আড্ডা ও আলাপে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় 

করেছে Sabiha Zaman

আজকের দিনেই ৮৬ বছরে পা রাখলেন দুই বাংলার খ্যাতিমান অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ঠিকি ধরেছেন আজ এই জনপ্রিয় ভারতীয় বাঙালী অভিনেতার ৮৬তম জম্মদিন। ১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে জম্ম। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের।তার পরিবারের আদি বাড়ী ছিলো বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার শিলাইদাহের কয়া গ্রামে। এই অভিনেতার জম্মদিন উপলক্ষ রোদসীতে আজ দেওয়া হলো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাথে আলাপ ও আড্ডা।

সেই দিনের কথা, সেই সকালের কথা মাঝেমধ্যেই জ্বলজ্বল করে মনে। সেদিন ছিল শুক্রবার, ২০১৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। সকাল সাড়ে ১০টায় আসার কথা তার। তবে তার আগেই আমরা উপস্থিত হয়েছিলাম রাজধানীর সেগুনবাগিচার শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার কক্ষে।উপস্থিত হয়েছিলাম আমরা কয়েকজন সাংবাদিক ও শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষ।ঠিক সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে দৃপ্ত পায়ে হলেন এক চিরসবুজ নায়ক।পরনে তার জিনস প্যান্ট, নীল রঙের হাফহাতা শার্ট। সৌম্যকান্তি চেহারার আশি পেরোনো সেই তরুণের নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়! সেমিনার কক্ষে ঢুকেই তিনি বললেন, ‘সুপ্রভাত! বাংলাদেশে এলেই মনটা ভালো হয়ে যায় আমার। কেননা এই বাংলাদেশের সাথেই তো আমার নাড়ির সংযোগ। তাই সব সময়ই এ দেশের প্রতি নাড়ির টান অনুভব করি।’

অভিনয় কিংবা আবৃত্তি করতে নয়, আমাদের সঙ্গে আলাপচারিতা, বলা যায় আড্ডা দিতেই শিল্পকলা একাডেমিতে হাজির হয়েছিলেন দুই বাংলার জীবন্ত কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।সেদিন সেই আলাপচারিতায়, আড্ডায় প্রাণোচ্ছল ভঙ্গিমায় তিনি বলেছিলেন তার ব্যক্তি ও শিল্পীজীবনের নানা অজানা কথা।বলেছিলেন বাংলাদেশ সম্পর্কে তার ভালোবাসার কথা, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগের কথা। বলেছিলেন বাংলাদেশ ও ভারতের চলচ্চিত্র -নাটক ও সংস্কৃতি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের।তার পরিবারের আদি বাড়ী ছিলো বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার শিলাইদাহের কয়া গ্রামে।

 

১৯৫৯ সালে বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে অভিনয়জগতে পথচলা শুরু করেছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তারপর ইতিহাস, তার পথচলা। বিস্ময়কর সাফল্য, মুগ্ধকর সব অর্জন। সৌমিত্র প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করেছিলেন। যার ফলে পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি, শুধুই সামনে চলা শুরু হয়ে যায় তার। শুরু হয়ে যায় শিল্পের নানা মাধ্যমে তার পদচারণ। সৌমিত্রের সেই পথচলা এখনো অটুট। তিনি সত্যজিৎ রায়ের ১৪টি ছবিতে অভিনয় করেন।

দুই শতাধিক চলচ্চিত্র, নাটকে অভিনয় করেন। চলচ্চিত্র, মঞ্চনাটক, টিভি নাটকসহ শিল্পের নানা মাধ্যমে কাজ  করে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। বাংলাদেশ ও ভারতের সুধীমহলে উ”চ প্রশংসিত তার নাট্যাভিনয়, পরিচালনা এবং রচনা। অভিনয়, আবৃত্তির পাশাপাশি তিনি একজন কবিও। তার কাব্যচর্চার ফসল পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ। এ  ছাড়াও তিনি সম্পাদনা করেছেন, কাজ করেছেন শিল্প-সংস্কৃতির নানা অঙ্গনে। অভিনয়ের জন্য ভারতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন। দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেয়েছেন সম্মানসূচক ডি-লিটসহ নানা পুরস্কার। ফরাসি সরকারের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যখন ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, তখন তার বয়স মাত্র ২৩ বছর। তরুণ বয়সে চলচ্চিত্রে অভিনয় করার সময় সৌমিত্র যতটা আকর্ষণীয় ছিলেন, ৮০ বছর বয়সে ‘অহল্যা’ শর্ট ফিল্মে অভিনয়েও ততটাই।  এখন তার বয়স ৮৬ পেরিয়ে।এখনো তিনি স্মার্ট, সমান আকর্ষণীয় কী ব্যক্তিত্বে, কী বাচনভঙ্গিমায়! কী চমৎকার করে যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যয় কথা বলেন, কী শুদ্ধভাবে ও সঠিক উ”চারণে! আহা! আমরা মুগ্ধ হয়ে তার কথা শুনেছিলাম, তন্ময় হয়ে তাকে দেখেছিলাম। কিংবদন্তি অভিনেতার সান্নিধ্য পেয়ে আনন্দ-আড্ডায় মেতে উঠেছিলাম।

পরিচয়পর্ব শেষে শুরু হয় আড্ডা ও আলাপন। ঘড়ির কাঁটা তখন বেলা ১১টা। আমাদের আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। সূচনাপর্বে গোলাম কুদ্দুছ ভাই প্রশ্ন করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। পর্যায়ক্রমে আমি তঁকে নানা প্রশ্ন করি, প্রশ্ন করে আমার কয়েকজন বন্ধু ও কয়েকজন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যখন ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন, তখন তার বয়স মাত্র ২৩ বছর।

 

পাক্কা দুই ঘণ্টার আলাপচারিতা। মাঝে চা-কফির আপ্যায়ন। মাঝেমধ্যে হাস্যরস, কৌতুক, সিরিয়াস সব কথাবার্তাও। আড্ডা-আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মেলে ধরেন নিজের মনের জানালা, খুলে দেন তাঁর ঘরের-বাইরের চলচ্চিত্র। উন্মোচন করে যেন ঢেলে দেন কথার ফোয়ারা।

গোলাম কুদ্দুছ ভাইয়ের প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্র বলেন,

‘আমার বাবা একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন। অভিনয় ও আবৃত্তির প্রতি ঝোঁক ছিল তার। কিন্তু তখনো অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়ার প্রশ্নটি ওঠেনি। এ কারণেই হয়তো বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে ওকালতি পেশায় নিযুক্ত ছিলেন বাবা। কিন্তু একান্ত নিমগ্নতায় বাবাকে অভিনয় আর আবৃত্তিটাই করতে দেখেছি। প্রথম জীবনে বাবার কাছ থেকেই আবৃত্তি শিখেছি। বাবা আমাকে বোঝাতেন কীভাবে অভিনয় করতে হয়, আবৃত্তি করতে হয়। ছোটবেলায় বাবা জোরে উচ্চারণ করে বোঝাতেন সঠিক উচ্চারণবিধি, বোঝাতেন আবৃত্তির কলাকৌশল। মূলত বাবাকে  দেখেই একসময় অভিনয় ও আবৃত্তির প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। পরে কলকাতায় শিশিরকুমার ভাদুড়ীর অভিনয় দেখে অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। তারপর তো অভিনয় হয়ে ওঠে আমার জীবনের আরাধ্য।’

আপনি যদি অভিনেতা না হতেন, তাহলে কী হতেন আমার এ-রকম সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, চলচ্চিত্র ও মঞ্চ দুটিই আমার প্রিয় মাধ্যম। অভিনেতা পরিচয়ই প্রধান পরিচয়। যদি আমি অভিনয় না করতাম, অভিনেতা না হতাম, তাহলে হয়তো আবৃত্তিকার হতাম। কিংবা কবি ও লেখক হতাম।’

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যে একজন চমৎকার আবৃত্তিশিল্পী ও কবি, সেটা স্মরণ করিয়ে দিতেই তিনি শিশুর মতো স্বর্গীয় হাসিতে উজ্জ্বল করে দেন শিল্পকলা একাডেমির ছোট সেমিনার কক্ষ। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আমি কবিতা লিখতে পছন্দ করি, কবিতা আবৃত্তি করতেও পছন্দ করি। কিন্তু আমাকে তো সবাই চেনে অভিনেতা হিসেবেই। কবি হিসেবে তো নামডাক নেই!’

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নাকি ছোটবেলায় সারাক্ষণ হীনমন্যতায় ভুগতেন! যারা ‘অপুর সংসার’ চলচ্চিত্রে ২৩ বছরের সুদর্শন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে  দেখেছেন, তারা কি কখনো ভাবতে পেরেছেন, এই মানুষটিই তরুণ বয়সে নিজের চেহারা নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতেন?

অপুর সংসার সিনেমার দৃশ্য

 

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় চমৎকার হাস্যরসের মধ্য দিয়ে শোনালেন জীবনের কথা। অভিনয়জীবনের শুরুর দিকের স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‘অভিনয় যে করব, এ অঙ্গনের মানুষের ভালোবাসা কাড়ব, তা কখনো ভাবিনি। আমার ভেতরে একটা হীনমন্যতা ছিল। আর সেটা ছিল আমার চেহারা নিয়ে! একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতার মুখে এ কথা শুনে হয়তো হাসবেন।  তবে এর কারণ ছিল। অল্প বয়সে টাইফয়েড হয়েছিল। খুব রূগ্ন ছিলাম। বাড়ির লোকেরা বলত, ছেলেটা কালো, হ্যাংলা-পাতলা! ব্যঙ্গ করে প্রায়ই বলত, তোর তো চেহারা নেই। নাক-চোখ-মুখের তেমন সুন্দর আদল নেই। ছোটবেলায় তা শুনে সংকুচিত হতাম। খেলাধুলা খুব করতাম, কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো ছিলাম না। ভালো ছাত্রও ছিলাম না। তবে আমার অভিনয় দেখে অনেকেই ভালো বলত। অভিনয়ে তো নিজেকে আড়াল করা যায়। নিজেকে আড়াল করার জন্যই অভিনয়ে এসেছিলাম।’

 

সৌমিত্রের বাবা মোহিতকুমার চট্টোপাধ্যায় পেশায় উকিল হলেও ভালোবাসতেন আবৃত্তি, নাটক, গান। বাবার কণ্ঠে আবৃত্তি শুনেই ছেলেবেলা পার করেছেন সৌমিত্র। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় বাবার আবৃত্তি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। কবিতা পড়লে তিনি দেখিয়ে দিতেন কীভাবে পড়তে হয়। কীভাবে সঠিক ও শুদ্ধ উ”চারণ করতে হয়।’

আড্ডা-আলাপচারিতায় একে একে চলতে থাকে কৌতূহলোদ্দীপক নানা প্রশ্ন। আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নাট্যজন সৈয়দ হাসান ইমাম, নাট্যজন কেরামত মওলা, অভিনেতা ও নাট্যজন ড. ইনামুল হকসহ অনেকেই।

ফেলুদার চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

অভিনয়ের প্রেমে কীভাবে পড়লেন জানতে চাইলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, কলকাতায় বিখ্যাতদের অভিনয় দেখতাম ছোটবেলা থেকেই।শিশিরকুমার ভাদুড়ীর অভিনয় দেখে যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। তারপর তার সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছিল। প্রায় তিন বছর তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। থিয়েটার নিয়ে আমার চিন্তাভাবনার ভিত তৈরি হয়েছিল তার কাছ থেকেই। সত্যজিৎ রায় তখন “পথের পাঁচালী” তৈরি করেছেন। এর সিক্যুয়াল “অপরাজিতা” তৈরি করবেন তিনি। তার এক সহকারীর কাছে শুনেছিলাম এসব। শিশিরকুমার ভাদুড়ী একদিন সত্যজিৎ রায়ের বাসায় নিয়ে যান। তখনই সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে খানিকটা আলাপ-পরিচয় হয়েছিল। তিনি যেন সারাক্ষণ মনে মনে অভিনেতাকে খুঁজতেন। চলচ্চীতের সঙ্গে মানানসই মুখ খুঁজতেন। আমি তখন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কাজ করি।

কিছুক্ষণ পর হাসতে হাসতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘সামান্য পরিচয় ও দেখাসাক্ষাতে আমাকে যে সত্যজিৎ রায় মনে রেখেছিলেন, সেটা ভাবতে পারিনি। তার পরের ছবি ছিল তৃতীয় সিক্যুয়াল “অপুর সংসার”। সেই চলচ্চিতের জন্য খুঁজছিলেন অভিনেতা। হঠাৎ একদিন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। নিজের গাড়ি করে নিয়ে গেলেন তার অন্য একটি ছবির শুটিং দেখাতে। সেখানেই সত্যজিৎ রায় নামকরা অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের কাছে নিয়ে যান। তাকে বলেন, এ হচ্ছে অপুর সংসারের অপু। এর আগ পর্যন্ত জানতাম না যে আমিই অপুর সংসারের অপু হব।’

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে সবিনয়ে আমি জানতে চাই প্রথম ক্যামেরার সামনে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা।স্মৃতিচারণা করে সৌমিত্র বলেন, ‘মঞ্চে টুকটাক কাজ করলেও ক্যামেরার সামনে তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। শিশিরকুমার ভাদুড়ীর কাছেই প্রথম শুনেছিলাম যে মঞ্চে ও চলচ্চিত্রের কাজে কিছু তফাত  থাকে। অবশ্য শিশিরকুমার নিজে চিত্রাভিনয়ে তেমন আকৃষ্ট হননি। তার ভালো লাগেনি, মঞ্চেই চলে এসেছিলেন। চিত্রাভিনয়ের খুঁটিনাটি দিক নিয়ে তখন ভাবতাম। নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখতাম।

সত্যজিৎ রায় ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

সত্যজিৎ রায়ের “পথের পাঁচালী” এবং  “অপরাজিতা” দেখলাম। বোঝার চেষ্টা করলাম সত্যজিৎ রায়ের অভিনয়ের ধারা। বোঝার চেষ্টা করলাম তার পরিচালনা ও ক্যামেরার কাজ। ফলে “অপুর সংসার” করার আগে থেকেই সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে কীভাবে কাজ করতে হবে, আমার ভেতর তার একটা স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়েছিল। “অপুর সংসার”-এর শুটিং এর অনেক আগে থেকেই সত্যজিৎ রায় আমাকে নিয়ে যেতেন নানা জায়গায়, বিভিন্ন বই পড়তে দিতেন, চলচ্চিত্র দেখতে বলতেন। তখন চিত্রনাট্যের খসড়াও আমাকে দিয়েছিলেন। চিত্রনাট্য পড়ে নিজের মতো প্রস্তুতি নিতে বলেছিলেন। সত্যজিৎ রায় আগে থেকেই সব বোঝাচ্ছিলেন যেন ক্যামেরার সামনে আমার কোনো আড়ষ্টতা না থাকে। তখন তিনি আমার কিছু ক্যামেরার টেস্ট নিয়েছিলেন। ক্যামেরা জিনিসটা কী চিনতে শিখিয়েছিলেন, ক্যামেরায় কীভাবে কাজ করতে হয়, তা বুঝিয়েছিলেন। ফলে প্রথম শুটিং করতে গিয়ে খুব একটা সমস্যা হয়নি।’

স্মৃতিময় আড্ডায় ও আলাপে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার। আড্ডায় উঠে এল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার কথাও। আলাপচারিতার একফাঁকে রামেন্দু মজুমদার বলেন, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নাট্যকার ও সাহিত্যবিষয়ক পত্রিকার সম্পাদকও। কলকাতার বিখ্যাত ‘এক্ষণ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। কবিতা চর্চা করছেন সেই ছোটবেলা থেকেই।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজেকে আড়াল করার জন্য অভিনয়ে এসেছিলেন, কিন্তু কবিতায় কীভাবে এলেন আমার এ-রকম প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্র বলেন, ‘কবিতায় নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ এল কিশোর বয়সে। তখন মেয়েদের প্রতি ভালোলাগার ব্যাপারটা শুরু হয়। বিশেষ মেয়েকে ভালোলাগার বিষয়টা তো থাকে। তখন তো একটু হাত ধরতেও কত অপেক্ষা করতে হতো! নিজের কথা যেখানে বলা যাচ্ছে না, তার একটা উপায় হিসেবেই কবিতা লেখার শুরু। গোপন প্রেমিকার উদ্দেশেই কবিতার লেখা শুরু করেছিলাম।’

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা যেন হাসির ঝোড়োহাওয়া বয়ে যায় সেমিনার কক্ষে। একজন হাসতে হাসতে জানতে চান, যাকে উদ্দেশ করে কবিতা লেখা শুরু, তাকে জীবনে পেয়েছিলেন কি?

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও হাসির দীর্ঘ আভা ছড়িয়ে বলেন, যাকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলাম, তাকে পেয়েছিলাম। তার কথায় ও রসিকতায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল সবাই। আমার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অতীতসাগরে ডুব দেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ডুবুরির মতো গভীর থেকে যেন তুলে আনেন তার স্মৃৃতিগু”ছ। কবিতা লেখা ও বই পড়ার প্রতি নিজের ভালোলাগার কথা প্রকাশ করে সৌমিত্র বলেন,

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

 

‘আমার ভেতরে কবিতা লেখার তাগিদ টের পাই ছোটবেলায়। অভিনয়, আবৃত্তি, কবিতা এসব শুরু করেছিলাম পারিবারিক সুন্দর একটা আবহে। কবিতা লেখার আগে থেকেই অভিনয়টার প্রতি টান ছিল। আবৃত্তির প্রতি অনুরাগ ছিল।

ছোটবেলা থেকেই আমি অভিনয় করছি,  আবৃত্তি করছি। কেননা আমাদের বাড়িতে থিয়েটার-চর্চা ছিল। আবৃত্তির চর্চাও ছিল। কিশোর বয়সে আমার মধ্যে কবিতা লেখার ঝোঁক এসেছিল। মোটামুটি ষোলো বছর বয়স থেকে কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। বেশির ভাগ বাঙালির ছেলে যেমন কিশোর বয়সে কবিতা লেখে, তেমনই কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। কিশোর বয়সে অধিকাংশ বাঙালি ছেলেই প্রেমে পড়লে কবিতা লেখে, আমিও তেমনভাবে কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। অবশ্য এটার পেছনেও অনুপ্রেরণা ছিল পরিবার। আমাদের বাড়িতে সাহিত্যের প্রতি ভীষণ ভালোবাসা ছিল। আমার দাদু সাহিত্যচর্চা করতেন। আমার বাবা-মা সাহিত্য খুব ভালোবাসতেন। ছোটবেলা থেকে আমাদের বইটই পড়ার কোনো বাধানিষেধ ছিল না। অনেক বাঙালির বাড়িতে নানা রকম বাধা থাকে বাইরের বই পড়ার। আমাদের বাড়িতে তা ছিল না। বলা যায় আমাকে বেশ উৎসাহ দিতেন বাবা-মা। ছোটবেলা থেকেই আমি বইয়ের পোকা ছিলাম। প্রচুর ছড়া ও কবিতা পড়তাম।’

আলাপের একফাঁকে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নাটক সম্পর্কে বলতে গিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘কলকাতার নাটকের অবনমন হয়েছে। মান কমে গেছে। সিনেমারও একই অবস্থা। কলকাতায় এখন সবকিছু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেখানকার রাজনীতিতে নোংরা জৌলুশ আছে। তরুণেরা বাংলা ভুলে যাচ্ছে, মিশ্র ভাষায় কথা বলছে। বাংলা-হিন্দি মিশিয়ে কথা বলছে। বাঙালি জাতিটাকে টিকিয়ে রেখেছে বাংলাদেশই। বাংলা ভাষাকে গৌরব দিয়েছে বাংলাদেশই।’ নাট্যজন কেরামত মওলার এক প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘অভিনয় ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারি না। অভিনয়ই তো আমাকে রুটি-রুজি দিয়েছে। আমাকে খ্যাতি ও সম্মান দিয়েছে, বিপুল মানুষের ভালোবাসা দিয়েছে।’

অভিনয়ের পাশাপাশি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নাটকও লিখেছেন। নাটক লেখার বিষয়ে প্রশ্ন রামেন্দু মজুমদারের। উত্তরে গুণী এই অভিনেতা বলেন, ‘আসলে প্রয়োজনের তাগিদে নাটক লেখা শুরু করেছিলাম। নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল রেখে জীবনের সঞ্চিত খাতায় অনেক নাটক লিখেছিলাম। কমবেশি অনেক নাটকই দর্শকশ্রোতা প্রিয় হয়েছে, মানুষের প্রশংসা পেয়েছে।’

 

 

নাটকের ভবিষ্যৎ কী এমন প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘অভিজ্ঞতা ও ত্যাগ কখনো বিফলে যায় না; যায়নি অতীতে, ভবিষ্যতেও যাবে না হয়তো। সেই সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের জীবনের সঙ্গে মিল রেখে কতটুকু প্রাসঙ্গিক আমাদের নাটক, সেটার ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করে। ভালো নাটক সব সময়ই বেঁচে থাকবে। ভালো নাটক মানুষ গ্রহণ করবেই।’

একজন ভালো অভিনেতার গুণাবলি সম্পর্কে জানতে চাইলে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘অভিনেতা হওয়া সহজ নয়। বড় সাধানার বিষয়। ভালো অভিনেতার কাছে মানুষ বিষয়, সমাজ বিষয়, রাষ্ট্রও বিষয়। যে অভিনেতা শুধু আত্মপ্রদর্শন করে তাকে আমার বড় অভিনেতা মনে হয় না। বড় অভিনেতা তার অভিনয়ে সমাজের বিভিন্ন অনুষঙ্গ দেখায়, মানুষকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি ভাবতে শেখায়।’

টিভি, চলচ্চিত্র ও মঞ্চ এসব জায়গায় অভিনয় করতে গিয়ে নিজেকে কি আলাদা করে তৈরি করতে হয় নাট্যব্যক্তিত্ব কেরামত মওলার প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘প্রথমত অভিনয়, তারপর পরিবেশ বুঝে উপস্থাপন। এতে আমি কোনো পার্থক্য খুঁজে পাই না। যিনি ছবি আঁকেন, তিনি ছোট ক্যানভাসেও আঁকতে পারেন, বড় ক্যানভাসেও আঁকতে পারেন। সে-ই সত্যিকার অভিনেতা যে সমাজের ভাবনাচিন্তা, অবস্থা অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারে।’

চারুলতা সিনেমায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও মাধবী মুর্খারজি

আমাদের আলাপে উঠে এসেছিল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নানা দিকও। উঠে  এসেছিল দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের কথাও। পাশাপাশি দুই দেশ, পাশাপাশি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ। ভাষা এক, সংস্কৃতিও এক। তারপরও দূরত্ব রয়ে গেছে অনেক জায়গায়। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রীর পথে আরও একটি বিষয় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত, তা হলো বাংলাদেশের চ্যানেল ভারতে দেখার ব্যবস্থা করা। কিন্তু‘ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে সেটি নেই। এ বিষয়ে আমার এক প্রশ্নে জবাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘বাংলাদেশের নাটক, চলচ্চিত্র ও  সংস্কৃতিকে খুব মিস করি। সাংঘাতিকভাবে মিস করি। এ দেশের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ থাকলেও এ রকম একটি প্রতিবন্ধকতার কারণে সেটা থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। এটার উত্তরণ জরুরি।’

তিনি বলেন ‘বাংলাদেশের নাটক, চলচ্চিত্র ও  সংস্কৃতিকে খুব মিস করি।

আড্ডার একফাঁকে আবৃত্তিশিল্পী ও নাট্যনির্দেশক গোলাম সারোয়ার জানতে চান অভিনয়ে আবৃত্তিচর্চার প্রয়োজন আছে কি না। সৌমিত্রর জবাব, ‘অভিনয়ের জন্য আবৃত্তিরও ভীষণ দরকার। যারা এটা বোঝেন না তারা এখনো চোখ বুজে আছেন। অভিনয়ের প্রারম্ভিক কাজ হলো কথা বলা, সেটা আবৃত্তিচর্চা ছাড়া হয় না। আমি প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আবৃত্তি ও গান করি।

প্রতিদিন রেওয়াজ করি, সাধনা করি। জীবনে সফল হতে হলে তার কাজকে সাধনার পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। সেটা অভিনয় হোক, আর আবৃত্তি হোক কিংবা যেকোনো মাধ্যমই হোক। একজন অভিনেতাকে চার অক্ষরের একটি শব্দকে আঁকড়ে রাখতে হয়, সেটা হলো ভালোবাসা। নিজের কাজের প্রতি প্রচণ্ড ভালোবাসা থাকতে হবে। নিজের কাজ ও দায়িত্বের প্রতি ভালোবাসাই মানুষকে সাফল্য এনে দেয়, পৌঁছে দেয় সঠিক অবস্থানে। ভালোবাসা ছাড়া কিন্তু  হয় না, হবেও না।’

 

লেখা: নওশাদ জামিল

ছবি: ইন্টারনেট

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

18 − 14 =