ঘরবন্দী জীবনে প্যারেন্টিং যেমন

করেছে Tania Akter

করোনার কারণে আবারও যদি সবাই ঘরবন্দী হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে বাবা-মা কীভাবে সন্তানদের নতুন পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত হতে ও সময় কাটাতে সহায়তা করতে পারবে, তা নিয়ে  কিছু পরামর্শ দিয়েছেন সাইকোলজিস্ট সুরাইয়া ইসলাম মুন্নি

 

দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কোভিড-১৯ বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশে সব বয়সী মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করেছে। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভীতি, লকডাউন, অর্থনৈতিক সমস্যা, বেকারত্ব, চাকরি হারানো, স্কুল বন্ধ, যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ ইত্যাদির প্রভাব সরাসরি পরিবারের বড় ও ছোটদের ভেতরে নেতিবাচক অনুভূতি ও চিন্তা তৈরি করেছে। বর্তমানে হঠাৎ করে দেশে করোনা বেড়ে যাওয়ায় অনেকের ভেতরে পুরোনো দুশ্চিন্তা, ভয়, হতাশা ফিরে এসেছে। অনেকেই দুশ্চিন্তায় আছে, হয়তোবা আবারও লকডাউন হতে পারে! আবারও যদি সবাই ঘরবন্দী হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে বাবা-মা কীভাবে সন্তানদের নতুন পরিস্থিতিতে অভ্যস্ত হতে ও সময় কাটাতে সহায়তা করতে পারবে, তা নিয়ে রইলো কিছু পরামর্শ:

 

১. সন্তানদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা : আবারও করোনার সংক্রমণ রোধে ঘরবন্দী হওয়ার সম্ভাবনা আছে এই বিষয়টি নিয়ে সন্তানকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে। কোভিড-১৯ কী, কীভাবে ছড়ায় এবং রোগের বিস্তার রোধে কেন ঘরে থাকতে হবে, তা শিশুকে জানাতে হবে। শিশু কোনো প্রশ্ন করলে সঠিক তথ্য সহজভাবে প্রদান করতে হবে। সন্তান ছোট হলে গল্পের মাধ্যমে বা ছবি এঁকে বোঝাতে পারো।

২. সঠিক তথ্য প্রদান : যেকোনো দুর্যোগময় সময়ে ভুল তথ্য ছড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই সন্তান যদি কোনো তথ্য শুনে ভয় পায় বা বিভ্রান্ত হয়, সে ক্ষেত্রে সন্তানকে বলুন, ‘আমি বুঝতে পারছি তুমি এই তথ্য শুনে ভয় পেয়েছ /বিভ্রান্ত হয়েছ। আসো একসাথে সঠিক তথ্যটি খুঁজে বের করি।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আইসিডিডিআরবির ওয়েবসাইট থেকে সহজেই কোভিড-১৯ সংক্রান্ত তথ্য পেয়ে যাবে।

৩. সন্তানের সঙ্গে তার অনুভূতি ও চিন্তা নিয়ে আলোচনা করো : সন্তানের ভেতরে কোভিড-১৯ বা ঘরবন্দী হওয়া নিয়ে নেতিবাচক অনুভূতি ও চিন্তা তৈরি হলে সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করো। সন্তানকে জানাও তুমি তার অনুভূতি বুঝতে পারছ। তুমি কোনো কিছু নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকলে সন্তানের সঙ্গে ও তোমার চিন্তাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে পারো। সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময় অন্য কারও সাথে কথা না বলে বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার না করে, সম্পূর্ণ মনোযোগ সন্তানকে দাও।

 

৪. কাজের জায়গা নির্দিষ্ট করতে হবে : ঘরবন্দী হওয়ার নির্দেশনা এলে হয়তোবা আবারও সবাইকে ঘর থেকে অফিসের কাজ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে বাসায় কাজের জায়গাটি নির্দিষ্ট করে নিতে হবে। সন্তানদের জানাতে হবে কাজের সময় তারা যেন সেখানে উপস্থিত না থাকে। প্রয়োজনে দরজা বন্ধ করে রাখতে হবে। এরপরও যদি সন্তান মনোযোগ চায়, তার কাছে জেনে নিতে হবে সে কোনো কিছু জানাতে চায় কি না বা কোনো কিছু জিজ্ঞেস করতে চায় কি না। এমনও হতে পারে সন্তান জরুরি কিছু বলতে চায়। তাই তার ডাকে সাড়া দিতে হবে। জরুরি কিছু না হলে সন্তান তোমাকে মিস করতে পারে। তাই তুমি ব্যস্ত হলেও সন্তানকে ব্যস্ততার কথা জানাও এবং কাজ কখন শেষ হতে পারে, তার সম্ভাব্য সময় বলে দাও।

 

 

 

৫. রুটিন তৈরি : সন্তান ও নিজের জন্য প্রতিদিনের রুটিন তৈরি করে ফেলতে হবে ও তা মেনে চলতে হবে। সন্তানের রুটিন তৈরি করতে সন্তানের মতামত নিতে পারো। সন্তানের মতামত নিলে সন্তান রুটিন মেনে চলতে আগ্রহবোধ করবে। দ্রুত রুটিন পরিবর্তন করবে না। প্রতিদিনের একি রুটিন মেনে চললে সন্তান নিশ্চয়তা বোধ করে। রুটিন তৈরিতে সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে করতে পারবে এমন কিছু কাজ রাখো। যেমন একসঙ্গে খাবার খাওয়া, বই পড়া, রান্না করা, গাছে পানি দেওয়া ইত্যাদি।

৬. সন্তানকে বয়স অনুযায়ী ঘরের বিভিন্ন কাজ করতে দাও। প্রথমে শিশুর সামনে নিজে কাজটি করবে। কীভাবে কাজটি করতে হয় শিশু তা দেখবে, পরে শিশু নিজে ও কাজটি করার চেষ্টা করবে। এর ফলে সন্তান আত্মনির্ভরশীল হবে ও তার আত্মবিশ্বাস বাড়বে।

৭. স্কুল বা অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন না হলে, এই সময়টিতে বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে আরও বেশি কোয়ালিটি টাইম কাটানোর সময় পাবে। বিভিন্ন বয়সের সন্তানের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম কাটানোর জন্য যা করতে পারো।
ছোট শিশুর (জন্ম থেকে চার বছর) সঙ্গে যেভাবে সময় কাটাতে পারো, শিশু মুখে যেসব শব্দ (সাউন্ড) করবে বা যে কথাগুলো বলবে তা অনুকরণ করে বলা, গান বা ছড়া শোনানো, মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করে শব্দ করা (ঝুনঝুনি, খেলনা গিটার, ড্রাম), ব্লক বা কাপ রং বা আকার অনুযায়ী সাজানো, শিশুকে ছবির বই দেখানো এবং গল্প পড়ে শোনানো।

বড় শিশুর (৫ থেকে ১২ বছর) সঙ্গে যেভাবে সময় কাটানো যেতে পারে : ছবিসহ বই পড়ে শোনানো, রং দিয়ে ছবি আঁকানো, গান গাওয়া বা নাচা, ঘরের কাজ করা; এবং স্কুলের পড়া ও লেখায় সহায়তা করা।

কিশোর-কিশোরীর (১৩ থেকে ১৯) সঙ্গে যেভাবে সময় কাটাতে পারো : সন্তানের আগ্রহের বিষয় নিয়ে গল্প করা (খেলাধুলা, গান, শখ বা বন্ধুবান্ধব), ঘরের কাজ করা (রান্না), ঘরে খেলা যায় এমন খেলা খেলতে পারো (লুডু, দাবা) এবং এক্সারসাইজ করা।

৮. সন্তানকে ভয় দেখানোর জন্য বা মজা করার জন্য সন্তানের কোভিড হয়েছে বা তোমার কোভিড হয়েছে এমন তথ্য সন্তানকে দেবে না। যেমন সন্তান হাঁচি কাশি দিলে তাকে ‘তোমার তো কোভিড হয়েছে’। এমন তথ্য না দেওয়া। এ ধরনের তথ্য সন্তানের ভেতরে ভীতি তৈরি করবে, যা সন্তানের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

৯. সন্তান স্কুলপড়ুয়া হলে সন্তানের একাকিত্ব কমাতে তাকে ভিডিও কল বা অডিও কলের মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে উৎসাহিত করতে পারো। এ ছাড়া আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে একইভাবে যোগাযোগ রাখতে পারো।

১০. কোনো প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাওয়ার সময় সন্তানকে জানিয়ে যেতে হবে। সন্তানকে জানাও তুমি কোথায় যাচ্ছ, কখন ফিরে আসবে এবং নিরাপত্তার জন্য তুমি কী ব্যবস্থা নিয়েছ (মাস্ক পরা, হ্যান্ডস্যানিটাইজার সঙ্গে রাখা, ইত্যাদি)।

১১. করোনাকালে অনেক পরিবার আর্থিক টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছ। এসব ক্ষেত্রে পারিবারিক বাজেট তৈরিতে কিশোর-কিশোরী সন্তানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সন্তান বাজেট তৈরিতে অংশগ্রহণ করে জানতে পারবে, সবারই কষ্টকর সময়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ ছাড়া তারা তাদের চাহিদা ও টাকার পরিমাণ হিসাব করে খরচ করা শিখতে পারবে।

১২. মনে করার চেষ্টা করো শেষ লকডাউনে কোন কোন ইতিবাচক কাজের মাধ্যমে তোমার সন্তানদের ব্যস্ত রেখেছিলে। একই কাজগুলো আবার অনুকরণ করতে পারো। শেষ বিধিনিষেধে যে বিষয়গুলো নিয়ে সন্তানসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, তার সম্ভাব্য সমাধানগুলো ভেবে রাখতে হবে। প্রয়োজনে বিষয়গুলো এড়িয়ে চলতে হবে।

১৩. সন্তানকে ভালো রাখতে একজন বাবা-মায়ের সবার আগে নিজের যত্ন নিতে হবে। তাই নিজের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতায় নিয়ম মেনে চলো। শারীরিক সুস্থতায় সঠিক সময়ে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পরিমিত পানি পান করা, পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। মানসিক সুস্থতায় প্রতিদিন নিজের পছন্দের কোনো একটি কাজ করো। যেমন বই পড়া, গান শোনা ইত্যাদি। মনকে শান্ত রাখতে ডিপ ব্রিদিং এক্সারসাইজ করতে পারো।

বিশেষ সতর্কতা : করোনাকালে অনেক শিশুই দীর্ঘ সময় নিয়ে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। ইন্টারনেট ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের নতুন ধরনের বিপদ তৈরি হয়েছে। যেমন সমবয়সী বা অপরিচিত মানুষ দ্বারা অনলাইনে বুলিং, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনলাইনে প্রকাশিত হওয়া, ক্ষতিকর কন্টেন্ট দেখা ও তা অনুকরণ করা (নির্যাতন, আত্মহত্যা), বয়স অনুপযোগী ভিডিও দেখা।

অনলাইনে সন্তানকে নিরাপদ রাখতে বাবা-মা যা করতে পারে

১. ইন্টারনেটে ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ সেট করা,
২. ইন্টারনেট ব্যবহারের ইতিহাস চেক করা,
৩. ব্রাউজারে ‘সেফ সার্চ’ অপশনটি অ্যাকটিভ রাখা,
৪. যে সময়গুলোতে ওয়েবক্যাম ব্যবহার করা হবে না, সে সময়গুলোতে ওয়েবক্যাম ঢেকে রাখা,
৫. সন্তানের সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষতিকর দিকগুলো এবং কীভাবে সন্তান অনলাইনে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারবে তা নিয়ে আলোচনা করো।

সন্তানের কোভিড হলে সে ক্ষেত্রে বাবা-মা স্বাস্থ্যবিধি নিয়ম মানা ছাড়া আরও যা করতে পারো

১. কোভিডে সন্তান বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভোগে, তাই চেষ্টা করো সন্তান যে ঘরটিতে আইসোলেশনে থাকবে, তা যেন আরামদায়ক ও সাজানো হয়।

২. সন্তানের যেসব কাজ বা খেলা পছন্দ, তা আইসোলেশন রুমে রাখার চেষ্টা করো। যেমন বই, রং, কাগজ, ক্রাফটের জিনিসপত্র, গান শোনার যন্ত্রাদি, পাজল, ইত্যাদি।

৩. সন্তানের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে মাস্ক পরে কথা বলো। তার কী কী প্রয়োজন জেনে নাও। সন্তানের কারণে অন্যদেরও কোভিড হতে পারে, এ ধরনের হতাশাজনক কথা বলা থেকে বিরত থাকো।

 

সাইকোলজিস্ট,  সুরাইয়া ইসলাম মুন্নি

ছবি: সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

two − one =