এসো হে বৈশাখ…

করেছে Sabiha Zaman

বিশ্বের প্রায় দেশে সব ইংরেজি নতুন বছর  উদযাপন করা হয়। কিন্তু বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রতি বাঙালির ভালোবাসা জন্ম থেকেই। ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন না করলেও আমাদের চলে, কিন্তু পহেলা বৈশাখের সঙ্গে আমাদের নাড়ির টান অনেক বেশি গভীর। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে আমাদের দেশে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়। আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করেছে বাংলা একাডেমি।

ফ্যাশন যেমন
প্রতিবছর বৈশাখ আসার আগেই বাজারে শুরু হয়ে যায় ক্রেতাদের আনাগোনা, উদ্দেশ্য বৈশাখের নতুন জামা। আমরা আমাদের সবার সাধ্যমতো বৈশাখ উদযাপন করতে ব্যস্ত হয়ে উঠি নতুন পোশাক নিজেকে সাজাতে। যেহেতু বৈশাখের আবহাওয়ার সঙ্গে মিল রেখে বেছে নিতে পারো আরামদায়ক পোশাক। সুতি পোশাকে বেশি জোর দিতে পারো। এতে বাঙালিয়ানা প্রকাশ পায়, আর গরমেও বেশ মানানসই পোশাক সুতি কাপড়। সুতি ছাড়াও লিলেন, এন্ডি কটন, বাটিক কিন্তু হালফ্যাশনে বেশ জনপ্রিয়।জামদানি শাড়ি 
অন্য সব দিন না হোক, অন্তত নববর্ষের দিন নিজেকে একটু ভিন্নভাবে সাজাতে অনেক মেয়েই শাড়ি পরতে ভালোবাসে। শাড়ির জনপ্রিয়তা অনেক বেশি বাঙালি নারীদের মধ্যে। সময়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শাড়ি নিজের স্থান করে নিলেও একটি শাড়ি কিন্তু সব নারীর কাছেই খুব জনপ্রিয়। ঠিক ধরেছ, জামদানি নিয়েই বলছি। অতীত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত জামদানি শাড়ির জনপ্রিয়তা কমেনি, বরং বেড়েই চলেছে। সুতি, সিল্ক ও হাফ সিল্কের জামদানি পাওয়া যায়। নান্দনিক ডিজাইন আর রুচিশীল বলে জামদানি নারীদের কাছে জনপ্রিয়। রুচি আর আভিজাত্যের সংমিশ্রণে জামদানি শাড়িতে নারীর সৌন্দর্য যেন আরও বেড়ে যায়। বর্তমান সময়ে মসলিন জামদানিও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

গয়না
শাড়ি হোক বা কুর্তি পোশাক যেটাই হোক না কেন, বৈশাখের পোশাকের পূর্ণতা আসে গয়নায়। আগে একটা সময় ছিল, যখন বৈশাখে নারীরা মাটির গয়না পরতে ভালোবাসত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে ফ্যাশন ও গয়নাতেও। এখন পোশাকের সঙ্গে মানানসই অ্যান্টিক জুয়েলারিগুলো খুবই জনপ্রিয় নারীদের কাছে, বিশেষ করে তরুণীদের কাছে। এ ছাড়া যারা একটু বেশি ভিন্ন আর আলাদা সাজতে ভালোবাসো, তারা বেছে নাও রুপার গয়না। রুপার কারুকাজের সঙ্গে মিল রেখে পাথরের গয়না আলাদা সৌন্দর্য তৈরি করে।
কাঠের গয়না কিন্তু কম জনপ্রিয় নয়। বাহারি রং আর নকশায় সাজলে এবারের বৈশাখে কিন্তু তোমাকে খুব ভালো লাগবে। চাইলে ট্রাই করতে পারো কাঠের কাঠগোলাপের গয়না। এতে বৈশাখী আবহ ফুটে উঠবে তোমার সাজে।
বর্তমান সময়ের একটি ট্রেন্ড হচ্ছে বড় কানের দুল। মাটির বা কাঠের কানের দুল, অ্যান্টিকের ঝুমকা বা চাঁদবালি দুল পরলে গলায় কিছু না পরলেও অনেক বেশি ভালো লাগে।


পোশাকের রঙের সঙ্গে মিল রেখে তোমার পহেলা বৈশাখের চুড়ি কিনেছ তো? শাড়ির সঙ্গে হাতে কাচের চুড়ি বেশ ভালো লাগে। রেশমি চুড়ির আবেদন সব সময় ছিল। বর্তমানেও রেশমি চুড়ি নারীদের পছন্দের তালিকায় সবার আগে থাকে। নানা বাহারের কাচের চুড়ি পরতেও ভালোবাসে নারীরা।
কাঠের বা সুতার চুড়ি কিনতেও কম ভিড় হয় না নববর্ষের সময়ে। হ্যান্ডপেইন্ট করা চুড়ি কিন্তু বৈশাখের সাজের জন্য পারফেক্ট চয়েস। চাইলে গাজড়া চুড়ি পরতে পারো। এখন গাজড়া চুড়ি মানে কেবল সাদা মুক্তাই নয়, পছন্দমতো বিভিন্ন রঙের গাজড়া চুড়ি বাজার ঘুরলেই পাবে। এতে অনেক ট্রেন্ডি লাগবে তোমাকে।

মেকআপ
পহেলা বৈশাখের দিন কীভাবে মেকআপ লুক দেবে ভাবছ? সকালের জন্য স্নিগ্ধ ভাব আনতে হালকা মেকআপ নিতে পারো। এতে লাবণ্যময় লাগবে তোমাকে। সারা দিনের জন্যও হালকা মেকআপ আর পোশাকের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে চোখ রাঙিয়ে ব্যবহার করো আইশ্যাডো। চুল খোলা অথবা খোঁপা করে ফুল দিতে পারো। যদি রাতে বাসার বাইরে যাও কিংবা ঘরেই পার্টি থাকে, তবে রাতের জন্য একটু ভারী মেকআপ দিতে পারো। কিন্তু অতিরিক্ত ভারী মেকআপ না করাই ভালো।

মিলে যাচ্ছে রমজান ও পহেলা বৈশাখ
এ বছরের পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ রোজায় হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। রমজান ও পহেলা বৈশাখ মিলে যাওয়ায় উদযাপনে আসছে পরিবর্তন। ১৪ এপ্রিল রোজা শুরু হলে এবং পান্তা-ইলিশের স্বাদ নিতে চাইলে তোমাকে অপেক্ষা করতে হবে ইফতার পর্যন্ত। লোভনীয় ইফতার দিয়ে নববর্ষ উদযাপন করতে কিন্তু বেশ ভালোই লাগবে। আরবি মাসের হিসাব অনুযায়ী আগামী তিন বছর পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে হবে রোজায়। তাই এ বছর থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করো অন্য রকম নববর্ষ উদযাপনের।

আরও একটি বৈশাখ কাটছে করোনায়
২০২০ সালেই প্রথম আমাদের দেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করা হয়নি। অনেক মলিন বৈশাখ কেটেছে গত বছরে। এ কারণেই ফ্যাশন হাউসগুলো নতুন পোশাক আনতে পারেনি গত বছরে। লকডাউনের প্রভাবে শপিং করার সুযোগ হয়নি মানুষের।
সময়ের সঙ্গে করোনাভাইরাসের প্রভাব কমতে শুরু করলেও চলতি বছরের মার্চ মাস থেকেই বাড়তে শুরু করে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে সরকার নিচ্ছে নানা পদক্ষেপ। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে বারবারই। আর এত কিছুর মধ্যে আমাদের আরও একটি বৈশাখ উদযাপন করতে হচ্ছে করোনাভাইরাসে। তাই এ বছরের পহেলা বৈশাখ কিন্তু গত বছরের মতোই ঘরে কাটাতে হবে।নিজের ঘরেই মনের মতো করে উদযাপন করো বৈশাখ।

একটু আলাদা হলেও মন খারাপ না করে সুস্থভাবে যে পরিবার নিয়ে বৈশাখ উদযাপন করছ, এটাই অনেক বড়। চাঞ্চল্যহীন নববর্ষ বরণ করতে হলেও কমতি রেখো না নিজের ঘরে। করোনাভাইরাসে শিখেছি কীভাবে ঘরে বসেই আমরা যুক্ত হতে পারি বন্ধু আর প্রিয়জনের সঙ্গে। করোনায় বাইরে না গেলেও নিজের ঘরে থেকেই ভার্চ্যুয়ালি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠো। পরিবারের সঙ্গে সুন্দর সময়গুলো ক্যামেরাবন্দী করে ফেসবুকময় ছড়িয়ে দাও সুন্দর কিছু মুহূর্ত। লকডাউনে শেখা রান্নায় তাক লাগাও ঘরের মানুষদের। নতুন মেকআপ টিউটোরিয়ালে নিজেকে ফুটিয়ে তোলো নতুনভাবে। উৎসব উদযাপন করাটাই মুখ্য। গোমড়ামুখে বসে না থেকে নিজের মতো করে রাঙিয়ে তোলো তোমার এ বছরের পহেলা বৈশাখ। কারণ, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান। এগুলো উপভোগ করাই আসল আনন্দ।

জীবনে ভালো থাকা বা মন্দ থাকা নির্ভর করে আমরা কীভাবে জীবনকে দেখছি বা বয়ে নিয়ে যাচ্ছি তার ওপরে। তুমি চাইলে এ বছরের পহেলা বৈশাখ নিজের মতো করে ভিন্নভাবেও উপভোগ করতে পারো। উৎসব যে সময়েই আসুক, সব সময় মনের রং দিয়ে উৎসব বরণ করতে হবে। তবেই তো জয় করা যায় জীবনকে। এই বৈশাখে মন খুলে গাও :
‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক।’
লেখা : সাবিহা জামান

ছবি : সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 × five =