কোন বয়সে কোন খেলনা

করেছে Sabiha Zaman

ডা. লুনা পারভীন:

শিশুর বিকাশের অন্যতম মাধ্যম খেলনা। তবে বুঝতে হবে কোন বয়সে কোন খেলনা প্রয়োজন। দোকান থেকে রঙচঙে খেলনা কিনে আনলেই হবে না। শিশুর বয়স অনুযায়ী খেলনা নির্বাচন করতে হবে। একটু বড় শিশুর খেলনা ছোট শিশুকে দিলে সে মজাও পাবে না, বিকাশও হবে না, তাই বয়স বুঝে খেলনা নির্বাচন করতে বলেন বিশেষজ্ঞরাও-

বিভিন্ন গবেষণায় শিশুস্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্থা জানালেন কোন বয়সে বাচ্চাকে কী খেলনা দেওয়া যায় বিকাশের জন্য-

০ থেকে ৬ মাস

প্রথম তিন মাস বাচ্চার দৃষ্টিশক্তি কিন্তু ঝাপসা থাকে, শুরুতে সবকিছু ডাবল দেখে। আস্তে আস্তে উজ্জ্বল আলো, রঙিন বড় বড় জিনিস, মায়ের মুখ চিনতে শুরু করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আশপাশের জিনিস চিনতে, হাত দিয়ে ধরতে ও মুখে দিতে চেষ্টা করে।

এ সময় নরম, সহজে চ্যাপ্টা করা যায়, কোনো ধারালো কোনা ছাড়া, মুখে চিবানো যায় তবে মুখে যাওয়ার মতো কোনো ছোট দানাদার কিছু যেন না থাকে, সহজে পরিষ্কার করা যায় এমন খেলনা দেবেন। ঝুন ঝুন করে শব্দ করে এমন খেলনাও খুব পছন্দ করে বাচ্চারা।
উজ্জ্বল রঙের বল, কাপড়ের পুতুল, ঝুনঝুনি, প্লাস্টিকের ছবি বা আয়না দিতে পারেন। ছড়া, গান, কবিতা শোনাতে পারেন হাত-পা নেড়ে অভিনয় করে।

৭ থেকে ১২ মাস

এ সময় একটু একটু করে নড়াচড়া শুরু করে বাচ্চারা, গড়িয়ে উপুড় হওয়া, ধরে দাঁড়ানো, নিজের নাম ও শরীরের বিভিন্ন অংশ চিনতে পারাই এ সময় তাদের কর্মচঞ্চলতার লক্ষণ।
বল, পুতুল, গাড়ি, বড় কিউব বা লেগো, কাগজ, বোতলের মধ্যে মুড়ি ভরা, শব্দ করে এমন খেলনা বা বাদ্যযন্ত্র। গল্পের বই থেকে ছোট ছোট গল্প, ছড়া, ছবি দেখানো।

১ বছর থেকে ২ বছর

শুরু হলো গতিময় জীবন। ধরে ধরে হাঁটতে শেখা, আস্তে আস্তে হাঁটা, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, কিছু ছুড়ে দেওয়া, লুকিয়ে রাখলে খুঁজে বের করতে চাওয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকে বাচ্চারা।
এ সময় বল, কাপড় বা প্লাস্টিকের পুতুল বা জীবজন্তু, মিউজিক্যাল সেট, লেগো, চার বা ছয় পিসের পাজল সেট, মোমের রংপেনসিল, কাগজ ও পেনসিল দাগাদাগি করার জন্য।

২ থেকে ৩ বছর

এ সময় দৌড়ঝাঁপের পাশাপাশি এরা আঙুলের সূক্ষ্ম ব্যবহারগুলোও শেখে, এমনকি চিমটি দেওয়াও। দক্ষতা ও কাজের পরিধি বাড়ানোর জন্য এ সময় তাদের বিভিন্ন পাজল, লেগো দিয়ে ঘর বানানো, কিচেন সেট, কনস্ট্রাকশন সেট যেমন হাতুড়ি-বাটালি, ভোঁতা কেচি এসব দিয়ে নতুন কিছু তৈরি করা, ঘর সাজানো, বড়দের নকল করতে ডাক্তারি সেট, ইঞ্জিনিয়ার সেট, শপিংমল, কিচেন সেট, বারবি পুতুলের ঘর এসব দেওয়া যেতে পারে। এমনকি হাঁড়িপাতিল, টি-সেট, তিন চাকার সাইকেল, খেলনা গাড়ি, বাদ্যযন্ত্র বাচ্চাদের উপযোগী দেওয়া যায়।
এ সময়টাই বর্ণ চেনানোর উপযুক্ত সময়। বিশেষ করে এবিসিডি উচ্চারণসহ পিয়ানো, স্লেট, বই পাওয়া যায়। এসব কানে শুনে ও চোখে দেখে পড়ার প্রতি আগ্রহ বাড়ে।

৪ থেকে ৫ বছর

পড়ালেখা শেখার সময় এখন থেকে শুরু। এ সময় এদের জানার আগ্রহ থাকে প্রচুর। কী কেন কীভাবে সারাক্ষণ যেন প্রশ্নের খই ফোটে। নতুন কিছু শেখার আগ্রহ ও অন্য বাচ্চাদের খেলার আগ্রহ এ সময় তাদের বন্ধু তৈরি ও শেয়ার করা শেখায়।
এই সময়ের খেলনা শিক্ষামূলক হলে ভালো হয় যেমন বর্ণমালা দিয়ে তৈরি বড়, কিউব, পাজল, আর্ট এনক্রাফট, বিভিন্ন জিনিস তৈরি যেমন তুলা দিয়ে মেঘ, কাটা সবজি বা চাল দিয়ে ফুল, পাতা, ঘর, রং করা ও ছবি আঁকার বই, বিদ্যুৎ-চালিত খেলনা, সুপার হিরোদের পুতুল, জামাকাপড়, আসবাবপত্রসহ খেলনা ঘর, ট্রেন, অ্যারোপ্লেন, নৌকা, রং করার সামগ্রী। এসব তাদের বর্ণমালা বলতে ও লিখতে শেখার অভ্যাস করানো যায়।

৬ থেকে ৭ বছর

এ সময় একা একা নয়, দল বেঁধে খেলতে আগ্রহী হয় বাচ্চারা। একসঙ্গে ঘরে বসে দাবা, লুডু, ক্যারাম বা মনোপলি খেলতে আগ্রহ বোধ করে। এ ছাড়া কম্পিউটার, মোবাইল বিভিন্ন ডিভাইসের প্রতি আগ্রহ ও তা সহজে আয়ত্ত করার দক্ষতা অর্জন করে ফেলে। বিভিন্ন স্পোর্টসে আগ্রহী করার জন্য ব্যাট-বল, টেনিস ব্যাট, ব্যাডমিন্টন এসব দিয়ে খেলতে দেওয়া যায়।

৮ বছর বা এর ঊর্ধ্বে

বাইরের খেলাগুলোতেই বেশি উৎসাহিত হয় বাচ্চারা। বিভিন্ন সায়েন্টিফিক গেম সেট দিয়ে বাচ্চাদের উৎসাহ দেওয়া যায় জ্ঞানচর্চার জন্য। বাচ্চাদের কীভাবে গড়ে তুলবে তার মূল চালিকাশক্তি আপনার হাতে রাখবেন। জেদকে প্রশ্রয় দেবেন না, বাচ্চার সামনে নিজেকে রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরুন। ভালো কিছু পেতে হলে তার জন্য অবশ্যই আপনাকে ভালো সময় দিতে হবে, পৃথিবীতে কোনো কিছুই বিনা পরিশ্রমে বা চাইলেই পাওয়া যায়, এমন নয়।

ডা. লুনা পারভীন
শিশু বিশেষজ্ঞ, বহির্বিভাগ
ঢাকা শিশু হাসপাতাল
শ্যামলী।

ছবি: ইন্টারনেট

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

19 − fifteen =