অফিস আউটফিট

করেছে Rodoshee Magazine

অফিস এখন আর সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের একটি কর্মস্থলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং দিনের সবচেয়ে বেশি সময় অফিসেই কাটে। শুধু সময় কাটিয়েই অফিস আমাদের জীবন থেকে বিদায় নেয় না। আসলে অফিস এখন আমাদের জীবনের একটি প্রধান অংশ। যতই অবকাশযাপনের জন্য দূরেই যাই না কেন, মুঠোফোনের বদৌলতে অফিস সব সময়ই আমাদের সঙ্গে থেকে যায়।

অন্যদিকে এখন আর শুধু টেবিলে মুখ গুঁজে একমনে কাজ করে গেলেই সাফল্য আসে না। বরং নিজের বাহ্যিক এবং ব্যক্তিত্বের উপস্থাপনা পারফরম্যান্সের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। আর সঠিক পোশাকের মাধ্যমে ব্যক্তিত্বের প্রকাশও যে অনেক উন্নত হয়ে যায়, তা বলা বাহুল্য। এই পোশাক যেহেতু আমাদের ক্যারিয়ারে এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, সুতরাং অফিস আউটফিট নিয়ে কিছুটা আলোচনা না করলেই নয়।
পোশাক তথা অফিসের সাজপোশাক নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে এ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্র্ণ।
তাই এ বিষয়ে এখানে নারী ও পুরুষের সাজপোশাক সম্পর্কে আলাদাভাবে আলোচনা করা হবে। তারপরও কিছু সাধারণ নিয়ম নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেমন পারফিউমের ব্যবহার, পোশাকের স্বাচ্ছন্দ্য, পরিবেশ উপযোগিতা, যথার্থ ফিটনেস ইত্যাদি নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে খুব কমই ভিন্ন হয়ে থাকে। এই কারণে মূল আলোচনা ছাড়াও থাকবে কিছু টিপস, যা নারী ও পুরুষ উভয়েই সহজে মেনে চলতে পারবে।

নারীদের অফিসের পোশাক
নারী সভ্যতার আদিকাল থেকেই দশভুজার মতো দুই হাতে চারপাশের গোটা পৃথিবীটাকে আগলে রেখেছে। হাউসওয়াইফ হও বা কর্মজীবীই হও নারীকে একই সঙ্গে ঘর ও বাহির উভয়ই সামলাতে হয়। কখনো এই যুদ্ধে তার সঙ্গে থাকে সহযোগিতার এক বা একাধিক হাত, আবার কখনোবা একাই তাকে এই যুদ্ধের মোকাবিলা করতে হয়। কিন্তু যুদ্ধ যতই সাধারণ বা সাংঘাতিক হোক না কেন, নারীকে একই সঙ্গে গুণবিচারী ও দর্শনধারী দুই-ই হতে হবে।
এই জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত প্রস্তুতির। পরদিন অফিসে কী পরে যাবে, তা আগের দিন রাতেই প্রস্তুত করে রাখো। এ জন্য পরের দিনের কার্যাবলি সম্পর্কেও প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। তুমি যদি জানো যে পরদিন তোমার কাজের তালিকায় কী কী আছে যেমন কোনো বিশেষ মিটিং, অ্যাপয়েন্টমেন্ট, দাওয়াত বা অন্য প্ল্যান আছে কি না। থাকলে সে অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করে রাখো।
তবে সব সময় মনে রাখবে, এমন কোনো পোশাক নির্বাচন করবে না যেন তোমার মূল কাজে বাধা আসে। যদি তোমার দিনটি কাজে ভরপুর হয়, তাহলে যে ধরনের পোশাকে তুমি সবচেয়ে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করো, তা-ই পারবে।
যদি সালোয়ার-কামিজে তুমি বেশি স্বচ্ছন্দ থাকো, তাহলে সেটি পরো। মনে রাখবে, বাঙালি নারী বাঙালি পোশাকেও একই রকম আধুনিক।

আর যদি তোমার স্বাচ্ছন্দ্য পশ্চিমা পোশাকে বেশি হয়ে থাকে, তাহলে সে ক্ষেত্রেও কিছুটা ঢিলেঢালা পোশাক নির্বাচন করো। আঁটসাঁট পোশাকে না তুমি স্বচ্ছন্দবোধ করবে, আর না দেখতে ভালো দেখাবে। আর অফিসের জন্য পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় সব সময় খেয়াল রাখবে, পোশাক হতে হবে এলিগেন্ট, কিন্তু জমকালো নয়। পোশাকের ফিটনেস, কাট, প্যাটার্ন ও স্টিচিং হতে হবে নিখুঁত। পোশাক প্রিন্টেড না হয়ে সলিড রঙের হলেই বেটার। তবে হালকা রঙের ওপর ছোট ছোট প্রিন্ট মন্দ নয়। কিন্তু অতিরিক্ত রঙিন বা বড় বড় ছাপার পোশাক অফিসের জন্য মোটেও মানানসই নয়। সেই সঙ্গে পোশাকে সিকুইন বা অন্য অ্যাকসেসরিজের ব্যবহার না হওয়াটাই ভালো। পশ্চিমা পোশাকের নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরামর্শ এই যে জিনস পরবে না। তোমার অফিসের পরিবেশ যদি পুরোপুরি ক্যাজুয়াল পোশাকের জন্য উপযোগী, তাহলে অবশ্য কথা ভিন্ন। আর সেমি ক্যাজুয়াল পোশাকের ক্ষেত্রে জিনসের সঙ্গে লম্বা কুর্তি পরো।
ফেব্রিকের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভারী ফেব্রিক বা সুতি কাপড়কেই বেছে নিতে চেষ্টা করো। সিল্ক বা জর্জেট দেখতে ভালো লাগলেও বা আরামদায়কবোধ হলেও ঠিক ফরমাল হিসেবে মানায় না। আর ভালো মানের জামদানি ও সুতির শাড়ি এবং সঙ্গে মানানসই শাল যেন সব সময়ই সংগ্রহে থাকে, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। শীতে ব্যবহারের জন্য শালে সবচেয়ে বেশি ফরমাল দেখাবে। আর যদি পশ্চিমা পোশাক পরো, তাহলে ব্লেজার পরাই উত্তম। তবে জ্যাকেট বা সোয়েটার কোনোটাই কিন্তু মেয়েদের অফিসের পোশাক হিসেবে মানানসই নয়। বরং বেখাপ্পাও লাগতে পারে।

জুতোর বেলায় বলব

সব সময়ই সামনের দিকে ঢাকা সামান্য হিলওয়ালা জুতা অর্থাৎ পাম্প হিল ব্যবহার করো। যদি হিলে সমস্যা থাকে, তাহলে লোফার ব্যবহার করো। চামড়ার জুতোয় তোমার পোশাকের আভিজাত্য এমনিতেই এক ধাপ বেড়ে যাবে। হাতে সব সময়ই মানানসই ঘড়ি পরো। এতে দেখতে যেমন স্মার্ট লাগবে, তেমনি তোমার পোশাকের পেশাদারি ভাবটিও ফুটে উঠবে। আর ব্যাগের ব্যাপারে বলব টোট ব্যবহার করো। এটি একদিকে যেমন বেশ অনেক জিনিস একসঙ্গে এঁটে যাবে, তেমনি ব্যবহারেও সুবিধা। তা ছাড়া আজকাল প্রায়ই পার্টিতে সোজা অফিস থেকেই যেতে হয়, সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মেকআপ, একটা জমকালো স্টোল অনায়াসেই এই ব্যাগে করে নিয়ে যেতে পারবে। এমনকি অফিসের জন্য লাঞ্চও এতেই নেওয়া যাবে। ভুলেও কখনো অফিসে ব্যবহারের জন্য কারুকার্যখচিত ব্যাগ, জুতা বা অন্য কোনো কিছুই ব্যবহার করবে না। জুয়েলারির বেলায় হালকা ডিজাইনের প্লাটিনাম বা ইমিটেশন বা প্লেটেড সোনার চুড়ি পরতে পারো, সঙ্গে একই রকম মানানসই কানের দুল। তবে কোনো কিছুতেই বাড়াবাড়ি যেন না হয়। আংটিও থাকতে পারে সঙ্গে।

পুরুষদের অফিসের পোশাক
পুরুষদের বেলায় এখন আর ফ্যাশন বা সাজসজ্জা নিয়ে রাখঢাক চলে না। এখন তারাও ফ্যাশন ব্যবসার অন্যতম ক্রেতা। আজকাল পুরুষেরাও অফিসে ফিটফাট থাকতে সচেষ্ট। কারণ বলাই বাহুল্য, নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলে ধরতে যে কেউ চাইবে। আর সেই সঙ্গে যদি নারী সহকর্মী থেকে প্রাপ্ত কর্মসংক্রান্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়, তাহলে এই ব্যাপারেও সচেষ্ট থাকতে হবেই। পুরুষের পোশাকের মধ্যে এখন আর শুধু মানানসই টাই বা ব্লেজারই প্রাধান্য পাচ্ছে না। বরং, ফর্মাল শার্ট পুরুষদের ফ্যাশনের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ফুল স্লিভ শার্টের পাশাপাশি হাফ স্লিভ শার্টও সমানভাবে জনপ্রিয়। আর রঙের বেলায়ও পুরুষেরা ভালোই এক্সপেরিমেন্ট করছে। তবে অফিসের পোশাক হিসেবে গাঢ় রংকে বেছে না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। সেই শার্টটি কোনো গর্জিয়াস পার্টির জন্যই তুলে রাখবে। তার চেয়ে বরং হালকা রঙের শার্টকেই বেছে নাও অফিসের জন্য, সেই সঙ্গে থাকতে পাওে স্ট্রাইপস বা চেক। রংচঙা প্রিন্টের শার্টটিও রেখে দিতে পারো কোনো বিচে ভ্রমণের জন্য। আর টি-শার্ট তো অফিসে একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়, যদি না কোনো স্পোর্টস ইভেন্ট থেকে থাকে।
অফিসের পোশাকের জন্য অবশ্যই ভালো মানের ভারী ফেব্রিক নির্বাচন কর। হালকা ফেব্রিক পোশাকের পেশাদারি আবেদন বেশ খানিকটাই নষ্ট হয়ে যায়। ভালো মানের ও হালকা রঙের সুতি বা খাদির পাঞ্জাবি অফিসের ইভেন্টের জন্য বেশ মানানসই। কিন্তু সিল্কের পাঞ্জাবি না পরাই ভালো। সেই সঙ্গে ভালো স্যান্ডালও আবশ্যক। আর শীতের দিনে সোয়েটারের বদলে শাল ব্যবহার করো। তবে শার্টের সঙ্গে স্লিভলেস সোয়েটার ভালোই মানাবে। কিন্তু জ্যাকেট অফিসের পোশাকের সঙ্গে একেবারেই মানানসই নয়। বরং ব্লেজার ব্যবহার করো। এ ক্ষেত্রেও ন্যুড শেডের দিকে গুরুত্ব দিতে পারো আর একগাদা পোশাকের পরিবর্তে তোমার সংগ্রহে মানসম্পন্ন কয়েকটি পোশাক রাখো।
হাতঘড়ি আর টাই এই দুটি অ্যাক্সেসরিজ যে পুরুষের অফিস পোশাকের জন্য অত্যন্ত আবশ্যক, এটা নিশ্চয় বলে দিতে হবে না। তবে তার মানে কিন্তু এই নয় যে ক্লোজেটভর্তি দামি দামি ঘড়ি আর টাই থাকতে হবে। বরং ভালো মানের দু-তিনটি সংগ্রহ থাকলেই যথেষ্ট। এ ক্ষেত্রে রং নির্বাচনের বেলায় একটু সচেতন হতে হবে। সাধারণত ন্যুড শেডের টাই এবং রুপালি রঙের চেনওয়ালা ঘড়ি বা চামড়ার বেল্টের ঘড়ি সব ধরনের পোশাকের সঙ্গেই মানানসই। জুতার বেলায় চামড়ার সঙ্গে কোনো বিতর্কে যাওয়াই বোকামি। ল্যাটেক্স সব ক্ষেত্রে মানানসই যেমন হয় না, তেমনি পোশাকের আভিজাত্যও বেশ কমে যায়। তবে চামড়ার জুতা মানেই কিন্তু দামি জুতা নয়। বরং আমাদের দেশে এখন বেশ সাধ্যের মধ্যেই আন্তর্জাতিক মানের চামড়ার জুতো তৈরি হচ্ছে।
পারফিউম ও আফটার শেভ লোশনের সঙ্গে কোনো রকম আপস একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। চুলের জেল এখনকার যুগে বেশ সাধারণ একটি বিষয় হলেও সেটা যেমন সবাইকে মানায় না, তেমনি সবার চুলের জন্য উপযুক্তও নয়। তাই ব্যবহারের আগে একটু যাচাই করে নেবে। ব্যাগের বেলায় তুলনামূলক বড় সাইজের চামড়ার ব্যাগ ব্যবহারেরই পরামর্শ দেব।

প্রো টিপস
 জুতা সব সময়ই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও ঝকঝকে রাখো।
 অফিসে ব্যবহারের পারফিউম হালকা হতে হবে।
 জমকালো পোশাক অফিসে ব্যবহার থেকে বিরত থাকো।
 পরের দিনের পোশাক আগের দিন রাতেই নির্বাচন করে, ইস্ত্রি করে রাখো।
 চুল পরিষ্কার ও পরিপাটি রাখো।
 পোশাকের যত্নে সচেতন হও ছেঁড়াফাটা পোশাক বা অনুষঙ্গ ব্যবহার করবে না।
 টাকাপয়সা ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কার্ড আলাদাভাবে ওয়ালেটে রাখো।
 সংখ্যার চেয়ে, পোশাকের মানের দিকে বেশি গুরুত্ব দাও।

লেখা : সোহেলী তাহমিনা

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

7 − one =