমাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করছে।’


কারণ, কোথাও একটি ভয় কাজ করে।


সে কী ভাববে?


আমি কি বেশি কিছু চাইছি?


আমাকে কি অন্য চোখে দেখবে?


অথচ নিজের সঙ্গীর কাছে ভালোবাসা, স্পর্শ বা যৌন ঘনিষ্ঠতা চাওয়া লজ্জার বিষয় নয়। নারীরও আকাঙ্ক্ষা আছে, অনুভূতি আছে, শরীর আছে। সেই চাওয়ার ভাষা থাকার অধিকারও তাঁর আছে।


কখনো শরীর নয়, মনটাই আগে কাছে আসতে চায়


অনেক সম্পর্কেই অভিযোগ শোনা যায়—‘আমাদের যৌন জীবন আগের মতো নেই।’


কিন্তু প্রশ্নটি হয়তো আরও আগে থেকে শুরু করা দরকার।


শেষ কবে দুজন মন খুলে কথা বলেছেন?


শেষ কবে কোনো কারণ ছাড়াই একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরেছেন?


শেষ কবে সঙ্গীকে জিজ্ঞেস করেছেন, ‘তুমি কেমন আছ?’


দিনের পর দিন অভিমান, অবহেলা, অসম্মান কিংবা মানসিক দূরত্ব জমতে থাকলে শরীরও অনেক সময় সাড়া দিতে চায় না। কারণ, ঘনিষ্ঠতা শুধু শরীরের ঘটনা নয়। মনের নিরাপত্তা, বিশ্বাস, সম্মান এবং আপন হয়ে থাকার অনুভূতিও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। কেউ হয়তো যৌন সম্পর্ক চাইছেন, অন্যজন চাইছেন তার আগে একটু মনোযোগ। কেউ স্পর্শ চাইছেন, অন্যজন আগে একটি ক্ষমা চাওয়া শুনতে চাইছেন।


কেউ হয়তো আসলে বলতে চাইছেন—


‘আমার শরীরের কাছে আসার আগে, একটু আমার মনের কাছে এসো।’ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়ও নীরব করে দেয়।  সব নীরবতার পেছনে লজ্জা থাকে না। কখনো থাকে পুরোনো প্রত্যাখ্যান। একদিন আপনি কাছে যেতে চেয়েছিলেন। সঙ্গী হয়তো ক্লান্ত ছিলেন, আগ্রহ দেখাননি। সেটি খুব স্বাভাবিক ঘটনাও হতে পারে। কিন্তু আপনি মনে মনে নিয়েছেন, ‘ও আমাকে আর চায় না।’


আরেকদিন বলতে গিয়েও থেমে গেছেন। তারপর একসময় নিজেই নিজেকে বোঝাতে শুরু করেছেন—আমার এসবের দরকার নেই। কিন্তু দরকার ফুরিয়ে যায়নি। আপনি শুধু চাওয়াটাকে চুপ করিয়ে দিয়েছেন।  এই জায়গাটিই সম্পর্কের জন্য কঠিন। কারণ, নীরবতা বাইরে থেকে শান্ত মনে হলেও ভেতরে ভেতরে অভিমান জমতে পারে। 


‘না’ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ‘হ্যাঁ’ও তেমন

সুস্থ ঘনিষ্ঠতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোর একটি হলো—দুজনেরই নিজের ইচ্ছার কথা বলার নিরাপত্তা থাকা। আজ একজনের ইচ্ছে নেই—তিনি বলতে পারবেন। কোনো স্পর্শে অস্বস্তি হচ্ছে—বলতে পারবেন। আবার কোনো এক রাতে খুব কাছে থাকতে ইচ্ছে করছে—সেটিও বলতে পারবেন। এবং কোনো কথার জন্য কাউকে অপমানিত, ছোট বা অপরাধী বোধ করতে হবে না। বিয়ে হয়েছে বলেই একজনের শরীরের ওপর অন্যজনের স্থায়ী অধিকার তৈরি হয় না। আবার নিজের সঙ্গীকে কামনা করাও লজ্জার কিছু নয়।


ঘনিষ্ঠতা সুন্দর হয় তখনই, যখন সেখানে চাওয়া এবং না-চাওয়া—দুটোরই মর্যাদা থাকে।


কথাটা শুরু করবেন কীভাবে?

সব কথা শোবার ঘরেই বলতে হবে, এমন নয়। বরং এমন একটি সময় বেছে নেওয়া যায়, যখন দুজনেই শান্ত। অভিযোগ দিয়ে নয়, নিজের অনুভূতি দিয়ে শুরু করুন।


‘তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না’—এর বদলে হয়তো বলা যায়—


‘তোমার সঙ্গে আগের সেই কাছাকাছি সময়গুলো খুব মনে পড়ে।’ ‘আমি চাই, আমরা শুধু সংসারের কথা নয়, আমাদের নিয়েও একটু কথা বলি।’

‘তুমি যখন আমাকে জড়িয়ে ধরো, আমার খুব ভালো লাগে।’ ‘আমাদের ঘনিষ্ঠতায় তোমার কী ভালো লাগে, জানতে চাই।’-- এগুলো কোনো কৌশলী বাক্য নয়। মূল বিষয় হলো, সঙ্গীকে দোষী না বানিয়ে নিজের অনুভূতির দরজাটা খুলে দেওয়া।


তারপর তাঁর কথাটাও শোনা

কারণ, হতে পারে তাঁর ভেতরেও এমন অনেক কথা জমে আছে, যা তিনি বলতে পারেননি। একই বিছানায় থেকেও যেন অচেনা হয়ে না যাই

দীর্ঘ সম্পর্ক বদলায়। কাজ বাড়ে। সন্তান আসে। দায়িত্ব বাড়ে। শরীর বদলায়। বয়স বাড়ে। অসুস্থতা আসে। মানসিক চাপ আসে। কখনো যৌন আকাঙ্ক্ষা বাড়ে, কখনো কমে।


কিন্তু সম্পর্ক বদলেছে বলে ঘনিষ্ঠতা শেষ হয়ে যেতে হবে, এমন নয়। হয়তো আগের মতো প্রেম সম্ভব নয়। কিন্তু নতুন এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি হতে পারে, যেখানে দুজন মানুষ একে অন্যের শরীরের পাশাপাশি বয়স, ক্লান্তি, ভয়, অস্বস্তি এবং পরিবর্তনকেও চিনবেন।


তার জন্য কথা বলতে হয়

কারণ, যে মানুষটির সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছেন, তাঁর কাছে যদি নিজের সবচেয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতিটিই বলতে না পারেন, তাহলে কোথাও না কোথাও একটি দরজা বন্ধ থেকে যায়।


আজ রাতে হয়তো বড় কোনো আলোচনা দরকার নেই।


শুধু এতটুকু বললেও শুরু হতে পারে—


‘অনেক দিন তোমাকে একটা কথা বলতে চেয়েছি...’


হয়তো ওপাশের মানুষটিও অপেক্ষা করছিলেন।


একটি কথার জন্য।


একটু কাছে আসার জন্য।


কিংবা শুধু এই নিশ্চয়তার জন্য—


এত বছর পরও আমরা শুধু একই সংসারের দুজন মানুষ নই; আমরা এখনো একে অন্যের সঙ্গী।


*রোদসী ডেস্ক


ঢাকা/এসই/আরএস

sidebar ad