উৎসবে বাড়ে শিশুর আত্মবিশ্বাস

করেছে Suraiya Naznin

সূরাইয়া ইসলাম মুন্নি

যে কোনো উৎসব শিশুর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে। ঈদের সময় বাবা-মা শিশুর বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন কাজে শিশুকে সহায়তা করার সুযোগ দিলে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। যেমন ঈদের শুকনো বা কাঁচাবাজারে শিশুর অংশগ্রহণ, ঘর গোছানো, জিনিসপত্র পরিষ্কার ও মোছা, রান্নায় শিশুর অংশগ্রহণ। এভাবে শিশুকে ব্যস্ত রাখলে তার উৎসব আরও আনন্দময় হবে।

পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য ঈদ অনেক আনন্দের ও প্রতীক্ষার। পরিবারের বড়দের মতো শিশুরাও অপেক্ষা করে ঈদ উৎসবের। দুঃখজনক হলেও সত্যি, ২০২০ সালের পর থেকে করোনার কারণে আনন্দঘন পরিবেশে ঈদ উদ্্যাপনের সুযোগ পায়নি শিশুরা। লকডাউনে না থাকায় এই বছরের রোজা ও ঈদুল ফিতর নিয়ে সবার ভেতরে উত্তেজনা তৈরি করছে। কোনো ধরনের বাধা না থাকায় ঈদের কেনাকাটা করতে পরিবারের সবাই একসঙ্গে ঘরের বাইরে যেতে পারবে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, করোনা-পূর্ব সময়ের মতো ঈদে শিশুরা আনন্দ করতে পারবে কি না। ঈদের পুরোনো ভাব ফিরে আনতে ও শিশুদের আনন্দ বাড়িয়ে তুলতে পরিবারের বড় সদস্যদের মূল ভূমিকা পালন করতে হবে।

পরিবারে ঈদ উৎসবের গুরুত্ব ঈদ মুসলিম সমাজের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। বাংলাদেশে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী মানুষেরাও ঈদের আনন্দে অংশগ্রহণ করে থাকে।

১. ঈদে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ছাড়াও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী আচরণের প্রচলন আছে। ঈদের ঐতিহ্যবাহী আচরণগুলো বড়দের পাশাপাশি পরিবারের ছোট শিশুদের জন্য আনন্দদায়ক। যেমন একসঙ্গে ঈদের নামাজ পড়া, নতুন জামা পরা, কোলাকুলি করা, সালাম করে সালামি নেওয়া, ইত্যাদি। শিশুদের সঙ্গে শিশুদের বাবা-মায়েরাও উপভোগ করে এ মুহূর্তগুলো।

২. অনেক সময় কর্মব্যস্ততায় বাবা-মা সন্তানকে সময় দিতে পারে না। এ ছাড়া বর্তমানে অনেক বাবা-মা ও সন্তানেরা ইলেকট্রনিক ডিভাইস (মোবাইল, ট্যাব, টিভি) নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত থাকে। যার ফলে একই পরিবারে কাছাকাছি থেকেও সবার মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়। ঈদের সময় ছুটির কারণে পরিবারের সব সদস্য নিজেদের কর্মব্যস্ততাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে নিজেরা একসঙ্গে সময় কাটাতে পারে।

৩. পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন ঐতিহ্য অনুসরণের মাধ্যমে ছোটরা তাদের অতীতের ও বর্তমানের বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারে। অনেক সময় শিশুরা সারা বছর উৎসবের এ মুহূর্তগুলোর জন্য অপেক্ষা করে থাকে, ‘কখন ঈদ আসবে, কখন সালামি পাব।’

৪. ঈদের সময় শিশুরা বাবা-মা বা বন্ধুদের সঙ্গে আত্মীয়, প্রতিবেশীদের বাসায় ঘুরতে যায়। অনেক সময় ঈদে শিশুরা গ্রামের বাড়িতেও ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ পায়। ভিন্ন পরিবারের বা ভিন্ন পরিবেশের মানুষদের জীবনযাত্রা দেখে নতুন কিছু শিশুরা শিখতে পারে, যেমন নতুন খাবার চেনা, কোনো নতুন কাজ কীভাবে করতে হয়, ভাষা (আঞ্চলিক ও শুদ্ধ), সামাজিকতা, ইত্যাদি।

৫. ঈদে ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকায় পরিবারের বড়দের মতো ছোটরাও ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে থাকতে পারে।

৬. ধর্মীয় উৎসব শিশুর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে। ঈদের সময় বাবা-মা শিশুর বয়স অনুযায়ী বিভিন্ন কাজে শিশুকে সহায়তা করার সুযোগ দিলে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। যেমন ঈদের শুকনো বা কাঁচা বাজারে শিশুর অংশগ্রহণ, ঘর গোছানো, জিনিসপত্র পরিষ্কার ও মোছা, রান্নায় শিশুর অংশগ্রহণ, ইত্যাদি।

৭. ঈদের সময় শিশুরা ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করায় নিজেদের পছন্দ ও অপছন্দের বিষয়গুলো সহজে বুঝতে পারে ও সচেতন হতে পারে।

৮. ঈদের সময় শিশুর সঙ্গে সব সময় যে ইতিবাচক নির্দিষ্ট ঘটনা ঘটে, এমন নয়। অনেক সময় অপ্রত্যাশিত ঘটনাও ঘটতে পারে। যেমন ঈদের সময় গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সময় রাস্তার জ্যাম বা দূরত্বের কারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা, রাস্তায় রিকশা বা গাড়ি না পেলে হেঁটে কাছাকাছি গন্তব্যে চলে যাওয়া, ক্লাসের বন্ধুদের বাসায় আসার কথা থাকা সত্ত্বেও না আসা, ইত্যাদি। এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা শিশুকে নতুন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে শেখায়। এ ছাড়া অপ্রত্যাশিত ঘটনায় বাবা-মা কীভাবে পরিস্থিতি সামলে নিচ্ছে, তা দেখেও শিশুরা অনেক কিছু শিখতে পারে।

৯. ঈদ-সম্পর্কিত ধর্মীয় গল্প শিশুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তৈরিতে ভূমিকা রাখে। যেমন ঈদে হজরত মুহাম্মদ (সা.) একজন এতিম শিশুকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন এবং শিশুটিকে নিজ পরিবারে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এই গল্প থেকে শিশুরা দয়াবান ও সহানুভূতি শিখতে পারে। এ ছাড়া বাবা-মা পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের নিজেদের বিভিন্ন বয়সের মজার গল্প শিশুর সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন, যা শিশুকে আনন্দ দেবে ও শিশুর কল্পনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

ঈদের ছুটিতে শিশুকে ব্যস্ত রাখার টিপস
ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে শিশুদের ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে রাখা জরুরি। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুকে যখন বাবা-মা মজাদার কোনো অ্যাকটিভিটি করতে দেবে, শুধু তখনই শিশু নিজের ইচ্ছায় ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে দূরে থাকবে। শিশুকে যে ধরনের অ্যাকটিভিটি দেওয়া যেতে পারে :

১. একসময় ঈদে কার্ড উপহার দেওয়ার প্রচলন ছিল। সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সন্তানের বন্ধুদের জন্য বা পরিচিত মানুষদের জন্য কার্ড কিনতে পারেন বা নিজেরা একসঙ্গে কার্ড তৈরি করতে পারেন। কার্ডে শুভে”ছাবাণী লেখায় সন্তানের সহায়তা নিন, তাকে কার্ডে লেখার বা ছবি আঁকার সুযোগ করে দিন।

২. ঈদের আগে সন্তানের কাছে জেনে নাও, সে ঈদে কী খেতে চায় এবং সে রান্নায় তোমাকে সহযোগিতা করতে চায় কি না। শিশুকে তার বয়স ও দক্ষতা অনুযায়ী কিছু কাজ করার সুযোগ দাও। শিশুর প্রশংসা করো।

৩. রান্না ছাড়াও ঘরের অন্যান্য কাজে শিশু সহায়তা করতে চাইলে তার ই”ছার গুরুত্ব দাও। যদি শিশু এমন কোনো কাজ করতে চায় যা শিশুর বয়স ও দক্ষতা অনুপযোগী তাহলে শিশুকে কারণসহ ব্যাখ্যা করো কেন তাকে তুমি কাজটি করতে দি”ছ না।

৪. সন্তানের জন্য কোনো একটি উপহার কিনে রাখো, যা তাকে ঈদের দিন উপহার দেবে। সালামির পাশাপাশি উপহার পেয়ে শিশু খুশি হয়ে যাবে। উপহার হিসেবে বয়স উপযোগী বই, রঙের বাক্স, ক্রাফটের উপকরণ ইত্যাদি দিতে পারো।

৫. সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে পরিচিত বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীর বাসায় ঘুরতে যাও। সন্তান স্কুলপড়–য়া হলে সন্তানের বন্ধু-বান্ধবীর বাসায় যাওয়া যায়। তবে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার আগে নিশ্চিত হয়ে নাও তারা বাসায় আছে কি না। পরিচিত বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের নিজেদের বাসায় দাওয়াত করো। সন্তান এর মাধ্যমে সামাজিকতা শিখতে পারবে।

৬. আপনার বাসায় আপনার শিশুর সমবয়সী বা কাছাকাছি বয়সের অন্য শিশুদের জন্য বয়স অনুযায়ী প্রতিযোগিতামুলক খেলা ও কুইজের আয়োজন করতে পারেন। সন্তানের সহপাঠীদের, একি বিল্ডিংয়ের শিশুদের বা পারিবারিকভাবে পরিচিত শিশুদের বাসায় আমন্ত্রণ জানান।

৭. ঈদের পূর্বে ও পরে অনেক পরিবার অসহায় মানুষদের পোশাক, খাবার বা আর্থিক সহায়তা করে থাকে। এই ধরনের দাতব্য কাজে সন্তানকে সাথে রাখুন। সন্তানকে জানাতে পারেন- “ঈদ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। মানুষদের বিভিন্ন জিনিস এই জন্য দেয়া হচ্ছে যেন সবাই একসাথে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে”।

৮. ঈদে শিশু খেলার জন্য অন্য কোন শিশুকে না পেলে শিশু একা খেলতে পারে এমন খেলা শিশুর জন্য তৈরি রাখুন। যেমনঃ গুপ্তধনের সন্ধান। এই খেলায় শিশুকে বিভিন্ন জিনিসের নাম লিখে একটি লিস্ট তৈরি করে দিন। শিশু পড়তে না পারলে জিনিসের ছবি একে দিতে পারেন বা প্রিন্টেড ছবি কাগজে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিতে পারেন। এখন শিশুকে নির্দিষ্ট সময়ের ভিতরে লিস্টে লেখা জিনিসগুলো খুজে বের করে আপনাকে এনে দিতে বলুন। খেয়াল রাখবেন, লিস্টে শুধুমাত্র ঘরে আছে এমন বস্তুর নাম লিখবেন। খেলার শেষে শিশুর জন্য উপহারও রাখতে পারেন।

৯. বাবা-মা সন্তানকে সাথে নিয়ে গল্পের বই পড়তে পারেন, ছবি আঁকতে পারেন, ঈদের সিনেমা বা নাটক দেখতে পারেন, রঙিন কাগজ কলম দিয়ে ফ্যামিলি ট্রি তৈরি করতে পারেন, বোর্ড গেম বা কার্ড গেম খেলতে পারেন। ঈদের দিন ঘরের সবাই একসাথে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করুন। পরিবারের সবাই একসাথে খাবার খাওয়া সন্তানের জন্য আনন্দের বিষয়।

ঈদে গ্রামে বা অন্য কোথাও ঘুরতে যাওয়াঃ ইংল্যান্ডে ২০১৫ সালের একটি গবেষণায় ৪৫% মানুষ জানান, তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হলো ছুটিতে পরিবারের সাথে ঘুরতে যাওয়া। তাই ঈদের ছুটিতে সুখময় স্মৃতি তৈরি করতে গ্রামে ঘুরতে যেতে পারেন। শহরের শিশুরা গ্রামের মনোরম পরিবেশে সুন্দর সময় কাটাতে পারবে।

এছাড়া ঈদে ঢাকা শহরের বাবা-মায়েরা সন্তানদের নিয়ে শহরের ভিতরে দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে যেতে পারেন। যেমন, শিশুপার্ক, শিশুমেলা, চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, লালবাগ কেল্লা, জাদুঘরসহ বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় যেতে পারেন। অনেকে ঈদের ছুটিতে সপরিবারে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে ঘুরে আসতে পারেন।

ঈদের ব্যস্ততায় সন্তানের যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবেঃ ঈদের ছুটি বছরের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোর একটি। তারপরেও অনেক সময় শিশুরা ঈদের ব্যস্ততায় অপ্রতাশিত আচরণ করে ও শিশুর ভিতরে উদ্বিগ্নভাব দেখা যায়। বিশেষ করে ছোট শিশু যাদের বয়স দেড় বছর থেকে চার বছর তাদের জন্য ঈদের হঠাৎ পরিবর্তন নেয়া বেশ কষ্টকর হয়। অনেক সময় শিশু কান্না করে, জিদ করে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে বাবা- মাকে শান্ত থেকে সন্তানের চাহিদায় মনযোগ দিতে হবে। প্রয়োজনে যে ঘরে মানুষ কম থাকবে, শব্দ কম থাকবে শিশুর সাথে কিছুক্ষণ সময় আলাদাভাবে ওই ঘরে কাটাতে হবে। শিশু শান্ত হলে তাকে আবার সবার মাঝে নিয়ে যেতে হবে।

ঈদে বাসায় পরিচিত অনেকেই ঘুরতে আসে। এইসব ক্ষেত্রে শিশু কোন আত্মীয় বা প্রতিবেশির কাছে যেতে না চাইলে তাকে জোর করবেন না। শিশুকে নিজের মতো খেলাধুলা করতে দিন।

ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার সাথে সাথে শিশুর দৈনন্দিন রুটিনে ফিরে যান। দৈনন্দিন রুটিন অনুসরণ করা শুরু করলে শিশুর ভিতরের উদ্বিগ্নভাব কমে যাবে। এছাড়া শিশুকে নিয়ে বাসার বাইরে ঘুরতে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর খাবার ও পানীয় সাথে রাখুন।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 × 1 =