চল্লিশ পেরোলে…

করেছে Rodoshee

চল্লিশ পেরিয়েও সুঠাম, সুস্থ, সুন্দর শরীর। না, কোনো ম্যাজিক মন্ত্রে নয়, বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে। জানালেন অভিজ্ঞ চিকিৎসক, ডায়েটিশিয়ান, ফিটনেস এক্সপার্ট।

_DSC1679

দেখতে দেখতে ত্রিশ পেরিয়ে তুমি এখন চল্লিশের কোঠায়। স্বামী, সন্তান, সংসার, ক্যারিয়ার নিয়ে পরিপূর্ণ জীবন। আরাম-আয়েশের আয়োজনে কোনো ত্রুটি নেই। বছরে দুবার হলিডে ট্রিপ, উইকএন্ডে পার্টি, গেট টুগেদার নিয়ে ভালোই আছো। কিন্তু এতসব কিছুর মধ্যে একটাই কাঁটা, তোমার স্ফীত হতে থাকা মধ্যপ্রদেশ কিংবা পিঠের কাছে জমা অতিরিক্ত মেদ। বিশ বছরের স্লিম-ট্রিম তুমি অনেক আগেই উধাও হয়েছ। ত্রিশের ফিটনেসও এখন আর নেই বললেই চলে। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া চেহারাটাকে অ্যাক্সেপ্ট করতে শিখেছ। কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওজন বাড়াটা যেন কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ব্যাপারটা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, মনে হয় পানি খেলেও ওজন বেড়ে যাবে! অথচ কয়েক বছর আগেও অনায়াসে দিনে দুটো মিষ্টি বা সপ্তাহে দুদিন কবজি ডুবিয়ে মাংস কষা খেতে। কই তখন তো ওজন বাড়ত না। আর এখন যেন কিছু খেলেই তা আঠার মতো গায়ে লেগে যায়। ভুঁড়ি, পিঠ, হাত, পা সব অংশই ফুলেফেঁপে ঢোল। আর এই নিয়ে তোমার হা-হুতাশের শেষ নেই। ওয়েট লস বই পড়া, এক্সারসাইজের ভিডিও দেখা, সকালে দৌড়ানো, বিকেলে সাঁতার, কিছুই বাদ দাওনি। কিন্তু মধ্যপ্রদেশ কিছুতেই বাগে আনতে পারছ না। ছেলেমেয়েও ইদানীং ওজন নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করছে। ফলে তুমিও হাল ছেড়ে দিয়ে আবার জাংক ফুডে মনোনিবেশ করছো। কিন্তু জানো কি, চল্লিশ বছরেও রোগা আর ফিট থাকা যায়। সলিউশন পাবে তোমার রান্নাঘরেই। আর তার সঙ্গে একটু রেগুলার এক্সারসাইজ করলেই কেল্লাফতে। তুমি কি খাচ্ছো, আর কখন খাচ্ছো এটাই তোমার গোপন মন্ত্র। মাসল মাস (শরীরের ক্যালরি বার্নিং টিস্যু) বাড়ানোর মোক্ষম দাওয়াই।
বয়সের সঙ্গে শরীরের বাহ্যিক পরিবর্তন যেমন হয়, তেমনই অভ্যন্তরীণ বদল হয়। ত্রিশ বছর বয়সের পর থেকে প্রায় প্রতিবছর একটু একটু করে মেটাবলিজম রিভাইভিং টিস্যুর ক্ষয় হয়। পঞ্চাশ বছরে এসে ক্ষয়ের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। আর এই মাসল মাসের ঘাটতি পূরণ করতেই শরীরে জমা হয় অতিরিক্ত মেদ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তোমার ভবিষ্যৎটাও এমন হবে। টাইট ডেনিম, বিশাল ভুঁড়ি, ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ যেন তোমার চল্লিশোর্ধ্ব জীবনকে বিপর্যস্ত করতে না পারে, তার জন্য দরকার একটু সতর্কতা। সঠিক খাওয়াদাওয়া ও এক্সারসাইজের কম্বিনেশন তোমাকে রাখবে একদম ফিট।

_DSC1655

ওবেসিটি, মেনোপজ এবং খাওয়াদাওয়া
আগেই বলেছি, সঠিক খাওয়াদাওয়া করলে ওজন শুধু নিয়ন্ত্রণেই রাখা যায় না, কমানোও যায়। ডায়েটে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফল, সবজি, হোল গ্রেন, পালসেস, লো ফ্যাট মিল্ক রাখলেই দেখবে তুমি কতটা তরতাজা অনুভব করছ। স্কিন ছাড়া চিকেন, মাছ খাওয়ার অভ্যাসও ওজন কমানোর জন্য ভালো। কী খাচ্ছো যতটা জরুরি, কখন খাচ্ছোও ততটাই জরুরি। আমরা প্রায় সবাই ব্রেকফাস্টে অল্প খেয়ে লাঞ্চে ভারী খাবার খাই। আবার বিকেলে চা-বিস্কুট পর্ব সেরে ডিনারে চর্ব-চূষ্য-লেহ্য-পেয়। এই দিনে দুবার ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাস কিন্তু ওজন বাড়ানোর ওস্তাদ। তাই দিনে ছটি ছোট মিল (অবশ্যই লো গ্লাইসেমিক) খাওয়ার চেষ্টা করো। এতে ক্ষিদে ক্ষিদে ভাবটাও নিয়ন্ত্রণে থাকে আর মেটাবলিক রেটও বেড়ে যায়। ফলে ওজন তাড়াতাড়ি কমে। জানি, অনেকের পক্ষেই নিজের রোজকার রুটিনটা চট করে চেঞ্জ করা সহজ নয়। কিন্তু ওজন কমাতে গেলে, সুস্থ থাকতে গেলে একটু তো করতেই হবে। আর ক্ষিদে নেই এই অজুহাতটা তো বহু পুরোনো। খিদে পেলে শিঙাড়া, পিৎজা খেতে যদি সময় নষ্ট না হয় তা হলে আম-, ফল খেতেও হবে না। আর যতটা পারো সিম্পল কার্বোহাইড্রেট থেকে নিজেকে দূরে রাখো। হোয়াইট ব্রেড, হোয়াইট রাইস, কেক, পেস্ট্রি, রুমালি রুটি, মিষ্টি যতই সুস্বাদু খাবার হোক না কেন, একটু কষ্ট করে জীবন থেকে ডিলিট করো। বেশি করে কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট যেমন ফল, সবজি, ডাল খাওয়া শুরু করো। জানি, বাঙালির ভাত ছাড়া চলে না, তাই পুরোপুরি ভাত ছেড়ে দিতে বলছি না। তবে হোয়াইট রাইস নয়, ব্রাউন বা রেড রাইস খাওয়া শুরু করো। এই অভ্যাসগুলো রপ্ত করতে পারলে লাইফটাইম ফিটনেস গ্যারান্টেড।

_DSC1687
রিনা হাসান, গৃহিণী। বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। বাইরে বেরোলে প্রায়ই তাকে শুনতে হয়, ভাবী আপনি তো বেশ মোটা হয়ে গেছেন। কে না চায় মেদহীন কমনীয় দেহের অধিকারী হতে! মোটা হয়ে গেছেন, মোটা মোটা লাগছে। এমন কথা শুনতে শুনতে একদিন তাই ঠিক করে ফেললেন তিনি ওজন কমিয়ে ফেলবেন। এই ভাবনায় কমিয়ে দিলেন খাওয়াদাওয়া। কিন্তু বেশি দিন এভাবে কম কম খেয়ে থাকাটা তার জন্য আর সম্ভব হলো না। শরীরটা খুব খারাপ হয়ে যেতে লাগল।

_DSC1616
এ ধরনের সমস্যা শুধু রুনা হাসানের নয়। আরও অনেক মানুষের। তারা হুটহাট ওজন কমাতে কম খেতে শুরু করেন তারপরই নানান শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকেন। আগের সমস্যাটা তো থেকেই যায় সঙ্গে যোগ হয় আরও কিছু সমস্যা, যা তার দৈহিক সৌন্দর্য নষ্ট করার পাশাপাশি শরীর অভ্যন্তরে দীর্ঘমেয়াদি একটা সমস্যা তৈরি করে স্বাস্থ্য নষ্ট করে।
এ নিয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, বর্তমান সময়ে ওজন বৃদ্ধি বিশেষত নারীদের জন্য এটি একটি বড় সমস্যা। দেহের চাহিদার অতিরিক্ত খাওয়া বিশেষ করে ফ্যাট, ক্যালসিয়াম ও ক্যালরিযুক্ত খাবার বেশি হলে দেহের ওজন বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়াও অতিরিক্ত আরাম-আয়েশ, শারীরিক পরিশ্রম কম হলে দেহে চর্বি জমে এবং ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকে।

_DSC1613
চর্বিজাতীয় খাবার যেমন মাখন, বাটার, তেল, গরু বা খাসির মাংস এগুলো থেকে দূরে থাকা ভালো হলেও এর যে প্রয়োজন নেই তা ঠিক নয়। শরীরের জন্য এগুলোও অপরিহার্য। কিন্তু তা নির্দিষ্ট পরিমাণে খেতে হবে। এর বেশি হলেই ওজন বেড়ে যায়। এ জন্য অনেক সময়ে দেখা যায়, ওজন কমাতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন অনেকে। এবং আগের মতোই খেতে থাকেন আর ওজনও বাড়তে থাকে। প্রথমে এ জন্য প্রয়োজন খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ সম্পর্কে সতেচন হওয়া। তারপর একটা ডায়েট চার্ট অনুসরণ করা। তাহলেই কেবল সফলভাবে ওজন কমানো সম্ভব।

_DSC1607
ওজন কমিয়ে মেদহীন ঝরঝরে স্বাস্থ্য পাওয়ার জন্য ডায়েট করা প্রসঙ্গে বারডেম হাসপাতালের সিনিয়র পুষ্টিবিদ আখতারুন নাহার আলো বলেন, ডায়েট সম্পর্কে সচেতন না হয়ে মানসিক প্রস্তুতি না নিয়ে হুট করেই খাওয়াদাওয়া কমিয়ে দেয় অনেকে। ফলে কিছুদিন পরে দেখা যায় সে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সারাক্ষণ মাথাব্যথা করছে শরীর খুব দুর্বল লাগছে, চুল পরে যাচ্ছে, নখ ভেঙে যাচ্ছে, ত্বকের স্বাভাবিক সজীবতা হারিয়ে কেমন খড়খড়ে ভাব চলে এসেছে। এবং মানসিকভাবেও অনেকে ভেঙে পড়েন। ফলে অনেকে শেষ পর্যন্ত এই কম খেয়ে ওজন কমানোর প্রসেস থেকে বেরিয়ে আসেন বাধ্য হয়ে। আবার অনেকে বেশি দিন যখন তখন, এটা-সেটা না খেয়েও থাকতে পারেন না বলেই ছেড়ে দেন। আখতারুন নাহার আলো মনে করেন, এগুলো কোনো কাজের কথা নয়। তার মতে, বুদ্ধিমানের কাজ হলো, প্রথমে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে দেহের বাড়তি ওজন কমানোর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া। শুরুতে প্রতিদিনের খাবার থেকে একটু একটু করে খাবার কমাতে হবে। এটা এমনভাবে করতে হবে যেন শরীর জানতে না পারে যে তাকে কম খাবার দেওয়া হচ্ছে। এতে শরীরের জন্য মানিয়ে নেওয়া সহজ হয় এবং শরীরও দ্রুত অভ্যস্ত হতে থাকে। সেই সঙ্গে বাড়তি মেদও কমতে থাকে। যেমন, একজন ব্যক্তি প্রতিদিন যেখানে তিনটি রুটি খেত, সেখানে সে ওজন কমানোর জন্য শুরুতে তখন আড়াইটি রুটি খাবে অথবা যে পরিমাণ ভাত সে খায় তার থেকে প্রতিদিন একমুঠো-দুমুঠো করে সরিয়ে রেখে বাকিটা খেয়ে নেবে। এতে শরীর এবং মন দুটোই অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং প্রশান্ত থাকে। এই যে প্রতিদিন একটু একটু করে কম খেতে শুরু করল এতে শরীর কষ্ট পাবে না আর ওজনও কমতে থাকবে। এ রকম ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে ডায়েটিং ছেড়ে দেওয়ার আর প্রয়োজনই হবে না কারও।
আর তাই যারা শরীরের বাড়তি ওজন কমাতে চাও তাদের জন্য একান্ত প্রয়োজন, ধৈর্য এবং দৃঢ় মানসিকতা এবং পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের নিবিড় সহযোগিতা। তাহলেই শারীরিক ফিটনেস ধরে রাখা সম্ভব হবে বয়স চল্লিশ পেরিয়ে পঞ্চাশ এমনকি ষাটেও!

_DSC1604
মেনোপজ
জীবনের অন্যান্য পর্যায়ের মতো মেনোপজও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেজ। আমরা যখন ছোট থাকি তখন যেমন গ্রোথ ও ডেভেলপমেন্টের জন্য আলাদা নিউট্রিশন দরকার হয়, তেমনি মেনোপজের সময় খাওয়াদাওয়া, এক্সারসাইজ, সাপ্লিমেন্ট একটু বেশি লাগে।
মেনোপজে জন্য আইডিয়াল ডায়েট ঠিক কী? এককথায় বলতে গেলে এর উত্তর হলো ফুড ডায়েট। হোল ফুড মানে তাজা ফল, সবজি , বাদাম, তিল, ডাল, সালাদ। আসলে এই সময়ে ডায়েটে ফাইটোইস্ট্রোজেন থাকা খুব দরকার। যেসব খাবারে ফাইটোইস্ট্রোজেন রয়েছে, সেগুলো হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির অল্টারনেটিভ হিসেবে কাজ করে।

বাড়িতে রোজ যে ডাল বা সবজি রান্না হয়, তার মধ্যে ১-২ টেবিল চামচ ফ্ল্যাক্সিসিড মেশাও। ফ্ল্যাক্সিসিডে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড আছে, যা হার্টের পক্ষে ভালো।

কফি, চকোলেট, চা, স্পাইসি খাবার এগুলো ট্রিগার ফুডের কাজ করে। এগুলো মেনোপজ-সংক্রান্ত সমস্যা আরও বাড়াতে পারে। সুতরাং এড়িয়ে চলো।

ওয়েট বিয়ারিং এক্সারসাইজ যেমন হাঁটতে পারলে ভালো হয়। এতে ফিট থাকবে আর ওজনও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

মেনোপজ হওয়া মানেই তোমার শরীরে অতিরিক্ত মেদ বাসা বাঁধবে এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। পিরিয়ড বন্ধ হলে ওজন বাড়ে এমন ধারণা ঠিক নয়। আসলে এই সময়ে ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি লেভেল একেবারে জিরো হয়ে যায়। আর খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো হয় না। এটাই ওজন বাড়ার মূল কারণ। তাই শুধু মেনোপজকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আসলে এই সময়ে যে এক্সট্রা অ্যাফোর্ট দিতে হবে, সেটা তোমাকে মেনে নিতে হবে। সেনসিবল ইটিং খুব জরুরি। আর সারা দিনে ১০ মিনিট এক্সারসাইজ করলে বাড়তি ব্যাগেজ ঝরিয়ে ফেলতে পারবে। এই সময়ে শরীরে চেঞ্জ দেখা দেয়। ইস্ট্রোজেন লেভেল কমে যায়, ফলে শরীরে নিজের মতো করে ফ্যাট রি-অর্গানাইজ করে। তাই হাত ও পা রোগা থাকলেও পেটে মেদ জমতে থাকে। অল্পতেই ক্লান্ত লাগে, জিমে যেতে ইচ্ছে করে না। তখন একটু স্বস্তির জন্য আমরা কমফোর্ট ফুটের দিকে ছুটে যাই। আসল কথা হলো মেনোপজ মানেই তরতর করে ওজন বেড়ে যাবে, সেটা যেমন ঠিক নয়, তেমনই এটাও বুঝতে হবে বডি প্রসেস স্লো ডাউন হয়ে যাচ্ছে, তাই আগের মতো সবকিছু পারফেক্ট হবে না। হেলদি মেনোপজের জন্য আগে থেকেই খাওয়াদাওয়ার দিকে নজর দিতে হবে। ডায়েটে কম ফ্যাট রাখো। দিনে চার-পাঁচবার হোল গ্রেন, দুবার প্রোটিন পোর্শান খাওয়ার চেষ্টা করো। স্নাকসে ড্রাই ফ্রুটস, বাদাম রাখো। ক্রেভিং হলে ফল খাও। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া এক্সারসাইজ করে নতুন অধ্যায়কে স্বাগত জানাও।

_DSC1602
হাড় ক্ষয়
ঢাকা সিটি ফিজিওথেরাপি হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও চিফ কনসালট্যান্ট ডা. এম ইয়াসিন আলী বলেন চল্লিশোর্ধ্ব নারীর ফিটনেস নষ্ট হওয়ার পেছনে আরও একটি বড় কারণ রয়েছে তা হলো অস্টিওপোরেসিস অস্থি ক্ষয় বা হাড়ের ক্ষয় রোগ। এটি এমন একটি অসুখ যার ফলে হাড়ের ঘনত্ব নির্দিষ্ট মাত্রায় কমে যাওয়ায় হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যায়। বিশ থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের মধ্যে হাড়ের পূর্ণাঙ্গ গঠন হয়ে থাকে। তারপর চল্লিশ বছরের পর থেকে হাড় তার ক্যালসিয়াম ও ফসফেট হারাতে থাকে, এর ফলে হাড়ের পরিবর্তন হয় এবং দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। নারীদের মেনোপজ পরবর্তী সময় থেকে পশ্চাশ বছর বয়েসে ১৫ ভাগ এবং সত্তর-আশি বছর বয়সে ৩০ ভাগ নারীর কোমরের বা নিতম্বের হাড় ভেঙে যায়। মূলত চল্লিশ বছর বয়স থেকেই এই হাড় ক্ষয়ের প্রবণতা শুরু হয়ে ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। মেনোপজ বন্ধ পরবর্তী নারীরা, যারা পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ করেন না, ব্যায়াম করেন না, যাদের ওজন কম, যাদের শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা কম এবং থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি, যেসব রোগে অনেক দিন শুয়ে থাকতে হয়, যেমন ব্রেনস্ট্রোক এই সকল সমস্যায় আক্রান্ত নারীরা এই নীরব ক্ষয়রোগ অস্টিওপোরেসিস রোগে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকেন। যদি শৈশব, কৈশোর বা যৌবনকালে অর্থাৎ বাড়ন্তকালে যখন হাড়ের বৃদ্ধি সাধন হয় তখন থেকেই সচেতনভাবে সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম গ্রহণ করেন তাহলে বয়স চল্লিশে এসেও এই সমস্যা থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব হবে।

_DSC1593
ফিটনেস ট্রেনিং
চল্লিশ বছর বয়সের পর অনেকেই জিমের দ্বারস্থ হন। কেউ হুজুগে, কেউবা বন্ধুদের কথা শুনে, কেউবা নিজেই বেশ মোটিভেটেড হয়। কিন্তু জিমে এক্সারসাইজ করার পর কি কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায়? ফল না পেয়ে অনেকেই কিছুদিন পর জিম ছেড়ে দেয়। অনেকেই আবার দিনের পর দিন একই এক্সারসাইজ করতে করতে বিরক্ত হয়, কেউ আবার আহত হয়ে জিমের প্রতি নিরাসক্ত হয়ে পড়ে। আসলে প্রত্যেক বয়সের তো একটা ধর্ম থাকে। সে ক্ষেত্রে যারা কোনো দিনও জিমে যায়নি, তাদের প্রথম প্রথম শ্যুট না করতেই পারে। আর এই জন্যই আছে কেটলবেল ট্রেনিং। দেখো এত বছর তুমি জিমের ধারেকাছেও তুমি যাওনি। এর মধ্যে যদি শরীরকে অতিরিক্ত খাটাতে হয় তাহলে চোট লাগতে বাধ্য। আর এখানে শুধু ওয়েট ট্রেনিংয়ের কথা বলা হচ্ছে না। ট্রেডমিলে সামান্য দৌড়ালেও জয়েন্টে চাপ পড়ে। তাই ওজন কমানোর আগে ফোকাস করা উচিত মোবিলিটির উপর। আর এখানেই আসে কেটলবেস গবলেট এক্সারসাইজ। কেটলবেল দুহাতে ধরে উবু হয়ে বসো। এমনভাবে বসো যেন তোমার নিতম্ব মাটি থেকে বেশ কিছুটা উপরে থাকে। দুইহাতের কনুই দুই হাটুর উপর রাখো। কেটলবেল তোমার হাতের তালুর মাঝখানে রাখবে। যদি দেখো এই পুরো বিষয়টি তুমি করতে পারছ না তাহলে বুঝতে হবে গোড়ালি আর নিম্নাংশ বেশ স্টিফ হয়ে আছে এবং আগে সচলতার উপর জোর দিতে হবে। এবার প্রশ্ন করতেই পারো যে কীভাবে বুঝবে তুমি কতটা সচল? এর সহজ উত্তর ওভারহেড স্কোয়াট। দুহাতের মধ্যে লাঠি নিয়ে কানের পাশ দিয়ে উপরে তোলো। লাঠি মাথার উপরে থাকা অবস্থায় স্কোয়াট করো। যদি পুরোপুরি স্কোয়াট করতে পারো, তাহলে বুঝবে তুমি কেটলবেল ট্রেনিংয়ের জন্য পুরোপুরি তৈরি। আর না হলে গোড়ালির মোবিলিটি বাড়ানোর জন্য অন্য এক্সারসাইজ করতে হবে। এবার আসি কেটলবেল ট্রেনিংয়ের কথায়। শুরু করো কেটলবেল ডেডলিফ্ট দিয়ে। তারপর সুইং। সুইং একবার আয়ত্তে আনতে পারলে জানবে আর কোনো দিনও মোটা হবে না! এক মিনিটে প্রায় ২০ ক্যালরি বার্ন করতে পারে সুইং। মাত্র কয়েক সপ্তাহেই লাভ হ্যান্ডেল দূর হয়ে যাবে। আর মনে রাখবে এক্সারসাইজ করার সময় কিছু শর্ত মানা জরুরি। বিশেষ করে তোমার বয়স যদি চল্লিশ ছুঁই ছুঁই হয় বা চল্লিশের ঊর্ধ্বে হয়। প্রথমেই আসবে ডায়েটের কথা। আগেও বলেছি এই ডায়েটের প্ল্যান ছাড়া শুধু ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক্সারসাইজ করে কোনো লাভ হবে না। আর হ্যাঁ, এক্সারসাইজ করার সময় নিজের সীমা সম্পর্কে জানা থাকা ভালো। অতিরিক্ত উৎসাহে রোজ দীর্ঘক্ষণ এক্সারসাইজ করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

_DSC1568
মূলত নারীদের ফিটনেস ধরে রাখতে ছোটবেলা থেকেই সচেতন হওয়া জরুরি। সেটা সম্ভব না হলে বয়স আঠারো থেকে নিজের প্রতি যতœশীল হওয়াটা অবশ্যই প্রয়োজন। অথচ আমাদের সমাজে এ ধরনের সচেতনতা খুবই কম থাকায় দেখা যাচ্ছে চল্লিশ পেরোনোর আগেই একজন নারী তার ফিটনেস হারিয়ে ফেলে। এগুলোই শুধু একজন নারীর ফিটনেস হারানোর কারণ নয়। পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক অবস্থা, টেনশন, ঘরসংসার, ছেলেমেয়ে সামলে অফিস ইত্যাদির অতিরিক্ত পরিশ্রম, নিজের প্রতি যত্ন না নেওয়া, নিজের প্রতি ভালোবাসার অভাববোধ করা, ঘরসংসারের বাইরে আত্মীয়পরিজন, বন্ধুবান্ধব থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া, বিনোদনের অভাব, অতিরিক্ত স্থূলতা, ওজন কম, অনিয়ম, ধূমপান, অ্যালকোহল আসক্তি, পর্যাপ্ত না ঘুমানো, গর্ভকালীন সময়ে ওজন বেড়ে যায় এবং সন্তান জন্মদানের পরে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না করা ইত্যাদিও প্রকাশ্য অথবা গুপ্তঘাতক হিসেবে শারীরিক ফিটনেস ধ্বংস করে থাকে।
তাই ডা. ইয়াসিন জোর দিতে বলেন ব্যায়ামের ওপর। কেননা, ব্যায়াম হাড়ের ক্ষয়রোধ করে, শরীরকে সতেজ ও সবল রাখে, মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়, কর্মস্পৃহা তৈরি করে, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়, শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক হয়, মাংসপেশির শক্তি ও দৃঢ়তা বৃদ্ধি পায়, হৃৎপিণ্ডকে শক্তিশালী করে, শরীরের জয়েন্টগুলোকে সচল রাখে ও রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায়। অতিরিক্ত ওজন ঝরাতে সহায়ক, শরীরে একপ্রকার ফিটনেস আসে যা দৈহিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে দেহকে তারুণ্যদীপ্ত করে তোলে। প্রতিদিন ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটা, জয়েন্টগুলোর নাড়াচাড়া, সাঁতার কাটা, সাইক্লিং, ইয়োগা, কায়িক পরিশ্রম, পেশির নাড়াচাড়া হয় এমন কাজ বা ব্যায়াম চল্লিশোর্ধ্ব নারীকেও তার কাজেকর্মে, মননে, সংসারে, মানসিক স্থিরতায় ফিট রাখবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় স্বতঃস্ফূর্ত রাখবে। চল্লিশ নয়, পঞ্চাশ-ষাট পেরিয়েও একজন নারী হয়ে উঠতে পারবে সুস্থতার প্রতীক। প্রত্যেক মানুষেরই প্রমথ চৌধুরীর সেই বিখ্যাত উক্তি মনে রাখা প্রয়োজন ‘ব্যাধি সংক্রামক, কিন্তু স্বাস্থ্য সংক্রামক নয়’।

_DSC1564
সার্জারি ওয়েটলেস
চল্লিশের পরে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন দেখা যায়। মেটাবলিজম রেট স্লো হয়ে যাওয়ায় শরীরে বাড়তি মেদ জমতে শুরু করে। বিশেষভাবে হিপ ও পেটের অংশে। ইস্ট্রোজেন লেভেল কমে যাওয়ায় ব্লাড ভেসলসে ফ্যাট ডিপোজিট শুরু হয়। সেই কারণে চল্লিশ বছরের পরে মহিলাদের হার্টের অসুখের প্রবণতা বেশি। ওবেসিটির সঙ্গে হাড় দুর্বল হয়ে যায়। শিরদাঁড়া ও হাঁটুতে ব্যথার সমস্যা বেড়ে যায়। ব্যথার কারণে বেশি হাঁটাচলা ও এক্সারসাইজ না করার কারণে আবার ওজন বাড়তে থাকে। মেটাবলিজম রেট কমে যাওয়া, ইস্ট্রোজেন ও গ্রাথ হরমোনের লেভেল কমে যাওয়ার কারণে ওবেসিটি দেখা দেয়। এর ফলে আবার ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। ওবেসিটির সঙ্গে আবার অন্য কতগুলো অসুখ হওয়ার চান্স বেড়ে যায়, যেমন হার্ট ডিজিজ, ক্যানসার, আর্থ্রাইটিস, স্লিপ অ্যাপনিয়া ইত্যাদি। তাই শুরু থেকে কতগুলো ব্যাপার মেনে চললে ভালো হয়।

স্মোকিং এড়িয়ে চলো বা একেবারে বন্ধ করে দাও।

ওবেসিটি নিয়ন্ত্রণে রাখো।

এক্সারসাইজ করো।

লো স্যাচুরেচেড ফ্যাট ও হাই ফাইবার ফুড খাওয়া দরকার।

অনেকে এ পদ্ধতিগুলো মেনে ওজন কমাতে পারো, কিন্তু অনেকের পক্ষেই তা সম্ভব নয়। এর কারণ অনেক সময় ওজন অস্বাভাবিক রকমের বেশি থাকে। কখনো আবার অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে জায়েন্ট পেইন, ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিজের মতো সমস্যা জড়িয়ে থাকে। এদের জন্য বেরিয়াট্রিক সার্জারি উপকারী। এই ধরনের সার্জারিতে স্টেপলিং প্রসিডিউর ফলো করা হয়। যার উদ্দেশ্য লেস ডায়েটারি ইনটেক বা খাওয়ার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা। ফলে সহজেই ওবেসিটির সঙ্গে অন্যান্য সমস্যাও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়।
লেখা : অলকানন্দা রায়
মডেল: জিনাত রেহানা
ছবি: রাশেদ রানা

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

17 + 19 =