গার্ড অব অনার, নারী কর্মকর্তাদের নিয়ে বিতর্কিত মতবাদ!

করেছে Sabiha Zaman

রোদসী ডেস্ক:  নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ আর পিছিয়ে নেই। দেশ পরিচালনা করছেন একজন নারী। দেশের উচ্চ পর্যায়ে শক্ত হাতে শাসন করছেন নারীরা। নিজের যোগ্যতা দিয়ে নারীরা সব কাজে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে, পালন করছে দায়িত্ব। আর সে দেশেই কিনা মুক্তিযোদ্ধাদের গার্ড অব অনার দেওয়ার সময়ে সরকারি নারী কর্মকর্তাদের বাদ রাখার বিষয়ে কথা তুলছে সংসদীয় একটি কমিটি।

মূল বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের সাংবিধানিক নীতিমালা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানিয়ে দাফন করা হয়। আর সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের ডিসি বা ইউএনওরা গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে গার্ড অব অনার দেওয়ার ক্ষেত্রে নারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিকল্প চায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। তারা এ সভার বিকল্প ব্যক্তি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে।

অনেক স্থানেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে নারী কর্মকর্তারা রয়েছেন। আর সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে কোনো মুক্তিযোদ্ধা মারা গেলে তারা গার্ড অব অনার দিয়ে থাকেন। এ নিয়েই সমস্যা দেখছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে ধর্মীয় এবং সামাজিক কারণ।
সংসদ ভবনে শাজাহান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির এ বৈঠকে অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, কমিটির সদস্য আওয়ামী লীগের রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, রাজিউদ্দিন আহমেদ, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, মোছলেম উদ্দিন আহমদ।
সুপারিশের বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোতে সংসদীয় কমিটির সভাপতি শাজাহান খান বলেন, ‘মহিলা ইউএনও গার্ড অব অনার দিতে গেলে স্থানীয় পর্যায়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন। মহিলারা তো জানাজায় থাকতে পারেন না। সে ক্ষেত্রে মহিলা গার্ড অব অনার দেন, এ রকম একটি ব্যাপার থেকেই এই কথার সূত্রপাত।’ অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বিবিসিকে বলেছেন, এ মুহূর্তে এমন প্রস্তাব তারা বিবেচনায় নিচ্ছেন না।

এ বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। ধর্মীয় নিয়ম অনুসারে জানাজায় কোনো নারী উপস্থিত থাকতে পারে না। আর সাধারণত জানাজার পর গার্ড অব অনার দেওয়া হয়ে থাকে। আর এ দুটি পুরোপুরি ভিন্ন বিষয়। গার্ড অব অনার তো জানাজার অংশ নয়, তাহলে কেন এ ধরনের লজ্জাজনক প্রস্তাব এল নারীর জন্য?

দেশের নারী সংগঠকেরা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি প্রস্তাবটিকে লজ্জাজনক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী মনে করছে। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নারী সংগঠক খুশী কবির বলেন, এটার সঙ্গে তো ধর্মের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। এটি তো সংবিধানের নিয়ম, রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান জানানোর কথা বলা হচ্ছে, এখানে নারী-পুরুষের বিষয় কী জন্য আসবে।
একজন নারী তার নিজের যোগ্যতা ও মেধার পরিচয় দিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব নেন। আমাদের সংবিধানে নারী-পুরুষকে আলাদা করে দেখা হয়নি, বরং দেওয়া হয়েছে সম-অধিকার। আর সেখানেই কিনা রাষ্ট্রীয় সম্মানের অংশ হিসেবে গার্ড অব অনার দেওয়ার সময় সরকারের নারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিয়ে আপত্তি। তাহলে আমরা নারীকে সমানভাবে দেখলাম কই। নারীর সম্মান আমরা কতটা দিচ্ছি, এটা ভাবতে হবে আমাদের। রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে নারীকে সরিয়ে দিয়ে আমরা কি নারীর যথাযথ সম্মান দিচ্ছি? হতেই পারে সবার চিন্তাধারা এক নয় কিন্তু রাষ্ট্রের উচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে এ ধরনের চিন্তা করতে পারেন। তারাই যদি এ মনোভাব প্রকাশ করেন, তবে নারীর অধিকার আমরা কোথায় পাব। একজন নারীকে কেন বারবার মনে করে দেওয়া হয় তুমি নারী, তবে কি আমরা মুখে বলছি এক আর মনে অন্য ধারণা লালন করছি?

ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের আটকে দেওয়ার চিন্তাধারার বদল আসবে কবে জানা নেই। তবে এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হয় ১৯৭২ সালের সংবিধানে যেখানে বাধা নেই, সেখানে কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নারী-পুরুষের ভেদাভেদ। তবে কি জানাজা আর গার্ড অব অনার এক জিনিস? উত্তর তো অবশ্যই না। দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় জেনেও এ ধরনের আপত্তি নারীর সম্মানের জন্য বিব্রতকর। একজন নারী হিসেবে আমার কাছে বিষয়টি খুব অসম্মানজক। একজন নারী যদি দেশ পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনে বাধা কেন।
একটা সময়ে তো নারীদের সমান অধিকার ছিল না, তারা সমানভাবে শিক্ষার সুযোগ পেত না। বাল্যবিবাহ ছিল সমাজের খুব পরিচিত ব্যাধি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে ভুল থেকে সঠিক পথে এসে নারী পেয়েছে তার অধিকার। আমাদের সংবিধানে নারী বা পুরুষ কাউকে আলাদাভাবে দেখা হয়নি। কিন্তু হুট করে এ আপত্তি যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। তবে কি সমাজের রক্ষণশীল নিয়মে আমরা নারীদের আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি তার স্থান নির্ধারিত। অন্তঃপুর থেকে মুক্তি মিলে গেলেও তোমাকে দেওয়া যাবে না গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ, সমাজের কিছু মানুষ তোমাকে সব অধিকারের শামিল করতে নারাজ।
স্বাধীনতার পর থেকেই সংবিধান অনুযায়ী সব স্তরে নারীকে দেওয়া হয়েছে সমান অধিকার। আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় রয়েছেন একজন নারী। তাই আশাবাদী বিভ্রান্তিকর এ প্রস্তাব কোনোভাবেই নারীর অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না। নারী এগিয়ে যাবে তার আপন শক্তিতে।
তথ্যসূত্র : বিভিন্ন গণমাধ্যম

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

13 − two =