অবলা নারীর সবলা কথন!

করেছে Rodoshee

‘নারিকেলের মালা বড় কাজে লাগে না, স্ত্রীলোকের বিদ্যাও বড় নয়।’ বঙ্কিমচন্দ্রের কমলাকান্তের উক্তি। ছোট্ট এবং সহজ স্বীকারোক্তিটি অনেক নারীই মাথা পেতে নেয়, একেবারে ছোট্টবেলা থেকেই। যখন তাকে খেলনা হিসেবে কিনে দেওয়া হয় হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল, সাজ পোশাকের জিনিস পত্তর। সে তো সেই আমলের কথা। কিন্তু এই আমলেও কি এর কোনো পরিবর্তন ঘটেছে?
নিজেকে জিজ্ঞেস করো প্রিয়তমাষু
তোমার কন্যা সন্তানকে রোবট কেন কিনে দিচ্ছো না? কিংবা রকেট, প্লেন, গাড়ি? নারীর সঙ্গে এসবের সম্পর্ক নেই বুঝি? হ্যাঁ। খুব ছোট্ট বয়সে কন্যা শিশুটির মগজে-মননে আমরা প্রোথিত করে দিচ্ছি- নারী তুমি অবলা! তোমার দৌড় সংসারের হাঁড়িটি- ট্রেন কিংবা গাড়িটি নয়, যেটার একসময় চালক হবে বলে নিজেকে কল্পনা করে নিতে পারো।
সীমারেখা টেনে দেওয়া শিশু কল্পনার জগৎটি তাই কোনো রাজপুত্রের অপেক্ষায় থাকে, যে এসে বিয়ে করে তাকে নিয়ে যাবে শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু সেখানেও কি সে স্বাধীন? ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০১৫’ শীর্ষক এ জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের বিবাহিত নারীদের ৮০ দশমিক ২ শতাংশ স্বামী ও শ্বশুরপক্ষীয়দের দ্বারা কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার। সে নির্যাতন শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক বা যৌন হতে পারে। শহর এলাকায় এ হার ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং গ্রাম এলাকায় ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ৪১ শতাংশ নারী স্বামীর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার। আর তার সঙ্গে মানসিক নির্যাতন তো আছেই! প্রতিটি পদে পদে তাকে পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হয় যে, সে মোটামুটি সংসার চালনার মতো সবলা!
বর্তমান যুগে সর্বক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমকক্ষ প্রমাণিত হচ্ছে। বিশ্বজয় করছে সে। কিন্তু তারপরও নারীর রাজপুত্ররা তার মনে দৃঢ়ভাবে গেথে দিচ্ছে এক অন্ধকার ধারণা। আর তা আজও নারীর শরীরে লেপ্টে থাকে ‘Frailty thy name is woman..’ হিসেবে! নিজের অজান্তে নারীর মনেও এই বিশ্বাস গাথা হয়ে গেছে যে সে বৃত্তে বন্দি প্রাণী, তার দৃষ্টির সীমানা সংকীর্ণ, মেধাচর্চার চাইতে ঘর-গেরস্থালি, সন্তানের জন্মদান আর প্রতিপালনেই তার জীবনের সার্থকতা। আর পুরুষশাসিত সমাজ নারীকে এভাবেই দেখতে চায়। নারীও নিজেকে এই জীবনে মানিয়ে নেওয়ার জন্য জন্মের পর থেকে তৈরি হয়। মেয়েদের অসহায় নীরবতার আড়ালে থাকে যন্ত্রণা আর অপমান। নীরব সেই যন্ত্রণা তাকে প্রতিনিয়ত দগ্ধ করে।

তবু তো দিন বদলায়…দিন বদলেছে
এখনো কিছু কিছু নারী সমাজবদলের জন্য পরিবর্তনের জয়গান গায়। মেধা-মননে অনেক এগিয়ে যাচ্ছে নারী। কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করছে। দেখাচ্ছে কৃতিত্ব। নারীরা এখন রাষ্ট্র পরিচালনা করছে, পর্বত জয় করছে, অগ্রণী ভূমিকা রাখছে অর্থনৈতিক উন্নয়নে। সব ধরনের খেলায়ও পুরুষের পাশাপাশি আজকের নারীরা পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। নারী অধিকার ও ক্ষমতায়নে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ।
তবু পরিবার ও সমাজে নারীর স্থান এখনো পুরুষের সমকক্ষ নয়। পুরুষশাসিত সমাজ মনে করে, পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে নারীর মতামতের খুব প্রয়োজন নেই। ফলে নারী তার ন্যায্য অধিকার এখনো পায়নি। নারীর পথচলায় এখনো অনেক বাধা রয়েছে সমাজে। ধরণী-মহাকাশ জয় করার পরও তাকে পদে পদে থামতে হয়। থামতে সে বাধ্য। হয় সমাজ নয়তো সমাজের ধর্ম কিংবা ধর্মের মর্ম তাকে থামতে বাধ্য করে। নারী ফুটবল ক্রিকেট খেলা যাবে না, যত্রতত্র গতিবিধি তথা সন্দেহজনক পরপুরুষের প্রতি আসক্তি, স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত ইত্যাদি শর্ত নানাভাবে কাঁটা এসে প্রতিনিয়ত বিঁধছে নারীর অগ্রগতির পদক্ষেপে।
বাদ পড়েননি বেগম রোকেয়াও!
ধর্ম ও নারীর বাধা নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘স্ত্রী জাতির অবনতি’তে। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের যথাসম্ভব অবনতি হওয়ার পর দাসত্বের বিরুদ্ধে কখনো মাথা তুুলিতে পারি নাই তাহার প্রধান কারণ এই বোধ হয় যে, যখনই কোন ভগ্নী মস্তক উত্তোলনের চেষ্টা করিয়াছেন, অমনই ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচনরূপ অস্ত্রাঘাতে তাহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। যাহা সহজে মানি নাই, তাহা পরে ধর্মের আদেশ ভাবিয়া শিরোধার্য করিয়াছি। আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্য পুরুষগণ ওই ধর্মগ্রন্থগুলিকে ঈশ্বরের আদেশপত্র বলিয়া প্রকাশ করিয়াছেন। তবেই দেখিতেছেন এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষ-রচিত বিধিব্যবস্থা ভিন্ন আর কিছুই নহে। যেখানে ধর্মের বন্ধন অতিশয় দৃঢ়, সেখানে নারীর প্রতি অত্যাচার অধিক। যেখানে ধর্মবন্ধন শিথিল সেখানে রমণী প্রায় পুরুষের ন্যায় উন্নত অবস্থায় আছেন।’ রোকেয়ার এই সাহসী উচ্চারণ, বৈপ্লবিক ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ উঠেছিল। গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় তাঁর লেখার কিছু অংশ বাদ দিয়ে ছাপাতে হয়।
ভেবে দেখো, এই আমলে এসেও অল্প কিছু শহুরে ক্ষেত্র ছাড়া এসবের কিছুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। এখনো গ্রামাঞ্চলে অনেক নারী কেবলই পুরুষের অন্দরমহলের বাসিন্দা, বাহ্যিক অধিকার হারিয়ে ফেলা অতি মাত্রায় নারী! এমন অধীনতার কবলে পড়ে যে, তাদের মুক্তির বিষয়টি তারা রীতিমতো ভুলতে বসে এবং ক্রমে হয়ে পড়ে পুরুষের ইচ্ছাধীন।
সত্যি বলতে কী, সমাজের ওপর থেকে নিচে এই ধারা একইভাবে প্রবল হয়ে অনেক ক্ষেত্রে অবস্থা এমন হয়েছে যে, নারীর শারীরিক অস্তিত্ব বজায় থাকলেও এক আবদ্ধ প্রাণীর মতো তারা কেবল পুরুষেরই বাহুলগ্না, ভোগ্যা ও দয়ার পাত্র।
হ্যাঁ। নারী, তোমাকেই বলছি। নিজের অবস্থান নিয়ে আক্ষেপ না করে নিজের ভূমিকে শক্ত করো। তোমার ঘরে নতুন যে কন্যাশিশুটি জন্ম নিল তাকে সবলা নারী করতে হলে তোমাকেই যে আগে তৈরি হতে হবে! তার হাতে পুতুল হাঁড়ি তুলে দিয়ে তার মননকে আবদ্ধ কোরো না। খেলনার দোকানে গিয়ে সে যদি চায় তাহলে তাকে বন্দুক কিনে দিয়ে তাকে বলো, ‘মা! এই বন্দুক দিয়ে তুমি দেশকে রক্ষা করবে শত্রুর হাত থেকে। দেশজয়ী হও। বিশ্বজয়ী হও। সবলা হও।’

লেখা: তাহমিনা সানি

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

12 − two =