ঘরবন্দি ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের ইতিবৃত্ত 

করেছে Sabiha Zaman

 

‘প্রেমের প্রদীপ শিখা চিরতরে জ্বলে, স্বর্গ থেকে আসে প্রেম স্বর্গে যায় চলে’

শাশ্বত এই প্রেমের উপলব্ধি সৃষ্টির শুরুর লগ্ন থেকেই ছিল, যুগে যুগে নর-নারী পরস্পরের প্রতি প্রেমময় বোধ নিয়ে পথ চলছে, যা খুবই সাবলীলতার বহিঃপ্রকাশ। সময়ের ভিন্নতায় মানুষের মধ্যে উপলব্ধির প্রকাশ ঘটেছে ভিন্নভাবে, কেউ সঙ্গীর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে বেছে নিয়েছে কবুতর, তার পায়ে চিঠি লিখে বেঁধে উড়িয়ে দিয়েছে আকাশে, প্রিয়তমার হাতে ঠিকই পৌঁছে গেছে সেই বার্তা, এরপর এল ডাক বিভাগ; ডাকপিয়ন বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দিয়েছে ভালোবাসার লাল গোলাপ আঁটা নীল খাম চিঠি।
যুগের প্রয়োজনে ইন্টারনেট এখন ছেয়ে গেছে পৃথিবীর সর্বত্র; ই-মেইল বা মেসেঞ্জারের মধ্য দিয়ে মানুষ প্রকাশ করছে তাদের নিজস্ব অনুভ‚তি। শুধু একটি ইমোজি প্রকাশ করলেই বোঝানো যাচ্ছে মনের ভেতরে গুপ্ত হয়ে থাকা সব ভাষা, এমন আধুনিক সময়ে হঠৎ কোভিড-১৯-এর উপদ্রব স্বাভাবিক জীবনচলাকে একেবারেই অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। ডড়ৎশ ভৎড়স যড়সব, য়ঁধৎধহঃধরহব, খড়পশ ফড়হি–এমন সব অজানা শব্দের সঙ্গে অভ্যস্ত হচ্ছে জনপদ।

আগে যে কাজটি মানুষ করত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বিচরণ করে; এখন তা অনায়াসেই করতে পারছে ঘরে বসে ডিভাইসের মাধ্যমে। এতে সময় বেঁচে যাচ্ছে বেশ। পারস্পরিক অনুভ‚তি প্রকাশে এসেছে ভিন্নতা, যে পুরুষ ভালোবাসার কথা প্রিয়তমার চোখে চোখ রেখে বলতে দ্বিধাবোধ করে, সে-ও অবলীলায় বলে ফেলছে তার মনের কথা। মোবাইল বা ল্যাপটপের মধ্য দিয়ে নর-নারী নিজেদের দেখতে পাচ্ছে একটা বাক্সের ভেতর ইথার পদ্ধতিতে, কোনোরকম রেস্টুরেন্ট বিল গুনতে হচ্ছে না বা পার্কে বসে উটকো লোকের যন্ত্রণাও সহ্য করতে হচ্ছে না।


অফলাইনে পছন্দের মানুষের সঙ্গে দেখা করার জন্য সশরীর দেখা করার সময় অফিস কামাই দিয়ে ট্র্যাফিক জ্যাম উপেক্ষা করে উপস্থিত হতে হয় কিন্তু অনলাইনে সেই ঝক্কি নেই। কেউ যদি ঠিক সময়ে উপস্থিত না হয়, তবে অভিমানের যে সূত্র রচিত হয়, সেই সম্ভাবনাও থাকে না অনলাইনের প্রেমিক-প্রেমিকা যুগলের। বলা যায়, খুব স্বাচ্ছন্দ্যে সময় বাঁচিয়ে বেশ সস্তায় এখন অনলাইন ডেট সেরে নেওয়া যাচ্ছে।
তা ছাড়া প্রিয় মানুষের কাছে উপহার পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনলাইন কেনাকাটার ওয়েবসাইটগুলো দারুণ সব পসরা সাজিয়ে রেখেছে ক্রেতাদের জন্য। সব মিলিয়ে অনলাইন সম্পর্ক মানুষের চাহিদা অনেকটাই পূরণ করে দিচ্ছে কেবল শারীরিক স্পর্শ ছাড়া, যেটা অবশ্যই নিরাপদ।
তবে অনলাইনে সম্পর্ক দীর্ঘায়িত করা বেশ ধৈর্যের ব্যাপার, যে মানুষটিকে তুমি এতকাল গøাসে বন্দী দেখে আসছ, তাকে সামনাসামনি দেখার পর হয়তো প্রথম ভালোলাগার অনুভ‚তিটা আর তোমার মধ্যে কাজ না-ও করতে পারে। তাই শুধু ছবি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া একেবারেই ঠিক নয়, যা অনলাইনে প্রেমের ক্ষেত্রে প্রায়ই ঘটে থাকে। আর একটি বড় প্রশ্নবোধক অবস্থা হচ্ছে নর-নারীর বয়স, বেশির ভাগ ইউজার তাদের সঠিক জন্মসাল উল্লেখ করে না, তাই আন্দাজ করে নিতে হয় তাদের অরিজিনাল বয়স। এখানে যাচাই করার কোনো সুযোগ থাকে না। অপরিচিত গন্ডির মধ্যে হলে তার এসএসসি সাল হিসাব করে তোমাকে আইডিয়া করে নিতে হবে, ভেরিফিকেশনের কোনো সুযোগ নেই এ ক্ষেত্রে।

অনলাইনে পরিচয় কিন্তু অফলাইনে দেখা করতে গিয়েও অনেক সময় বিপত্তিতে পড়েছে অনেক নর-নারী, ছেলে প্রোফাইল ইউজার অবশেষে নারী বা নারী সেজে কোনো পুরুষ আবিভর্‚ত হয়েছে। অনেকে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছে, অনেক ক্ষেত্রে বেশি হেনস্তা হয় নারীরা; ফেসবুকে ভুয়া আইডি ব্যবহার করে নারীর নগ্ন শরীরের দৃশ্য ভিডিও করে আপলোড দিয়ে ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও শোনা যায় অনেক ক্ষেত্রে।
অনলাইনে প্রেমের সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে কারও পারিবারিক অবস্থা বোঝা না যাওয়া, অপর প্রান্তে মানুষটি বিবাহিত নাকি ডিভোর্সড, এটা ঠিকভাবে প্রকাশ করে না অনেকেই। একই সঙ্গে একাধিক আইডি দিয়ে অনেকগুলো সম্পর্ক গড়ে তোলে অনেক অসুস্থ চিন্তার মানুষ। তাই পরিস্থিতি যতই বিপরীতমুখী হোক কাউকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করাটা বোকামি।

ইন্টারনেট প্রতারণা শিকার এক নারী বলেছে, ‘ইন্টারনেটের প্রতি আমার গভীর আস্থাহীনতা রয়েছে এবং মনে হয় এটি প্রতারণাকে উৎসাহ দিচ্ছে। আমার প্রাক্তন স্বামী অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির ছিলেন। কিন্তু অনলাইনে তিনি প্রচÐ আত্মবিশ্বাসী আচরণ করতেন এবং সহজেই অন্য নারীদের আকৃষ্ট করতে পারতেন।’ সে আরও বলেছে, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ইন্টারনেট ছাড়া তিনি এতগুলো প্রেমের সম্পর্ক করতে পারতেন না।’
২০ থেকে ৭৩ বছর বয়সীদের নিয়ে করা জরিপভিত্তিক এক গবেষণা প্রমাণ করে যে বেশির ভাগ অংশগ্রহণকারীই মনে করে, ইন্টারনেট প্রতারণার আশঙ্কা বাড়ায়।

করোনাভাইরাসের টিকা চলে এসেছে, এই ভাইরাস অত সহজে নির্মূল করা সম্ভব নয়। পৃথিবী থেকে এই মন্দাভাব এত সহজে আর যাচ্ছে না, মানুষ দিনে দিনে আরও নেট নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মানুষ প্রেমে পড়বে, একে অপরকে ভালোবাসবে এটাই সত্য। প্রেম মানুষের নিত্য চাহিদার অন্যতম একটি, তাই ঘরবন্দি থেকে অনলাইনের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে পছন্দের মানুষটির ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করো, তার দেওয়া তথ্য যাচাই করে নাও। মনে রাখবে, স্ক্রিনের সামনে সবাই খুব মিষ্টি করে কথা বলে, পছন্দের ব্যক্তিকে একটু বেশি সময় দাও তাহলেই তার ভেতরের আমিত্বকে তুমি অনায়াসে বের করে নিয়ে আসতে পারবে। তুমি সচেতন থাকলেই অনলাইনে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব, এ জন্য নেট ব্যবহার আয়ত্তে নিতে হবে। ঘরে বসে ইউটিউবে বেশ কিছু অনলাইন সাইটের টিউটোরিয়াল দেখে নিতে পারো, যা তোমাকে পরবর্তী সময়ে ডেটিং সাইটগুলো চালাতে সাহায্য করবে। মনে রাখবে, তুমি নিজেকে দক্ষ করলেই একটি সুষ্ঠু সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে দক্ষতা অর্জন করবে।

লেখা : রোদেলা নীলা

গল্পকার ও নাগরিক সাংবাদিক

ছবি : সংগৃহীত

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

sixteen + 19 =