এডিএইচডিঃসন্তানের অতিরিক্ত চঞ্চলতা যখন দুশ্চিন্তার বিষয়

করেছে Shaila Hasan

শায়লা জাহানঃ

বাচ্চারা স্বভাবতই চঞ্চলপ্রিয়। দৌড়ঝাঁপ, লাফালাফি, দুরন্তপনা; ক্ষেত্রবিশেষ অমনোযোগী ভাব তাদের মধ্যে থাকবেই। কিন্তু যখন তাদের এই অতিরিক্ত চাঞ্চল্যতা ও কোন কিছুতে মনোনিবেশ না  করার ভাব বেশি দেখতে পাওয়া যায় তখন তা চিন্তার কারন হয়ে দাঁড়ায় বটে। আর এই সবকিছুই এডিএইডি’র লক্ষন হিসেবে সনাক্ত হতে পারে। কি এই এডিএইচডি? তা নিয়েই আজ আমরা জানবো। 

এডিএইচডি’র পূর্নরুপ অ্যাটেনশন-ডেফিসিট ডিসঅর্ডার বা মনোযোগ-ঘাটতি ব্যাধি। এটি একটি আচরণগত ব্যাধি, যা সাধারনত অসাবধানতা, আবেগপ্রবণতা এবং কিছু ক্ষেত্রে হাইপার এক্টিভিটি দ্বারা শৈশবেই প্রথম নির্ণয় করা যায়। এই উপসর্গগুলো কখনো একসাথেই ঘটে আবার কখনোবা একটি অন্যগুলো ছাড়াও দৃশ্যমান হতে পারে। একটি এস্টিমেটে দেখা গেছে যে, প্রায় ৪% থেকে ১২% শিশুর এই এডিএইচডি আছে। মেয়ে শিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুদের হাইপার এক্টিভ বা সম্মিলিত এডিএইচডি হওয়ার সম্ভাবনা ২-৩ গুণ বেশি। হাইপার এক্টিভিটির লক্ষণগুলো অনেকসময় সন্তানের ৭ বছর বয়সের মধ্যে স্পষ্ট হয় এবং খুব অল্প বয়সী প্রিস্কুলারদের মধ্যে উপস্থিত হতে পারে। একটি শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সম্মুখীন না হওয়া পর্যন্ত এই মনোযোগ ঘাটতি স্পষ্ট নাও হতে পারে। এই এডিএইচডি তিন ধরনের টাইপস রয়েছে-

কম্বাইন্ড বা সম্মিলিত প্রকার

এডিএইচডি’র প্রকারের মধ্যে এটি সবচেয়ে কমন। আবেগপ্রবণ এবং অতিসক্রিয় আচরনের পাশাপাশি অসাবধানতা ও বিভ্রান্তি দ্বারা একে চিহ্নিত করা হয়।

হাইপার এক্টিভ বা অতি সক্রিয় প্রকার

অসাবধানতা ও বিভ্রান্তি ছাড়াই আবেগপ্রবণ এবং অতিসক্রিয় আচরন দ্বারা এটি চিহ্নিত।

অমনোযোগী ও বিভ্রান্তিকর প্রকার

এতে হাইপার এক্টিভিটি দেখা যায়না। এটি শুধুমাত্র অসাবধানতা এবং বিভ্রান্তি দ্বারা চিহ্নিত।

এই ব্যাধির কারন ও লক্ষন

এডিএইচডি হল শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সবচেয়ে গবেষণা করা ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে একটি। কিন্তু এর হওয়ার পেছনে সঠিক কারন এখনও অজানা। তবে পাওয়া উপাত্ত দ্বারা এটা নির্দেশিত হয় যে এডিএইচডি জেনেটিক। এটি একটি মস্তিষ্ক-ভিত্তিক জৈবিক ব্যাধি। নিম্ন স্তরের ডোপামিন ( একটি মস্তিষ্কের রাসায়নিক), যা একটি নিউরোট্রান্সমিটার, এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে পাওয়া যায়। ব্রেইন ইমেজিং স্টাডিজ দেখায় যে, এডিএইচডি আক্রান্ত শিশুদের মস্তিষ্কের বিপাক ক্রিয়া কম থাকে যা মনোযোগ, সোশ্যাল জাজমেন্ট এবং মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রন করে। এখন এর উপসর্গের ব্যাপারে জানবো। যদিও প্রতিটি শিশুই ভিন্নভাবে উপসর্গগুলো অনুভব করে। তবে এর ৩ বিভাগের মধ্যে নিম্নলিখিতগুলো অন্তর্ভূক্ত রয়েছে-

অমনোযোগী

-মনোযোগ টিকিয়ে রাখতে অসুবিধা

-অন্যের কথা শুনতে অসুবিধা

-সহজেই বিভ্রান্ত

-বিস্মৃতি

-দূর্বল সাঙ্গগঠনিক দক্ষতা

-দূর্বল অধ্যয়ন দক্ষতা

আবেগপ্রবণতা

-প্রায়শই অন্যদের বাঁধা দেয়

-ঘন ঘন ঝুঁকি নেয় এবং কোন কিছু চিন্তা না করেই যেকোন কাজ করে ফেলে

হাইপার এক্টিভিটি

-অত্যধিক চঞ্চলতা

-অতিরিক্ত কথা বলা

-বারবার এবং প্রায়ই জিনিস হারায় বা ভুলে যায়

-কাজে থাকার অক্ষমতা; কোনো কাজ শেষ না করেই এক কাজ থেকে অন্য কাজে চলে যাওয়া

প্রতিকারের উপায়

এডিএইচডি  সাধারনভাবে শৈশবেই নির্ণয় করা যায়। একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ শিশুদের মধ্যে এটি শনাক্ত করতে পারেন। পিতামাতা এবং শিক্ষকদের কাছ থেকে সিশুর আচরনের বিশদ ইতিহাস, আচরনের পর্যবেক্ষণ এবং মনোশিক্ষামূলক পরীক্ষা এডিএইচডি নির্ণয় করতে অবদান রাখে। তবে এ শিশুদের ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য থাকে তাদের চঞ্চলতা কমানো। চঞ্চলতা কমাতে পারলেই তাদেরকে উদ্দিষ্ট কাজে মনোনিবেশ করা সহজ হবে। আর এছাড়া কিছু ব্যবস্থা গ্রহন করা যায়। যেমন-

-বাচ্চার খাবারের প্রতি নজর দেয়া দরকার। স্কুলে যাওয়ার আগে বা কোন কাজ শুরু করার আগে তার খাবারের দিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। কারন ক্ষুধাবোধ চঞ্চলতা বাড়ায়। তাই তার ভরপেটে সকালের নাস্তা খাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

-মনোযোগ বৃদ্ধিতে মেডিটেশন বা ডিপ ব্রিদিং অনেক কাজে দেয়। বাচ্চাকে এইসব রিলাক্সেশন টেকনিক খেলারছলে শেখানো যায়। আর না হয় কোন দক্ষ ব্যক্তির সাথে আলোচনা করে কিভাবে শেখানো যায় তা ঠিক করতে হবে।

-এরা সদারনত এক্টিভ থাকতে পছন্দ করে। তাই তাদের জন্য একটি দৈন্দিন রুটিন প্রণয়ন করে রাখলে ভালো হয়। এতে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

-কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফট বা শান্ত টাইপের মিউজিক অনেক কাজে দেয়। ঘুম পাড়ানোর সময়, বা খাবারের সময় তার চাঞ্চল্য কমানোর জন্য এই ধরনের মিউজিক ছেড়ে দিয়ে দেখা যেতে পারে।

-খাবারের তালিকার পরিবর্তন করা। তারা যদি নিয়মিত হাই আয়রন যুক্ত খাবার খায় তা হলে অনেকটাই নিয়ন্ত্রন থাকে এই সমস্যা। সেক্ষেত্রে খাবারের পাতে থাকতে হবে রকমারি শাক সবজি। বিশেষ করে ব্রোকোলি, পালং শাক, ফুলকপি ইত্যাদি।

-মাছে থাকে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। কিন্তু বাচ্চারা অনেক সময় মাছ খেতে চায়না। সেইরকম হলে তাদের রকমারী বাদাম দেয়া যেতে পারে। বাদামে প্রচুর মাত্রায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড আছে যা এডিএইচডি নিয়ন্ত্রনে খুবই কার্যকরী।

-সর্বোপরি নিজেকে শান্ত রাখা। তাদের সাথে অস্থির বা রাগ বা হতাশ আচরন করা ঠিক না। এতে তাদের হাইপার এক্টিভিটি আচরনে এর প্রভাব পড়তে পারে। যদি নিজেকে শান্ত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে তবে দ্রুত অন্য রুমে চলে যাও এবং নিজে শান্ত হওয়ার সময় দাও।

-ছবি সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

one + six =