ইতিহাস-ঐতিহ্যের খোঁজে

করেছে Sabiha Zaman

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন একটি জাতির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে পরিগণিত। বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস, জাতিসত্তা বিকাশের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমা উদঘাটনে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো অনন্য ভূমিকা পালন করছে। আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মধ্যে রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্য-বৌদ্ধবিহার, মন্দির, মসজিদ, সাধারণ বসতি, আবাসিক গৃহ, নহবতখানা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জমিদার প্রাসাদ অথবা রাজপ্রাসাদ, অসংখ্য প্রাচীন পুকুর ও দিঘি, শানবাঁধানো ঘাট, পানীয় জলের কুয়া, প্রস্তরলিপি, তাম্রলিপি, মুদ্রা, প্রাচীন পুঁথি-তুলট বা তালপাতায় লেখা, পোড়ামাটির ফলকচিত্র, পোড়ামাটি ও পাথরের ভাস্কর্য, মৃৎপাত্র ইত্যাদি। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সমৃদ্ধ ভান্ডার এ দেশের ইতিহাস বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ নিয়ে লিখেছেন সুমন্ত গুপ্ত

লালবাগ কেল্লা, ঢাকা
লালবাগ কেল্লা মোগল আমলের বাংলাদেশের একমাত্র ঐতিহাসিক নিদর্শন, যাতে একই সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে কষ্টিপাথর, মার্বেল পাথর আর নানান রংবেরঙের টালি। লালবাগ কেল্লা ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো ঐতিহাসিক নিদর্শনে এমন বৈচিত্র্যময় সংমিশ্রণ পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত। লালবাগ কেল্লা পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত। লালবাগের কেল্লার নকশা করেন শাহ আজম। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র আজম শাহ ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার সুবাদারের বাসস্থান হিসেবে এ দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন। দুর্গের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার আগেই মারাঠা বিদ্রোহ দমনের জন্য সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে দিল্লি ডেকে পাঠান। ফলে একটি মসজিদ ও দরবার হল নির্মাণের পর দুর্গ নির্মাণের কাজ থেমে যায়। নবাব শায়েস্তা খাঁ ১৬৮০ সালে ঢাকায় এসে পুনরায় দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেন। তবে শায়েস্তা খানের কন্যা পরী বিবির মৃত্যুর পর এ দুর্গ অপয়া মনে করা হয় এবং শায়েস্তা খান ১৬৮৪ খ্রিষ্টাব্দে এর নির্মাণ বন্ধ করে দেন।

লালবাগ কেল্লা, ঢাকা

এই পরী বিবির সঙ্গে শাহজাদা আজম শাহের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। পরী বিবিকে দরবার হল এবং মসজিদের ঠিক মাঝখানে সমাহিত করা হয়। শায়েস্তা খাঁ দরবার হলে বসে রাজকাজ পরিচালনা করতেন। ১৬৮৮ সালে শায়েস্তা খাঁ অবসর নিয়ে আগ্রা চলে যাওয়ার সময় দুর্গের মালিকানা উত্তরাধিকারীদের দান করে যান। শায়েস্তা খাঁ ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নানা কারণে লালবাগ দুর্গের গুরুত্ব কমতে থাকে। ১৮৪৪ সালে ঢাকা কমিটি নামে একটি আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্গের উন্নয়নকাজ শুরু করে। প্রথমে এর নাম ছিল কেল্লা আওরঙ্গবাদ। পরে লালবাগ দুর্গ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯১০ সালে লালবাগ দুর্গের প্রাচীর সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে আনা হয়।

হাজীগঞ্জ দুর্গ, নারায়ণগঞ্জ
হাজীগঞ্জ দুর্গ নারায়ণগঞ্জ শহরের হাজীগঞ্জ এলাকায় শীতলক্ষ্যার পশ্চিম তীরে অবস্থিত। ঢাকা থেকে হাজীগঞ্জ দুর্গে যেতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে। হাজীগঞ্জ দুর্গ আবার খিজিরপুর দুর্গ নামেও পরিচিত। জলদুর্গের বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত দুর্গটি শীতলক্ষ্যার সঙ্গে পুরাতন বুড়িগঙ্গার সঙ্গমস্থলে নির্মিত হয়। মুগল সুবাদার ইসলাম খান কর্তৃক ঢাকায় মুগল রাজধানী স্থাপনের অব্যবহিত পরে নদীপথে মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে দুর্গটি নির্মিত হয়। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ কেল্লার স্থানটির সামনে দাঁড়াতেই বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল। অদ্ভুত সুন্দর বিশাল এক কেল্লা। ১৫৮০ খ্রিষ্টাব্দে মোগল শাসক ঈশা খাঁ মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের কবল থেকে এ জনপদকে রক্ষা করার জন্য শীতলক্ষ্যা-ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা নদীর মিলনস্থলে কেল্লাটি নির্মাণ করেন। ১৭০০ শতাব্দী বা তারও আগে নির্মিত এ দুর্গের সঠিক স্থপতির নাম তেমন পরিষ্কারভাবে কোথাও নেই। তবে ধারণা করা হয়, সম্ভবত সুবাদার ইসলাম খানের সঙ্গে সংঘর্ষকালীন ঈশা খাঁ এ দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। তার মৃত্যুর পর রাজধানী সোনারগাঁয়ের নিরাপত্তার জন্য মীর জুমলা অধিকাংশ সময় অবস্থান করতেন এ কেল্লায়। প্রায় দুই কিলোমিটার জায়গা নিয়ে বিস্তৃত এ দুর্গ।

হাজীগঞ্জ দুর্গ, নারায়ণগঞ্জ

দুর্গের উত্তর দেয়ালেই দুর্গের একমাত্র প্রবেশপথ ‘দুর্গ তোরণ’। কিছুটা উঁচু এই দুর্গে ঢুকতে হলে তোমাকে প্রবেশ তোরণের প্রায় ২০টি সিঁড়ি ডিঙাতে হবে। আর তোরণ থেকে দুর্গ চত্বরের নামতে হবে ৮টি ধাপ। প্রাচীরের ভেতরে চারদিকে চলাচলের পথ রয়েছে প্রাচীর ঘেঁষেই। দুর্গের পূর্ব-দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় দুটি বুরুজ আছে। আরও একটি বুরুজ রয়েছে দক্ষিণ পাশে। টাওয়ারে ঢোকার জন্য ছিল ছোট্ট একটি পূর্বমুখী দরজা। ভেতরে ঠিক মাঝখানে একটি মোটা গোল পিলার, পিলারের সঙ্গে ছিল গোলাকার সিঁড়ি। আজ পিলারটি টিকে থাকলেও নিচের দিকের অনেকটুকু সিঁড়িই ভেঙে গেছে।

যাবে কীভাবে
ঢাকার যেকোনো স্থান থেকে তোমাকে প্রথমে যেতে হবে গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী বা কমলাপুর। গুলিস্তান বা যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জে যেতে পারবে এসি বা নন-এসি বাসে।

শশী লজ, ময়মনসিংহ
মুক্তাগাছা জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরীর তৃতীয় উত্তরপুরুষ রঘুনন্দন আচার্য চৌধুরী নিঃসন্তান ছিলেন। অথচ পিতৃতান্ত্রিক সমাজের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী সম্পত্তি সংরক্ষণে সক্ষম একটি পুত্রসন্তান ভীষণভাবে প্রয়োজন! কী করা যায়? গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীকে দত্তক নিলেন রঘুনন্দন। সময়ের এক বিশেষ লগ্নে দত্তক পুত্রের হাতে জমিদারির ভার অর্পণ করে কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পাড়ি জমালেন পরপারে! জমিদার গৌরীকান্ত আচার্য চৌধুরীর প্রতিও সদয় ছিল না নিয়তি! সন্তানহীন অবস্থায় অকালপ্রয়াণ ঘটল তাঁরও! গৌরীকান্তের বিধবা পত্নী বিমলা দেবী দত্তক নিলেন কাশীকান্তকে। কাশীকান্তের কপালও মন্দ ছিল ভীষণ! দীর্ঘ রোগযন্ত্রণায় ভুগে সন্তানহীন অবস্থায় পরলোকগমন করলেন তিনিও! তার বিধবা পত্নী লক্ষ্মী দেবী আচার্য চৌধুরানী পূর্বসূরিদের পথ অনুসরণ করে দত্তক নিলেন চন্দ্রকান্তকে! ভাগ্যের বিরুদ্ধাচরণে চন্দ্রকান্তও অতিদ্রুত ত্যাগ করলেন পৃথিবীর মায়া। তবে হাল ছাড়লেন না লক্ষ্মী দেবী। পুনরায় দত্তক নিলেন তিনি। দ্বিতীয় দত্তক পুত্রের পূর্ব নাম পূর্ণচন্দ্র মজুমদার।

শশী লজ, ময়মনসিংহ

কুলগুরুর সামনে মহাসমারোহে লক্ষ্মী দেবী নতুন নাম রাখলেন পুত্রেরÑ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী! সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর শাসনামলে ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী জনপদে যুক্ত হলো সোনালি মাত্রা। প্রায় একচল্লিশ বছর জমিদারি পরিচালনার প্রশস্ত প্রেক্ষাপটে বহু জনহিতকর কাজ করলেন তিনি। ময়মনসিংহে স্থাপন করলেন একাধিক নান্দনিক স্থাপনা। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে ময়মনসিংহ শহরের কেন্দ্রস্থলে ৯ একর ভূমির ওপর একটি অসাধারণ দ্বিতল ভবন নির্মাণ করলেন সূর্যকান্ত। নিঃসন্তান সূর্যকান্তের দত্তক পুত্র শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর নামে এই ভবনের নাম রাখা হলো শশী লজ।

যাবে কীভাবে
ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ভোর পাঁচটা থেকে প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর ময়মনসিংহের উদ্দেশে সৌখিন, এনা, নিরাপদ বাস ছেড়ে আসে। এরপর মাসকান্দা বাস টার্মিনাল অথবা স্টেশন থেকে রিকশা, অটোরিকশাযোগে যাওয়া যায় অথবা ব্রিজ থেকে রিকশা, অটোরিকশা, টেম্পোযোগে যাওয়া যায় শশী লজে।

জৈন্তেশ্বরী, সিলেট
সিলেট-তামাবিল সড়কের পাশে জৈন্তাপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছেই ‘জৈন্তেশ্বরী বাড়ি’র অবস্থান। ‘জৈন্তেশ্বরী বাড়ি’ মূলত সিন্টেং বা জৈন্তা রাজাদের পূজিত দেবতার বাড়ি। জৈন্তার রাজা যশোমানিক ১৬১৮ সালে অত্যন্ত আড়ম্বরে উপহার হিসেবে প্রাপ্ত কালী দেবীর মূর্তিকে এ বাড়িতে স্থাপন করেন এবং বাড়িটি নির্মাণ করেন। বাড়িটির মধ্যখানে মূল মন্দিরঘরটির অবস্থান। বর্তমানেও মূল ঘরটির ভিটা এবং সংলগ্ন দক্ষিণের ঘরটি নানা দৈব-দুর্বিপাকের মধ্যেও দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা সংস্কার করে একদল হিতৈষী ব্যক্তি ঘরটি ‘ইরাদেবী মিলনায়তন’ নামকরণ করেছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান মাঝেমধ্যে এতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ঘরটির স্তম্ভগুলো লোহার এবং স্থাপত্যশৈলী বেশ দৃষ্টিনন্দন। বর্তমানে বাড়িটিতে মোট তিনটি ফটক দেখা যায়।

জৈন্তেশ্বরী, সিলেট

প্রধান ফটকটি দক্ষিণ দিকে অবস্থিত এবং সেটি সাবেক কালেব রাজকীয় ভাব অনেকটা ধরে রাখতে পেরেছে। যদিও সংস্কার ও পরিচর্যার অভাবে সেটি এখন প্রায় বিবর্ণ এবং ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পের কারণে ওপরের অংশটি ভেঙে পড়েছে। অপর গেট দুটির একটি পূর্ব দিকে এবং একটি পশ্চিম দিকে অবস্থিত।

যাবে কীভাবে
ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে সিলেট। সিলেট থেকে এক ঘণ্টার পথ জৈন্তাপুর। বাস, মিনিবাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা মাইক্রোবাসে চড়ে জৈন্তাপুর চলে যেতে পারো। উঠতে পারো জৈন্তা হিল রিসোর্টে অথবা কাছের নলজুড়িতে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয়।

বাঘা মসজিদ, রাজশাহী
বাঘা মসজিদ রাজশাহী জেলা সদর থেকে প্রায় ৪১ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে বাঘা উপজেলায় অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ। সুলতান নাসিরউদ্দিন নসরত শাহ ১৫২৩ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদটি ১৫২৩-১৫২৪ সালে (৯৩০ হিজরি) হুসেন শাহি বংশের প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দিন শাহের পুত্র সুলতান নসরত শাহ নির্মাণ করেন। পরে বিভিন্ন সময় এই মসজিদের সংস্কার করা হয় এবং মসজিদের গম্বুজগুলো ভেঙে গেলে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদে নতুন করে ছাদ দেওয়া হয় ১৮৯৭ সালে। মসজিদটি ২৫৬ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত। সমভূমি থেকে ৮-১০ ফুট উঁচু করে মসজিদের আঙিনা তৈরি করা হয়েছে। উত্তর পাশের ফটকের ওপরের স্তম্ভ ও কারুকাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। মসজিদটিতে ১০টি গম্বুজ আছে। আর ভেতরে রয়েছে ৬টি স্তম্ভ। এ ছাড়া আছে পোড়ামাটির অসংখ্য কারুকাজ যার ভেতরে রয়েছে আমগাছ, শাপলা ফুল, লতাপাতাসহ ফারসি খোদাইশিল্পে ব্যবহৃত হাজার রকম কারুকাজ। মসজিদের ভেতরে-বাইরে সর্বত্র টেরাকোটার নকশা বর্তমান।

বাঘা মসজিদ, রাজশাহী

যাবে কীভাবে
ঢাকা থেকে সড়ক, রেল ও আকাশপথে রাজশাহী যাওয়া যায়। ঢাকার কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে দেশ ট্রাভেলস ও গ্রিন লাইন পরিবহনের এসি বাস যায় রাজশাহী। এ ছাড়া ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ন্যাশনাল ট্রাভেলস, বাবলু এন্টারপ্রাইজ প্রভৃতি পরিবহন প্রতিষ্ঠানের বাস যায় রাজশাহী।

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, নওগাঁ
পাহাড়পুরকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার বলা যেতে পারে। আয়তনে এর সঙ্গে ভারতের নালন্দা মহাবিহারের তুলনা হতে পারে। এটি ৩০০ বছর ধরে বৌদ্ধদের অতি বিখ্যাত ধর্মচর্চাকেন্দ্র ছিল। শুধু উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকেই নয়, চীন, তিব্বত, মিয়ানমার (তদানীন্তন ব্রহ্মদেশ), মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের বৌদ্ধরা এখানে ধর্মচর্চা ও ধর্মজ্ঞান অর্জন করতে আসতেন। খ্রিষ্টীয় দশম শতকে বিহারের আচার্য ছিলেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এই বিশাল স্থাপনা আবিষ্কার করেন। পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলার পাহাড়পুর ইউনিয়নে অবস্থিত। পাহাড়পুরের এই ভগ্ন মন্দিরের জন্যই পাহাড়পুর বিখ্যাত। মূল গেট দিয়ে প্রবেশ করতে সামনে পাবে জাদুঘর। জাদুঘর থেকে মন্দিরে যেতে খানিকটা হাঁটতে হবে। মন্দিরটি অনেক পুরোনো হওয়ায় ভেতরে প্রবেশের রাস্তাগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। পুরো মন্দির এলাকা ঘুরতে দুই ঘণ্টার মতো সময় লাগবে।

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, নওগাঁ

পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, নওগাঁ

যাবে কীভাবে
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে নওগাঁ শহরে এসে নওগাঁ বালুডাঙ্গা বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি বাসযোগে ঐতিহাসিক পাহাড়পুরে যাওয়া যায়। দূরত্ব আনুমানিক ৩২ কিলোমিটার এবং বাসভাড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা। অথবা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে জয়পুরহাট শহরে এসে বাস অথবা অটোরিকশা নিয়ে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার চলে আসতে পারবে। জয়পুরহাট থেকে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের দূরত্ব মাত্র ১৩ কিলোমিটার। ট্রেনযোগে জয়পুরহাটের জামালঞ্জ স্টেশনে নামলে এখান থেকে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে আসতে চাইলে তোমাকে ভ্যান অথবা অটোরিকশা নিতে হবে। জামালগঞ্জ থেকে পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের দূরত্ব মাত্র ৫ কিলোমিটার।

মহাস্থানগড়, বগুড়া
মহাস্থানগড় বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী ইতিহাসে পুণ্ড্রবর্ধন বা পুণ্ড্রনগর নামেও পরিচিত ছিল। একসময় মহাস্থানগড় বাংলার রাজধানী ছিল। যিশুখ্রিষ্টের জন্মেরও আগে অর্থাৎ প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এখানে সভ্য জনপদ গড়ে উঠেছিল প্রত্নতাত্ত্বিকভাবেই তার প্রমাণ মিলেছে। ২০১৬ সালে এটি সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা হয়। প্রাচীরবেষ্টিত এই নগরীর ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন আমলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকদের প্রাদেশিক রাজধানী এবং পরে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অসংখ্য হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা রাজত্ব করেন। মহাস্থানগড়ের অবস্থান বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত। বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে গেলে এই শহরের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। মহাস্থানগড় থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে ভাসুবিহার নামের গ্রামটিতে পা দিলে চোখে পড়বে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ধ্বংসের চিহ্ন।…যে পুণ্ড্রনগরীর কথা এখানে বলা হচ্ছে তা ছিল রাজধানী।

মহাস্থানগড়, বগুড়া

মৌর্য, গুপ্ত, পাল রাজা যিনিই ক্ষমতায় এসেছেন, পুণ্ড্রনগরীকেই বানিয়েছেন রাজধানী। মৌর্যদের শাসনের পর গুপ্ত আমল। এরপর আনুমানিক ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে গোপাল পাল পুণ্ড্রনগরের শাসনভার গ্রহণ করলে পরবর্তী ৪০০ বছরে পালদের শাসনামলেই বাংলাদেশ শৌর্যে, বীর্যে, কৃষ্টিতে ও সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছায়। এরপর সেনরাজদের আমলে এ অঞ্চলের শাসন স্থানান্তরিত হতে থাকে গৌড়ে। প্রাচীরঘেরা নগরী শুরু হওয়ার আগে উঁচু যে স্থান দেখা যায়, সেখানেই রয়েছে শাহ সুলতান (র.)-এর বিশাল মাজার। আর এর পাশেই রয়েছে বিশাল মসজিদ।

কীভাবে যাবে
ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো সার্ভিস হলো গ্রিন লাইন, টিআর ট্রাভেলস এবং এসআর পরিবহনের এসি বাস। বগুড়া শহর থেকে অটোরিকশা কিংবা টেম্পোতে চড়ে আসতে পারো মহাস্থানে।

তাজহাট জমিদারবাড়ি, রংপুর
শত বছরের অমলিন কীর্তি রংপুরের তাজহাট জমিদারবাড়ি। কালের পরিক্রমায় আমাদের অনেক কীর্তি হারিয়ে গেলেও এখনো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে তাজহাট জমিদারবাড়ি। শহর থেকে অল্প কিছুদূরেই এর অবস্থান। রিকশায় যেতে আধা ঘণ্টার মতো সময় লাগে। রংপুর শহরের তাজহাট জমিদারবাড়ি বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক। শহরের কাছেই ইতিহাসবিজড়িত সংগ্রহশালার ঐতিহাসিক প্রাসাদটি যে কাউকে মুগ্ধ করবে। তাজহাট জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা মান্না লাল রায়। তিনি পাঞ্জাব থেকে এসে রংপুরের মাহীগঞ্জে বসবাস শুরু করেন। সে সময় মাহীগঞ্জ ছিল রংপুরের জেলা শহর। কথিত আছে যে স্বর্ণ ব্যবসায়ী মান্না লাল রায়ের আকর্ষণীয় ‘তাজ’ আর ‘রত্ন’খচিত মুকুটের কারণে এ এলাকার নামকরণ হয় তাজহাট। জীবদ্দশায় তিনি বিপুল পরিমাণ ভূসম্পত্তির মালিক হন। রংপুরের অনেক এলাকা তার আয়ত্তে আসে। বংশপরম্পরায় মান্না লাল রায়ের নাতি ধনপতি লাল জমিদার হন। ধনপতি রায়ের নাতি উপেন্দ্র লাল রায় জমিদারি গ্রহণের পর অল্প বয়সে মারা যান। তখন জমিদারির দায়িত্ব তার কাকা ‘মুনসেফ’ গিরিধারী লাল রায়ের হাতে আসে। তিনি নিঃসন্তান হওয়ার কারণে কলকাতার গোবিন্দ লালকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। গোবিন্দ লাল ১৮৭৯ সালে এই জমিদারির উত্তরাধিকারী হন।

তাজহাট জমিদারবাড়ি, রংপুর

কীভাবে যাবে
ঢাকা থেকে ট্রেন ও বাসে রংপুর যাওয়া যায়। রাজধানীর গাবতলী, কল্যাণপুর ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবহনের বাস যেকোনো সময় রংপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায়।

কান্তজিউ মন্দির, দিনাজপুর
ইন্দো-পারস্য ভাস্করশৈলীতে নির্মিত দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির দেশের সবচেয়ে সুন্দর মন্দির। শুধু নির্মাণশৈলীই নয়, উৎকর্ষের জন্য অধিকাংশ স্থাপত্যকর্মীকেও পারস্য থেকে আনা হয়েছিল। এ মন্দির শ্রীকৃষ্ণের জন্য নিবেদিত। কালিয়াকান্ত জিউ অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ স্থাপনের জন্য তাই মন্দিরের নাম কান্তজিউ, কান্তজি বা কান্তজির। মন্দিরের জন্য এ এলাকা কান্তনগর নামে পরিচিতি পায় এবং সে কারণে পরে এ মন্দিরের অপর নাম কান্তনগরের মন্দির হয়ে ওঠে। মন্দিরের উত্তর দিকের ভিত্তিবেদীর শিলালিপি থেকে জানা যায়, তৎকালীন দিনাজপুরের মহারাজা জমিদার প্রাণনাথ রায় তার শেষ বয়সে মন্দিরের নির্মাণকাজ শুরু করেন। ১৭২২ খ্রিষ্টাব্দে তার মৃত্যুর পরে তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তার পোষ্যপুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ খ্রিষ্টাব্দে মন্দিরটির নির্মাণকাজ শেষ করেন। শুরুতে মন্দিরের চূড়ার উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে মন্দিরটি ভূমিকম্পের কবলে পড়লে এর চূড়াগুলো ভেঙে যায়। মন্দিরের বাইরের দেয়ালজুড়ে পোড়ামাটির ফলকে লেখা রয়েছে রামায়ণ, মহাভারত এবং বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি।

কান্তজিউ মন্দির, দিনাজপুর

যেভাবে যাবে
দিনাজপুর শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে এবং কাহারোল উপজেলা থেকে সাত কিলোমিটার দূরে সুন্দরপুর ইউনিয়নে কান্তজিউ মন্দিরটি অবস্থিত। মন্দিরের পাশেই ঢেপা নদী।

ষাটগম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট

ষাটগম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। মসজিদটির গায়ে কোনো শিলালিপি নেই। তাই এটি কে নির্মাণ করেছিলেন বা কোন সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল, সে সম্বন্ধে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী দেখলে এটি যে খান-ই-জাহান নির্মাণ করেছিলেন, সে সম্বন্ধে কোনো সন্দেহ থাকে না। ধারণা করা হয় তিনি ১৫শ খ্রিষ্টাব্দে এটি নির্মাণ করেন। মসজিদটি বহু বছর ধরে ও বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল।

 ষাটগম্বুজ মসজিদ, বাগেরহাট

কীভাবে যাবে
ঢাকা থেকে বাগেরহাটে বাসে যাওয়ার দুটি ভিন্ন রুট রয়েছে। একটি হচ্ছে ঢাকার গাবতলী হয়ে আরিচা ফেরি পারাপার হয়ে খুলনা বাগেরহাট। আর অন্যটি গুলিস্তান, সায়েদাবাদ হয়ে মাওয়া ফেরি বা লঞ্চ পারাপার হয়ে বাগেরহাট।

ছবি: লেখক

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

16 − fifteen =