ক্যারিয়ার যখন ফিল্মমেকিং

করেছে Wazedur Rahman

ফিল্মমেকিং ক্যারিয়ারের বিভিন্ন শাখার মধ্যে আছে অভিনয়, পরিচালনা, প্রযোজনা, চিত্রনাট্য লেখা, সিনেমাটোগ্রাফি, সাউন্ড রেকর্ডিং, ভিজু্যুয়াল মিক্সিং, এডিটিং ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। মারাত্মক প্যাশন ছাড়া এই পেশায় নাম করা সম্ভব নয় কোনোমতেই।

গণমাধ্যমসংক্রান্ত যা যা ক্যারিয়ার অপশন হতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং সৃজনশীল অপশন বোধ হয় এই ফিল্মমেকিং। সিনেমা মানে কিন্তু শুধু বিনোদন নয়, সেই সঙ্গে জুড়ে থাকে আরও হাজারটা টেকনিক্যাল খুঁটিনাটি দিক। দেশ-বিদেশের সাংস্কৃতিক গণ্ডি মুছে দিতে পারে সিনেমাই। ফিল্মমেকিং ক্যারিয়ারে ফিচার ফিল্ম বানানোর পাশাপাশি, ডকুমেন্টারি, নিউজ রিল, প্রমোশনাল ফিল্মস, টিভি কমার্শিয়ালস, মিউজিক ভিডিওজ ইত্যাদি হাজারো জিনিস শেখার এবং পরবর্তী জীবনে সেই নিয়ে কাজ করার অপশন থাকে।

এই পেশায় নানা বিষয়ে স্কিলড মানুষজনের সঙ্গে দল বেঁধে কাজ করার ব্যাপার থাকে। ছবি যে ধরনেরই হোক, এই দলগত প্রচেষ্টাটা কিন্তু ফিল্মমেকিংয়ের ক্ষেত্রে মস্ত প্রয়োজনীয় একটা ফ্যাক্টর। মনে রাখতে হবে, ফিল্মমেকিং মানে কিন্তু প্রথম কাজ থেকেই নাম-যশ-খ্যাতির হাতছানি নয়, বরং এই পেশায় সবচেয়ে বেশি করে প্রয়োজন তীব্র প্যাশনের। এ ধরনের কাজে সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার ক্যাপাসিটি কী আছে তোমার? আছে, ফিল্মমেকিংয়ের খুঁটিনাটির প্রতি ফাটাফাটি প্যাশন? তাহলে জেনে নাও কীভাবে এগোবে এই পথে…

 

আরও একটু গৌরচন্দ্রিকা

ফিল্মমেকিং ক্যারিয়ারের বিভিন্ন শাখার মধ্যে আছে অভিনয়, পরিচালনা, প্রযোজনা, চিত্রনাট্য লেখা, সিনেমাটোগ্রাফি, সাউন্ড রেকর্ডিং, ভিজ্যুয়াল মিক্সিং, এডিটিং ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাকে ছবি বানানোর সময় এসব দিকের ওপর নজর রাখতে হয়, ঠিক যেমনভাবে জাহাজের ক্যাপ্টেন নজরে রাখেন জাহাজ চালনার কাজে তাঁর অধীন সব দপ্তর।

বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে প্রতিবছর প্রচুর সিনেমা-নাটক-টেলিফিল্ম মুক্তি পাচ্ছে, সেখানে দাঁড়িয়ে ফিল্মমেকিংয়ের পেশায় কাজের সুযোগ কিন্তু প্রচুর। গোড়াতেই ঋত্বিক ঘটকের মতো সিনেমার মতো সেট বানিয়ে এনে কোনো প্রযোজক তোমার পায়ে পড়ে ‘একটা সিনেমা পরিচালনা করে দিন ভাই!’ বলে হাউমাউ কাঁদবেন না, সেটা নিশ্চয়ই আমার বলার অপেক্ষা রাখে না? যেকোনো পেশার মতোই এখানেও এক্কেবারে তলা থেকে শুরু করে ওপরে ওঠার মানসিকতা রাখতে হবে তোমাকে।

এ দেশে প্রতিবছর প্রচুর ছবি বানানো হচ্ছে যে বললাম, এই কথাটা অবিশ্বাস করার আগে মনে রাখতে হবে, ‘ছবি’ বলতে কিন্তু স্রেফ সিনেমা হলে মুক্তি পাচ্ছে এ রকম সিনেমাগুলোর কথাই বলছি না। বরং এক্কেবারে গোড়ায় যে নানা রকমের ছবির কথা বলেছিলাম, বলছি তার সবগুলোর কথাই।

 

ফিল্ম প্রোডাকশন

এই শাখায় থাকতে হলে একটা ছবির ম্যানেজমেন্টের খুঁটিনাটি সামলাতে হয়। কী রকম? যেমন ধরো, অর্থনৈতিক দিকগুলো, ফান্ডিং, বিভিন্ন কন্ট্র্যাক্ট সাইন করা, লোকজন, যন্ত্রপাতি কিংবা লোকলস্কর ভাড়া করে আনা, আর্টিস্টদের সঙ্গে দরদাম করা, টেকনিশিয়ান থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সারদের সামলানোর পাশাপাশি বিভিন্ন আইনি দিক, যেমন কপিরাইট কিংবা লিগ্যাল রাইটের ব্যবস্থা করা, ইনশিওরেন্সের ব্যবস্থা, বাজেট নির্ধারণ করা, পাবলিক রিলেশন এবং পাবলিসিটির দেখভাল করা, বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ, ম্যানেজমেন্ট সামলানো, লোকেশন দেখা, কাজের দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলা, মিটিং প্ল্যান করা, ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা ইত্যাদি এ রকম হাজারটা কাজ!

ফিল্ম ডিরেকশন

ফিল্মমেকিংয়ের সব সৃজনশীল দিকের সুতোই পরিচালকের হাতে। তিনি যেমন যেমন সুতো ছাড়বেন, টানবেন, প্যাঁচ কষবেন, বাদবাকি টিম সেইমতো তালে তাল মিলিয়ে কাজ করবে, তবেই না তৈরি হবে ভালো ছবি! ছবির স্ক্রিপ্ট, চরিত্রায়ণ, লোকেশন, ক্যামেরা, সাউন্ড, শুটিং শিডিউল নির্ধারণ, কলাকুশলীদের নিয়ে রিহার্স করা ও তাদের পরিচালনা, মেকআপের সাতসতেরো, সবটাই প্রাথমিকভাবে পরিচালক ও তার নিজস্ব টিম ঠিক করেন।

স্ক্রিপ্টের দায়িত্বে যিনি বা যারা থাকেন, চিত্রনাট্য লিখে ফেলার পাশাপাশি তাদের কাজ থাকে খুঁটিনাটি হাজারটা এটা-সেটা দিয়ে চিত্রনাট্য সাজানোর জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা সেরে রাখার। ক্যামেরার টিমের দায়িত্বে থাকে একটা ছবির সবটার ভিজ্যুয়ালাইজেশন, ফিল্মিং, লাইটিং, কোন ‘টেক’-এর পর কোন ‘টেক’ নেওয়া হচ্ছে, তার ট্র্যাক রাখা, লগ শিডিউল মেইনটেন করার মতো কাজগুলো। সাউন্ড ডিপার্টমেন্টের কাঁধে থাকে সব রকম সাউন্ড এফেক্ট, মিউজিক, মিক্সিং, রেকর্ডিং, ডাবিংয়ের মতো কাজগুলো।

কী বুঝলাম?

একটা ছবি তৈরি করা যে নিছক মুখের কথা নয়, বরং তার পেছনে থাকে প্রযোজক, পরিচালক, লেখক, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী, সিনেমাটোগ্রাফার, ক্যামেরাম্যান, সাউন্ড রেকর্ডিস্ট, সাউন্ড মিক্সার, কাস্টিং ডিরেক্টর, আর্ট ডিরেক্টর, মিউজিক ডিরেক্টর, লিরিসিস্ট, কোরিওগ্রাফার, স্টান্ট ডিরেক্টর, স্পেশাল ম্যানেজার, কস্টিউম ডিজাইনার, চিফ হেয়ার স্টাইল ডিজাইনার, মেকআপ ডিরেক্টর, এডিটরের মতো প্রায় শ দেড়েক-দুয়েক মানুষের ঘাম-রক্ত-পরিশ্রম, সে কথাটা নিশ্চয়ই বোঝা গেছে এতক্ষণে? যে কারণেই শুরুতে বারবার টিমওয়ার্কের কথাটা বলছিলাম। একটা ছবি তৈরির সময় পছন্দমতো যে ডিপার্টমেন্টেই তুমি থাক না কেন, ‘দশে মিলি করি কাজ’-এর বিশ্বাসে তুমি বিশ্বাসী না হলে এ লাইনে ভাই… হেঁ হেঁ… মুশকিলই আছে!

শিক্ষাগত যোগ্যতা

টেকনিক্যাল বিভিন্ন কোর্সের জন্য এই যোগ্যতা হলো উচ্চমাধ্যমিক স্তর অবধি লেখাপড়া। অন্যান্য কোর্সে ভর্তি পরীক্ষায় বসার জন্য সবার প্রথমেই গ্র্যাজুয়েশন চাই। তারপর ভর্তি পরীক্ষায় অ্যাপটিটিউড টেস্ট ও ইন্টারভিউর মাধ্যমে যাচাই করা হবে তোমার প্রতিভা। তোমার পছন্দের ইনস্টিটিউশন ও পছন্দের কোর্সের ওপর নির্ভর করবে তোমার কোর্সের সময়সীমা কতটা হবে।

স্পেশালাইজেশন করতে পার প্রোডাকশন, ডিরেকশন, এডিটিং, সিনেমাটোগ্রাফি, ফিল্ম প্রসেসিং, অ্যানিমেশন, অ্যাক্টিং, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকআপ, ফটোগ্রাফি ইত্যাদি নানা শাখার যেকোনোটায়। স্পেশালাইজেশনের প্রায় প্রতি শাখাতেই ডিপ্লোমা, পোস্ট ডিপ্লোমা এবং সার্টিফিকেট কোর্সও করার সুযোগ আছে।

 

আয়রোজগার কী রকম?

চায়না ফোন জানো তো? কপালে থাকলে সে ফোন দুবছরও হেসেখেলে চলে যেতে পারে, না থাকলে দুদিনে খারাপও হয়ে যেতে পারে। এই পেশাতেও তেমনি অনেকগুলো ক্রাইটেরিয়ার ওপর নির্ভর করবে তোমার আয়ের পরিমাপ। নেহাতই সোনাবাঁধানো ভাগ্য নিয়ে কাজে না নামলে এক্কেবারে গোড়াতেই কেউ তোমাকে মাসপ্রতি লাখ টাকা অফার করবে, এতটা আশা করাটা বোকামি। এই পেশায় নাম ও দাম, দুই অর্জন করাই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। পাঁচটা কাজ করার পর একটা কাজে হয়তো তোমার নাম হলো, একটু ভালো আয় হতে শুরু করল, ব্যস।

কিন্তু পরের তিনটি কাজই লোকে আবার নিল না। আবার তুমি ব্যাকফুটে। গোড়া থেকে শুরু আবার। এই লেখার এক্কেবারে শুরুর দিকে এ জন্যই বলেছিলাম, ছবি করতে হলে কাজটার প্রতি প্যাশন না থাকলে কিন্তু মুশকিল। কাজটাকে দরদ দিয়ে, নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসলে, নিজের সর্বস্ব উজাড় করে লেগে থাকলে তবেই নাম, যশ; দেখা পাবে সবেরই।

 

লেখা: রোদসী ডেস্ক 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 × 5 =