শায়লা জাহানঃ

মাতৃত্ব এমন এক অনুভূতি যার কোন তুলনা হয়না। কিন্তু মাতৃত্বের যাত্রা সবার জন্য সহজবোধ্য হয়না, আর তা যদি হয় সিঙ্গেল মাদারহুড; তখন পরিস্থিতি তো আরও কঠিন মনে হতে পারে। এমন অনেক দ্বন্দ্ব এবং চাপ রয়েছে যা একক মায়েদের মধ্য দিয়ে যায় যা অন্য পরিবারগুলো সরাসরি অনুভব করতে পারেনা। একক মায়েদের শক্তি এবং স্থিতিস্থাপকতা অবিশ্বাস্যভাবে প্রশংসনীয়, তবে এর পেছনে তাদের ক্লান্তি অনুভব করাও বোধগম্য।

সুখী সমৃদ্ধময় একটি পারিবারিক জীবন কে না চায়। কিন্তু অনেক সময় বাস্তবতার খাতিরে আমাদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় যা কারোরই কাম্য হতে পারেনা। সিঙ্গেল প্যারেন্টস এমনই এক বিষয়। একক অভিভাবক হওয়ার পেছনে অনেক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বিবাহবিচ্ছেদ, পরিত্যাগ, বিধবা হওয়া, ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স, একক ব্যক্তি দ্বারা সন্তান জন্মাদান বা দত্তক নেয়া। সঙ্গীর সাথে অভিভাবকত্ব ইতিমধ্যেই অপ্রতিরোধ্য এবং চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। সেখানে একক মা হওয়া সম্পূর্ণ অন্য এক অগ্নিপরীক্ষা। তাদের প্রতিনিয়ত জীবনে বেশকিছু অপ্রতিরোধ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। যেমনঃ

আর্থিক চ্যালেঞ্জ

সন্তানের জীবনে একমাত্র উপার্জনকারী এবং যত্নশীল হওয়া অবিশ্বাস্যভাবে চ্যালেঞ্জিং। একজন প্রাপ্তবয়স্ককে একাই ভার বহন করতে হয় যা সাধারণত দুজন বহন করে। এতে করে বিশাল এক দায়িত্ব এসে পড়ে। এই কষ্ট শুধুমাত্র আর্থিক নয়, এটি একটি মানসিক বোঝাও বটে এবং মা প্রায়ই তার বাচ্চাদের জন্য যথেষ্ট না দেওয়ার জন্য নিজেকে দোষী বোধ করেন।

মানসিক চ্যালেঞ্জ

বাস্তবতা হলো একক মা হওয়া মানে একাকী হয়ে যাওয়া। নিজেদের ভালো লাগা, মন্দ লাগা শেয়ার করার মতো কোন সঙ্গী থাকেনা। উদ্বেগ, স্ট্রেস, আশাহীন বা মূল্যহীন বোধের মতো মানসিক স্বাস্থ্যের লড়াই একক মায়েদের জন্য সাধারণ।

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

একটি একক মায়ের লড়াইয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা অনেক বড় এক প্রতিবন্ধকতার কাজ করে। সিঙ্গেল মাদারহুডের সাথে সাথে সামাজিকভাবে যে অপবাদ আসে তা পুরানো এবং সেকেলে কিন্তু কোনভাবেই তা দূর করা যাবেনা। সমাজ এখনও মনে করে একজন একক বাবা শান্ত ও সাহসী এবং একক মা দরিদ্র ও ক্লান্ত।

সিদ্ধান্তের চাপ

অভিভাবকত্ব দায়িত্ব পালন করা কঠিন। বাচ্চা বড় হওয়ার সাথে সাথে এই দায়িত্ব আরও বেশি বেড়ে যায়। একজন সঙ্গীর সমর্থন ছাড়া একটি সন্তানের জীবনের অনেক বড় সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য একক মায়ের উপর সবকিছুই ছেড়ে দেয়া হয়। এটি অবিশ্বাস্যভাবে ভীতিজনক এবং প্রচুর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

অপরাধবোধ

সমস্ত একক মায়ের সংগ্রামের মধ্যে, এটির বিরুদ্ধে লড়াই করা সবচেয়ে কঠিন হতে পারে। তাদের মনে অপরাধবোধ আসার যেন শেষ নেই। নিজে যে আর্থিক জিনিসগুলো সরবরাহ করতে পারবেনা সে সম্পর্কে অপরাধবোধ, বাচ্চাদের থেকে দূরে কাটানো সময় সম্পর্কে অপরাধবোধ, পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার প্রেক্ষিতে যেগুলো করতে পারা যায়না সে সম্পর্কে অপরাধবোধ। সন্তানরা একক পিতামাতার সন্তান হিসেবে যেভাবেই বেড়ে উঠুক না কেন তা তাদের উপর কী প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ও নিজেদের দায়ী বোধ মনে হয়।

একক মাতৃত্ব সহজ করার উপায়

একটি শিশুকে নিজের মতো করে বড় করা সহজ কাজ নয়, তবে তুমি একা নও। নিজের মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে, ব্যক্তি হিসেবে উন্নতি করতে এবং মাতৃত্ব সহজ করার কিছু উপায় দেয়া হলঃ

-তুমি তোমার ধারণার চেয়েও বেশি শক্তিশালী। একজন সঙ্গী ছাড়া সবচেয়ে কঠিন কাজ তুমি একাই করতে পারছো। যখন ক্লান্তি ও হতাশা মনে ধরে যাবে তখন নিজেকে ব্যর্থ মনে হবে। কিন্তু সেখান থেকে একবার পাশ কাটিয়ে উঠে যখন দেখবে দিন শেষে বাচ্চারা সুস্থ থাকে, সুখী হয় তাহলে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কিছুতেই নেই।

-মাতৃত্বের কঠিন সময়ে পরিবার এবং বন্ধুদের উপর নির্ভর করতে সক্ষম হওয়া তোমার সুস্থতা রক্ষার জন্য অপরিহার্য। সাহায্য প্রয়োজন তা স্বীকার করা শক্তি প্রমাণ করে, দূর্বলতা নয়।

-নিজের জন্য সময় বের করা। যদিও এটা অর্জন করা কঠিন হতে পারে কিন্তু নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করা বার্নআউট এবং ক্লান্তি এড়াতে প্রয়োজনীয়। নিয়মিতভাবে মাইন্ডফুলনেস ভিত্তিক স্ব-যত্ন অভ্যাস অনুশীলন করতে হবে। এটি শারীরিক পাশাপাশি মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করবে।

-কীভাবে একজন একক মা সুখী হতে পারে? নিজেকে জীবনে অনুপ্রাণিত রাখতে নিজের জন্য স্মার্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। যদিও তোমার সন্তানের উপর ফোকাস করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু পাশাপাশি এটাও মনে রাখতে হবে তোমার সমগ্র জীবনকে কেন্দ্র করে তাদের চারপাশে থাকতে পারবেনা। তাই নিজের জন্যও কিছু ব্যক্তিগত লক্ষ্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

-একাকীত্ব বোধ এমন এক জিনিস যা অনেকের ভিড়ে থেকেও নিজেকে নিঃসঙ্গ বোধ করিয়ে দেয়। এই একাকীত্ব বোধের সাথে লড়াই করতে হবে। ছবি আঁকা, বই পড়া, গান শোনা বা বন্ধুদের নিয়ে প্রিয় কোন মুভি দেখতে যাওয়ার মতো কাজ করা যেতে পারে।

তুমি তোমার জীবনের স্থপতি। মনে রাখবে প্রতিটি দিন নতুন করে তৈরি হয়। নিজেকে বিশ্বাস ও সম্মান করা তোমার সন্তানের জন্য একটি চরিত্র গঠনের পরিবেশ তৈরী করতে সাহায্য করে।

-ছবি সংগৃহীত

 

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

8 + 18 =