চাই মানসিক নির্ভরতা

করেছে Sabiha Zaman

খুব খারাপ সময় কাটছে মিরার। একা একা লাগে ভীষণ। স্বামী মারা গেছে তা-ও ৯ বছর হলো। ছেলেমেয়েরা যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মিরা চাকরি থেকে অবসর নিল ছয় মাস আগে। এখন সময়ের বেশির ভাগটাই কাটে জানালার রেলিংয়ে। জীবনের মানে খুঁজতে হচ্ছে বয়সের সীমানায় এসে। মেনোপজের পর থেকে মিরা আরও বেশি অবসাদে ভুগছে। কিন্তু এ সময় দরকার মানসিক নির্ভরতা। এই বয়সটা সব নারীকে বেশি ভাবিয়ে তোলে। কেউ উতরে যায় খুব সহজে, আবার কেউবা চোরাবালির চোরাকাঁটায় আটকে যেতে থাকে।

এই বয়সটা এক হতাশা তৈরির সময়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক রকম সমস্যা দেখা দেয় শরীরে, তা থেকে বিরক্তি আসে। বিশেষত নারীদের মেনোপজের পর থেকে নানা সমস্যা শুরু হয়। হাঁটুর ব্যথা, চোখে কম দেখা, বদহজমের সমস্যা তো আছেই। শারীরিক অক্ষমতায় অন্যের ওপরে নির্ভর করাটা করাটা বিরক্তিকর। তার সঙ্গে রয়েছে একাকিত্ব। এখন অনেকের সন্তানই বিদেশে বা ভিনরাজ্যে বা অন্য জেলায় কর্মসূত্রে বসবাস করে। এক ছাদের তলায় থাকলেও মা-বাবার সঙ্গে বসে বেশ খানিকটা সময় গল্প করে, আনন্দ করে কাটাচ্ছে, এমনও তো নয়। ফলে তারা ক্রমে একা হয়ে পড়ে। তার থেকেও হতাশা দানা বাঁধে।

একজন সারা জীবন চাকরি করেছেন। বিশেষ পদমর্যাদা ভোগ করেছেন। সেই সুবাদে অনেক মানুষ তাকে ঘিরে থেকেছে, তার কাজের প্রশংসা করেছে। কিন্তু অবসর গ্রহণের পর থেকে সেই বৃত্ত ছোট হয়ে আসে। সেখানে প্রশংসা তো দূরের কথা, ন্যূনতম স্বীকৃতি পাওয়াও বেশ দুর্লভ। প্রত্যেক মানুষই স্বীকৃতি চায়। কিন্তু সেটা হয়তো সব সময়ে পায় না।
এর পরে রয়েছে সাংসারিক অশান্তি। কিছু পরিবারে হয়তো বৃদ্ধ-বৃদ্ধা আকাক্সিক্ষত নয়। তাই নিয়ে রোজকার কলহ। একটা মানুষ প্রতি মুহূর্তে যদি বুঝতে পারে যে তাকে কেউ চাইছে না, এদিকে তার অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গাও নেই। সেই অনুভূতি থেকেও অবসাদ গ্রাস করে। একটা বয়সের পরে হতাশা কমে না। ক্রমে তা বেড়েই চলে। কিছু ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতাও অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে কোনো দম্পতি যদি খুব সুখী জীবন কাটায়, তার মধ্যে হঠাৎ একজন চলে গেলে অন্যজন ভেঙে পড়ে। বয়সকালে একা থাকার ভয়, অনিশ্চয়তা থেকে একধরনের অবসাদ তৈরি হয়। আবার যাদের হয়তো দাম্পত্যে তেমন মিলমিশ ছিল না, তা-ও কাজে-কর্মে একসঙ্গে কাটিয়ে দিয়েছে, তাদেরও কিন্তু এই বয়সে এক ছাদের তলায় থাকতে থাকতে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে যায়। তার থেকেও হতাশা তৈরি হয়। তবে এই অসুখের সুবিধা হলো, এটা যার সমস্যা, সে নিজেই বুঝতে পারে। নিজের মন খারাপ হলে, তা কিন্তু বোঝা যায়। হতাশা গ্রাস করছে বুঝতে পারলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। তবে তাদের মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যাওয়াটাও একটা চ্যালেঞ্জ। অনেকেই যেতে চায় না। কিন্তু দরকার হলে চিকিৎসকের কাছে যেতেই হবে। তার আগে আশপাশের মানুষেরও কিছুটা সচেতনতা জরুরি। প্রাথমিকভাবে ওদের পাশে থাকার মাধ্যমেই অনেকটা হতাশা কাটানো সম্ভব।

সংসারে বৃদ্ধ মা, বাবা, শ্বশুর, শাশুড়ি থাকলে তাদের সময় দাও। বিদেশে বা অন্য রাজ্যে থাকলেও এখন দূরত্বটা বাধা নয়। ফোন কলে তাদের সঙ্গ দাও। তিনি কী খেলেন, সারা দিন কী করলেন, ছোটবেলার সুখস্মৃতির আলোচনা এগুলো জরুরি। সুখস্মৃতি মানুষের মনে আলো দেখায়। দূরে থাকলেও কথাবার্তায় তাদের সঙ্গে সময় কাটানো কঠিন নয়।

একটি শিশুর যেমন যত্ন দরকার, বাড়ির প্রবীণদেরও ঠিক ততটাই যত্ন দরকার। একদিন শাশুড়ি বা মায়ের চিরুনিটা হাতে নিয়ে যত্ন করে তার চুল বেঁধে দাও। দেখবে খুশি হবে। স্পর্শ খুব জরুরি। এই স্পর্শই তাদের জীবনের দিকে ফেরাবে।
প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু শখ থাকে। গাছ লাগানোর, বই পড়ার, সেলাইয়ের বা ভালো সিনেমা দেখার। একটু কথা বললেই সেই শখের কথা জানা যায়। সেই শখ পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।
উৎসাহ দাও নতুন কাজে। অনেক সময়েই বাড়ির প্রবীণ মানুষটিকে গুটিয়ে যেতে দেখা যায়। ‘তোরা যা, আমি যাব না’, ‘ওরে বাবা! আমি পারব না’ এগুলো ওদের মুখে খুব পরিচিত। কথাগুলো থেকে ‘না’-টা সরানোর দায়িত্ব নিতে হবে। কেউ এক সময়ে খুব ভালো রাঁধতেন, এখন কনফিডেন্স পান না। একদিন বলে ফেলো, ‘তোমার হাতে পায়েস খেতে খুব ইচ্ছে করছে, তোমার মতো কেউ পারে না।’ তিনি রাঁধলে সেটা ভালোবেসে খাও। ‘এই তো তুমি পেরেছ’ এইটুকু আশ্বাসই তাদের মন ভালো রাখার মেডিসিন হিসেবে কাজ করবে।

অনেকেই বলে, মা-বাবা নতুন জামাকাপড় চান না। উপহার কী দেবে বুঝতে পারে না। ওদের এমন জিনিস দাও, যাতে ওদের সময় কাটে। হতে পারে সেটি আধুনিক জীবনের সঙ্গে খাপ খায় না, কিন্তু ওদের প্রিয়। মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ির বন্ধুদের গেট টুগেদারের ব্যবস্থা করা যায়। ঠিক যেমন বাড়িতে সন্তানের জন্মদিনের আয়োজন করা হয়, তাদের আনন্দের জন্যও একটা দিন না হয় সাজিয়ে দাও। দেখবে, সেই এক দিনের আনন্দ নিয়েই কত দিন আলোচনা করবেন আপন ভালোবাসায়।

লেখা : সুরাইয়া নাজনীন

ছবি : সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

1 × 4 =