এলোমেলো মনে নেপালে

করেছে Rodoshee

নাম তার হিমালয় কন্যা। পরতে পরতে যার ছবির মতো সৌন্দর্য। আছে পাহাড় আর সাগরের অপূর্ব সন্মিলন। হ্যাঁ, নেপালের কথাই বলছি! হিমালয়ের দেশ নেপাল ঘুরে এসে লিখেছেন ইমরান মাহফুজ

পাখি হয়ে ঘোরাই আমার স্বভাব। একটু ফুরসত পেলেই হাওয়া। গ্রাম কিংবা শহর কোথাও নেই দ্বিধা। সাধ্যের মধ্যে করি জীবনানন্দ ফেরি। অনুপ্রেরণা পাই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘মানস ভ্রমণ’ কবিতায় : ইচ্ছে তো হয় সারাটা জীবন/ এই পৃথিবীকে/ এফোঁড়-ওফোঁড় করে যাই দুই/ পায়ে হেঁটে হেঁটে অথবা বিমানে’। আমিও গত ১৩ এপ্রিল দুপুরে বাংলাদেশ বিমানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘যেতে যেতে একলা পথে’ চলি। আর মনে করি কবিগুরুর ঘুরে বেড়ানোর দারুণ নেশাকে। প্রচুর ভ্রমণ করেছেন বিশ্বকবি। ট্রেন, জাহাজ, নৌকা, পালকি কিংবা গরুর গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশে-বিদেশে।

বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে সহজলতা বিদেশ বলতে প্রথমেই যে নামগুলো মনে আসে ভারত, নেপাল ও ভুটান। নেপাল তাদের মধ্যে অন্যতম। আমি বেছে নিলাম নেপালকে। তা ছাড়া খরচও আয়ত্তের মধ্যে। যাকে বলে সাধ্যের মধ্যে সাধ পূরণ। কবি আশিক রেজার আন্তরিক সহযোগে জীবনের প্রথম বিদেশ সফর নেপাল!

স্বাগত ত্রিভুবন

এয়ারপোর্টে চেকিং শেষে প্লেনে উঠি। প্লেন ঠিক সময় থেকে ৩০ মিনিট দেরিতে ছাড়ল। একজন যাত্রী আসতে দেরি আসায় অপেক্ষায় কিছুটা বিলম্ব। ঢাকা থেকে আকাশে ওড়ার কিছুক্ষণ পর জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখলাম সবকিছু ছবির মতো সুন্দর। দেখতে দেখতে কাঠমান্ডুর কাছাকাছি এসে বিমানের ক্যাপ্টেন জানাল, নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে জ্যাম আছে। বাধ্য হয়ে আরও প্রায় এক ঘণ্টা আকাশেই! ঢাকা থেকে যখন উড়াল দিই, তখন জানানো হয় যাত্রার সময় থেকে আনুমানিক দেড় ঘণ্টা। এখন তা দাঁড়াল প্রায় আড়াই ঘণ্টা। অবশেষে পাখির মতো উড়ে নামলাম ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে। ভেতরে প্রবেশ করতেই আশিক ভাই অভ্যর্থনা জানায়। ভিসা-সংক্রান্ত কাজ সেরে বিমানবন্দর যখন বাইরে আসি, তখন সূর্য হেলে পড়ছে। হালকা ঠান্ডাও অনুভব করলাম। গরম পোশাক পরে গাড়িতে উঠি। উদ্দেশ্য কাঠমান্ডুর থামেলসস্থ সার্ক সচিবালয়। ট্যাক্সিতে দুজনই বেশ আনন্দে দেশের খোঁজখবর নিতে নিতেই অফিসে আসি। সেই সঙ্গে জানলাম, নেপালের সংস্কৃতিতে কারও সঙ্গে দেখা হলে প্রথমে প্রার্থনার ভঙ্গিতে হাতজোড় করে নমস্তে বা নমস্কার বলতে হয়। যদি কোনো প্রবীণকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে হয়- তবে নারীর ক্ষেত্রে দিদি এবং পুরুষের ক্ষেত্রে দাই সম্বোধন করতে হবে। নেপালে পায়ে ধরে সম্মান দেখানোর কোনো রীতি নেই।

নাগরকোট

বেলা প্রায় তখন চারটা। দুপুরের খাবার খেলাম। মিনাশিক ভাবি খুবই চমৎকার রান্না করেন। এমন ভোজে প্রায় সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। বেলা গড়াতে আমরা প্রস্তুতি নিলাম পহেলা বৈশাখ উৎসব অংশগ্রহণ করতে নাগরকোটে যাওয়ার। বলে রাখা ভালো, আমাদের দেশের বাংলা সনের সঙ্গেই তাদের দেশেরও মিল আছে। ফলে আনন্দ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সে জন্য আমরা যথারীতি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে নাগরকোটের উদ্দেশে মাইক্রোতে রওনা হলাম। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত স্থাপনা দেখতে দেখতে কাঠমান্ডু শহর পার হতেই সূর্য সেদিনের মতো বিদায় জানাল। আমরা হাওয়ায় উড়ছি। মাঝে মাঝে রাস্তার অবস্থা দেখে চক্ষু চড়কগাছ। নাগরকোট যাওয়ার পুরোটা পথ পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে আর সবুজে ঘেরা। মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলাম। কিছুটা মিল পেলাম আমাদের বান্দরবানের নীলগিরি যাওয়ার পথটার সঙ্গে। সারি সারি উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে আঁকাবাঁকা পথ। এক পাশে বাড়ি অন্য পাশে পাহাড় এমন দৃশ্যে চমৎকার লাগছিল। দারুণ এই পারস্পরিক মিল, পাহাড়, পথ আর লেকের মাঝখানে একবার হোটেলে থামল কিছুক্ষণের জন্য। এভাবে গাড়ি চলল প্রায় চার ঘণ্টা। কিন্তু তবু গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলাম না। নির্ধারিত হোটেল খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। অবশেষে দুই জওয়ানের সহযোগিতায় ‘নাগরকোট হিলসাইড ভিলেজ রিসোর্টে’ এলাম। আর হোটেল দেখেই আমাদের কী আনন্দ! হোটেল থেকে নিচে তাকাতেই পাহাড়ের মাঝে মাঝে অচেনা অনেক দারুণ গাছের সমাহার। পুরো জায়গাটা মনটাকে মাতোয়ারা করে রাখল। প্রাকৃতিক পরিবেশ অনন্য।

ইতিমধ্যে আমরা অনেক উচ্চতায় উঠে গেছি। মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে জানলাম প্রায় ২৮০০ ফিট ওপরে! এখানকার হিমালয়ের সর্বোচ্চ শিখরের নাম প্যানারোমা। হিমালয়ের আরও কিছু চূড়া যেমন মানাস্লু, গণেশ হিমেল, লেঙ্গান, চোবা ভাম্রি গৌরীশঙ্কর নাগরকোট থেকে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। আমরা ভোররাতেই গাড়িতে করে চলে গেলাম পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে। সূর্য ওঠার সময় অপার্থিব সোনালি আভা যখন প্রকৃতি আর মন ছুঁয়ে যায়, তখন সত্যিই মনে প্রশ্ন ওঠে- যাপিত জীবনে এত এত হিংসা-বিদ্বেষ কেন করি!

চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক

এক রাত দুই দিন পর- বাসায় এসে ভোর ছয়টার আগেই চলে গেলাম রত্ন পার্ক হয়ে থামেলস্থ ট্যুরিস্ট বাস স্পটে। বাস ছাড়বে সাড়ে ছয়টায়। আমরা যাব নেপালের দক্ষিণাঞ্চলের চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কে। সেখানে দেখা মিলবে রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং এক শিংবিশিষ্ট বিরল প্রজাতির গন্ডারসহ নানান ধরনের প্রাণী। উদ্ভূত এক রোমান্সে সরাসরি দেখা যাবে- ৩৬০ বর্গমাইলের চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক। এটি ত্রিশূলী নদীকে বাঁদিকে রেখে সবুজ পাহাড়ের শরীর বেয়ে কাঠমান্ডু থেকে নামতে নামতে প্রায় মাটির কাছে আসছে। নেপালের প্রথম এই ন্যাশনাল পার্ক ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত। যেতে যেতে প্রায় দুপুর একটা বেজে গেল। সবুজ অরণ্যে বাসস্টপেজ। যেন একখ- বাংলাদেশ। এখানকার একটা বিশেষত্ব হচ্ছে মূল শহরের বাইরে যানবাহন রাখার স্থান আর এতে পর্যটকদের গাড়ির শব্দে কোনোরকম বিরক্তি আসে না। তা ছাড়া নেপালে তো গাড়ির হর্ন দেওয়ার নিয়মও নেই। আমরা হোটেলের গাড়ি করে হাওয়ায় নাচতে নাচতে চলে গেলাম চিতওয়ানের বুকে। বিকেলে লেকের ধারে ধারে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ প্রাণীর পরিচয় দিল গাইড। এখানকার প্রতিটি বিষয় এমন গোছানো যা আমাদের গ্রহণীয়-কীভাবে সবুজ বনায়নসহ প্রকৃত সৌন্দর্যকে ইকো ট্যুরিজমের আওতায় আনা যায়। সত্যি- ভাবনার। চারদিক মুগ্ধকর সবুজ, আর তা ছাড়া নেপাল মানেই একধরনের রহস্যময়তা। যেভাবে মিহি কুয়াশার চাদর এখানকার মখমলে পাহাড়ের শরীরকে কখনো আড়ালে, কখনো গোপনে, কখনো চোখের সামনে এনে ফেলে, ঠিক সেই রহস্যময়তাই যেন ছেয়ে আছে সারা কুমারী মাতার শরীরজুড়ে!

পরদিন সকাল আটটায় বের হলাম। ‘জঙ্গলের হৃদয়ে’ হাতি আর হাতি- আর এত হাতির কথা শুনে চমকে ওঠার কিছু নেই। কারণ, এই জঙ্গলের একমাত্র বাহন এই হাতিই। হাতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানা গেছে গাইডের আলোচনায়। এবার শুরু আশিক ভাইয়ের পরিবারসহ ‘জঙ্গল সাফারি’। হাতির পিঠে ঘন জঙ্গলে দুই ঘণ্টার অ্যাডভেঞ্চার। চিতওয়ানের জঙ্গলে মাছির মতো ভিড় গন্ডার আর হরিণের। গন্ডা কয়েক গুন্ডা টাইপের গন্ডার আর শয়ের কাছাকাছি হরিণের দেখা মিলল। ওখানে পরিচয় হলো এক ভারতীয় পরিবারের সঙ্গে। বেশ মজায় সময়টা কাটল। ‘রাপ্তি’ নদীতে গোসল করলাম জলের অনুভবে। দুপুরের খাবার বেশ উপভোগ্য মনেই খেলাম।
তারপর ক্যানো রাইডিং। ‘রাপ্তি’ নদীতে জঙ্গলের গা ঘেঁষে ক্যানোয় চরে বয়ে যাওয়া। জঙ্গলে পাখি দেখার এ এক সুবর্ণ সুযোগ। বহু প্রজাতির পাখির মিলনমেলা এই অঞ্চলে। মাঝে মাঝে মিলে দেখা যায় কুমিরের। সেই সঙ্গে চিতওয়ানেই মিলেছে পৃথিবীর অন্যতম হাতি প্রজননকেন্দ্র বলে রাখা ভালো পৃথিবীতে হাতি প্রজননকেন্দ্র একেবারেই হাতে গোনা।

এমন মজার দৃশ্যে চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্কে থেকে যেতে ইচ্ছা করবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। উল্লেখ্য যে, এই পার্কটি হলো পর্যটকদের জন্য নেপালের প্রধান আকর্ষণ এবং তা ইউনেস্কোর বিশ্ব উত্তরাধিকার তালিকার অন্তর্ভুক্ত। ২০০৮ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, চিতওয়ানে দেখা যায় ৪০৮টি গন্ডার।

ভক্তপুর
চিতওয়ান ন্যাশনাল পার্ক থেকে এসে গেলাম প্রাচীন রাজাদের আবাসস্থল ভক্তপুর ও পশুপতিনাথ মন্দির। একসময়ের নেপালে রাজধানী ছিল ভক্তপুর। যেটি বর্তমানে কাঠমান্ডু থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে প্রবেশমূল্য আমাদের কাছ থেকে রাখা হয়েছে জনপ্রতি ৫০০ নেপালি রুপি। আর নেপালিদের ইতিহাসে আগ্রহী করতে কোনো মূল্য নেওয়া হয় না। যে চিন্তাটি চাইলে বাংলাদেশ গ্রহণ করতে পারে।

এই শহরটি মধ্যযুগীয় শিল্প-সাহিত্য, কাঠের কারুকাজ, ধাতুর তৈরি মূর্তি ও আসবাবপত্রের জাদুঘর বলে পরিচিত। শহরটিতে বৌদ্ধ মন্দির ও হিন্দু মন্দিরের অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। ৫৫টি জানালা সমৃদ্ধ রাজপ্রাসাদ ও তার অপূর্ব কারুকাজ নেপালের ঐতিহ্য বহন করে। বেশ কিছু ধর্মীয় উপাসনালয় রয়েছে এখানে। প্রাচীন কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রার ছোঁয়াও এখানে পাওয়া যায়। এখানকার স্থানীয় লোকজন এখনো কাঠমান্ডু ভ্যালির অনেক আবাদি জমিতে ফসল ফলায়। এর চিহ্ন মেলে স্থানীয় লোকজনের বাড়ির জানালায় ঝুলে থাকা খড়ের ব্যবহারে। আমরা দেখার সঙ্গে এসবের কিছু ছবি নিলাম অনুমতি নিয়ে। দায়িত্বে থাকা লোকজন দর্শনার্থীদের আন্তরিক সহযোগে সব সময় থাকে, যা বলার মতো। তবে কেনাকাটায় একটু খেয়াল রাখতে হবে!

পশুপতিনাথ মন্দির
১৮ এপ্রিল এখান থেকে যোগ হলো আমাদের যাত্রায় কবি জামসেদ ওয়াজেদ। গেলাম পশুপতিনাথ মন্দিরে। কাঠমান্ডু শহরের পূর্বদিকে বাগমতি নদীর তীরে মন্দিরটি অবস্থিত। পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত এই শিবমন্দির ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান। এটি এই দেশের প্রাচীনতম হিন্দু মন্দির। বলা হয় হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রধান দেবতা শিবের আরেক নাম পশুপতি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে বিভিন্ন পৌরাণিক প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়েছে একবার শিব ও পার্বতী কাঠমান্ডু উপত্যকায় বাগমতী নদীর তীরে বেড়াতে আসেন। নদী ও বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে শিব পার্বতী মুগ্ধ হয়ে নিজেদের হরিণে পরিণত করে এই এলাকায় ঘুরে বেড়ানো শুরু করলেন। কিছুদিন পরই দেবতা ও মানুষেরা শিবকে খুঁজতে শুরু করলেন। বহু পরে দেবতারা শিবকে খুঁজে পেলেও তিনি এই স্থান ত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। শেষ পর্যন্ত শিব ঘোষণা করলেন যেহেতু তিনি বাগমতীর তীরে হরিণ বেশে ঘুরেছেন সেহেতু তিনি এখানে পশুপতিনাথ বা পশুদের অধিকর্তা বলে পরিচিত হবেন। আর তাই হলো।

দেখা যায় পশুপতিনাথের মূল মন্দিরটি নেপালের প্যাগোডা রীতিতে তৈরি। কৌণিক গঠন, কাঠের কারুকার্য এসবই নেপালের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যরীতির অংশ। মন্দিরটি চারকোনা। এক স্তরবিশিষ্ট ভিত্তিভূমির ওপর স্থাপিত মন্দিরটি ভূমি থেকে ২৩.৬ মিটার উঁচু। মন্দিরটির সারা গায়ে সোনা ও রুপার কারুকাজ করা। হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি খোদাই করা হয়েছে মন্দিরের দেয়ালে। দুই স্তরবিশিষ্ট ছাদ তামার তৈরি, তাতে সোনার প্রলেপ দেওয়া। মন্দিরটির চারটি প্রধান দরজা। চারটি দরজাই রুপা দিয়ে মোড়া। প্রতিটি দরজার দুই পাশে সোনা দিয়ে প্রধান দেব-দেবীদের মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। মন্দিরের ভেতরে রয়েছে একটি পবিত্র কক্ষ। এখানে একটি শিবলিঙ্গ রয়েছে। এটি এক মিটার দীর্ঘ ও চতুর্মুখ। এই চারটি মুখ শিবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কিত চার দেব বিষ্ণু, সূর্য, পার্বতী ও গণেশের। মন্দিরের চূড়া সোনার তৈরি। পশ্চিম দরজার সামনে রয়েছে একটি বিশাল ষাঁড়ের মূর্তি যার নাম নন্দী। নন্দী মূর্তিটি ব্রোঞ্জের তৈরি সোনার প্রলেপ দেওয়া। মূল শিবলিঙ্গটি কালো পাথরে তৈরি ছয় ফুট দীর্ঘ। মন্দিরের ছাদের নিচের দেয়ালে সপ্তদশ শতাব্দীতে কাঠের অপূর্ব কারুকার্যের মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে শিব, পার্বতী, গণেশ, কুমার কার্তিক এবং যোগিনীদের মূর্তি। এ ছাড়া রয়েছে হনুমান, রাম, সীতা, লক্ষ্মণসহ রামায়ণের বিভিন্ন চরিত্র ও পুরাণের বিভিন্ন কাহিনি ও দেব-দেবীর ছবি।

মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা বাগমতী নদী- হিন্দু ও বৌদ্ধ দুই সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই পবিত্র নদী। পুণ্যার্থীরা এই নদীতে স্নন করেন। দেখলাম- এ জন্য নদীর দুই তীরে রয়েছে অনেক ঘাট। লেখা আছে- এর মধ্যে উনিশ শতকে প্রতিষ্ঠিত আর্য ঘাট বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ ঘাটে শুধু নেপালের রাজপরিবারের সদস্যদের মরদেহ দাহ করা হতো। নদীর তীরে গেলেই দেখা যায় সারি সারি চিতা জ্বলছে। গৌরী ঘাট হলো নারীদের স্নানের জন্য বহুল ব্যবহৃত ঘাট। মন্দির তার অপূর্ব শৈল্পিক কারুকার্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক দেখতে আসছে। মানুষ আর মানুষ যেন মিলনোৎসব!

পাঠান দরবার স্কয়ার

এখান থেকে কবি জামসেদ ওয়াজেদসহ দরবার স্কয়ারে। নেপালের একটি খুবই বিখ্যাত স্থান দরবার স্কয়ার। এটি এখানকার তিনটি দরবার চত্বরের মধ্যে অন্যতম। এই জনপ্রিয় চত্বরে, এই অঞ্চলের শাসনকারী শাহ এবং মল্ল রাজাদের প্রাসাদগুলো রয়েছে। কাঠমান্ডু দরবার চত্বরটি হনুমান ধোঁকা প্রাসাদ ভবনেরও একটি স্থল। এটি ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত নেপালের রাজাদের রাজকীয় বাসভবন ছিল। গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলো এই জায়গায় অনুষ্ঠিত হতো এবং সেই ঐতিহ্য আজও চলে আসছে। বিরাজমান সংস্কৃতিতে কিছুটা ভারতের কালচার প্রবেশ করলেও মূল নেপালি কালচার প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিস্তারিত পরের লেখায়। তাহলে দেখতে দেখতে এখন বলা যাক কাঠামো নিয়ে-
প্রাসাদটির সমগ্র কাঠামোটি বিস্তীর্ণভাবে কাঠের খোদাইকার্যের সঙ্গে খুবই সুন্দরভাবে সুসজ্জিত। সেই সঙ্গে এখানে সুশোভিত প্যানেল ও জানালা রয়েছে। প্রাসাদটি মহেন্দ্র মিউজিয়াম ও রাজা ত্রিভুবন মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের সমন্বয়ে গঠিত। ভ্রমণার্থীরা এই প্রাসাদের অভ্যন্তরে অবস্থিত রাষ্ট্র কক্ষগুলোও পরিদর্শন করার সুযোগ আছে।
কাঠমান্ডু দরবার চত্বরের দক্ষিণ অংশে অবস্থিত কুমারী চৌক হলো একটি জনপ্রিয় স্থান। এটি নেপালের এক অন্যতম রহস্যময় আকর্ষণ বলে মনে করা হয়। এখানে একটি পিছল পিঞ্জর রয়েছে যেটিতে প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন ঐতিহ্যগত চর্চার মনোনয়নের মাধ্যমে একজন যুবতী মেয়েকে রাখা হতো। মেয়েটিকে, জনপ্রিয় হিন্দু মাতৃ দেবী, দেবী দুর্গার মনুষ্য অবতার বলে মনে করা হতো এবং ধর্মীয় উৎসবের সময় পূজা করা হতো। এখানে অবস্থিত বিভিন্ন প্রাসাদ ও মন্দির বেশ কয়েকবার পুনঃসংস্কার করা হয়েছে, যেহেতু তাদের মধ্যে অনেকগুলো অবহেলার দরুন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেগুলোর কাজ দ্রুত করছে এমনটাই দেখতে পেলাম।

ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ থামেল
১৮ এপ্রিল নেপালের কথাসাহিত্যিক কুমার শ্রেষ্ঠার থার্ড আই থিয়েটারের আমন্ত্রণে থামেলে আসি। কাঠমান্ডুর প্রাণকেন্দ্র বলা হয় থামেলকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর ঐতিহাসিক স্থাপনা ছাড়াও আধুনিকতার ছোঁয়া তো আছেই। ঘুরে ঘুরে আমি আর জামসেদ দেখলাম- রয়েছে স্বল্পমূল্যের হোটেল, রেস্টহাউস ও পানশালা। থামেল অনেকটা বাংলার চকবাজারের মতো। এখানে প্রয়োজনীয় সব জিনিসই কেনাকাটা করার সুযোগ রয়েছে। এই এলাকার অধিকাংশ হোটেল-রেস্টুরেন্ট থাইল্যান্ড আর চীনা পর্যটকদের পদচারণায় মুখর।

এই বাজারে পুরুষ বিক্রেতার চেয়ে নারী বিক্রেতার সংখ্যাই বেশি। প্রায় দোকান মালিকের বাড়ি ভারতে আর কর্মচারী নেপালি। এভাবে ভারতের আশ্রয়ে নেপাল! এই বাজার থেকে হেঁটে আসি নারায়ণহিটি প্যালেস জাদুঘরে। থামেল থেকে দশ মিনিটের মতো হাঁটা পথ হবে। মূলত এই জাদুঘর একসময় নেপালের রাজপ্রাসাদ ছিল। ১৯৬১ সালে রাজা মহেন্দ্র বিশাল এই রাজপ্রাসাদ সংস্কার করেন। নেপালের রাজকীয় সব কাজ, রাজপরিবারের আবাসন, অতিথিদের আবাসন সবই ছিল এই প্রাসাদে। প্রাসাদের দেয়ালে রাজপরিবারের বিভিন্ন সদস্যের ছবি, বিভিন্ন কক্ষে তাদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র, চেয়ার-টেবিল, খাট-আলমিরা সাজানো আছে এখানে। সঙ্গে আছে রেশমি কাপড়, গরম কাপড়, পর্বতারোহণের সরঞ্জাম, অ্যান্টিক, চিত্রকর্ম, ট্রাভেল এজেন্সি ও ট্যুরিস্ট-স্যুভেনির বা পর্যটন-স্মারক দোকানই বেশি। কথা বলে জানলাম, সন্ধ্যার পর এখানকার নাইট ক্লাবগুলো পর্যটকের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। প্রায় সবাই নেপালের জনপ্রিয় মুমোমুমো খেতে ভুল করে না।

কিছু দোকানে ঢুকে আমরা জিনিসপত্র দেখি। কাঁসা-পিতলের বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি, বুদ্ধমূর্তি, গান-বাজনার নানা সরঞ্জাম, চিত্রকর্ম, কাঠের মুখোশ, নেপালের ঐতিহ্যবাহী খুরপি (একধরনের ছুরি), পুঁতির মালাসহ বিভিন্ন গহনা, ট্যাপেস্ট্রি, নেপালের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থাপনা ও স্থানের ছবিসংবলিত বিভিন্ন স্মারক, ক্যালেন্ডার, শুভেচ্ছা কার্ডসহ পর্যটনের নানা স্মারক পণ্য দিয়ে সাজানো দোকানগুলো। এসব পণ্য কেনার জন্য দোকানগুলোয় পর্যটকের বেশ ভিড়ও লেগেই থাকে।

কায়সার লাইব্রেরিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ!
২১ এপ্রিল আসার আগের দিন থামেল হয়ে কাঠমান্ডুর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কায়সার লাইব্রেরির আঙিনায় গিয়েছিলাম। ভেতরে প্রবেশ করতে পারিনি। কারণ, প্রবেশ নিষিদ্ধ! এই সময়ে কোনো লাইব্রেরিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ, ব্যাপারটা ভালো ঠেকে না। জানা যায়, কায়সার লাইব্রেরিতে কদিন আগেও বিদ্যার্থী আর দর্শনার্থীতে গমগম করত। বিদ্যার্থীদের আনাগোনা ছিল সেখানকার অমূল্য সংগ্রহের কারণে। আর দর্শনার্থীদের আগমন ছিল পুরো স্থাপনা আর সেখানকার বিশাল সংগ্রহের পুরাতাত্ত্বিক মূল্য ও সৌন্দর্যের কারণে। কিন্তু এখন সবই ধুলায় লুটাচ্ছে। যে ধ্বংসাবশেষটুকু দাঁড়িয়ে আছে, সেটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায়- প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিলের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ১২০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক কায়সার লাইব্রেরি ভবনটি এখন সত্যিই ইতিহাস। এমন একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার পেছনে নেপালের রানা রাজবংশের এক উত্তরাধিকারী কায়সার শমসেরের অবদান রয়েছে। ১৯০৮ সালে ইংল্যান্ড ভ্রমণে গিয়ে তিনি সেখানকার রাজভবন আর এর গ্রন্থাগারগুলোর প্রেমে পড়ে যান। দেশে ফিরে তিনি নিজ বাসভবনে গড়ে তোলেন গ্রন্থাগার। সেটিই আজকের কায়সার লাইব্রেরি। ২৮ হাজার বইয়ের সংগ্রহ আছে এখানে। এসবের মধ্যে বৌদ্ধমত, তান্ত্রিকতা আর জ্যোতিষশাস্ত্রের দুর্লভ বই, প্রাচীন পা-ুলিপি, এমনকি তালপাতায় লেখা পা-ুলিপিও আছে। আছে ১ হাজার ১০০ বছরের পুরোনো শুশ্রুতসংহিতা। প্রাচীন সংস্কৃত আয়ুর্বেদ-সংক্রান্ত এই সংগ্রহটি ইউনেসকোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারের তালিকাভুক্ত।

 

একসময় এখানে যাতায়াত করত এমন একজন বইপ্রেমী থেকে জানলাম, গ্রন্থাগার বলে সেখানে কেবল বইয়ের সমাহার তেমনটা কিন্তু নয়। সেখানে শিকার করা বিভিন্ন পশুর চামড়া আর মাথা, প্রাচীন মূর্তির সংগ্রহও দেখার মতো। ভবনের নির্মাণশৈলীও প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য ধারণ করে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু ভূমিকম্প ধূলিসাৎ করে দিয়েছে সবটা। এখনো যে অবশিষ্টাংশ দাঁড়িয়ে আছে তাতে নিরাপত্তার কথা ভেবে গ্রন্থাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পর্যন্ত ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।

সাহিত্য-সংস্কৃতি
নেপালের প্রচুর সংস্কৃতিমান মানুষ লেখালেখি করছেন। বিশেষ করে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের অবসানের পর থেকে। এর মধ্য দিয়ে দেশটির সামগ্রিক চালচিত্র বোঝা সম্ভব হবে। ১৯৬০-এর দশকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বিপুল বৈচিত্র্য ও প্রাণসম্পদের মধ্যে নেপালি সাহিত্যের বিকাশ শুরু হয়। পাহাড়-পর্বত-উপত্যকা সমৃদ্ধ হিমালয় কন্যা, গৌতম বুদ্ধের দেশ নেপালের সাহিত্য দেশের গ-ি ছাড়িয়ে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করেনি। দেশীয় গল্পগাথা এখনো মৌখিক কিংবদন্তিনির্ভর। তবে এর কিছু কিছু সাম্প্রতিক কালে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। পাশাপাশি নেপালি লেখকদের অনেকেই এখন ইংরেজিতে লিখছেন। ফলে আগের চেয়ে অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছে নেপালি সাহিত্য। বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় নিজেদের উপস্থিতি নেপালি লেখকদের এ প্রয়াস ক্রমেই বেগবান হচ্ছে। ইতিমধ্যে পড়েছি, লোকনাথ পাউদাল ও বালক কৃষ্ণের কবিতা। তাঁর কবিতার বাংলায় এমন : যে মানুষকে মানুষ ভাবে/ সে হলো শ্রেষ্ঠ মানুষ, আর মানুষই যে তার ভগবানকে দেখতে পায়, সে আসলে নিজেই ভগবান। কি মারাত্মক কথা! ভাবনায় দোল খায়।

বিদায় হিমালয়কন্যা
আমার ফ্লাইট ছিল ২১ এপ্রিল বেলা ১১টায়। আকাশের মন খারাপে তিনটায় উড়াল দিই। হাজার হাজার বছর ধরে তাবৎ দুনিয়ার মানুষকে অভিভূত করে রেখেছেন হিমালয়। হিমালয় হলো পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালা। হিমালয় পর্বত থেকে নেমে আসা নদীগুলোকেই বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে নয়তো ভারত মহাসাগরে গিয়ে মিলিত হয়েছে। আমাদের দেশের বেশির ভাগ নদীর পানিই আসে হিমালয় পর্বতমালা বরফ গলে। সমগ্র পৃথিবী থেকে প্রতিদিন হাজারো পর্যটক এখানে ভিড় জমায়। মৌসুমি জলবায়ুর এই ছবির মতো সুন্দর এই দেশে জুন থেকে সেপ্টেম্বরে প্রচুর বৃষ্টি হয়ে থাকে, বাকি সময়টা সাধারণত থাকে শুষ্ক। অক্টোবর-নভেম্বরে নেপালের শুষ্ক মৌসুম এবং বছরের সেরা সময়। নেপাল এমন একটি দেশ, যেখানে একসঙ্গে পাওয়া যায় ছুটি উপভোগের সবকিছু।

রোদসী/আরএস

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

19 + four =