চিরদিনের সেরা বিশটি ছবি

করেছে Rodoshee Magazine

আজ যখন প্রতিদিন নানা ছবি বা চিত্রকর্মের প্রদর্শনী, শিল্পকলাবিষয়ক নানা মুনীর নানা মতে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি, খুব অল্প কিছু ছবিই কিন্তু বাস্তবে চিরায়ত ছবির মর্যাদা পেয়েছে। নিচে সারা বিশ্বের সর্বসময়ের সেরা বিশটি ছবির নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলো :
১. দ্য মোনালিসা : লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মোনালিসার নাম ব্যতীত সারা বিশ্বের যে কোনো চিত্রকর্মের তালিকা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। লিসা দেল গিওকন্দো নামে এক নারীর এই প্রতিকৃতিটি ১৫০৩-১৫১৯ সাল নাগাদ সম্পূর্ণ করা হয়, যা বর্তমানে প্যারিস নগরীর ‘মিউজি দ্যু ল্যুভর’-এ প্রদর্শিত হচ্ছে।

চুম্বন (দ্য কিস) এবং পুষ্পবাহক (দ্য ফ্লাওয়ার ক্যারিয়ার)

২. তারাভরা রাত (স্টারি নাইট) : ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ সারাজীবনে অসংখ্য ছবি এঁকেছেন। তবে ‘স্টারি নাইট’ বা ‘তারাভরা রাত’ই তার জীবনের সেরা কাজ বলে মনে করা হয়। ১৮৮৯ সালে আঁকা এই ছবিটি শিল্পীর স্মৃতি থেকে আঁকা এবং সে সময় শিল্পী যে স্যানাটোরিয়াম বা আরোগ্য নিকেতনে অবস্থান করছিলেন, স্যানাটোরিয়ামের কক্ষ থেকে দেখা রাতের নিসর্গই তিনি এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন।

৩. আর্তনাদ (দ্য স্ক্রিম) : কার্ডবোর্ডের ওপর অয়েল ও প্যাস্টেল ব্যবহার করে এডওয়ার্ড মুঙ্খ তাঁর বিখ্যাততম ছবি ‘দ্য স্ক্রিম’ এঁকেছেন ১৮৯৩ সালে। ‘টেলস ফ্রম দ্য ক্রিপ্টে’ বিধৃত পৈশাচিক প্রতিকৃতিগুলোর মতো দেখতে এই এক্সপ্রেশনিস্ট ছবির পশ্চাদপটে নরওয়ের অসলো শহরকে নিজস্ব কল্পনায় উপস্থাপন করেছেন তিনি।

৪. গুয়ের্নিকা : স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় স্পেনের গুয়ের্নিকায় বোমাবর্ষণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ শিল্পী পাবলো পিকাসো তাঁর জীবনের বিখ্যাততম ছবি ‘গুয়ের্নিকা’ আঁকেন ১৯৩৭ সালে। এই ছবিটি আঁকার আর্থিক অনুমোদন দিয়েছিল খোদ স্প্যানিশ সরকার, যাতে করে যুদ্ধের যন্ত্রণা প্রতীক আকারে মানুষের কাছে ছড়িয়ে যায়।

গুয়ের্নিকা

৫. স্মৃতির স্থায়িত্ব (দ্য পার্সিস্টেন্স অব মেমোরি) : ১৯৩১ সালে অপর এক স্প্যানিশ শিল্পী সালভাদর দালির আঁকা ‘দ্য পার্সিস্টেন্স অব মেমোরি’ শিল্পের ইতিহাসের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় ও সেরা কয়েকটি শিল্পকর্মের একটি। গলিত ঘড়িতে আবৃত এক অন্ধকার সমুদ্রসৈকতের এই ছবিটি সম্ভবত আলবার্ট আইনস্টাইনের ‘আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব’ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকবে।

৬. তিন সংগীতজ্ঞ (থ্রি মিউজিশিয়ানস) : প্রথম দৃষ্টিতে এই ছবিটিকে একটি কোলাজের মতো মনে হতে পারে। তবে পাবলো পিকাসোর বিখ্যাত ছবি ‘তিন সংগীতজ্ঞ (থ্রি মিউজিশিয়ানস)’ মূলত একটি তৈলচিত্র। ১৯২১ সালে ছবিটি তিনি আঁকা শেষ করেন। ‘ফিলাডেলফিয়া মিউজিয়াম অব আর্ট’-এ ছবিটি রয়েছে।

৭. ‘লা ঘ্রন্দ জাতে দ্বীপে এক রোববারের বিকেল (আ সানডে আফটারনুন অন দ্য আইল্যান্ড অফ লা ঘ্রন্দ জাতে)’ : পয়েন্টিলিজম কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে এই ছবিটি আঁকা হয়েছে। পয়েন্টিলিজম হচ্ছে শিল্পের সেই বিশেষ ও অনবদ্য কৌশল, যা শুধুই স্বতন্ত্র অসংখ্য ছোট ছোট ও নানা রঙের বিন্দু ক্যানভাসে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি পূর্ণ ইমেজ বা চিত্র ফুটিয়ে তোলার কাজটি করা হয়। জর্জেস সিউরাত নামের ফরাসি চিত্রকর তার ‘আ সানডে আফটারনুন অন দ্য আইল্যান্ড অব লা ঘ্রন্দ জাতে’ নামে তাঁর বিখ্যাতম চিত্রকর্মের মাধ্যমে শিল্পকলার এই বিশেষ কৌশলটির প্রবর্তন করেন। শুরুতে সমালোচকেরা নতুন এই অঙ্কন পদ্ধতিকে বিদ্রুপ করে ‘পয়েন্টিলিজম’ বললেও পরবর্তীতে শিল্পের এই নতুন টেকনিকই এক অভিনব মান্যতা ও সমাদর পায়।

তারাভরা রাত (স্টারি নাইট) এবং তিন সংগীতজ্ঞ (থ্রি মিউজিশিয়ানস)

৮. মুক্তোর কানের দুল পরা বালিকা (গার্ল উইথ আ পার্ল ইয়ারিং) : অনেক সমালোচকের কাছেই এই ছবিটি ‘মোনালিসা অব দ্য নর্থ’ বা ‘উত্তরের মোনালিসা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও ডাচ চিত্রশিল্পী জোহানেস ভার্মিরের আঁকা এই ছবিটি ছবির শিরোনামের হুবহু প্রতিফলন মুক্তোর কানের দুল পরা বালিকা। ১৬৬৫ সালে আঁকা এই ছবিটি দ্য হেগের মোরিৎশ্যুইস গ্যালারিতে রয়েছে।

৯. হুইসেল বাঁশি বাদকের মা (হুইসলার্স মাদার) : এই ছবিটি আসলে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী জেমস ম্যাকনিল হুইসলারের ততোধিক বিখ্যাত পোর্ট্রেট ছবি অ্যারেঞ্জমেন্ট ইন গ্রে অ্যান্ড ব্ল্যাক : দ্য আর্টিস্টস মাদারের অগ্রভাগহীন ছবি। বিশ্ব শিল্পকলার ইতিহাসে মার্কিনি চিত্রকরদের আঁকা যে হাতে গোনা কয়েকটি ছবি ভুবন বিখ্যাত ছবির তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে, এই ছবিটি তাদের একটি। ১৮৭১ সালে আঁকা এই ছবিটি প্যারিসের একটি জাদুঘরে রয়েছে এবং তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খুব কমই দেখা যায়।

স্মৃতির স্থায়িত্ব (দ্য পার্সিস্টেন্স অব মেমোরি) এবং আর্তনাদ (দ্য স্ক্রিম)

১০. শিল্পীর শ্মশ্রুহীন আত্মপ্রতিকৃতি (সেলফ-পোর্ট্রেট উইদাউট বেয়ার্ড) : যদিও ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের এই ছবিটির শিরোনাম কিছুটা গতানুগতিক, তবু তার এই ছবিটি চিরকালের মহত্তম ছবিগুলোর একটি। যদিও এর আগেও ভ্যান গঘ আরও কিছু আত্মপ্রতিকৃতি এঁকেছেন, এটা তাঁর শ্মশ্রুহীন হাতে গোনা কয়েকটি আত্মপ্রতিকৃতির একটি। সবচেয়ে যেটা বড় কথা যে ১৯৯৮ সালে ৭১.৫ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হওয়া এই ছবিটি গোটা বিশ্বের চিত্রকর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া ছবিগুলোর একটি।

১১. দ্য নাইট ওয়াচ : ডাচ ভাষায় ‘দ্যু নাখটওয়াখট’ নামের এই ছবিটি বহির্বিশ্বে ‘দ্য নাইট ওয়াচ’ নামে পরিচিত। ক্যানভাসে অয়েল ব্যবহার করে রেমব্রান্ডট এই ছবিটি এঁকেছেন। সামরিক বাহিনীর এক ক্যাপ্টেন এবং তার ১৭ জন মিলিশিয়া রক্ষী নিজেদের কোম্পানির ছবি আঁকার জন্য রেমব্রান্ডটকে ১৬৪২ সালে অনুদান প্রদান করেন। ফরাসি রানির ডাচ দেশে অত্যাসন্ন সফরের সময় নিজেদের বাহিনীকে বিপুল গৌরবে উপস্থাপন ছিল এই ছবি আঁকিয়ে নেওয়ার কারণ।

দ্য মোনালিসা, মুক্তোর কানের দুল পরা বালিকা (গার্ল উইথ আ পার্ল ইয়ারিং) এবং রাতের কাফে চত্বর (ক্যাফে টেরাস অ্যাট নাইট)

১২. চুম্বন (দ্য কিস) : গুস্তাভ ক্লিমটের সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি ‘চুম্বন (দ্য কিস)’ এক চুম্বনরত দম্পতির একই সঙ্গে বাস্তববাদী ও জ্যামিতিক বর্ণনা। ছবিটি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ১৯০৮ সালে আঁকা শেষ হয়। তালিকার অন্য তৈলচিত্রগুলো থেকে এটা এ কারণেই আলাদা যে ক্যানভাসে তেল ছাড়াও খুবই সূক্ষ্ম ও মিহি সোনার আস্তরণ ব্যবহার করা হয়েছে, যার ভেতর থেকে সূর্যরশ্মি গমন করতে সক্ষম।

১৩. শাপলাদল (ওয়াটার লিলিজ) : ফরাসি চিত্রকর ক্লঁদ মনেত ১৮৪০ থেকে ১৯২৬ সাল নাগাদ ওয়াটার লিলিজ শিরোনামে ১৮৪০ থেকে ১৯২৬ সাল নাগাদ ২৫০টি ছবি আঁকেন। শিল্পীর বাড়ির পেছনে যে পদ্মপুকুর ছিল সেই পদ্মপুকুরের পুরো সৌন্দর্য ও সুষমা ফুটিয়ে তুলতে ঠিক ২৫০টি ছবি এঁকেছেন তিনি। পৃথিবীর নানা বিখ্যাত গ্যালারিতে তার এই ‘শাপলাদল’ সিরিজের ছবিগুলো আছে।

১৪. পুষ্পবাহক (দ্য ফ্লাওয়ার ক্যারিয়ার) : স্প্যানিশ ভাষায় ‘কার্গাডোর দ্যু ফ্লর্স’ নামে এই ছবিটি দিয়েগো রিভেরা ১৯৩৫ সালে এঁকেছিলেন। বিশ শতকের সেরা মেক্সিকান চিত্রশিল্পী হিসেবে পরিচিত এই শিল্পী খ্যাত ছিলেন উজ্জ্বল রং ব্যবহারের মাধ্যমে খুবই সরলভাবে আঁকা চিত্রকর্মের জন্য। আলোচ্য এই ছবিটিও এর ব্যতিক্রম নয়।

শাপলাদল (ওয়াটার লিলিজ) এবং দ্য নাইট ওয়াচ

১৫. আমেরিকান গথিক : মার্কিনি শিল্পকলায় আর একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী চিত্রকর্ম হলো ‘আমেরিকান গথিক।’ ১৯৩০ সালে শিল্পী গ্রান্ট উডের আঁকা এই ছবিতে এক কৃষক ও তার খুব সাদাসিধে কন্যার ছবি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মূলত ত্রিশের মহামন্দা এই ছবিতে মূর্ত হয়েছে।

১৬. রাতের কাফে চত্বর (ক্যাফে টেরাস অ্যাট নাইট) : প্রবল সৃষ্টিশীল ছবি ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের এই ছবিটি তার আর দশটি ছবির মতোই সাদামাটা শিরোনাম বেছে নিয়েছে। তবে দৈনন্দিন অতি সাধারণ পরিবেশের অসাধারণ বিবরণ হয়ে উঠেছে ছবিটি। যদিও ভ্যান গঘ এই ছবিতে স্বাক্ষর করেননি, তবু শিল্পীর নানা ব্যক্তিগত চিঠিপত্র বা লেখায় এই মাস্টারপিস ছবিটির কথা তিনি উল্লেখ করে গেছেন।

১৭. মানবপুত্র (দ্য সন অব ম্যান) : ১৯৬৪ সালে আঁকা এই ছবিটিতে রেনে মাগ্রিত্তেস আত্মপ্রতিকৃতি আঁকলেও এখানে তার মুখটি একটি ভাসমান সবুজ আপেলে অনেকটাই ঢাকা পড়েছে।

নং ৫, ১৯৪৮, আমেরিকান গথিক এবং হুইসেল বাঁশি বাদকের মা (হুইসলার্স মাদার)

১৮. নং ৫, ১৯৪৮ : ১৯৪৮ সালে আঁকা এই ছবিটির নামকরণ শিল্পী জ্যাকসন পোলক করেছেন খুবই নৈর্ব্যক্তিক শিরোনামে। যদিও ছবিটি আপাত বিশৃঙ্খল, তবু এটি তার একটি অসামান্য শিল্পকৃতি, যেখানে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ঠিক পরবর্তী সেই উত্তাল তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সময়ের কথা উঠে এসেছে এই ছবিতে।

১৯. লো ম্যুলিন দো লা গালেতে নৃত্য (ডান্স অ্যাট লো ম্যুলিন দো লা গালেত) : এই ছবিটির চিত্রকল্প যদিও সঙ্গে সঙ্গেই বোঝা সম্ভবপর নয়, তবু এই ছবিটি ৭৮.১ মিলিয়ন ডলার ও পরে ১২৭.৪ মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয়। ফরাসি চিত্রশিল্পী পিয়েরে-অগ্যুস্ত রেঁনোয়ার আঁকা এই ছবিটি চিত্রকলার বিশ্ব ইতিহাসের চিরদিনের সেরা ও বিখ্যাততম ছবিগুলোর একটি।

শিল্পীর শ্মশ্রুহীন আত্মপ্রতিকৃতি (সেলফ-পোর্ট্রেট উইদাউট বেয়ার্ড) এবং ‘লা ঘ্রন্দ জাতে দ্বীপে এক রোববারের বিকেল (আ সানডে আফটারনুন অন দ্য আইল্যান্ড অফ লা ঘ্রন্দ জাতে)’

২০. কুকুরেরা তাস খেলছে (ডগস প্লেয়িং পোকার) : ১৯০৩ সালে ব্রাউন অ্যান্ড বেগেলৌ সিগারস কর্তৃক অনুদানপ্রাপ্ত এই ছবিতে মার্কিনি চিত্রশিল্পী সিএম কুলিজ ‘ডগস প্লেয়িং পোকার’ নামে অবিস্মরণীয় চিত্রকর্মের মাধ্যমে এই সিগারেটের ব্র্যান্ডের জন্য এক অনন্য কীর্তি স্থাপন করেন। ছবিটি পরে নানা সময়ে নানা শুভেচ্ছা কার্ডে ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ব্যবহৃত হয় যেখানে দেখা যায় যে একটি টেবিলের চারপাশে বসে কিছু কুকুর তাস খেলছে। ছবিটি আপাতদৃষ্টিতে একটি সিগারেট কোম্পানির বিজ্ঞাপন হিসেবে করা হলেও এ ছবি বলে সহস্র কথা! যেন খোদ জর্জ অরওয়েলের ‘অ্যানিমেল ফার্মে’র সেই দৃশ্য যেখানে ‘সবাই সমান হলেও কিছু বেশি সমান’ পশু মদের গ্লাস আর দামি চুরুট হাতে তাস খেলে আর গরিষ্ঠসংখ্যক পশু সেই বিপ্লব-পূর্ব সময়ের মতোই হাড়ভাঙা খাটুনি, অপমান আর দাসত্বে দিন কাটায়।

লেখা: অদিতি ফাল্গুনী 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

eighteen + five =