এ যুগের ঈদ আনন্দ

করেছে Sabiha Zaman

বিশ্ব বাঙালির কাছে ঈদের খুশি ছড়িয়ে পড়ে প্রথম রোজা শুরু থেকেই। আর পুরো মাসের সিয়াম সাধনার শেষে গ্রামেগঞ্জে পাড়ায় মহল্লায় অলিগলিতে বেজে ওঠে প্রিয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ।’ এই গানের সুরের সঙ্গে বাঙালি মুসলিমের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের রং আনন্দের অনির্বচনীয় বারতা। রোজার শেষ দিনের ইফতারের পরে ঈদের নতুন চাঁদ দেখার মাধ্যমে বিশ্ব মুসলিম আনন্দে একাকার হয়ে যায়। চারদিকে খুশির জোয়ারে মেতে ওঠে সব বয়সী মানুষ। ঈদের আনন্দ সব সময় একই না থাকলেও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় এই উৎসবে আনন্দের কমতি কখনোই ছিল না কখনো।

সেকালে-একালে সব কালেই আনন্দময় সর্বজনীন ঈদ উৎসব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে উৎসব উদযাপনের ধরন। বদলেছে এর অনুভূতি প্রকাশের ভিন্নতা। সময়ের পরিবর্তনে ঈদ আনন্দে লেগেছে ডিজিটাল হাওয়া। ইন্টারনেট, অনলাইন, ফেসবুক, টুইটার, ভাইবার, ইন্সট্রাগ্রাম, হোয়াটসআপ ইত্যাদির মাধ্যমে ঈদের বৈশ্বিক রং আরও বেড়েছে। ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এই সব ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়া।

ঘরে বসে আমেরিকা বা বিলাতপ্রবাসী সন্তানসন্ততির সঙ্গে ভিডিও কলিংয়ের মাধ্যমে একে অপরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছে ঈদের আনন্দ। এক মুহূর্তের মধ্যে দুনিয়ার এই প্রান্তের ঈদ আনন্দের ছোঁয়ায় মেতে উঠছে দুনিয়ার অপর প্রান্তের মানুষ। আর এই অভূতপূর্ব যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে। তাই বদলে যাচ্ছে পৃথিবীব্যাপী ঈদ উৎসবের আমেজ। তথ্যপ্রযুক্তি আর অনলাইনের দুনিয়ায় প্রচলিত ঈদ আনন্দে লেগেছে নতুনত্বের বাতাস। আগেকার দিনের মতো নাগরিক মানুষেরা এখন আর দোকানে দোকানে ঘুরে ঘুরে শপিংয়ে ক্লান্ত হয়ে ঈদের কেনাকাটায় মাতে না।

ই-কমার্স বদলে দিচ্ছে ঈদ কেনাকাটার প্রথাগত পদ্ধতি। অনলাইন শপিং প্ল্যাটফর্মে ঢুকে যে কেউ নিজের পছন্দের ঈদের পোশাক এবং উৎসবের প্রয়োজনীয় সব কিছুই পেয়ে যাচ্ছে এক ক্লিকে। অনলাইন শপে অর্ডার করার সঙ্গে সঙ্গে পছন্দের ঈদসামগ্রী পৌঁছে যাচ্ছে ঘরের ড্রয়িংরুমে। নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে এখন আর বাসের ট্রেনের বা প্লেনের টিকিট কাটতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না।

অনলাইনে অর্ডার করে যে কোনো ডেসটিনেশনের টিকিট সহজেই পেয়ে যাবে। কেনাকাটা বা টাকাপয়সা পরিশোধে এসেছে নতুনত্ব। বিকাশে টাকা দেওয়া বা ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডে বিল পরিশোধ এনেছে নতুন গতি। আর এভাবেই ঈদের আনন্দ আরও সহজ এবং ব্যাপকভাবে ডিজিটালাইজড হয়ে ধরা দিচ্ছে নতুন প্রজন্মের মানুষের কাছে। তবে সব সময়ই ঈদের আনন্দের বেশির ভাগ জুড়ে থাকে শিশুরা। কেমন ছিল আগের ঈদ? স্মৃতির আবেগে ভেসে ভেসে অতীতে গেলে আর ফিরতে ইচ্ছে করে না কারও। আর তা যদি হয় ঈদের স্মৃতি, তাহলে তো কথাই নেই। কী আনন্দ, কী উৎসবের মাতামাতি! সেই সময়ে এখনকার বসুন্ধরা শপিং মল যমুনা ফিউচার পার্কের মতো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বড় বড় শপিং মল ছিল না। আড়ং, মায়াসীর, ক্যাটস আই, মেনজ ক্লাব, অহং, রেলুসে, সাদাকালো, দেশী দশ, ইনফিনিটি, অ্যাপেক্স, ইয়োলো, সাদাকালো, অঞ্জনস, বিশ্বরঙ, দর্জিবাড়ী, এই রকমের নামি দামি ব্র্যান্ডের সুপার শপ তো দূরের কথা তখন রেডিমেড গার্মেন্ট পর্যন্ত ছিল না।

থান কাপড়ের দোকান থেকে থান কিনে পোশাক বানাতে হতো। রোজার আগে থেকেই ভিড় শুরু হয়ে যেত খলিফা, টেইলর বা দরজিবাড়িতে। আবার এসব থান কাপড় যখন তখন কেনাও যেত না, হাটের দিন হাট ছাড়া কাপড় পাওয়া যেত কম। গঞ্জে বা সদরের নিউমার্কেট থেকে উ”চবিত্তরা অবশ্য কাপড় কিনতে পারত। দরজিবাড়িতে কাপড় বানাতে দিয়ে রাতে ছোটদের চোখে ঘুম নামত না। কখন দরজি বানাবে তার শার্ট-প্যান্ট এই চিন্তায়? ছোটরা সব সব সময় ঘুর ঘুর করত দরজিবাড়ির আশপাশে- কখন বানানো শেষ হবে তারটা? এই আনাগোনা ও অপেক্ষার ক্ষণকাল সবার চোখেই লেগে আছে মধুর স্মৃতি হয়ে। দুই-এক দিন আগে স্বপ্নের পোশাক হাতে পেয়ে ঈদের আনন্দ রঙিন হয়ে উঠত আমাদের ছেলেবেলার ঈদ।

সকালে ছোট-বড় সবাই মিলে পুকুরে বা নদীতে গোসল করে নতুন পোশাক পরে সেমাই খেয়ে দলে দলে দূরের কোন ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়তে যাওয়া। মনে হয় মেঠো পথে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি টুপি পরিহিত মানুষের মিছিল মিলিত হয়েছে কোনো এক মোহনায়। তখন গ্রামে গ্রামে ঈদগাহ মাঠ ছিল না। কয়েকটি গ্রামের জন্য ছিল একটি ঈদগাহ মাঠ। গ্রামে গ্রামে ঈদগাহের প্রয়োজনীয়তাও মনে করত না। কারণ, এ উপলক্ষে ঈদগাহে কয়েকটি গ্রামের লোক একসঙ্গে মিলিত হতে পারত। নামাজ শেষে পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করে চলত কুশল বিনিময়।

 

ঈদগাহ থেকে ফেরার পর প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া, মিষ্টিমুখ করা। ছোটরা নতুন জামাকাপড় পরে দল ধরে এ বাড়ি সে বাড়ি বেড়াতে বের হতো। তাদের তো দশ-বারো বাড়িতে না যেতে পারলে যেন ঈদের আনন্দ পরিপূর্ণ হতো না। কোনো কোনো আত্মীয়স্বজন ছোটদের দুই টাকা বা পাঁচ টাকা ঈদের সালামি দিত। এই সালামি পেয়ে নিজেদের অনেক সম্পদশালী মনে হতো। এই মূল্যবান সম্পদ আমরা অনেক দিন আগলে রাখতাম। টাকার গরম অনেক দিন থাকত। আগের দিনে অনেক এলাকায় গ্রামের লোকজন সাধারণত গরিবদের ফেতরার টাকা না দিয়ে সমপরিমাণ খাবার চাল দিত।

তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতি ও স্যাটেলাইট টিভির প্রভাবে বর্তমানে ঈদ উদযাপনের পদ্ধতিও পাল্টে গেছে। আগে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য ঈদকার্ড প্রেরণ বেশ জনপ্রিয় ছিল। বর্তমানে অফিস ও করপোরেট জগতে এর প্রচলন থাকলেও ব্যক্তি পর্যায়ে তেমন একটা নেই। এখন ঈদের শুভেচ্ছা জানানো হয় ফেসবুক, ভাইবার, টুইটার, ই-মেইল বা মোবাইলের এসএমএস বা এমএমএস-এর মাধ্যমে। ঈদের আনন্দ আবর্তিত হয় ফ্যাশন ডিজাইন, বিউটি পারলার ও শপিংকে কেন্দ্র করে। কেনাকাটাই যেন এখন ঈদের মূল আনন্দ। ঈদের আনন্দ বাড়িয়ে দিতে আমাদের হাতের কাছে তাদের সেবা নিয়ে হাজির থাকে সব সমই স্কয়ার, মেরিল, ইউনিলিভার, রেকিট অ্যান্ড বেনকিজার, ম্যারিকো বাংলাদেশ, প্রাণ, ব্র্যাক, ঈগলু, স্বপ্ন, বসুন্ধরা গ্রুপ, রূপচাঁদা, মীনাবাজার, নন্দন, এসিআই, ওয়ালটন, স্যামসাং, এলজি, বাটারফ্লাই, সিঙ্গারসহ দেশি-বিদেশি নানা প্রতিষ্ঠান।

নিজেকে সুন্দর করে সাজানোর জন্য রমজানের মাঝামাঝি সময় থেকেই বিউটি পারলারগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে। ফ্যাশন হাউসগুলো জমজমাট হয়ে ওঠে। কিশোরী-তরুণীর হাতে মেহেদি লাগানো সেকাল-একাল দুই কালেই খুব জনপ্রিয়। মনে হয় তাদের হাতে আনন্দ যেন মূর্ত হয়ে ওঠে। আনন্দ যেন হাতের মুঠোয় থাকে। তবে এখন বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন রঙের মেহেদি রেডিমেড পাওয়া যায়, হাতে লাগানোর সহজ উপায় আছে। কিন্তু সেকালে মেহেদি লাগানো ছিল অনেক কষ্টকর। তখন এই কষ্টকর কাজটিই ছিল ঈদ আনন্দের প্রধান আকর্ষণ। পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে সংগ্রহ করা হতো মেহেদি বা মেন্দির পাতা। তারপর রাতে একজন শিল-পাটা নিয়ে মেন্দি বাটতে বসত। আর তাকে ঘিরে চারদিকে গোল হয়ে বাকিরা বসত। চলত গল্পগুজব, হাসিঠাট্টা গান।

মেহেদি প্রস্তুত হলে একটি ছোট কাঠি দিয়ে হাতে মেহেদির নকশা আঁকা হতো বা চুন দিয়ে নকশা এঁকে হাতের তালুতে মেহেদি ছাপ মেরে রাখা হতো।পরে দেখা যেত হাত লাল সাদা নকশা হয়েছে। নিজের, চাচাতো ফুফাত, প্রতিবেশী ভাইবোনদের সঙ্গে মেহেদি লাগানোর সেই সময়টুকু যে কি মধুর ছিল! কিন্তু যে ঈদের জন্য এত আয়োজন, সেই ঈদের দিনে কি আগের দিনের মতো আনন্দ হয়?

ঈদের দিনে দল ধরে প্রতিবেশীদের বাড়ি বেড়ানো গ্রামে কিছুটা থাকলেও শহরে এখন নেই বললেই চলে। সারা দিন অলস সময় কাটানোর পর বিকেলে বা সন্ধ্যায় শিশুপার্ক, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক বা আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে বের হয় কেউ কেউ। ঈদের মাঠের আনন্দও সীমিত হয়ে গেছে। শহরে তো ঈদের নামাজ ও শুক্রবারের জুমার নামাজের পার্থক্যই বোঝা যায় না। কারণ, মসজিদেই হয় ঈদের জামাত।কোলাকুলি করার জায়গা নেই। বড় ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়ে কয়জনে? অবশ্য এখন ঈদের আনন্দ দিতে বা ঈদ আনন্দকে ঘরে বন্দী করতে ব্যস্ত স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো।

সপ্তাহব্যাপী প্রচারিত হয় ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। আধুনিক প্রজন্মের মেয়েরা ব্যস্ত থাকে ঈদের টিভি অনুষ্ঠানে নিজেদের মাতিয়ে। ব্যস্ত শহর, ব্যস্ত মানুষের জন্য এই আনন্দকম কি! ঈদের অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিকতা যাই থাকুক না কেন, ঈদের আনন্দ থাকে প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে, ধর্মীয় অনুভূতিতে। এই আনন্দে ছোট বড়, ধনী গরিব, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে একাকার হয়ে যায়। এটাই ঈদের বড় মহিমা। ইসলাম ধর্ম মুসলমানদের যে কটি দিবসকে আনন্দ ফুর্তি করার জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে, তার প্রধানতম দিবসটি হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন। তাই এ দিনের আনন্দও ইবাদতের মধ্যে গণ্য।

তবে এ আনন্দে অশ্লীলতার মিশ্রণ ঘটালে হিতে বিপরীতই হবে অর্থাৎ সওয়াবের পরিবর্তে গুনাহ হবে। যেহেতু পবিত্র ঈদুল ফিতর মুসলমানদের সর্ববৃহৎ ইসলামি দিবস তাই ঈদুল ফিতর আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে, সেই ইসলামের গোড়াপত্তন থেকেই। আমাদের সমাজে ঈদের দিনে হরেক রকমের আয়োজন থাকে। বিশেষ করে পবিত্র রমজানের শুরু থেকে আরম্ভ হয়ে যায় ঈদ উদযাপনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি।

তবে আমাদের পূর্ব পুরুষদের ঈদের আচারানুষ্ঠান ও বর্তমান প্রজন্মের ঈদের আচারানুষ্ঠান তথা আনন্দ ফুর্তির মধ্যেও দেখা যায় বিস্তর ফারাক। সে সময় ঈদে সামর্থ্যবান অনেকেই নতুন জামা কিনত। তবে সে সময় এত ফ্যাশন ট্যাশনের প্রতিযোগিতা ছিল না বিধায় পুরুষেরা সাধারণত লুঙ্গি, ধুতি, গেঞ্জি আর মহিলাদের জন্য সুতি শাড়িই কেনা হতো। ঈদের আনন্দ-ফুর্তিতেও এসেছে নতুনত্ব ও আধুনিকতার ছড়াছড়ি।পিতা বা দাদার আমলে সম্পূর্ণ দেশীয় যে পিঠা সন্দেশ তৈরি করা হতো তার আধুনিকায়ন হয়ে বর্তমানে বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বা পত্রিকার পাতা থেকে রেসিপি দেখে তৈরি করা হয় পিঠা-পায়েস।

আর এসব পিঠা বা সন্দেশের নাম পরিবর্তন হয়ে ধারণ করে অত্যাধুনিক সব নাম। আগের যুগে বিপ্তি বা উপরি কাপড়ের দোকান থেকে লুঙ্গি, গেঞ্জি ও সুতি শাড়ি কেনার পরিবর্তে বর্তমানে গড়ে ওঠা অত্যাধুনিক শীতাত নিয়ন্ত্রিত মার্কেট থেকে সদ্য আগত দেশি-বিদেশি ডিজাইনের প্যান্ট-শার্ট পাঞ্জাবি শেরওয়ানি ফতুয়া মোবাইল ড্রেস লেহেঙ্গা থ্রিপিস শর্ট ড্রেস স্কার্ট বাহারি ডিজাইনের শাড়ি ইত্যাদি কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। বর্তমানে নায়ক, নায়িকা বা মডেল তারকাদের পরিধেয় বস্ত্র অনুসরণ করে নতুন নতুন ডিজাইন আমদানি করার প্রতিযোগিতা তো আছেই। অনেক অভিজাত পরিবারের লোকেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে যেতেও দেখা যায়। আর এখনকার বাংলাদেশে ভারতীয় এবং পাকিস্তানি কাপড়ের চাহিদা বেড়ে গেছে অনেক।

ঈদের কাপড় কিনতে অনেকেই বেছে নিচ্ছে বিদেশি পোশাক। তবে আমাদের দেশীয় পোশাক এবং ঐতিহ্যের স্বার্থে এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে সবাইকে। বিদেশি ফ্যাশন এবং কাপড়ের পরিবর্তে বেছে নিতে হবে আমাদের দেশীয় পোশাক। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বেড়ানোর প্রবণতা কমিয়ে বর্তমানে পার্ক অভিজাত হোটেল রেস্টুরেন্ট কফি বার পিকনিক বা বিনোদন স্পটে ভিড় করতে দেখা যায় বেশি।

এ ছাড়া আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়ানোর পরিবর্তে অনেকেই ঘরে বসে বিভিন্ন চ্যানেলের ঈদ অনুষ্ঠান উপভোগেই বেশি মনোযোগ দিয়ে থাকে। আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বেড়ানোর বদলে রাজনৈতিক নেতাদের বাড়িতেই বেশি ভিড় করতে দেখা যায়। রাজনৈতিক নেতারাও নিজ নিজ বাড়িতে কর্মী-সমর্থকদের জন্য গরু জবাই করে ভূরিভোজের আয়োজন করার সংস্কৃতি বেড়েছে চোখে পড়ার মতো।

এ ছাড়া আগের দিনে ঈদ কার্ড ডাকযোগে প্রেরণের যে একটা রেওয়াজ ছিল, তা বর্তমান ডিজিটাল যুগে হ্রাস পেয়ে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, এস এম এস, হোয়াইটসআপ, ইমো, ই-মেইলসহ অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে এসে ঠেকেছে। ঈদের দিনে বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়দের সঙ্গে ফোনালাপ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে চ্যাটিং বেড়েছে বর্তমান যুগে। পায়ে ধরে মা, বাবাসহ গুরুজনকে সালাম করার প্রবণতা যথেষ্ট হ্রাস পেয়েছে। কেউবা পাহাড়সম অট্টালিকায় বসে এয়ারকুলারের বাতাসে গা ভাসিয়ে দিয়ে ডিশের মাধ্যমে বিনোদনে মত্ত আবার পাশের বাড়িতে তার আত্মীয় বা পড়শি নতুন জামা কেনা দূরের কথা, জঠর জ্বালায় দুমুঠো ভাতও জোগাড় করতে পারছে না।

বর্তমানে অনেকেই পাড়া বা মহল্লার মসজিদ বা ঈদগাহের পরিবর্তে জেলা সদরের বড় ঈদগাহ মাঠ বা বাংলাদেশের বৃহত্তম ঈদগাহ মাঠে গিয়েও ঈদের জামাত পড়তে দেখা যায়। তবে এতে পড়শিদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা সম্ভব হয় না। আবার কোথাও কোথাও কোলাকুলি করার প্রবণতাও হ্রাস পেয়েছে বিভিন্ন কারণে।বর্তমানে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে কর্মী-সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের ঈদের শুভেচ্ছা জানাতেও দেখা যায় রাজনৈতিক বা সামাজিক অনেক নেতাকে। তবে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে ঈদকে উপলক্ষ করে নেতাদের কর্মতৎপরতা ব্যাপক হারে বাড়তে দেখা যায়।

তখন শুরু হয় ভোটারদের মোবাইল নাম্বার অনুসন্ধানের হিড়িক। অতিরিক্ত লোক নিয়োগ করা হয় ভোটারদের নামে এসএমএস পাঠাতে। এখনকার দিনে ঈদের সময়ে নতুন নতুন চলচ্চিত্র মুক্তির হিড়িক পড়ে। অনেকেই পরিবার নিয়ে ঈদের ছুটিতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত সিনেপ্লেক্সে বসে সিনেমা দেখে সময় কাটায়। পরিবার পরিজন নিয়ে অনেকে দেশের ভেতরে কিংবা বিদেশে ঘুরতে যায় ঈদের সময়। এয়ারলাইনস এবং ট্যুর অপারেট কোম্পানিগুলো ঈদের সময় নানা ভ্রমণ অফার নিয়ে হাজির হয়।

শহুরে জীবনে ঈদের রসনা পূরণ করতে পত্রিকাগুলো বিভিন্ন রেসিপি সংখ্যা প্রকাশ করে এবং টেলিভিশনে মজাদার সব রান্নার অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে পোশাক কেনাকাটায় বিদেশি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে হাল আমলে। এই প্রবণতার কারণে মার খাচ্ছে আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। তাই ডিজিটাল যুগের ঈদের আনন্দ আরও পরিপূর্ণ করতে হলে আমাদের সবাইকে আরও দায়িত্বশীল এবং মানবিক হতে হবে। তাহলেই প্রকৃতভাবে ধরা দেবে ঈদের আনন্দ সবার ঘরে ঘরে।

লেখা : রাজু আলীম

ছবি : ইন্টারনেট

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

four × five =