চল্লিশের বিষণ্নতা

করেছে Wazedur Rahman

বয়স হওয়া মানেই কিন্তু বুড়িয়ে যাওয়া নয়। নয় জীবনের ফুলস্টপ। বরং এই চল্লিশ থেকেই শুরু হয় জীবনের এক নতুন অধ্যায়। আত্মবিশ্বাস ধরে রেখে আর এই ধাপে ধাপে পরিবর্তিত আমিকে ভালোবেসে শুরু করতে হবে নতুন জার্নি। আর এই জার্নি যে খুব কঠিন তা-ও কিন্তু নয়। শুধু নিজেকে একটু গুছিয়ে নেওয়া। নানা কারণে মনে বাসা বাঁধা বিষণ্নতাকে বাই বাই জানানোর সময়ও এটা।

সময়কে ধরে রাখা যায় না। মনে হয় এই তো কিছুদিন আগে খুব সুন্দর করে সেজেগুজে ঝলমলে হয়ে কলেজ অথবা ভার্সিটি ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়িয়েছ। নিজেকে প্যাম্পার করতে যেমন সময় ব্যয় করেছ, তেমনি মানুষের সুন্দর কমপ্লিমেন্টও পেয়েছ। কিন্তু এখন আয়নার সামনে দাঁড়ালেই কেমন যেন মনটা ভরতে চায় না নিজেকে দেখে। সহজেই চোখে পড়ে চোখের নিচে, ঠোঁটের কোনায় হালকা বলিরেখা। চুলেও দেখা দিয়েছে রুপালি রেখা।

মাঝেমধ্যেই হাড়ের মধ্যে ব্যথা, ঘুমের সমস্যা, ভুলে যাওয়া, মেজাজ খিটখিটে হওয়া অর্থাৎ ‘সায়েন্স অব এজিং’ যেন দরজায় এসে কড়া নাড়ছে। সত্যিই কি তাহলে বয়সের কবলে পড়ে গেলে! এসব মনে হতেই একরাশ বিষাদ এসে ছেঁকে ধরে। আর যেসব কারণে এই চল্লিশ বছর বয়সে পা দিয়ে একজন মানুষ বিষণ্নতায় ভোগে তা হলো খুব কাছের মানুষটির চোখে নিজেকে আগের মতো লাগছে কি না এই চিন্তা। আর এটিই মনে হয় অন্য সব চিন্তার চেয়ে বেশি ভোগায়।

এই চল্লিশে এসে আরেকটি চিন্তা নিজেকে একটু একটু করে বিষণ্নতার দিকে ঠেলে দেয় তা হলো মেনোপজ। আমরা সবাই এই ডিজিটাল যুগে মেনোপজ সম্পর্কে কমবেশি অবগত। ঋতুস্রাব, যা প্রতি মাসের একটি রুটিন ছিল তা হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেলে মনে হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক যে আমি বুঝি শেষ! একদম বুড়িয়ে গেছি। আমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না। মেনোপজের সঙ্গে সঙ্গে হরমোনের যে বিশাল পরিবর্তন হয়, তা শরীরের ও মনের অনেক পরিবর্তন করে। এর মধ্যে চামড়ার চকচকে ভাব কমে যাওয়া, চুল পড়ে যাওয়া, অতিরিক্ত গরম বা শীত অনুভূত হওয়া, স্মরণশক্তি হ্রাস পাওয়া, শারীরিক চাহিদা কমে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে।

ইনসিকিউরিটি বোধ

পরিবারের কনিষ্ঠ কাউকে তার নিজের ব্যাপারে ব্যস্ত থাকতে দেখলেও এই বয়সে এসে নিজের গুরুত্ব নিয়ে মনে হাজারো চিন্তা আসে। এতদিন পরিবারে তোমার সিদ্ধান্তকেই সবাই শেষ সমাধান হিসেবে মেনে নিত। কিন্তু এখন মাঝেমধ্যে যখন সন্তানদের সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে হয় তখন নিজের জন্য একটা ইনসিকিউরিটি বোধ কাজ করে, যা থেকে জন্ম নেয় অবসাদ। আরেকটি ভয় এই বয়সী মানুষের মধ্যে খুব দেখা যায়, তা হলো অন্যের ওপর শারীরিক নির্ভরতা। অর্থাৎ মনে চিন্তা আসে বারবার যে এমন কোনো বড় অসুখ হবে না তো যে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হবে?

আরও কিছু সমস্যা

  • হাই ব্লাডপ্রেশার
  • ডায়াবেটিস
  • শ্বাসকষ্ট
  • হাড়ের গিঁটে গিঁটে ব্যথা

এগুলো খুবই কমন, তাই এই ভয় মনে আসাটাও খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এটাই তো জীবনের চিরন্তন সত্যি। কথায় আছে না, ‘চেঞ্জ ইজ দ্য অনলি কনস্ট্যান্ট ইন লাইফ।’ বয়সের সঙ্গে প্রকৃতির নিয়মে মানুষ বদলাবেই। আর এই প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া ‘আমিকে’ মেনে নিয়েই তো নতুন করে বাঁচতে শিখতে হবে।

প্রয়োজন নতুন রুটিন

নিজের চেহারায় যে পরিবর্তন এসেছে তাকে দেখে ভয় না পেয়ে, হতাশ না হয়ে বরং নিজের সৌন্দর্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। রুটিন করে আগের মতো নিজের ত্বকের যত্ন করা অর্থাৎ ক্লিনিং, টোনিং, ময়শ্চারাইজিং করা যাতে ত্বকের জেল্লা ফুটে ওঠে।

বয়স হয়েছে বলে পারলারে যাওয়া যাবে না, ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে তারা কী বলবে? এসব চিন্তাকে পাত্তা না দিয়ে মাসে একবার হলেও পারলারে যাও। সেখানে মুখের সঙ্গে সঙ্গে চুলেরও যত্ন নাও। হাত পায়ের যত্ন নাও। এভাবে নিজেকে প্যাম্পার করলে দেখবে তোমার সৌন্দর্য অবশ্যই বেরিয়ে আসবে। তোমাকে টিনএজারদের মতো না দেখাক সমস্যা নেই। কারণ, প্রত্যেক বয়সেরই একটি সৌন্দর্য আছে। তুমি সেটাকেই ঠিকমতো বহন করো। দেখবে হতাশা তোমার থেকে অনেক দূরে পালিয়ে গেছে। নিজের বয়সের ধরন অনুযায়ী সুন্দর পোশাক পরে তবেই বাইরে যাবে। এতে করে মানুষ ভালো কমপ্লিমেন্ট দেবে, যার ফলে তোমার সঙ্গে সঙ্গে তোমার সবচেয়ে কাছের মানুষটিও দেখবে ভালো বোধ করবে।

অনেক কিছু মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি

কার্যক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হতে পারে। ছেলেমেয়েরা নিজের ব্যাপারে নিজেই সিদ্ধান্ত নেবে, এ রকম সুযোগ করে দিলে ওরাও স্পেস পাবে। যার ফলে ওরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠবে। সন্তানদের ব্যস্ততা বাড়বেই। তাদেরও পৃথক সংসার হবে। এগুলোকে বুঝলেই আর নিজেকে নিয়ে একাকিত্ব বা ইনসিকিউরিটির চিন্তা আসবে না।

এই প্রযুক্তিনির্ভর যুগে মানুষ চাইলেই বয়স অনুযায়ী শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের ধারা, কী কী রোগ হতে পারে আর কীভাবে সেগুলো থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় তা সহজেই জানতে পারে। এগুলো সম্পর্কে জানলে আর হতাশা স্থান পাবে না। নিজের ওজনকে কমিয়ে ফেলে, মেনোপজের জন্য যে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হয় এগুলো সম্পর্কে জেনে সেগুলোকে মেনে নিলেই মনে হতাশা স্থান পাবে না।

জানতে হবে

নিয়মিত রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করে শরীরে কোনো অসুখ আছে কি না জানতে হবে। হার্টের সমস্যা, ডায়াবেটিসের সমস্যা ধরা পড়লে আগেভাগেই এগুলোর ব্যাপারে সচেতন হতে পারলে রোগের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। এর ফলে কারও ওপর বোঝা হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।

বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ না রেখে তাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে আড্ডা দিতে হবে। মাঝেমধ্যে বেড়াতে যেতে হবে। এতে মন প্রফুল্ল থাকবে। ভবিষ্যতের জন্য সুন্দরমতো সবকিছুর পরিকল্পনা করে রাখো। এই চল্লিশ বছর বয়সই হচ্ছে এই পরিকল্পনার জন্য আদর্শ সময়। এতে নিজের খুঁটি মজবুত থাকবে। আর তুমিও নিশ্চিন্ত থাকবে। নিজের খাওয়াদাওয়া অর্থাৎ ফ্যাটি খাবার এড়িয়ে চলা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, বয়স অনুযায়ী এক্সারসাইজ করা ও পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা এসব দিক ঠিক রাখলেও তুমি অনেক ভালো থাকবে।

তাই বয়স বাড়ুক আনন্দে। এক একটা বছর আসবে যাবে, সমৃদ্ধ হবে আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি। উন্নত হবে চেতনার স্তর। সেটাই কি বাড়তি পাওনা নয়?

লেখা: ডা. তানজিলা আল্-মিজান

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

12 + 10 =