কেন দরকার যৌনশিক্ষার

করেছে Sabiha Zaman

সুরাইয়া নাজনীন: শিশুকে যৌনশিক্ষা? ছি, ওর বয়স হয়েছে নাকি! আমাদের সমাজব্যবস্থায় অভিভাবকদের মুখে এসব কথা খুবই প্রচলিত। কিন্তু নিজের শিশুটিই যখন ঘর থেকে অ্যাবিউজিং হবে, তুমি ঘুণাক্ষরেও টের পাবে না। কারণ, শিশুটিই জানে না অ্যাবিউজিং কী? তাই শারীরিক স্পর্শের সীমা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন প্রত্যেক শিশুর।

তুমি ভাবছ সন্তানের স্কুলে যাওয়ার বয়স যেহেতু হয়নি, তাই এত তাড়াতাড়ি শিশুকে যৌনশিক্ষা দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু গবেষকেরা এমনটা মনে করেন না। তাদের মতে, শিশুকে ডায়াপার পরার বয়স থেকেই যৌনশিক্ষা দেওয়া উচিত।

রুটগার্স ইউনিভার্সিটির যৌনশিক্ষাবিষয়ক সংস্থা আনসার-এর কার্যনির্বাহী পরিচালক ড্যান রাইস বলেন, ‘শিশু বয়স থেকেই যৌনশিক্ষার সূচনা হওয়া উচিত। বিকাশসাধনের শুরু থেকে শিশুরা সবকিছু বোঝার চেষ্টা করে এবং তাদের শরীর হলো এসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
শিশুকে যৌনশিক্ষা দেওয়ার মানে কেবল এটা নয় যে শারীরিক বিকাশসাধন ও বাচ্চা তৈরির প্রক্রিয়া বোঝাবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো শারীরিক স্পর্শের সীমা সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা। কারা স্পর্শ করতে পারবে এবং কারা পারবে না, তা সম্পর্কে জানাতে হবে।

যৌনশিক্ষা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্তিকরণ খুবই জরুরি, যা আমাদের দেশে নেই। কথিত সমাজতান্ত্রিক মনোভাব পোষণ করে দোষ চাপাতে থাকি ধর্ষণের শিকার নারীর, কেন সে গেল? কেন সে করল? ইচ্ছা না থাকলে কেনই-বা যাবে? নানা অজুহাত, কারণের ডামাডোলে বিষয়টাকে ঠুনকো করে ফেলার চেষ্টা এবং আর একটি ধষর্ণের প্রশ্রয় দিয়ে থাকি আমরা নিজেরা। এমনটাই বললেন ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টরের সম্পাদক শারমিন শামস্।

তিনি আরও বলেন, যৌনশিক্ষা শুধু ধর্ষণই কমাবে না, বরং এটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য বড় গুরুত্বের বারতা নিয়ে আসবে। জন্মপ্রক্রিয়ায় যৌনতা কোনো খারাপ বিষয় নয়, হ্যাঁ খারাপ হতে পারে যখন অপরিণত বয়সে এর প্রভাব বিস্তার করা হয়। সুস্থ যৌনতা শেখা, বোঝার জন্যই যৌনশিক্ষার প্রয়োজন অনেক বেশি।


পর্নো প্রবণতা ধর্ষককে কতটুকু প্রভাবিত করে। এই প্রশ্নে তিনি বলেন, পর্নো তো সবাই দেখে। ছেলে কি মেয়ে? কিন্তু বয়সটা বুঝতে হবে। অপরিণত বয়সে তুমি তোমার সন্তানকে পর্নো দেখার সুযোগ করে দিলে সে তো দেখবেই। এখন কথা হচ্ছে আমি প্যারেন্ট হয়ে সন্তানকে পর্নো দেখার সুযোগ কেন দেব? ঘাপলা এখানেই, তুমি বুঝতেই পারছ না সে আসক্ত। কারণ তার পারিপার্শি¦ক পরিবেশ আবদ্ধ। ডিভাইসকেন্দ্রিক। কর্মব্যস্ততার জন্য তুমি তাকে খেয়াল রাখার সময় সুযোগ পাচ্ছ না, যা তোমার সন্তানের বেড়ে ওঠার জন্য খুবই জরুরি। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও পর্নো একটি ক্ষতির কারণ, যখন সে আসক্ত হয়। তখন সেই মানুষটি পরিবার তথা সমাজের জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এসব খারাপ প্রবণতা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের চারপাশটাকে ভালো বিনোদনের আওতাভুক্ত করতে হবে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ‘আনুশকা ধর্ষণ এবং হত্যা’ এই বিষয়টাকে অনেকেই অনেকভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তুমি কী বলবে? শারমিন শামস্ এ বিষয়ে বলেন, হ্যাঁ, সবাই ঘটনার কারণ খোঁজার চেষ্টা করছে। এতে ধর্ষককে ইন্ধন দেওয়া হয়, ধর্ষকের অপরাধকে হালকা করে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে। যারা করছে, তারাও সমান অপরাধী। এখন শোনা যাচ্ছে ধর্ষক নাকি আনুশকার ওপর বিকৃত যৌনতার পরীক্ষা চালিয়েছিল, যা তার টার্গেট অনেক আগে থেকেই। এটাই তার প্রথম অপরাধ নয়, এ ছাড়াও তাকে নিয়ে এলাকায় অনেক কুকর্মের অভিযোগ আছে বলে জানা যাচ্ছে।
সমাজ পাল্টাতে হলে কিসে বেশি জোর দিতে হবে? তিনি বলেন, আইন করা হয়েছে মাসিক চলাকালীন সময় বিয়ে পড়ানো যাবে না, তখন নাকি মেয়েটা অপবিত্র থাকে। এই বিষয়টা ঠিক আমার মাথায় ঢুকল না। সৃষ্টির শুরু কিংবা সন্তান জন্মদানে একজন নারীর মাসিক ছাড়া কীভাবে সম্ভব? কই তখন তো কোনো আইন হলো না, মাসিক চলাকালে নারী সন্তান জন্ম দিতে পারবে না। এসব আজব ফতোয়ার দেশে কী আর আশা করা সম্ভব! তাই আমাদের গোড়ায় হাত দিতে হবে। পরিবারের সচেতনতা বাড়াতে হবে বহুগুণে। সন্তানকে সময় দিতে হবে। শেয়ারিংয়ে এগিয়ে আসতে হবে। একটু কৌশলে সন্তানের ভালো লাগা, খারাপ লাগা খুঁজে বের করতে হবে।

 


শিশু বিকাশ বিশেষজ্ঞ ও প্যারেন্টিং এক্সপার্ট আঞ্জুমান পারভীন বলেন, যৌনশিক্ষা পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা খুবই জরুরি, তবে তা হতে হবে একদম ছোটবেলা থেকেই অর্থাৎ গ্রেড ওয়ান থেকে। শরীরের নানা অর্গান পড়ানোর সময় আমরা লজ্জার স্থানগুলোকে এড়িয়ে যাই, ওদের মনের মধ্যে একটি গোপনীয়তার জায়গা তৈরি করে দিই। যখন তারা বড় হতে থাকে, এসব বিষয়ের প্রতি আগ্রহও বাড়ে। ওখান থেকেই অপরাধগুলোর জন্ম হয়। সে জন্য বাবা-মায়ের শিক্ষাটাও বাড়াতে হবে। স্কুল থেকে যদি মাঝেমধ্যে খোলা আলোচনার সেমিনার করা হয় অভিভাবক, শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের সমন্বয়ে তাহলে মানসিক সংকোচ, সংকট কাটানো সম্ভব। জাতিগতভাবে আমাদের ইগনোর করার প্রবণতা আছে যেগুলো বড় বড় বিপদ ডেকে আনে জীবনের নানা বাঁকে। শিশু হঠাৎ করেই কন্ডাক্ট ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হচ্ছে কিন্তু আমরা অভিভাবকরা এর মানেই বুঝতে পারছি না। এর ছোট ছোট লক্ষণ আগে থেকেই বোঝা যায় যেমন মিথ্যা বলা, শিক্ষকদের বুলিং করা, কাউকে কষ্ট দিয়ে মজা পাওয়া এগুলো সন্তানের মধ্য দেখলে ভাবতে হবে সে স্বাভাবিক অবস্থানে নেই। এগুলো ঠিক করতে বকাঝকা দেওয়া যাবে না, কৌশলে এগোতে হবে। সে জন্য বাবা-মায়ের প্যারেন্টিং শিক্ষাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে কি শিশুর পর্নো আসক্তির জন্য বাবা-মা দায়ী? তিনি বলেন, পরোক্ষভাবে অবশ্যই দায়ী। প্রথমত গোপনীয়তার বেড়াজাল ভাঙতে হবে। এসব বিষয়ে পরিচ্ছন্ন আলোচনার জায়গা তৈরি করতে হবে। পরিবার থেকে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সে যদি জানতে পারে যৌনতা কী, এটা জীবনেরই অংশ, তাহলে সে ঘরে দরজা বন্ধ করে পর্নো দেখবে না।
ইদানীং দেখা যাচ্ছে মাদক গ্রহণ ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে, এই বিষয়ে আপনি কী মনে করেন? আঞ্জুমান পারভীন বলেন, ‘মাদকেও আধুনিকতা চলে এসেছে, যা আমাদের তরুণ প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকারক। জানলে অবাক হবেন সম্প্রতি আমার এক ক্লায়েন্ট আমাকে এসে বললেন, ওনার স্কুলে পড়ুয়া সন্তান অনলাইন থেকে ব্রাউনি অর্ডার করেছে, দাম ১৫০০ টাকা। দাম শুনে তার মা একটু অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করেছে এবং ঘটনাটা খতিয়ে দেখে, ব্রাউনির সঙ্গে এসেছে ইয়াবা। তাহলে আমাদের সমাজব্যবস্থা, আধুনিকতা কোন জায়গায় পৌঁছে গেছে? বর্তমানে মায়েরা সিরিয়াল দেখায় ব্যস্ত থাকছেন আর বাবারা টাকার পেছনে ছুটছেন। এতে একেকটি পরিবার নীরবে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগের দিনে সন্তানের খেলাধুলা করার সুযোগ ছিল, বাড়িতে বসেই ইনডোর গেমগুলো পরিচালিত হতো। সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে শিশু খারাপ জগতে ঢোকার সুযোগ পেত না।’
আমাদের দেশে সাধারণ মানুষেরই যৌনশিক্ষা পাওয়ার কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। বরং এটা এমন এক নিষিদ্ধ বিষয় যে এ নিয়ে অভিভাবক, শিক্ষক কাউকে প্রশ্ন করাই যেন এক অপরাধ। উচ্চমাধ্যমিকের জীববিজ্ঞান বইয়ে মানুষর জননাঙ্গ সম্পর্কে একটি অধ্যায় ছিল, সেখান থেকে পরীক্ষায় প্রশ্ন আসত বটে, তবে সেই অধ্যায় শিক্ষকেরা ক্লাসে বা প্রাইভেট টিউশনিতে পড়াতেন না। বলতেন নিজে নিজে শিখে নিতে।

 


আমাদের সমাজে কিশোর-কিশোরী বা যুবক-যুবতীদের যৌনতাবিষয়ক জ্ঞান পাওয়ার মূল উৎস পর্ণ। অবাস্তব, অস্বাভাবিক এসব ফিল্ম দেখে যৌনতাবিষয়ক যে জ্ঞান তাদের হয়, তাতে ধর্ষণ, সম্মতি, স্বাভাবিক যৌনজীবন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন বরং মনে হতে পারে, যৌনসঙ্গম হচ্ছে নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব খাটানো, যা পুরুষত্বের বহিঃপ্রকাশ।
যৌনশিক্ষা ধর্ষণ প্রতিরোধে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, সেটা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের নানা রকম মন্তব্য রয়েছে। ধর্ষণ রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ আর নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি যৌনশিক্ষারও প্রয়োজন রয়েছে। মানুষের যৌনাঙ্গ, যৌনতা, সম্মতি, সম্পর্কের বিষয়ে আমাদের দেশের মানুষের প্রকৃত জ্ঞান জরুরি আর এসব জানলে অনেক ভ্রান্ত ধারণা এমনিতেই ঘুচে যাবে, কমবে নারী-পুরুষের মানসিক দূরত্ব।
একজন ছেলেমেয়ে কোথায় কোথায় সমস্যায় পড়তে পারে সেগুলো নিয়ে পুরো বিশ্বে কথা হচ্ছে কিন্তু আমাদের মধ্যে এখনো এ বিষয়গুলো লুকিয়ে রাখার মানসিকতা কাজ করে। যৌনশিক্ষাকে স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক করা হলে সেটি সবচেয়ে ভালো দিক হতো, যেখানে শিক্ষার্থীরা কী করা যাবে বা যাবে না, কীভাবে করা যেতে পাওে, সেসব বিষয়ে শিক্ষকেরা তাদের মতো করে নানা উদাহরণের শিক্ষা দিতে পারেন। আশঙ্কাজনকভাবে দেশে শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। অশ্লীলতা ও তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদক, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, আইনের ধীরগতি, শিশুরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রতিরোধে অক্ষম এবং নানা হুমকি দিয়ে শিশুদের চুপ করিয়ে রাখা যায় বলেই শিশু ধর্ষণের হার বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। একই সঙ্গে মাদক, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, আইনের ধীরগতি ও বৈষম্যমূলক প্রয়োগ এবং নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ধর্ষককে নানাভাবে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।

ছবি: ইন্টারনেট

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

15 − 1 =