আয়েশা সিদ্দিকা : যে প্রথম নারী কাজি হতে চেয়েছিল

করেছে Sabiha Zaman

নারীর অধিকার, মর্যাদা-মূল্যায়ন, ধর্ষণসহ নানাবিধ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যখন গোটা দুনিয়া কাঁপছে, তখনই এক গরম খবর! নারীরা নাকি কাজি হতে পারবে না। তা-ও আবার হাইকোর্ট বলেছেন। ঘটনা সামনে এল যখন দিনাজপুরের আয়েশা সিদ্দিকা কাজি হতে চাইল এবং ধাপে ধাপে নিয়োগের সব পরীক্ষায় প্রথম হয়েও সে আইনি নিষেধাজ্ঞায় আটকে গেল। এ নিষেধাজ্ঞা সমগ্র নারী সমাজকে কোথায় দাঁড় করাল? বিবিসি বাংলা আয়েশা সিদ্দিকাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছে, রোদসীর পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো;

প্রায় ১৯ বছর ধরে দিনাজপুরে ফুলবাড়ী উপজেলার পূর্ব কাটাবাড়ী হোমিও চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছে আয়েশা সিদ্দিকা। এলাকায় চিকিৎসক হিসেবে সুনামও আছে তার। এখনো সে সপ্তাহে চার দিন রোগী দেখে। কিন্তু এই হোমিও চিকিৎসকই হতে চেয়েছিল বাংলাদেশের প্রথম নারী কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রার।
ব্যতিক্রমী পেশার স্বপ্নে
২০১২ সালে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে ফুলবাড়ী পৌরসভায় নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজি পদের জন্য আবেদন করে আয়েশা সিদ্দিকা। নিয়োগ বিজ্ঞাপনে কেবল পুরুষ সদস্য আবেদন করতে পারবে, এমন কোনো কথা লেখা ছিল না। ধাপে ধাপে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে ২০১৪ সালে নিয়োগ পরীক্ষায় সে প্রথম স্থান অধিকার করে।
নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবে না বাংলাদেশের নারীরা
নিয়োগপ্রক্রিয়া চ‚ড়ান্ত গঠিত কমিটির সদস্য ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়রসহ মোট পাঁচজন। ওই কমিটি নির্বাচিত তিনজন সদস্যের একটি প্যানেল প্রস্তাব দিয়ে চ‚ড়ান্ত করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে কমিটির কাছে জানতে চাওয়া হয়, তারা কাকে নিয়োগ দিতে চান। সে সময় কমিটি চিঠি দিয়ে আয়েশা সিদ্দিকাকে নিয়োগের সুপারিশ করে। কিন্তু কয়েক মাস পরে আয়েশাকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছিল যে নিয়োগ কমিটির প্রস্তাবিত প্যানেল বাতিল করে দিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়।

আদালতে গেলে কখন?
আয়েশা সিদ্দিকা জানিয়েছে, ২০১৪ সালের ১৬ জুন আইন মন্ত্রণালয় ‘বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়’, এমন মত দিয়ে একটি চিঠি দিয়ে নিয়োগ কমিটির প্রস্তাবিত প্যানেল বাতিল করে। মনঃক্ষুণ হলেও সে মেনেই নিয়েছিল বিষয়টি। কিন্তু এর মধ্যে আয়েশা হঠাৎ জানতে পারল, প্যানেলের প্রস্তাবিত তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যে একজন পুরুষ এবং সম্পর্কে তার আত্মীয়।

‘এ ঘটনায় আমি খুবই আঘাত পাই মনে। আমার খুব অপমানও লাগে যখন জানতে পারি যে পরীক্ষায় প্রথম হয়েও আমি নিয়োগ পাব না, কারণ আমি মহিলা!’
বিষয়টি নিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে স্বামীর পরামর্শে আয়েশা আইনি প্রতিকার চাইতে ঢাকায় আসে। এরপরই আইন মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠিকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে আয়েশা সিদ্দিকা। ছয় বছর পরে ২০২০ সালের ২৬ ফেব্রæয়ারি আদালত মন্ত্রণালয়ের মতামতকে বহাল রেখে রায় দেয়। সম্প্রতি ১০ জানুয়ারি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়, আর তারপরই বিষয়টি সবার সামনে চলে আসে। বিষয়টি নিয়ে দেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে এখনো।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে যে কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে দেশের নারীরা নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজি হতে পারবে না।
আয়েশা জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ রায় এখন প্রকাশিত হলেও, ২০২০ সালে আদালতের রায়ের পরই সে আপিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইতিমধ্যে অ্যাপিলেট ডিভিশনে এ নিয়ে একটি আপিল দায়ের করা হয়েছে।

নিকাহ রেজিস্ট্রার কেন হতে চেয়েছিল
আয়েশা সিদ্দিকার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল নিকাহ রেজিস্ট্রার বা কাজির মতো যে পেশায় এখন পর্যন্ত কোনো নারী নিয়োগ পায়নি, তেমন একটি পদে সে কেন আবেদন করেছিল?
সে বলেছে, ব্যতিক্রমী কিছু করার জন্য সে আবেদন করেনি। বিজ্ঞপ্তি দেখে সে আগ্রহী হয়েছিল, কারণ সমাজে গ্রহণযোগ্যতা আছে এ পেশার। ‘তা ছাড়া ওই বিজ্ঞপ্তিতে তো উল্লেখ ছিল না যে নারীরা আবেদন করতে পারবে না। আমি যখন দেখলাম যে নারী-পুরুষ কিছু উল্লেখ নাই, তখন ভাবলাম, তাহলে আমি তো আবেদন করতেই পারি।’


‘পরে আবেদনপত্র বাছাই বা পরীক্ষার সময়ও তো আমাকে মহিলা বলে বাদ দেয় নাই, নিয়োগ কমিটিও তো ফলাফল চ‚ড়ান্ত করে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই কোনো পর্যায়েই তো আমাকে ডিসকোয়ালিফাইড বা অযোগ্য ঘোষণা করা হয় নাই! তাহলে আমি তো অযোগ্য না।’
আয়েশার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ফুলবাড়ীর পূর্ব কাটাবাড়ীতে। তিন বোন, এক ভাইয়ের পরিবারে দ্বিতীয় সন্তান সে। বাবাও ছিলেন হোমিও চিকিৎসক। বাবা অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় মাদ্রাসায় পড়তে পড়তেই অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় তাকে। বিয়ের পরও সে পড়াশোনা চালিয়ে যায়। একই সঙ্গে ফুলবাড়ীর দারুল সুন্নাহ সিনিয়র সিদ্দিকিয়া মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস করেছে, আবার হোমিও কলেজ থেকেও ডিগ্রি নিয়েছে।
‘ব্যতিক্রমী কিছু করার ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু এটা মেনে নেওয়া কষ্টকর যে শুধু মহিলা হওয়ার কারণে আমি অযোগ্য হব কোন কিছুর জন্য।’

লেখা- রোদসী ডেস্ক

ছবি- সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

13 − six =