আমিই অভিভাবক

করেছে Sabiha Zaman

পরিবার সমাজের সৌন্দর্য। পারিবারিক বন্ধন ভালো থাকলে সন্তানের বিকাশও হয় দ্রুত। কিন্তু নামে মাত্র পরিবারে কি সন্তান ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারে? আসতে থাকে জীবন গঠনে নানা বাধা। একসময় সন্তান বাবা-মায়ের নানা টানাপোড়েন দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে ওঠে। তাই পারিবারিক বিষয়গুলোকে সন্তানের সামনে না আনাই ভালো। বর্তমানে খুব দেখা যাচ্ছে একক অভিভাবকত্ব। সেটা বাবা কিংবা মা-ই হোক। একক সন্তান লালনের জন্যও চাই সিঙ্গেল প্যারেন্টিং ধারণা। নিজেদের ব্যক্তিগত সমস্যা সন্তানের ওপর পড়লে মানসিকভাবে তারা অত্যন্ত ভেঙে পড়ে। সিঙ্গেল প্যারেন্টিং নিয়ে লিখেছেন সুরাইয়া নাজনীন

জানা যাক কিছু কথা
সব সময় সব পরিবার প্রচলিত নিয়মে সাজানো-গোছানো হয় না। অনেক পরিবারই থাকে যেখানে বাবা অথবা মা কেউ একজন থাকেন না। তারপরও জীবন কেটে যায়, কাটিয়ে নিতে হয়।
পরিবার বলতে সবার মনে একটা নিখুঁত ছবি সাজানো থাকে। সেখানে বাবা থাকে, মা থাকে, সন্তান থাকে। বাবা-মায়ের আলাদা দায়িত্ব-কর্তব্য থাকে। এই সুন্দর নিয়মের ছন্দপতন হয় যখন পরিবার থেকে বাবা অথবা মা কেউ একজন চলে যান। এ রকম পরিবারগুলোকে সমাজবিজ্ঞানে ‘সিঙ্গেল প্যারেন্টিং ফ্যামিলি’ বলা হয়। দুজন মিলে সন্তান মানুষ করাই বেশ কঠিন কাজ। এ কাজ যখন একজনের ওপরে এসে পড়ে, তখন দায়িত্ব একজনের ওপর বেড়েও যায়।

সিঙ্গেল প্যারেন্টিং নানাভাবে হতে পারে। যেমন বাবা অথবা মা কেউ একজন মৃত্যুবরণ করলে বা কাজের প্রয়োজনে অন্য জায়গায় বসবাস করলে একজনের অবর্তমানে অন্যজনের পরিবার পরিচালনা করতে হয়। তবে যদি বিবাহবিচ্ছেদের ফলে একা সন্তান পালন করা হয়, তবে সিঙ্গেল প্যারেন্টিং সন্তান এবং তার অভিভাবকের জন্য কিছুটা বিব্রতকর হয়। বিচ্ছেদ যে কারণেই হোক অধিকাংশ ক্ষেত্রে একক অভিভাবকের পরিবারগুলো মায়ের পরিবার হয়। আর একক অভিভাবকের পরিবার যদি বিবাহবিচ্ছেদের কারণে হয়, তবে সেটা রক্ষণাবেক্ষণ করা সব সব সময়ই আলাদা এবং কিছুটা কষ্টকরও।

আইনের বেলায়
একজন বিশেষজ্ঞের মতে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বিচ্ছেদের পরে পুরুষেরা খুব কমই একা থাকে। এ ছাড়া বিচ্ছেদসংক্রান্ত আইনও কিছুটা পুরুষতান্ত্রিক বলে মনে করেন তিনি।
‘বিবাহবিচ্ছেদসংক্রান্ত আইন অনুযায়ী, সন্তানের বাবা তার প্রকৃত অভিভাবক এবং মা হেফাজতকারী মাত্র।’ বিচ্ছেদের পরে সন্তান কার কাছে থাকবে, এটা নির্ভর করে সন্তানের বয়স এবং লিঙ্গের ওপর। সাধারণত পুত্রসন্তানের বেলায় সাত বছর বয়স পর্যন্ত সে মায়ের কাছে থাকতে পারে আর কন্যাসন্তান বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত মায়ের হেফাজতে থাকে। এর পরে সন্তানদের বাবার কাছে যাওয়ার বিধান রয়েছে।
তবে এখন বিচারব্যবস্থায় বেশ পরিবর্তন এসেছে এবং সন্তানকে বাবা অথবা মায়ের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। তবে মা যদি আবার বিয়ে করে, সে ক্ষেত্রে সন্তানকে বাবার কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার একটা সাধারণ নিয়ম রয়েছে, যা একজন নারী বা ‘একক মা’কে একা থাকতে বল প্রয়োগ করে থাকে।
তাই বিচ্ছেদের পরে বাবা সানন্দে বিয়ে করে ফেললেও মাকে একা থেকে সন্তানের দায়িত্ব নিতে হয়।

সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি
আমাদের সমাজে বিবাহবিচ্ছেদকে এখনো খুব ভালো চোখে দেখা হয় না। স্বাভাবিক নিয়মে যে কিছু সম্পর্ক টেকসই হয় না, এই কথাটা মানার মতো মানসিকতা এখনো সাধারণের মধ্যে তৈরি হয়নি। যার ফলে আলাদা হয়ে যাওয়া পরিবার নিয়ে সবার অসীম আগ্রহ এবং কোনো এক পক্ষকে দোষারোপ করার বা কার দোষ খুঁজে বের করার একটা প্রবণতা সবার মধ্যেই থাকে, যা সন্তান এবং বাবা-মা উভয়কেই মানসিকভাবে চাপ দেয়।

এ রকম একটি পরিস্থিতিতে সন্তানের লালন-পালন করা একটি কঠিন এবং অবশ্যই স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত। অনেক ক্ষেত্রেই বাবা-মা অথবা পরিবারের লোকজন বিচ্ছেদের বিষয়টা সন্তানের কাছে খোলামেলাভাবে তুলে ধরেন না। সবার মধ্যে একটা রাখঢাক কাজ করে, যেন পরিবারের বাইরে বেশি কেউ এ ঘটনা জানতে না পারে। এ অবস্থায় সন্তান অন্তর্মখী হয়ে যায় এবং সমাজবিবর্জিত একটি জীবনযাপন বেছে নেয়। এটা তাদের স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রে একটি বিরাট অন্তরায়।
অনেক সময় দুই পরিবারের স্বজনেরা নিজেদের মধ্যকার বিরোধের ‘বিষ’ সন্তানের মধ্যেও ঢেলে দেয়। এতে তাদের মনে আস্থাহীনতা এবং অবিশ্বাস তৈরি হয়, যা খুবই ক্ষতিকর। সন্তানকে জানতে হবে বিচ্ছেদ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, এখানে কোনো একজনের দোষ নয়, স্বাভাবিক নিয়মে কিছু সম্পর্ক ভেঙে যায়।

ভালো থাকুক সন্তান
খুব কম পরিবারই আছে, যারা একা মায়ের সিদ্ধান্তকে প্রথম দিন থেকেই সমর্থন করে। সন্তানকে নিয়ে একটি ভালো রুটিন করে নাও। সন্তানের ভালো লাগাকে গুরুত্ব দাও। ছুটির দিনে একসঙ্গে সময় কাটানো যায়। সকালে অফিস যাওয়ার আগে সময় পেলে কিছুটা সময় সন্তানকে দিতে পারো। কোনো কোনো দিন বিকেলবেলা বল নিয়ে মাঠে চলে যেতে পারে বাবাও। কিংবা কোনো ছুটির দিনে যাওয়া যেতে পারে গেমিং স্টেশনে। ফোন, টেলিভিশনের বাইরে দুজনে একসঙ্গে সময় কাটানোয় নজর দিতে হবে। এতেই বন্ধন ভালো হবে। সন্তানও তোমাকে বুঝতে শিখবে।

অন্য বাবা-মায়েদের তুলনায় সিঙ্গল প্যারেন্টসদের জার্নি একটু আলাদা, কিন্তু সন্তানের মধ্যে সেই পার্থক্য না আনাই ভালো। বরং কীভাবে সন্তানের মধ্যে ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে। বাচ্চার বয়স তিন পেরোলেই তাকে নানা রকম কাজ দিতে হবে। হয়তো কখনো মটরশুঁটি দিয়ে বসিয়ে দেওয়া। নিজের জিনিস কীভাবে নিজে গুছিয়ে রাখবে তা শেখাতে হবে। কোথায়, কোনটা রাখতে হয়, তা শিখিয়ে দিতে হবে। সেই সঙ্গে নিজের হাতে খেতেও শেখানো উচিত। বাচ্চার বয়স পাঁচ হলে তাকে ডিনারের টুকিটাকিতেও সাহায্য করতে বলা যেতে পারে। এতে বাস্তবকে চিনতে শিখবে সন্তান।

স্বামী বা স্ত্রী সম্পর্কে অতীত অভিজ্ঞতা যতই তিক্ত থাকুক না কেন, সন্তানকে অবশ্যই তার বাবা-মা সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দিতে হবে। সন্তানের মূল উৎস যেহেতু তার বাবা-মা, তাই তাদের কারও সম্পর্কে কোনো খারাপ ধারণা সন্তানের মনে গভীর উদ্বেগ, হীনমন্যতা ও আস্থাহীনতা তৈরি করতে পারে। বাবা-মায়ের ডিভোর্সের ক্ষেত্রে একটু পরিণত বয়সে ডিভোর্সের কারণ হালকা করে বলা যেতে পারে। তবে বিষয়টা এমনভাবে বলা উচিত, যাতে বাবা-মা সম্পর্কে বড় ধরনের কোনো খারাপ ধারণা গড়ে না ওঠে।

ছবি: সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

8 + one =