চ্যালেঞ্জ নেয়ার মানসিকতাটাই আসল

করেছে Rodoshee

একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হেলেনা জাহাঙ্গীর। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে তিনি একজন আলোচিত মুখ। সম্প্রতি নির্বাচিত হয়েছেন এফবিসিসিআই-এর পরিচালক হিসেবে। অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ‘জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার দরিদ্র অসহায় মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন। কাজ করেছেন পথ শিশুদের নিয়ে। জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের অধীনে ‘গোধুলী আলো’ নামে কুমিল্লাতে একটি প্রকল্প চালু আছে। এখান থেকে ৬০ জন মহিলা-পুরুষকে বয়স্ক ভাতা দেয়া হচ্ছে। ১৯৯৬ সাল থেকে পোশাক শিল্পের ব্যবসা বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন হেলেনা জাহাঙ্গীর। এরপর বাংলাদেশের স্বনামধন্য নিট কনসার্ন গ্রুপের চারটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। হেলেনা জাহাঙ্গীর ব্যবসার বাইরে বিভিন্ন সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক সংগঠনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। সমাজসেবায় অনন্য কার্যক্রমের জন্য তিনি ইতোমধ্যেই পেয়েছেন সিস্টার হেলেন উপাধি। ঈদ ও বর্ষপূর্তি সংখ্যায় রোদসী আড্ডায় মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। আড্ডায় মেতেছেন রোদসী সম্পাদক সাবিনা ইয়াসমীনের সঙ্গে।

সাবিনা ইয়াসমীন : এফবিসিসিআই-এর পরিচালক নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন। প্রথমে আপনার ছোটবেলার গল্প শুনতে চাই।
হেলেনা জাহাঙ্গীর: ধন্যবাদ। আসলে এই পর্যায়ে আসার পেছনে ছোটবেলাই মুখ্য বিষয়। ছোটবেলায় কেমন ছিলাম সেটাই এখানে স্পষ্ট। যদি কারও সঙ্গে না মিশতাম তাহলে কিন্তু আজ এই পর্যন্ত আসতে পারতাম না। ছোটবেলায় খুব চঞ্চল প্রকৃতির ছিলাম। স্কুলে পড়ার সময় সব খেলায় নাম দিতাম। হয়তো কখনো প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হতাম বা হতাম না। তবুও নাম দিতাম। বেশি দুষ্ট থাকার কারণে লেখাপড়ার দিকে মনোযোগ কম ছিল। দেখা যেত পরীক্ষা চলে এসছে কিন্তু আমি তো পড়িনি! পরীক্ষার খাতায় বানিয়ে বানিয়ে উত্তর লিখতাম। মার্কও ভালো পেতাম। এভাবেই আসলে বেড়ে ওঠা। আমার বাবা বিদেশি জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন। বাবা বাইরে বাইরে থাকতেন। আমরা দুই ভাই দুই বোন। আমি দ্বিতীয়। আমার বড় ভাইয়ের পর আমি তারপর আরেকটা বোন তারপর ছোট ভাই। আমরা সবাই মোটামুটি পিঠাপিঠি। আমার জন্মের পর বাবা চলে গেলেন রাশিয়ায়। আমার জন্ম ঢাকাতে। টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে। আব্বা যখন বিদেশ চলে যান তখন আমরা দাউদকান্দি চলে গেলাম। আব্বা দেশে আসলে আমরা চিটাগাং চলে যাই। ছোটবেলায় চিটাগাং পড়েছি ক্লাস এইট-নাইন পর্যন্ত। দাউদকান্দি আসার পরে বিয়ের প্রস্তাব আসছিল তাই আম্মা ভাবল বিয়ে দিয়ে ফেলি। আমিও আগেপাছে না ভেবে বিয়ে করে ফেলি। আমার কাছে বিয়েটা খেলার মতো মনে হয়েছিলো। ভাবলাম, বিয়ে করি ভালো না লাগলে চলে আসব! আসলে বাস্তবে তো তা হয় না। যাই হোক, বিয়ের পর দেখলাম স্বামী অনেক ভালো। এখনো আমার চোখে উনি হচ্ছেন সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি। বিয়ের পর আমি বললাম লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চাই। উনি সব ব্যবস্থা করলেন। ভোররাতে ডেকে দিত। আমাকে নিজে পড়াত পরীক্ষার আগে। সারাক্ষণ বলত এই পড়ো, পড়ো। খুব উৎসাহ দিয়েছে। নবাবপুরে ভাশুরের বাসায় থেকে পড়াশোনা করেছি, রান্নাবান্না করেছি। বিয়ের পরে দাউদকান্দি থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। এইচএসসি দিয়েছি ১৯৯২ সালে। লেখাপড়ার ফাঁকে ছেলেমেয়েও হয়ে গেল। তারপর মনে হলো একটা কিছু করা দরকার। শুরু হলো চাকরি খোঁজা। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে ইন্টারভিউ দিয়েছি। এমনকি রিসিপশনের ইন্টারভিউ দিয়েছি আমি। তখন ভাবতাম রিসিপশনের মেয়েরা খুব স্মার্টলি বসে কথা বলে। আমিও তাই করবো। এটা সেই ২০-২৫ বছর আগের একটা অনুভূতি। পরে আমার স্বামীর অফিসে গিয়ে দেখলাম বিশাল বড় অফিস। সুন্দর চেয়ারে বসে। বিশাল টেবিল তার সামনে। আছে কম্পিউটারও। দেখে মনে হলো তিনি এত বড় জায়গায় আর আমি রিসিপশনিস্ট হবো? তখন আমার ব্রেনটা কাজ করলো, আমি তাকে বললাম আমিও কিছু করতে চাই। একটা বুটিক শপ করব। অথবা একটা দোকান করে দাও বা একটা ফ্যাক্টরি। এরপর মিরপুরে সে আমাকে একটা ফ্যাক্টরি করে দিল। ওটা ছিলো একটা এমব্রয়ডারি ফ্যাক্টরি। এটা সেই ১৯৯৬ সালের ঘটনা। আমার কাজের উৎসাহ খুব। আমি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে খুব সুন্দর গেটআপ নিয়ে অফিসে যেতাম। খুব স্পিড ছিল। সে সময় ঢাকার অদূরে যত ফ্যাক্টরি ছিলো মোটামুটি সব কটি ভিজিট করেছি। আমার নেশা ছিল তারা কীভাবে কাজ করে, তাদের অফিশিয়াল গেটআপ কী, তারা কীভাবে সবকিছু মেইনটেন করে এগুলো দেখে আরও ভালো কিছু করার চেষ্টা করতাম। সেইখান থেকে বাড়াতে বাড়াতে আল্লাহর রহমতে এখন আমার সাতটা ফ্যাক্টরি। একটা বুটিক শপ আছে, একটা ব্যান্ড শপ আছে।

হেলেনা জাহাঙ্গীর ও রোদসীর সম্পাদক সাবিনা ইয়াসমীন

সাবিনা ইয়াসমীন : ফ্যামিলি থেকে কোনো সাহায্য পেয়েছেন কিনা?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: আসলে প্রতেকটা নারীর কাজে বাধা থাকবেই। ফ্যামিলি থেকে বাধা থাকবে। শ্বশুর-শাশুড়ির বাধা থাকবে। বউকে নিয়ে গবেষণা করবে- এটা আমাদের বাঙালিদের কালচার। স্বামী যতই ভালো হোক বউ বাড়ি ফিরতে এত লেট করতেছে কেন? নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও ঝামেলা আছে- এসব আরকি। তাদের একধরণের তদারকি থাকে। সবকিছু মিলে আসলে অনেক প্রতিবন্ধকতা থাকে প্রায় সবারই। এইসব বাধা পার হয়ে আসতে হয় প্রতিটা নারীকে। আমার স্বামী অনেক ভালো। তবে তার মধ্যেও অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। আমি আমার মতো করে তাকে বুঝিয়ে বলেছি। তবে তার বন্ধুরা যখন তাকে বলেছে আমি ব্যবসায় খুব ভালো করছি। এতেও তার মন ভালো থাকত। ফলে খুব একটা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতো না।
সাবিনা ইয়াসমীন : যদি বাধাটা এমন হয় যে, হয় এসপার নয় ওসপার। সে ক্ষেত্রে কী করার?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: যদি কোনো মেয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যায় তাহলে তাকে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তাকে কাজ করতে হবে। এমন অনেকেই আছে প্রতিষ্ঠিত হতে গিয়ে সংসার টেকেনি। আসলে যারা বুদ্ধিমতী, জ্ঞানসম্পন্ন তাদের বুদ্ধিমত্তার কারণে হয়তো সংসার টেকে। যেমন আমি প্রায় ৪০-৪৫টা ক্লাবের মেম্বার, আমার স্বামী পছন্দ করে না, তাই আমি যাই না। আমি যদি মনে করি গিয়ে একটু এনজয় করব আমার স্বামী কী করবে? আমি যদি অফিস করে ক্লাবে গিয়ে সেখানে পড়ে থাকি স্বাভাবিকভাবেই কিন্তু আমাদের সংসারে অশান্তি হবে। আমি অফিস থেকে বের হয়ে সরাসরি বাসায় চলে আসছি। নিজে সৎ হলেই সব ঠিক। “Honesty is the best policy in the world” এইটা মনে রাখলেই হবে। এটা এক সময় না এক সময় কাজে দেবেই। যেমন আমাদের এই সমাজের অনেক পুরুষ আমাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা করত। বেশি লাফালাফি করছে, স্বামীর ওপর দিয়ে বেশি চলে যাচ্ছে। আমি আমার যোগ্যতা দিয়ে সব জায়গা আমি দখল করব। আমার কথা হচ্ছে এইটা। আমার কর্মই আমাকে নিয়ে যাবে। আমি যখন ইলেকশন করেছি আমি কিন্তু কারও কাছে বলিওনি। আমি ব্যবসা করি পরিচিতিটা একটু বেশি হওয়ায় সবাই ভেবেছে মনে হয় আমি রাজনীতি করি। কেউ বলে জাতীয় পার্টি করি, কেউ বলে বিএনপি করি আর কেউ বলে আওয়ামী লীগ করি। সব মিলিয়ে চারদিক থেকেই চাপ। সবাই বলে এখানে যোগ দেন। ওখানে যোগ দেন। কিন্তু আমি একদমই নারাজ। কারণ, আমার স্বামী একদমই পছন্দ করেন না। আমি যখন মেয়র ইলেকশনের জন্য নমিনেশন নিয়েছিলাম, তখন সে সেটা অপছন্দ করলেন। আমি ঠিক করলাম ইলেকশন করব না। তবে হ্যাঁ যদি সুস্থ এবং সুন্দর রাজনীতি হয়, সেখানে যদি আমাকে কোনো ভালো কাজ করার সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাহলে হয়তো আমি যাব। কিন্তু কোনো দলে যোগ দিয়ে আন্দোলন করে আমি রাজনীতি করতে চাই না। একটা এমপি যতটুকু না কাজ করছে আমি হেলেনা জাহাঙ্গীর তার থেকে অনেক বেশি কাজ করেছি। আমি মনে করি, মানুষের কর্ম হচ্ছে অনেক বড় ইবাদত। মানুষের কর্মের মাধ্যমে অনেক ওপরে পৌঁছাতে পারে।

সাবিনা ইয়াসমীন : এফবিসিসিআই-এর একজন পরিচালক হিসেবে নারীদের জন্য আপনি কোন ধরনের উদ্যোগ নেবেন?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: আমি এমনিতেই উইমেন এমপাওয়ারমেন্টের ওপর কাজ করে আসছি। তবে আমি পল্লী উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে কাজ করব। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ইনভলভ থাকব। আমাদের যে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প আছে তা অ্যানালগ, হাতে কাজ করছে। এখন ইচ্ছা করলে ডিজিটাল মেশিনে তা করা যায়। এগুলো যদি আমরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গ্রামে দিতে পারি তাহলে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসার প্রবণতা কমে যাবে। তাদের আমি প্রশিক্ষণ দেব তারা যেন শহরমুখী না হয়। তাদের এটাই শেখানো হবে, ‘তোমরা গ্রামে থেকেই উন্নয়ন করো।’
সাবিনা ইয়াসমীন : প্রশিক্ষণের পরে মূলধনের জন্য ব্যাংক লোন নেওয়া খুব টাফ। আর মিডলম্যানকে সরানোর কোনো ইচ্ছা আছে কি না? যাতে তৈরি পণ্যের ভালো দাম তারা পায়?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: আমি একটা লিংক তৈরির চেষ্টা করবো। যেমন আড়ং করেছে। যারা গরিব বা দরিদ্র তাদের কাছ থেকে তারা সরাসরি উৎপাদন করে মাল আনছে। কিন্তু তারা আসলে সেই পরিমাণ অর্থ পাচ্ছে না।
সাবিনা ইয়াসমীন : ব্যাংক লোনের ব্যাপারে কী উদ্যোগ থাকবে?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: নারীদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে ৪ লাখ টাকা ঋণ বরাদ্দ করেছিল সরকার। তবে আমার ইচ্ছা সরকারের সঙ্গে কথা বলে আমি এটাকে ৮-১০ লাখ টাকায় বরাদ্দ করার ব্যবস্থা করবো। একটা ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্প ৪ লাখ টাকা আসলে তেমন কিছু না। যদি বড় একটা অ্যামাউন্ট পায় তাহলে প্রডাকশন আরও বাড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে তার প্রফিটটা হলে সে লোন শোধ করেও তার হাতে কিছু থাকবে।
সাবিনা ইয়াসমীন: এই চার লাখ টাকা নিতে গেলেও অনেক সময় ঘুষ দিতে হয়।
হেলেনা জাহাঙ্গীর: সরকার বলে যাচ্ছে সহজে ঋণের ব্যাপারে কিন্তু কাজটা সহজ নয়। তবে এ রকম কোনো ঘটনা আমার নজরে এলে আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো যাতে সেই উদ্যেক্তা সহজে টাকাটা পায়।
সাবিনা ইয়াসমীন: জয়যাত্রা ফাউন্ডেশন সম্পর্কে জানতে চাই।
হেলেনা জাহাঙ্গীর: এটি আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত একটি ফাউন্ডেশন। এবং নন প্রফিটেবল একটা ফাউন্ডেশন। আমার ভাবনা থেকেই এটি করা। অনেকেই অনেক কথা বলছিল কিন্তু আমার চিন্তা ছিল কিছু একটা করা, আর সেই থেকেই আসলে এটার শুরু করা। মোটামুটি সারা বাংলাদেশেই এটার কার্যক্রম আছে।
সাবিনা ইয়াসমীন: ফাউন্ডেশনটা আসলে কোন বিষয় নিয়ে কাজ করে?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: এতিমখানা চালাচ্ছে, বৃদ্ধাশ্রম চালাচ্ছে। বিদেশে সরকার বৃদ্ধা ভাতা দিচ্ছে। আমাদের দেশে সেই সুযোগ নেই। আমাদের দেশে বয়স হলে মায়েদের কোনো মূল্য দিচ্ছে না। প্রতিটি মানুষ যদি তার স্থান থেকে চিন্তা করে তাহলে বুঝবে বৃদ্ধা হয়ে গেলে তার কষ্ট কতটুকু। যেমন শ্যামলীতে একটা বৃদ্ধাশ্রম আছে ওখানে ঢুকতে দেয় না। ওটাতে ভালো ফ্যামিলির বাবা-মায়েরা ওখানে আছেন। ‘গোধূলির আলো’ বৃদ্ধাশ্রমটি আমি চালাচ্ছি, ওখানে ৬০ জনকে প্রতি মাসে একটা ভাতা দেওয়া হয়।
সাবিনা ইয়াসমীন: এটার কার্যক্রম কি সামনে আরও বাড়ানোর চিন্তাভাবনা আছে?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: আপাতত বাড়ানোর ইচ্ছা নেই। কারণ, ওনারা এতই বৃদ্ধা যে এর মধ্যে দু-তিন জন মারা গেছেন। ওখানে আবার নতুন করে নিচ্ছি। ওই ৬০ জনকে ঠিক রেখেই কাজ করা হচ্ছে। এই ভাতাটা একদম বেতন-ভাতার মতোই দিচ্ছি।
সাবিনা ইয়াসমীন: ভাতা দেবার ক্ষেত্রে বৃদ্ধদের নির্বাচন কিভাবে করলেন?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: যাদের বয়স ৫০-এর বেশি তাদের দিচ্ছি। যারা সবল নয়, কাজ করে খেতে পারবে না, তাদের দিচ্ছি।
সাবিনা ইয়াসমীন: সম্প্রতি একটা ক্রিকেট টুর্নামেন্ট করলেন, কোন চিন্তা থেকে?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: জেপিল নামে আমার একটা টুর্নামেন্ট হয়েছিল। আসলে বড় বড় ক্রিকেটার যারা আছে তারা একসময় থাকবে না। দেখা গেল গ্রামে অনেক ভালো ভালো খেলোয়াড় আছে। কিন্তু তাদের তেমন মূল্যায়ন হয়তো হচ্ছে না। ওদেরই খুঁজে বের করার জন্যই আসলে এই উদ্যোগ নেওয়া। ওটা ছিল ২০টা স্কুল নিয়ে। বিসিবির সব ডিরেক্টর সেখানে ছিলেন। ঈদের পরে আবার করব।
সাবিনা ইয়াসমীন: সাম্প্রতিক ঘটনা নারী হ্যারাসমেন্ট নিয়ে আপনি কী বলতে চান?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: যার যার জায়গা থেকে সবাই যদি ভালোভাবে কাজ করত, তাহলে এগুলো ঘটত না। একটা পুলিশ নিজেই সে অকারেন্স করছে, সে অন্যায় কীভাবে ঠেকাবে। কুমিল্লার যে তনু হত্যা ধামাচাপা হয়ে গেল, কোনো কিছুই হলো না। এগুলো কেন হচ্ছে? কারণ যে যার জায়গা থেকে ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না।
সাবিনা ইয়াসমীন: সমাজের একটা কমন প্রবলেম হলো নারীর দোষ ধরা। এসব ঘটনায় কেউ কেউ বলেন নারীর পোশাক ভালো ছিলো না তাই এসব হয়েছে। আজকাল দুই-চার বছরের বাচ্চাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। ওর তো আর পোশাকের দোষ না। আপনার মতামত কি?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: আসলে পোশাক তো কোনো ফ্যাক্টর না। আবার এটাও মনে রাখতে হবে, সবাই তো আর খারাপ না। ভালো তো ভালোই। ঐশী তার বাবা-মাকে মেরেছে। একটা মানুষ কিন্তু স্বাভাবিক অবস্থায় তার বাবা-মাকে মারতে পারে না। শুধু তাই নয়, সে কাউকেই মারতে পারবে না। তার মানে হলো, সে ইয়াবা খেত বা ড্রাগ নিত বলেই কিন্তু ডিজঅর্ডার হয়েছে। যার ফলে সে এটি করেছে। কাজটা সঠিক না বেঠিক সে বুঝতেই পারেনি। বর্তমানে যা-ই ঘটে একটা সুস্থ মানুষ কিন্তু তা করতে পারে না।
সাবিনা ইয়াসমীন: একজন নারী হিসেবে তাহলে ঘটনাগুলো নিশ্চয় আপনাকে কষ্ট দেয়?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: অবশ্যই কষ্ট দেয়। আর কষ্ট লাগে বলেই তো এই আন্দোলনে নেমেছি।
সাবিনা ইয়াসমীন: অভিযোগ আছে গার্মেন্টেসে নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হয় না বা দিলেও চাকরি থাকে না। আপনিও তো একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। সবচেয়ে বড় কথা একজন নারী। এ বিষয়ে কী বলবেন?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: এটা সবারই দেয়া উচিত। আমরা দিয়ে যাচ্ছি। যদিও আমাদেরটা আপাতত লসে আছে তাও আমরা দিয়ে যাচ্ছি। অনেক সময় দেখা যায় একটা মেয়ে প্রেগন্যান্ট হয়েও বলে না। এক মাসের প্রেগন্যান্ট অবস্থায় সে জয়েন করে। পরবর্তীতে সে ছয় মাসের ছুটি পাচ্ছে। আর এই টাকার মধ্যে সে অগ্রিম নিয়ে যাচ্ছে তিন মাসের আর বাকিটা আবার তিন মাস পরে নিচ্ছে। আমরা দিচ্ছি, অন্যদেরটা জানি না। আমি মনে করি অন্য অন্য ব্যবসায়ী যারা আছে, তারা যদি সুন্দর ব্যবসা করতে চায় তাহলে তারাও অবশ্যই এটা দেবে।
সাবিনা ইয়াসমীন: গার্মেন্টসের মেয়েদের নিয়ে আলাদা কোনো ভাবনা আছে?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: এখানে আসলে সব লোয়ার লেভেলের মেয়েরা আসে। শিক্ষিত কোনো মেয়ে আসে না। কেউ একটু শিক্ষিত হলেই অন্য লাইনে কাজ করে। এখানে আসে না। নারীরা আসলে আধুনিক জব করতে পছন্দ করে। গার্মেন্টস তো আসলে সেই অর্থে ভালো জব না। আমাদের যখন শিপমেন্ট থাকে অনেক সময় ওভার টাইম করতে হয়। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই দেখা যায় কাজ করতে হয়। সেক্ষেত্রে নারীরা আসলে পারে না। এ জন্যই হয়তো শিক্ষিত নারীরা এই জব করতে ইন্টারেস্ট না।

সাবিনা ইয়াসমীন: তরুণ উদ্যোক্তার উদ্দেশে কিছু বলবেন? হেলেনা জাহাঙ্গীর হতে চাইলে কি গুণ থাকা উচিত বলে মনে করেন?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: প্রথমেই বলবো চেষ্টা থাকতে হবে। তাকে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। খুব চিন্তা ভাবনা করে চলতে হবে। মানে একটা কাজে হাত দিলে চ্যালেঞ্জ নেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে যে, আমি শেষ পর্যন্ত করবই। মনে রাখতে হবে লাভ-ক্ষতি নিয়েই ব্যবসা। ব্যবসায় লস হতেই পারে। যেমন আমি নতুন একটা গার্মেন্স খুলেছি। সেখানে কিন্তু দুই বছর ধরে কোনো লাভের মুখ দেখিনি। প্রতিটি কাজেই প্রথম দিকে আমাদের লস দিতে হয় এবং ধৈর্য ধরতে হবে। অনেক মানুষই আছে একটা হচ্ছে না আরেকটা ধরে। ওইটা হচ্ছে না ফলে আরেকটা। ফলে সে কখনোই সামনে এগোতে পারে না। এমন অস্থিরতা বাদ দিতে হবে।
সাবিনা ইয়াসমীন: অনেকেই আপনাকে সিস্টার হেলেনা বলেন। বিষয়টি উপভোগ করেন নাকি দায়িত্ববোধ বেড়ে যায়?
হেলেনা জাহাঙ্গীর: এটা আসলে আমার কাজের গতি বাড়িয়ে দেয়। আর আমি আসলে মাদার তেরেসাকে অনুসরণ করতাম। সারাটা জীবন উনি জনসেবায় পার করে দিয়েছেন। আমরা পারব না কেন?
সাবিনা ইয়াসমীন: ব্যবস্ততার মধ্যেও সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
হেলেনা জাহাঙ্গীর: আপনাকেও ধন্যবাদ।

রোদসী/আরএস

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

one + fifteen =