অপরূপ সাজে কনে

করেছে Sabiha Zaman

বিয়ের সাজের পরিকল্পনা একটু সময় নিয়েই করতে হয়। এখানে অনেক বিষয় জড়িত থাকে। নানা ধাপে চলে বিয়ের সাজের আনুষ্ঠানিকতা। কোনোটি কম গুরুত্ব বহন করে না। ফ্যাশন বদলায় ক্ষণে ক্ষণে। বিয়ের ফ্যাশনে থাকে বাড়তি আমেজ যা বর-কনেকে ভাবিয়ে তোলে বিয়ে শেষ হওয়া অবধি। এবার মহামারির জন্য বিয়ের আয়োজন হয়তো কিছুটা অন্য রকম হচ্ছে, তবে এবার ফ্যাশন ডিজাইনাররা বিয়ের ফ্যাশন নিয়ে ততটা নিরীক্ষা করার সুযোগ পাননি। গত বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রয়েছে। বিয়ের সাজসজ্জা ও যত্ন আত্তি নিয়ে এবারের আয়োজন :
বিয়ে ঠিক হওয়ার সময় থেকেই কনেকে নিজের যতœ-আত্তির বিষয়ে সচেতন হতে হয়। তাই যতেœর বিষয়ে কনের আইডিয়া থাকতে হবে, না থাকলে বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে।
নিয়মিত ত্বক পরিষ্কার
নিয়মিত ত্বক পরিষ্কার ত্বক ভালো রাখার প্রথম ধাপ। নিজের স্কিনের সঙ্গে ভালো যায়, এমন ফেসওয়াশ দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করতে হবে। মাঝেমধ্যে অয়েল ম্যাসাজ করে নেবে ত্বকে। কনেদের জন্য অয়েল ক্লিঞ্জিং বেশ ভালো কাজে দেবে। স্কিন সফট এবং টাইট রাখার জন্য অয়েল ক্লিঞ্জিং মাস্ট। নারকেল তেল, অলিভ অয়েল, ভিটামিন ই অয়েল এগুলো দিয়ে তো করা যাবেই, তা ছাড়া আর একটা বেস্ট অপশন হলো কোকোনাট মিল্ক। বাটিতে কোকোনাট মিল্ক নিয়ে ফ্রিজে ২০ মিনিটের জন্য ঠান্ডা হতে দাও। এরপর একটি কটন প্যাডের সাহায্যে পুরো মুখে লাগিয়ে নাও। এবার দুই হাতের মধ্যমা এবং রিং ফিঙ্গার দিয়ে মুখে ম্যাসাজ করে নাও ২-৩ মিনিট, এরপর ধুয়ে ফেলো।

কনের জন্য প্যাক

কিছুদিন আগে থেকেই প্যাক ব্যবহার করতে হবে। তাহলে ত্বকের  গ্লো ঠিক থাকবে।

  • ২ টেবিল চামচ বাটিতে চন্দন পাউডার, ১  টেবিল চামচ টক দই, ১ টেবিল চামচ কোকোনাট মিল্ক, হাফ টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে নাও। পুরো মুখ, গলা এবং চাইলে হাতে-পায়েও লাগিয়ে নিতে পারো মাস্কটি। ২০ মিনিট অপেক্ষা করে ধুয়ে নাও।
  •  বাটিতে ২ টেবিল চামচ বেসন, কোয়ার্টার টেবিল চামচ হলুদগুঁড়া, ১ টেবিল চামচ অ্যালোভেরা জেল, ১ টেবিল চামচ কোকোনাট মিল্ক নিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নাও। এই মাস্ক টি পুরো মুখ এবং গলায় ১৫-২০ মিনিট লাগিয়ে রেখে ম্যাসাজ করে ধুয়ে ফেলো। এই মাস্কটি রাতের বেলায় ব্যবহার করবে। অবশ্যই মাস্ক লাগানোর পরে টোনার এবং ময়েশ্চারাইজার লাগাবে।
  •  বিয়ের এক মাস আগে নতুন কোনো প্রোডাক্ট ট্রাই করার কথা মাথায় না আনাই ভালো। কোন প্রোডাক্ট স্কিনে কী রিয়েক্ট করে, তা তা বলা যায় না। এ জন্য আগের ব্যবহারকৃত বিশ্বস্ত প্রোডাক্টগুলোই চালিয়ে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বিয়ের আগে স্কিনে যদি পিম্পল, র‌্যাশ, ব্রেকআউট থাকে, তবে সবচেয়ে ভালো হয় স্কিন ডক্টরের শরণাপন্ন হওয়া। এটাও বিয়ের দুই-তিন মাস আগে করা উচিত।
  •  বিয়ের আগে যতবারই দিনের বেলায় বাইরে যাবে, সানস্ক্রিন মাস্ট। বাইরে যাওয়ার ২০ মিনিট আগে মুখ, গলা এবং সান এক্সপোজড এরিয়াগুলোতে এসপিএফ ৪০+ সানস্ক্রিন লাগিয়ে নেবে।


গায়েহলুদের মায়াবী সাজ
এখনকার বিয়েগুলোতে গায়েহলুদের আয়োজনটাই মনমাতানো। খুব ঘটা করে গায়েহলুদের আয়োজন করা হয়। এখন গায়েহলুদেও শাড়ির রঙের ক্ষেত্রে হলুদই থাকতে হবে, সে ধারণাও বদলেছে। গায়েহলুদে শাড়ির রঙের ব্যাকরণ তৈরি করে ফ্যাশন ডিজাইনাররা। এখন শুধু হলুদ নয়, একরঙা লাল, কাঁচা মেহেদির রং, সবুজও থাকতে পারে। আর শাড়ি সব সময় হলুদ হতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। তুমি চাইলে ভিন্ন রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নিতে পারো। ফেব্রিক হতে পারে মসলিন, সিল্ক, কটন, জামদানি। শাড়িতে খুব জমকালো কাজ না থাকলেই ভালো। হলুদে বরপক্ষের ও কনেপক্ষের আত্মীয়রাও একই ধরনের শাড়ি পরে। তবে শুধু শাড়িই যে পরতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। তুমি যদি কমফোর্ট ফিল করো, তাহলে পরে নিতে পারো লেহেঙ্গা অথবা লং কামিজ।

আর সঙ্গে মানানসই গয়না ও সাজ শুধু হলুদকে বেজ করে তুমি শাড়িতে নানা রঙের পাড় বসিয়ে দিতে পারো। তাহলে তোমার শাড়ি ও সাজে আসবে ভিন্নতা। আবার শাড়ি, গয়না সব যদি একই রঙের ম্যাচ করে পরে থাকো, তাহলেও কিন্তু দেখতে অনেক ভালো লাগবে। বøাউজের নকশায় থাকছে বাহারি রঙের ছোঁয়া। কাটছাঁটেও আসছে ভিন্নতা। থাকছে অনুষঙ্গের প্রাধান্য। হলুদের সাজে ফুলের গয়নার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে রুপালি অথবা সোনালি গয়না পরার চল। শুধু বাঁধা চুলেই নয়, হলুদের দিন খোলা চুলেও সাজছে কনেরা। হলুদের চলতি ধারার সাজে এমনই নানা পরিবর্তন কনের সাজে তুলে ধরছে বিশেষত্ব।

হলুদে নান্দনিক গয়না
গায়েহলুদে কাঁচা ফুলের গয়নাই বেশি মানানসই। এ ছাড়া শুকনো ফুলের সঙ্গেও পুঁতি-জরির কাজ, স্টোন দিয়ে তৈরি কৃত্রিম ফুলের মালা কিনতে পাওয়া যায়, যা শাড়ির রঙের সঙ্গে ম্যাচ করে অর্ডার দিয়ে বানিয়েও নেওয়া যায়। যেমন গয়নাই পরা হোক না কেন, ফুলের আকার ছোট হলেই ভালো। সাজের ভিন্নতা আনতে চাইলে রুপা বা পুঁথির গয়নাও পরতে পারো। হাতে থাকতে পারে ফুলের গয়না। হাতভর্তি কাচের চুড়ি তো আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি করবে।

হলুদের স্নিগ্ধ মেকআপ
গায়েহলুদের জন্য হালকা মেকআপই ভালো। হলুদের অনুষ্ঠানে একটা ঘরোয়া ভাব থাকে। গায়েহলুদে যদি হলুদ রঙের শাড়ি বেছে নেওয়া হয়, তবে মেকআপ হবে গোল্ডেন, ব্রাউন, ব্রোঞ্জ শেডের। মেকআপ হালকা হলেই ভালো দেখায়, চোখের সাজেও গোল্ডেন, ব্রোঞ্জ, ব্রাউন আইশ্যাডো ব্যবহার করো। সঙ্গে গাঢ় করে আইলাইনার। মাসকারা ও আইলাশের ব্যবহার চোখ দুটোকে করে দেয় অনেক বেশি আকর্ষণীয়। গালে ব্রাউন বøাশঅন, শেড আর ঠোঁটে ন্যাচারাল লিপস্টিক। লিপ গøস না ব্যবহার করে এমন লিপস্টিক ব্যবহার করা উচিত, যা বেশিক্ষণ পর্যন্ত থাকে।মেহেদি
হলুদে নকশার জন্য টিউব মেহেদি ব্যবহার করতে পারো। বর্তমানে মেহেদির ডিজাইনের ক্ষেত্রে অ্যারাবিয়ান ডিজাইন চলছে বেশি। অ্যারাবিয়ান ডিজাইনের ক্ষেত্রে কালো মেহেদি এবং সাধারণ মেহেদি দুটোই ব্যবহার করা হয়। এ ক্ষেত্রে বর্ডারে কালো মেহেদির ব্যবহার হয় এবং ভেতরের সূ² ডিজাইনটি হয় সাধারণ মেহেদির দ্বারা। এ ছাড়া হলুদের অনুষ্ঠানে যদি মেহেদি পরতে চাও, তাহলে ডিজাইনটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে ব্যবহার করতে পারো ফেব্রিক্স, স্টোন ও চুমকি।

বিয়ের স্বপ্নিল সাজ
প্রতিটি মেয়েরই নানা স্বপ্ন থাকে তার বিয়ের দিনটিকে ঘিরে। বিয়ের বেশ অনেক দিন আগে থেকেই নানা জল্পনাকল্পনা চলতে থাকে, বিশেষ করে সাজ কেমন হবে, তা নিয়ে। ব্রাইডাল মেকআপ একটু বেশি অন্য রকমের হয়। বিয়ের সাজের সবচেয়ে বড় ভুল যেটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, কনের মুখে মেকআপের পরত চড়িয়ে-চড়িয়ে সাদা করে দেওয়া! আসলে আমাদের গায়ের রঙের সঙ্গে মানানসই করে মেকআপের শেডগুলো বাছলে তা দেখতে ভালো লাগে। বেশির ভাগ বাঙালি কনের বিয়ের মেকআপ হয় একটু লালচে বা গোলাপি ঘেঁষা, নিজের স্কিন টোন অনুযায়ী ফাউন্ডেশন এবং অন্যান্য মেকআপের শেড বেছে নাও এবং খুব ভালো করে বেøন্ড করে বিয়ের মেকআপ করে নাও। এখনকার বিয়ের সাজের প্রধান অংশ ধরা হয় চোখের মেকআপ। হালকা গোলাপি বা বাদামি শেডের গিøটার দেওয়া আইশ্যাডো খুব ভালো করে বেøন্ড করো চোখের ওপরের অংশে। চাইলে রঙিন আইলাইনার বা গ্লিটার দেওয়া আইলাইনার লাগাতে পারো, তা না হলে কালো জেল আইলাইনার লাগাও। বাঙালি কনে আর লাল বেনারসি, এ যেন একে অপরের পরিপূরক।

নিজের স্কিনটোনের সঙ্গে মানানসই শেড বেছে বেস মেকআপ করে নাও এবং তারপর সোনালি আইশ্যাডো লাগাও চোখে। তবে শুধু সোনালি আইশ্যাডো নয়, সঙ্গে অন্যান্য মানানসই শেড মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ করে চোখের মেকআপ করবে। ঠোঁটে লাগাও লাল রঙের ম্যাট লিপস্টিক। বিয়ের মেকআপ অবশ্যই ফেসের ধরন অনুযায়ী হতে হবে। ফেসের ধরন অনুযায়ী মেকআপ সিলেক্ট করা খুব জরুরি। বিয়ের মেকআপের আগে ফেসিয়াল, অয়েল ম্যাসাজ, ময়েশ্চারাইজার এবং মেকআপ প্রাইমার ব্যবহার করা উচিত। বিয়ের দিন সাধারণত একটু ব্রাইট সাজ ভালো লাগে। শাড়ির কালারের সঙ্গে চোখের শেড মিলিয়ে লাগালে ভালো লাগবে। বিয়ের মেকআপ একটু শাইনি হতে হয়, কারণ কনেকে সবাই অনেক দূর থেকে দেখবে। চোখের জন্য চোখের গড়ন অনুযায়ী ডাইমেনশন ক্রিয়েট করতে হয়। ব্রাইডাল মেকআপের জন্য আলাদা একটা স্পেস থাকা উচিত।

বউভাতে গর্জিয়াস
বিয়ের পর বউভাতের আগে যদি হাতে সময় থাকে, তাহলে একটি ফেসিয়াল নিলে ভালো হবে। বিয়ে যদি ট্র্যাডিশনাল সাজে হয়ে থাকে, তাহলে বউভাতের সাজটা মডার্ন লুকে ভালো লাগবে। এ জন্য লাল রঙের পরিবর্তে অন্যান্য কালার পরলেও ভালো লাগে। চুলে হাফ স্পাইরালের সঙ্গে খোঁপা করলে ভালো লাগে। খোঁপায় থাকা চাই ফুল, তা পোশাক ও সাজের সঙ্গে মিল রেখে। বউভাতে তুমি নুড মেকআপ করাতেই পারো। নুড মেকআপ মানেই ‘নো মেকআপ’ নয়। লাল টুকটুকে বেনারসি না পরে যদি অন্য কোনো হালকা রং পরো, সে ক্ষেত্রে এই মেকআপটি খুব ভালো লাগবে। তবে মেকআপের সরঞ্জামের সবকিছুই নুড শেডের হলেও কিন্তু আইভ্র আঁকবে মোটা করে, তাতে মুখের ফিচারগুলো বেশ হাইলাইটেড হবে। গত কয়েক বছরের ব্রাইডাল মেকআপ প্যালেটে আধিপত্য দেখা যাচ্ছে প্যাস্টেল রঙের।

যেমন মভ, ল্যাভেন্ডার, আইভরি, স্যামন পিংক, পিচ, পিচ-পিংক, মিন্ট গ্রিনের মতো রং। সঙ্গে মেকআপও হচ্ছে ন্যুড। মেকআপ আর্টিস্টের নিপুণ হাতে কনের চোখে দেখা যাচ্ছে পিঙ্ক স্মোকি, অরেঞ্জ স্মোকি, প্লাম স্মোকি, পার্পল স্মোকি, ডার্ক পিঙ্ক স্মোকি আইজ। এইচডি মেকআপ পদ্ধতিতে তোমার মুখের সেরা ফিচার্সগুলো হাইলাইট করে মুখের খুঁত ঢেকে ফেলা হয় এমনভাবে, যাতে ছবিতে ও ভিডিওতে তোমাকে ফ্ললেস লাগে। হালকা বা ন্যাচারাল লুক রাখতেও এই মেকআপ কার্যকরী।

লেখা: নুসিয়্যাত মায়োমি

ছবি : রোদসী ও সংগৃহিত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like