গল্পের এপিঠ-ওপিঠ

করেছে Sabiha Zaman

গওহর গালিব

‘পুরুষের প্রতি ধাবমান এক অপেক্ষার নাম নারী আমার ফেসবুক ওয়ালে এহেন এক পোস্ট দেওয়ার পর থেকেই অশান্তির শুরু। মানুষটা আমি বরাবরই সরল। তারপরও কীভাবে কীভাবে যেন জটিল সব অবস্থার ভেতরে পড়ে যাই। এই এখন যেমন! স্ত্রী কথা বন্ধ করে দিয়েছে। নারী ও পুরুষের সাম্পর্কিক এই প্রকাশ্য কথাবার্তা হয়তোবা তার নজরেও পড়েছে। একই বাসায় থাকি বলে মুখোমুখি হতে হয়; না হলে চোখের দেখাটাও দেখত কিনা সন্দেহ। অথচ গত বছর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলার সময়েই বলে নিয়েছিলাম এসব অতি হালকা জিনিস ভাই, এসব নিয়ে যেন কোনো অশান্তি করো না। ‘তাহলে ওসবে থাকার দরকার কী স্ত্রীর এমন প্রশ্নের উত্তরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উপযোগিতা সম্পর্কে ছোটখাটো একটা ভাষণ দিয়েছিলাম। বউ আমার বক্তব্য ঠিকঠাক শুনেছিল কি না বুঝতে পারিনি, তবে ছাই দিয়ে টাকি মাছের মাথা চেপে বঁটির সামনে নিতে নিতে আলগোছে বলেছিল সাবধান! তখন সে হুঁশিয়ারির মানে বুঝিনি, এখনটা যেমনটা বুঝতে পারছি।

অবশ্য বছরখানেকের মধ্যে ফেসবুকের কল্যাণে আমি যে রীতিমতো সেলিব্রেটি বনে যাব, সেটা আমার চিন্তারও বাইরে ছিল। একটা সরকারি অফিসের মধ্যম সারির কর্মচারী আমি (অবশ্য বাইরে পরিচয় দিই কর্মকর্তা হিসেবে), এসব ফেসবুক-টেসবুক খুব একটা টানত না আমায়। বরং সমবেতনের কলিগদের নিয়ে স্বল্পমূল্যে জমি কিনে উচ্চমূল্যে বাড়ি বানানোর প্লট বিক্রির ব্যবসার দিকেই বেশ মনোযোগী ছিলাম। একদিন অফিসে লাঞ্চের সময় পাশের টেবিলের ফকরুল সাহেবকে এক লাস্যময়ীর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে দেখে নিজেকে কেমন যেন ছোট ছোট লাগল। মিন মিন করে ফকরুল সাহেবকে শুধাতেই কড়া এক ধমক খেলাম ‘ধুর মশায়! আপনি ভারি অসামাজিকই থেকে গেলেন। ফেসবুকে একখানা অ্যাকাউন্ট খুলুন তো। দুনিয়াবি মজাটা দেখবেন না! বউ-বাচ্চা নিয়ে সংসার আর কাঁহাতক ভালো লাগে।’ (ছাত্রাবস্থায় ফকরুল সাহেব মঞ্চনাটক করা মানুষ। সেই সঙ্গে তিনি কলকাতার সিরিয়ালের ভাষায় কথা বলতে বেশ পুলক অনুভব করেন।)
সেই থেকে শুরু। পরে তো আমি ফেসবুক জগতে মোটামুটি নামই করে ফেললাম। বিভিন্ন গঠনমূলক পরামর্শ, সুন্দর আর দর্শনীয় জায়গার স্থানিক বর্ণন, পত্রপত্রিকার ইতিবাচক সংবাদ শেয়ার করার মধ্য দিয়ে আমার ফেসবুক দিনলিপির প্রথম দিকটায় ভালোই লাইক-কমেন্ট পেতে লাগলাম। দেখতে দেখতে সমস্ত দিনের শেষে কিংবা কাজের ফাঁকে ফেসবুকে ঢুঁ মারার একটা চমকপ্রদ অভ্যাসও রপ্ত করে ফেললাম। আমার এহেন অভ্যাসে স্ত্রী-কন্যার জীবনে খুব একটা রকমফের হলো না। আমার বারো-তেরো বছরের মেয়েটা স্কুল আর কোচিং নিয়েই সারাক্ষণ ব্যস্ত। আমার স্কুলশিক্ষয়িত্রী স্ত্রী স্কুল-বাসা আর মেয়েকে সামলিয়ে আমার দিকে খুব একটা মনোযোগ দিতে পারত না। অবশ্য বিয়ের এত দিন পর মধ্যবয়সী এই আমাকে নিয়ে তার খুব একটা ভাবনারও কিছু ছিল না। আমাদের সবার একত্রে দেখা হতো রাতে, খাবার টেবিলে। আমারই নির্দেশে বাড়িতে এ বিষয়টা কঠোরভাবে মেনে চলতে হতো। পারিবারিক বন্ধন রক্ষার জন্য এক বেলা একত্রে সময় কাটানো খুবই জরুরি।

অথচ সেই আমি দেখতে দেখতে খাবার টেবিলে কেমন যেন উদাস হয়ে যেতে থাকলাম। অবশ্য এর একটা কারণও ছিল। ফেসবুক জগতে হামাগুড়ি সেরে যখন মোটামুটি হাঁটতে শিখেছি, ঠিক তখনি আমার টাইমলাইনে টুকটাক কবিতা লেখা শুরু করলাম। ‘আপনার কবিতা কিন্তু লাইনে আসা শুরু করেছে দাদা ফকরুল সাহেবের এহেন মন্তব্য আমাকে ভীষণ রকম প্রণোদনা দিচ্ছিল। পাশাপাশি দু-একজন কবির মন্তব্য, বিশেষত কমেন্টস বক্সে নারী কবিদের সরব উপস্থিতি আমার কবিসত্তাকে একেবারে নবকিরণে রাঙিয়ে দিচ্ছিল। আমি যারপরনাই পুলকিত হচ্ছিলুম (দেখুন, কবিতার প্রসঙ্গ এলেই আমার কেমন কাব্যিক ভাষা এসে যাচ্ছে)। এই কবি হওয়ার মোহ আমায় কীভাবে চিরচেনা স্বাভাবিক জীবন থেকে আলাদা করে ফেলছিল তার কিছু উদাহরণ দেওয়া দরকার।


বিয়ের পর থেকে রাতে দৈহিক মিলনের প্রাক্কালে আমাকেই তৎপর হতে হতো। বীণা তো (আমার স্ত্রী) এ ব্যাপারে ভীষণ রকমের লজ্জাকাতুরে। তাই তার লজ্জা ভাঙিয়ে রণে (পড়ুন রসে) আনতে আমার বেশ বেগ পেতে হতো। কখনো কখনো এ সময়টা এত দীর্ঘ হতো যে আসল সময়ে আমি খেই হারিয়ে ফেলতুম। সে সময়ে বীণার খিলখিল হাসি আমায় ভীষণ রকম লজ্জায় ফেলে দিত। আমি রাগে-বিরক্তিতে একঠা হয়ে থাকতুম। পরদিন যতক্ষণ সময় পেত, বীণা আমার রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করত। অবশ্য পরের রাতে আমরা বেশ মিলমিশ হয়ে যেতুম, কেননা বীণা তখন কিছুটা তৎপর হয়ে আমায় সম্ভাব্য লজ্জার হাত থেকে বাঁচাত। সেই আমি ফেসবুকের কবি হওয়ার পর স্ত্রী-সান্নিধ্য সম্পর্কে কেমন যেন উদাস হতে থাকলুম। রাত হলেই ফেসবুকে কবিতা লিখতে বসে যেতুম। স্ত্রী বীণাকেও দেখতুম পাশ ফিরে শুয়ে থাকতে। কবি তকমা নেওয়ার পর থেকে আমরা ঘনিষ্ঠ হয়েছি কি না আমার মনে পড়ে না। আমার না হয় কাব্যিচর্চা করতে হয়, কিন্তু বীণার কী হলো? ও কেন আর আগের মতো ভরা নদীর ন্যায় ডাকে না। মনে হয় বিয়ের দশ-পনেরো বছর পর মেয়েদের আগ্রহ কমে যায় আমি এ রকম একটা উত্তর খুঁজে নিয়ে বীণাকে একপ্রকার ক্ষমা করে দিয়েছিলুম।

যে কথাটা বলছিলুম, ফেসবুকে তত দিনে কবি হিসেবে আমার মোটামুটি একটা পরিচয় ছড়িয়েছে। আমার ফেসবুকের বায়োতে লেখা পয়েট, আর কাভার ফটোখানা আমারই লেখা দু-এক ছত্র পঙক্তি দিয়ে সাজানো। তবে যা-ই বলুন, নারী মহলে কবি পরিচয় দিতে পেরে আমি ভীষণ রকমের পুলক অনুভব করতে থাকলুম। সেই সঙ্গে নারী কবিরা যখন কথা প্রসঙ্গে জেনে যেত আমি সরকারি চাকুরে, তখন কবি হিসেবে আমায় স্বীকৃতি দিতে তারা আর কুণ্ঠাবোধ করতেন না। অফিসেও আমার খানিকটা কদর বেড়ে গেছিল। আসলে লাইক আর কমেন্ট দিয়ে যখন জনপ্রিয়তা মাপা হয়, সে ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকার কোনো মানেই হয় না। কেননা কীভাবে লাইক-কমেন্ট পেতে হয়, কিংবা কোন পোস্টে কতটা লাইক পড়তে পারে, সে ব্যাপারে আমার ভীষণ রকমের সব গবেষণা করা হয়ে গেছিল। তবে একটা ব্যাপারে আমি ভীষণ রকমের সিরিয়াস ছিলাম, এখনো আছি। সেটা হলো আমি কোনোভাবেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে কিছু লিখতাম না, কিংবা মন্তব্যও করতাম না। প্রাথমিক পাঠেই ফকরুল সাহেব আমায় সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ‘খবরদার দাদা, প্রশাসনের বিরুদ্ধে কিছু লিখবেন না। আপনি ফুর্তি করেন, মজা লোটেন কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু প্রশাসনকে চটাবেন না।’ এই উপদেশ আমি বেদবাক্য বলে মানি। ফলে এত দিনেও ফেসবুককেন্দ্রিক জটিলতায় আমায় পড়তে হয়নি। যত সব জটিলতা, সব আমার নিজের সৃষ্ট।

মডার্নিজম, তারপর পোস্ট-মডার্নিজম যার বাংলা করলে দাঁড়ায় আধুনিকতা ও উত্তরাধুনিকতা। এই উত্তরাধুনিক শব্দটি নিয়ে হাল আমলে বেশ কাব্যি কথা চলছে। আমি ওসব ঠিক একটা বুঝি না, তবে কেউ কেউ উচ্চারণ করলে বেশ একটা সমীহের দৃষ্টিতে তাকাই। একবার এক বুড়ো কবি বলে বসলেন উত্তরাধুনিকতার দিকে বাংলা কবিতা অনেক দুর্বল। আমি নতুন কবি, তার ওপর সরকারি চাকুরে, কবিতার নাড়ি-নক্ষত্র সব আমার জানার কথা নয়। তবে নিজেকে যেহেতু কবি বলে দাবি করি, তাই কবিতা নিয়ে কেউ কিছু বললে মনোযোগী হই। ফলে কবিতার উত্তরাধুনিকতা বিষয়টি আমাকে ভাবাতে লাগল। কারণ কবিতাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। সেই দায় থেকে এবং কিছুটা ঠিকঠাক বুঝতে না পারার অক্ষমতা থেকে বুড়ো এবং বিখ্যাত সেই কবির বাসায় একদিন হাজির হলাম। বললাম, ‘দাদা, কবিতায় উত্তরাধুনিকতার ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলেন তো! বুড়ো কবি আমায় অনেকক্ষণ জ্ঞান দিলেন। কিছুই বুঝলাম না, বেশির ভাগ কথাই মাথার ওপর দিয়ে গেল। প্রায় ঘণ্টাখানেক অতিবাহিত হওয়ার পর বুড়ো কবি শুধালেন ‘কিছু বুঝলে হে?’ আমি মাথা চুলকে বললাম, না দাদা কিছু বুঝিনি। তিনি আমার ওপর ভারি রুষ্ট হলেন। তিনি বললেন তোমার দ্বারা কিচ্ছুই হবে না, কবিতা তো নয়ই। শুনে কেমন রাগ লাগল। একপ্রকার জেদ চেপে গেল। আমি বুড়ো কবির হাত চেপে ধরে বললাম, না দাদা, অমন অভিশাপ দেবেন না।

আমায় উত্তরাধুনিক কবিতা লিখতেই হবে। একটা কিছু উপায় বলুন। তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন শিষ্য, সত্যিই তুমি উত্তরাধুনিক কবিতা লিখতে চাও। আমি ওপর-নিচ মাথা দোলাতে দোলাতে বললাম, হ্যাঁ চাই…অবশ্যই চাই। তিনি খানিক মুচকি হেসে বললেন, তুমি যে তার কিছুই বোঝো না হে। আমি নাছোড়বান্দার মতো বললাম, না দাদা আপনি একটা কিছু উপায় বলুন। শেষে তিনি থাকতে না পেরে বললেন (আসলে আমার জবরদস্তি দেখে) তুমি এক কাজ করো, তোমার কবিতায় খানিক উল্টোপাল্টা যৌনগন্ধী শব্দ ঢুকিয়ে দাও, দেখবে কবিতায় উত্তরাধুনিক ছাপ পড়ে গেছে। বুড়ো কবির কথা শুনে বেশ ভরসা পেলাম। সদ্য জন্ম নেওয়া বাছুরের মতো কৃতজ্ঞচিত্তে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে এলাম। যে করেই হোক উত্তরাধুনিক কবিতা লিখতেই হবে, মন্ত্র তো পেয়েই গেলাম। সেই থেকে উত্তরাধুনিক কবিতা লেখার শুরু। আমি বেছে বেছে আমার কবিতায় যৌনগন্ধী শব্দ ঢোকাতে লাগলাম।

তবে কবিতায় যৌনগন্ধী শব্দ প্রবেশ করানো আমার জন্য খুব কঠিন একটা ব্যাপার ছিল। কারণ, যা-ই লিখছিলাম কেমন একটা ভালগার ব্যাপার হয়ে উঠছিল, শিল্পের ব্যাপারটা হচ্ছিল না। আমার জন্য কবিতা লেখাই কঠিন, তার ওপর যৌনগন্ধী শব্দ। শেষে আমি একটা বুদ্ধি আবিষ্কার করলাম। আমার পড়া যেসব উপন্যাসে সেক্স রিলেটেড বর্ণনা ছিল, সেসবই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে কবিতায় স্থান দেওয়ার চেষ্টা করতে থাকলাম। ছাত্রাবস্থায় আমার জীবনে বেশ প্রভাব ফেলেছিল ‘সংশপ্তক’ আর ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাস দুটি। ‘সংশপ্তক’-এর হুরমতীকে তো কোনো দিন ভুলতে পারিনি, ‘ক্রীতদাসের হাসি’র মেহেরজান ঘুমের মধ্যেও হানা দিত। শুরু করলাম ‘ক্রীতদাসের হাসি’ দিয়ে। এ উপন্যাসে খলিফা হারুনের দুজন পোষ্য কবি আবুল আতাহিয়া এবং আবু নওয়াসের সংলাপ ভোলার নয়। আমার স্মৃতিতে গেঁথে ছিল ///কবি আবু ইসহাকের//// এই সব পঙক্তি (যা খলিফা হারুন-অর-রশীদকে শোনানো হচ্ছিল)–
‘ইরানি মেয়ের সিনা ভালো
মিসরি মেয়ের ঊরু
আরবি মেয়ের নাভির নিচে
স্বর্গ ঠারে ভুরু’
বেশ কদিন ভেবে ভেবে এই কবিতার সিনা-ঊরু-নাভি-স্বর্গ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে দুর্দান্ত সব কবিতা লিখতে শুরু করলাম। ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে আমার কবিতাগুলো এত বেশি শেয়ার হতে থাকল যে, লোকজন আমাকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি দিল। শুধু কবি না, উত্তর আধুনিক কবি। আমার উদ্দেশ্য একপ্রকার সফল হয়ে গেল, বাংলা কবিতাকে উদ্ধার করতে পারার আবেগজনিত উচ্ছ্বাস আমাকে আকাশে-বাতাসে ভাসাচ্ছিল। ভেবেছিলাম নারী কবিরা আমার বিরুদ্ধে লেগে যাবেন। কিন্তু তারাও যে ঊরু, সিনা এই শব্দগুলোকে এত বেশি পছন্দ করবেন, বুঝতে পারিনি। চতুর্দিকে আমার প্রশংসা প্রশংসা। আমার এহেন কবিতা লেখার ফলে, বেশ কিছু নারী কবির সঙ্গে ইনবক্সে দারুণ সব কথাবার্তা হতে থাকল। যেহেতু আমি সেক্সনির্ভর কবিতা লেখা শুরু করেছি, ফলে ইনবক্সে আমি খানিক সাহসী হয়ে উঠলাম। দেখলাম নারী কবিরাও আমাকে প্রশ্রয় দিতে থাকল।

কবিতা, নারীর প্রশংসা, ফেসবুকের উচ্ছ্বাস এসব করতে করতে পরিবারের সদস্যদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলুম। পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল যে যেখানে থাকি, রাতের খাবারটা যেন সকলে একসঙ্গেই খাই। আমার সেলিব্রেটি হওয়ার তাড়ায় সেসব আর মনে থাকছিল না। কখন বাসায় আসি না আসি, তার ঠিক ছিল না। পরিবারের কাউকেই সময় দিতে পারছিলাম না। দারুণ এক উন্মাদনা পেয়ে বসেছিল আমায়। জনপ্রিয় হওয়ার তাড়ায় আমি ছিলাম বেহুঁশ। শুধু নিজেকে নিয়ে ছিলাম ভীষণ ব্যস্ত। কেমন একটা ঘোর লাগা উচ্ছ্বাসে ভাসছিলাম। আমার স্ত্রী এমনিতে কম কথা বলে, চুপচাপ থাকা মানুষ। আমার এ রকম ঘটনায়, খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল আরও বেশি চুপচাপ হয়ে যাচ্ছিল। আমি তার এ আচরণে খুব একটা পাত্তা দিচ্ছিলাম না, বরং অতীতের কতক ঘটনার মধুরতম প্রতিশোধ নিতে পেরে খুশি হচ্ছিলুম। বিয়ের পরপর তার ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পেতে, আমায় অনেক বেশি বেগ পেতে হতো। অনেক কসরতের পর তার নাগাল পেতাম। আমার বেশ মনে আছে, কতশত রাত চলে যেত তার হাত ধরেই বসে থাকতাম কিন্তু ঘনিষ্ঠ হতে পারতাম না। আর এখন, সে চাইলেও আমি তাকে সময় দিতে পারছি না।

 

এরই নাম পুরুষের প্রতিশোধ। সে রাগ করে বিছানায় মুখ ঘুরিয়ে থাকছিল, আমি ইচ্ছা করেই তার মান ভাঙাচ্ছিলাম না। বরং অতীতের কথা ভেবে প্রতিশোধ নেওয়ার আনন্দ পাচ্ছিলুম, আর নিজের মনেই আওড়িয়ে যাচ্ছিলুম…
‘একবার পাইবার পর নিতান্ত মাটির মনে হয় সোনার মোহর’। এখন বোঝ বাপু, মাটির মোহর আর সোনার মোহর কোনটারে কয়!
সত্যিই তাই, আমার স্ত্রীকে এখন আমার মাটির মোহরই মনে হয়। তো যাক সে কথা, লোকমুখে আমার কবি পরিচিতি নামটাই আমার আসল পাওয়া। আমি ভীষণ উপভোগ করছিলুম। অফিস-আদালতের সবাই আমায় কবি বলে সম্বোধন করছিল। ক্ষমতায় অর্থবৃত্তে কোনোভাবেই বড়দের সমান ছিলাম না, সেই আমি কিনা অফিসের কালচারাল প্রোগ্রাম এখন কবি বলে কিছু বলার সুযোগ পাচ্ছিলাম। সবাই তো চায়, সবার সামনে একটু আলাদা হতে।

তো যাক…এবার কবি হিসেবে আমার আলাদা প্রাপ্তির বিষয়গুলো বলে নিই। কবি হবে অথচ তোমার কোনো নারীসংসর্গিক দোষ থাকবে না, তাই কী হয়Ñ সেই বুড়ো কবি একবার কথায় কথায় আমাদের আড্ডায় বলছিলেন। আমি হাঁ করে তার দিকে তাকিয়েছিলাম। তিনি উপদেশ দেওয়ার ভঙ্গিতে বলেছিলেন, শোনো হে, কবিদের জীবনে দু-একজন নারী আসতেই পারে। সেটা নিয়ে বিব্রত হইও না, বরং সবকিছুই উপভোগ করার চেষ্টা করো। উপভোগের দরকার আছে। হাজার হোক মন ভালো না হলে, মনের খোরাক না জুটলে কবিতা লিখবে কেমনে!! তো মনের খোরাক জোগাতে গিয়ে, নারীর সান্নিধ্যের ভেতর দিয়ে দেহের সীমা-পরিসীমাও যে যোগ হবে, সেটা আমার আগে জানা ছিল না। আমার সঙ্গে কবিতা নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে এক নারীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ঘটে গেল।

কবিতার বহুতর স্তর, সম্পর্কেরও তেমনি। মানুষ যখন যা ঘটাতে চায়, তার পেছনে দেখায় কারণ ও যৌক্তিক পরম্পরা। অঘটনের পেছনেও তার কোনো কারণের অভাব থাকে না। তেমনি আমি যা কিছু করছিলাম, মনে হচ্ছিল ঠিক করছিলাম। পূর্বের প্রেম, সংসার, স্ত্রী-কন্যা কোনো কিছুই ধর্তব্যের মধ্যে আনছিলাম না। বিবেক মাঝেমধ্যে চোখ ঠাওরাচ্ছিল, কিন্তু আমি পাত্তা দিচ্ছিলাম না। নিজের কবিত্বের জগতেই আবাহন করছিলাম। সরকারি-চাকরি-কবিতা-নারী সবকিছু মিলেই দারুণ চলছিল আমার। অবশ্য এসব করতে গিয়ে ব্যক্তিমানুষ হিসেবে আমার দারুণ কিছু অভিজ্ঞতা হচ্ছিল। যেমন যে নারীর স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয়, যে নারীর প্রেমিক চলে গেছে, যার সংসার ভালো লাগে না, যৌনজীবনে যে নারী সন্তুষ্ট নয়, এদের কার আচরণ কেমন, এরা কে কী শুনতে পছন্দ করে, আমি এখন তার সব বুঝতে পারি। আমি সেইমতো চলি, সেইমতো বলি, ফলে আমি লম্পট না হয়ে হয়ে উঠছি এক সিদ্ধি পুরুষ। নারীদের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আমার এখন আর যাওয়ার কোনো তাড়া নেই, কারণ এতদিনে আমি বুঝে গেছি, ‘হরেক রকম রং হলেও, আসল বিষয় এক।’

গল্পের ওপিঠ

বলো তুমি এই কাজটা কেন করেছিলে?
এমনি।
এমনি মানে?
ইচ্ছে হয়েছে তাই।
নিজের বান্ধবীর এত বড় ক্ষতি কেউ করে?
ওর ওটা পাওনা ছিল!
পাওনা মানে?
ওর অনেক কিছুই আমার সহ্য হচ্ছিল না।
মানে?
আপনি বুঝবেন না। তা ছাড়া..
তা ছাড়া..?
ও আমার বয়ফ্রেন্ডের দিকে হাত বাড়িয়েছিল।
তোমার বয়ফ্রেন্ড?
সে কারণেই তো ওকে একটা শিক্ষা দিতে হলো!
অফিসার আর কথা বাড়ান না। আদেশ দেন
চলো, আমাদের সঙ্গে তোমায় যেতে হবে।
বারো-তেরো বছরের মেয়েটি যখন ভাবলেশহীন মুখে উঠে দাঁড়ায়, বিস্মিত অফিসারের বিস্ময় আরও বেড়ে যায়। তিনি ভেবেই পান না, এত ছোট একটা মেয়ে, এত ভালো পরিবারের সন্তান…সে এমন একটা কাজ করল কীভাবে! একটা আইসিটি আইনে করা মামলার তদন্ত করতে এসে অফিসার এই বিস্ময়ের মুখোমুখি হন। বারো-তেরো বছরের এই মেয়েটিকে তিনি গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হচ্ছেন। মেয়েটির নিজের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির পর তার আর কিছুই করার থাকছে না। কিছুদিন আগে মেয়েটি তার ক্লাসমেট ও প্রিয় বান্ধবীর স্নানের ছবি গোপনে ধারণ করে নেটে ছেড়ে দেয়। সেই মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই মেয়েটিকে গ্রেপ্তার করতে হলো।
মেয়েটিকে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে পুলিশ-ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, তখন মেয়েটির মা কাঁদতে কাঁদতে বারবার পুলিশের হাতে-পায়ে ধরছিলেন। কিন্তু পুলিশের তখন কিছুই করার ছিল না। তাদের দায়িত্ব পালন করতেই হবে, বাকিটা কোর্টের ব্যাপার। পুলিশের সঙ্গে আসা ওয়ার্ড কমিশনারও অনুরোধ জানাচ্ছিলেন, এখানেই ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলা যায় না, ভাই। মেয়েটির বাবা… মানে উনি আমাদের এলাকার মানী লোক, কবিতা-টবিতাও লেখেন। তা ছাড়া এই পরিবারের মান-সম্মানেরও একটা ব্যাপার আছে।

অনুরোধ শুনে পুলিশ অফিসার ঘুরে দাঁড়ান, তারপর হতাশা মিশ্রিত স্বরে বলে ওঠেন, দেখুন ভাই, এখানে আরও একটা পরিবারের মান-সম্মান জড়িত। ওনাদের মেয়েটা তো সুইসাইড অ্যাটেম করেছিল। দুঃখিত, আমাদের যেতে দিন। ম্লানমুখে অফিসার তার নারী কলিগদের নির্দেশ দেন অভিযুক্ত মেয়েটিকে নিয়ে যেতে।
পুলিশের গাড়িটি যখন গলি থেকে বেরিয়ে পড়ে…তখন সত্যি সত্যিই এই বাড়ির একলা ঘরে একটি প্রকৃত কবিতা লেখা হতে থাকে। সে কবিতাটির নাম ‘এক বেদনার্ত পিতা…’

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

two + eleven =