জরায়ু ক্যান্সার:প্রতিরোধের সফল উদাহরন

করেছে Sabiha Zaman

‘ক্যান্সার’ রোগটির নাম শুনলেই বেশির ভাগ মানুষের  মনে আতঙ্ক তৈরি হয় যার কারণ আমরা ধরেই নিয়েছি ক্যান্সারের শেষ পরিণতি মৃত্যু। কিন্তু একটু সচেতন হলেই এই রোগ থেকে মুক্তি সম্ভব।  ক্যান্সার আক্রান্তদের এক তৃতীয়াংষই সেরে উঠতে পারেন। আজ বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। প্রতিবছর ৪ ফেব্রুয়ারি সারা বিশ্বে ক্যান্সার দিবস পালন করা হয়। বিশ্বে ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করাই  দিবসটির উদ্দেশ্য।  ক্যান্সার জয় করার গল্প নিয়ে আজ আমাদের এই বিশেষ লেখা। লিখেছেন অধ্যাপক পারভীন শাহিদা আখতার।

বাংলাদেশে নারীদের প্রধান রোগের মধ্যে পড়ে ক্যান্সার। নারী ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ১৮%। খুব ধীরে ধীরে সৃষ্টিহয় এ রোগ। এক যুগের ও বেশি সময় ধরে জরায়ু মুখের স্বাভাবিক কোষ পরিবর্তিত হতে থাকে। এক সময়ে তা ক্যান্সারে রূপ নেয়।ক্যান্সার কোষ সংখ্যা বেড়ে বেড়ে তা পিন্ডের আকার ধারন করে। জরায়ু মুখের ক্যান্সার পিন্ডটি ক্ষত হয়ে বিভিন্ন সংক্রামক রোগঘটায়। বিভিন্ন প্রকার উপসর্গ দেখা দেয়। যেমন পানির মত  স্রাব, দুর্গন্ধযুক্ত  স্রাব, রক্তক্ষরন, জ্বর, নীচের পেটে ও কোমরে ব্যথা, খাবারে রুচি কমে যাওয়া এবং দূর্বলতা ইত্যাদি। যথাসময়ে চিকিৎসা না হলে এ রোগ ভয়াবহ রুপ নেয়। তখন আর নিয়ন্ত্রেনের মধ্যে থাকেনা।

যে সকল বিষয় এ রোগের সূচনা ঘটায়-

  •  হিউম্যান পেপিলোমা ভাইরাসের আক্রমন।
  •  অল্প বয়সে বিয়েবা যৌনসম্পর্ক করা, একাধিক বিয়ে বা একাধিক যৌনসাথী।
  •  ঘনঘন সন্তান ধারন।
  • প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপায়ী, পানের সাথে তামাক পাতা বা জর্দাখাওয়া, দাঁতের গোড়ায়তামাকপাতার গুড়া (গুল) ব্যবহার।
  • দীর্ঘদিনজন্ম নিয়ন্ত্রনবড়ি সেবন (এক টানা ১০/১২ বছরেরঅধিকসময়)
  • পুষ্টিহীনতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া।

যে বয়সেসাধারনতজরায়ুমুখক্যান্সারেআক্রান্তহয়ে থাকেন-
৩৫ হতে ৫৫ বছর বয়সীরা বেশী আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বিশ বছরের নীচে এ রোগ হয় না। ষাটবছরের পর ও এ রোগ হতে পারে, তবে তাদেও সংখ্যা তুলনামূলক কম। প্রাথমিক পর্যায়ে কোন উপসগর্ই থাকেনা।পরীক্ষাকরে তেমন চিহ্নবা ক্ষত চোখে দেখা যায় না। তবে সহবাসের পর রক্ত ফোটা দেখতে পাওয়াকে প্রাথমিক চিহ্ন হিসাবে দেখা হয়।
জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং-
উন্নতদেশে এ রোগের প্রকোপ অনেক কমে এসেছে এবং এ রোগজনিত মৃত্যুরহার উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে গেছে।নারী শিক্ষার প্রসার, উন্নত জীবনযাপন,স্বাস্থ্য-সচেতনতা,সর্বোপরি যুগান্তকারী ‘পেপ্সটেস্ট’ আবিষ্কার। (জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং এর একটি পদ্ধতি)

পেপ্স টেস্ট
এটি একটি সহজ পরীক্ষা। জরায়ুমুখ  হতে রসনিয়ে অনুবীক্ষণীক(মাইক্রোস্কোপিক) যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা। এ পরীক্ষা দিয়ে ক্যান্সার, ক্যান্সার হওয়ার পূর্ব অবস্থা ও জরায়ু মুখের অন্যান্য রোগ যেমন প্রদাহ (ইনফ্লামেশন) সনাক্ত করা যায়। এতে কোন ব্যথা হয় না। এ টেস্টে খরচও কম। স্বাধারনত বিবাহিত মহিলাদেও বিয়ের তিন বছর হতে (২১ বছরেরআগেনয়) এ টেস্ট শুরু করা যেতে পারে এবং ৬৪ বছর বয়স পর্যন্ত প্রতি ৩ বছর পর পর এ টেস্ট করা উচিত। তবে চিকিৎসকের পরামর্শে এ রুটিনের পরিবর্তন হতে পারে।হিউম্যান পেপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি)
জরায়ু মুখেরক্যান্সার এর জন্য এটি একটি অন্যতম প্রধান কারণ (শতকরা ৭০ভাগ)। তবে একমাত্র কারণ নয়। যৌনসংযোগে এর সংক্রামন ঘটে।অল্পবয়সে বিয়েবা যৌনসংযোগে এ সংক্রামনের ঝুঁকি অনেক গুন বেশী।

  •  এ যাবৎ ১০০ প্রকার এইচপিভি সনাক্ত হয়েছে। এদের বেশীরভাগই (৭০%)জরায়ু ক্যান্সার এর জন্য তেমন ঝুঁকি পূর্ননয়। তবে জরায়ু ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ন এইচপিভিনং ১৬, ১৮, ৬, এবং ১১।
  • এ সকল ভাইরাসে আক্রমন হলেই যে ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়, তা নয়। স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্থ নারীরা প্রায়ই এইচপিভি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকেন। এতে কোন উপসর্গ থাকেনা । শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাবলে ১৮-২৪ মাসের মধ্যে জরায়ু প্রায় সকলএইচপিভি মুক্ত হয়েযায়।
  • কেবল মাত্র জরায়ুতে এইচপিভি দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে, জরায়ু কোষে পরিবর্তনের সূচনাকরে। অতি ঝুঁকিপূর্ন এইচপিভি আক্রান্ত হলে জরায়ুমুখ, জরায়ুপথ,পায়ুপথ এবং সংলগ্ন স্থানে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন প্রকার রোগ হতে পারে।
  •  যে সকল বিষয় জরায়ুতে এইচপিভির স্থায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়,তাহলো’- ধূমপান ও তামাক পাতার ব্যবহার যেমন পানজর্দা, সাদাপাতা, গুল (তামাকের গুড়া), দীর্ঘদিন জন্ম নিয়ন্ত্রনবড়ি সেবন (১০-১২ বছর), অপুষ্টি, ঘনঘন সন্তান ধারন, এইডস, জরায়ুতে অন্যান্য ইনফেকশন ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ইত্যাদি।

এইচপিভি টেস্ট করার নিয়মাবলি-

  • জরায়ু মুখ হতে রস নিয়ে ডিএনএ টেস্ট করে এইচপিভি সনাক্ত করা যায়।
  •  এইচপিভি টেস্ট করার পূর্বে অবশ্যই পেপ’স টেস্ট করা হয়।
  • জরায়ু মুখ ক্যান্সারের জন্য অতিঝুঁকিপূর্ন নারীদের এ টেস্ট করা হয়। তবে ত্রিশবছরের কম বয়সীদের এ টেস্ট করা হয় না। কারন কম বয়সীরা প্রায়ই এইচপিভিআক্রান্ত হয়ে থাকে এবং স্বাভাবিক নিয়মেই শরীর ভাইরাস মুক্ত হয়ে যায়। এইচপিভি টেস্ট তাদের অহেতুক ভীতির সৃষ্টি করতে পারে।

এইচপিভি আক্রান্ত হলে করণীয়-

  • সাধারনভাবে এইচপিভি আক্রন্তদের কোন চিকিৎসা নাই। চিকিৎসার কোন প্রয়োজন হয় না।
  •  তবে যদি জরারু মুখ ক্যান্সারের জন্য ঝুঁকিপূর্ন নারী, তার পেপস টেস্ট অস্বাভাবিক((ডিস্প্লেসিয়া) এবং একই সঙ্গে অতি ঝুঁকিপূর্ন এইচপিভি আক্রন্ত হয়ে থাকেন, তাকে অবশ্যই এ রোগ সম্পর্কে সর্তক করা হয়।
  •  এইচপিভি আক্রান্ত জরায়ু মুখে ক্ষত হয়েছে কিনা আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য কল্পোস্কোপি (এক ধরনের যন্ত্র যাদি য়েজরায়ুমুখ ২ হতে ২৫ গুন বড়করে দেখা যায়) দ্বারা জরায়ু মুখ ভালো ভাবে পরীক্ষা করা হয়। যাতে ক্যান্সারপুর্ব অবস্থায় রোগ সনাক্ত করা হয়। যদি জরায়ুতে কোন অস্বাভাবিকতা সনাক্ত হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে চিকিৎসার বিভিন্ন রকম পদ্ধতি আছে।
  •  পূনপূন পরীক্ষা করে দেখা। শুধু মাত্র লক্ষ রাখা। সময়ের সাথে সাথে অনেক ক্ষেত্রে জরায়ুমুখের অস্বাভাকিত
  •  (ডিস্লপেসিয়া) স্বাভাবিক হয়ে যায়।
  •  লিপঃইলেক্ট্রিক যন্ত্রেও সাহায্যে জরাযু মুখের আক্রান্ত কোষ কেটে ফেলা হয়।

এইচপিভি এর প্রতিরোধ-

  • কার্যকর প্রতিরোধ হলো এইচপিভির মাংস পেশীতে ইনজেকশন উপযোগী টিকা নেয়া।
  • এইচপিভি-১৬ ও ১৮ এর প্রতিশেধ কটিকা (সারভারিক্স) কিংবা এইচপিভি-১৮,১৬,১১ ও ৬ প্রতি শেধো কটিকা (র্গাডাসিল) টিকা নেয়া হলে শরীরে উল্লেখিত ভাইরাসের বিরেদ্ধে কার্যকর এন্টিবডি সৃষ্টি হয়। জরায়ুতে ঝুঁকিপূর্ন ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ারর সাথে সাথে পূর্ব হতে সৃষ্টি ওয়া এন্টিবডি তা ধ্বংসকওে দিতে সক্ষম হয়।
  •  মেলা মেশায় কনডম ব্যবহার করা।

আমেরিকার ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) নিয়মানুযায়ী ৯বছর হতে ২৫ বছর বয়সে এ টিকা কার্যকর হয়। যে কোন এক ধরনের টিকা (সারভারিক্স অথবার্গাডাসিল) বার/তেরবছরের বালিকাদের এইচপিভি আক্রান্ত হওয়ার আগে দেয় হয়।

এইচপিভি টিকার নিয়মাবলী-
দুটি ডোজঃ ৯-১৪ বছরপর্যন্ত (প্রথম ও ষষ্ঠমাসে)
তিনটি ডোজঃ ১৫-২৫ বছর পর্যন্ত (প্রথম, দ্বিতীয় ও ষষ্ঠমাসে)

এইচপিভিটিকাসম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ন তথ্য-

  • বিবাহিতজীবনযাপনকরানারীদের এ টিকা তেমনকার্যকরী হয় না।
  • গর্ভাবস্থায় এ টিকা নেয়াএখনওঅনুমোদনহয়নি।
  • এইচপিভিইনফেকশন হয়ে যাওয়ার পর বা ক্যান্সার হয়ে যাওয়ারপর টিকা দিলে কোন কাজে আসেনা। কারন এ টিকা ইনফেকশন দমন করতে পারেনা এবং ক্যান্সার গতিরূদ্ধ করতে পারেনা।
  • এ টিকা গ্রহন কারীকে ও নিয়মিত পেপস টেস্টে অংশ নিতে হবে।

জরায়ু মুখের ক্যান্সার প্রতি রোধেনিম্নলিখিত বিষয়গুলি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন

  •  বাল্য বিবাহবন্ধকরা।বাংলাদেশেরপ্রচলিতআইন (মেয়েদেরবিয়েরবয়স ১৮ বছর) মেনেচলা ।
  • অধিকসন্তান নেয়া থেকে বিরত থাকা।
  • প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষধূমপান ওতামাকপাতারব্যবহার (পানের সাথে জর্দা,সাদাপাতা, গুল) বন্ধকরা ।
  • সুষম খাবার খাওয়াযাতে পুষ্টি ঘাটতিনা থাকে। প্রতিদিন ৪-৬ বার টাটকা শাকসবজি, তরকারী এবং দেশীফল খেতে হবে।
  • পরিস্কার পরিচ্ছন্ন , স্বাস্থ্যসম্মত ও সুশৃংখল জীবন যাপন করা।
  • একটানা দীর্ঘ দিন জন্মনিয়ন্ত্রন বড়ি সেবন না করা
  • নিয়মিত পেপস টেস্টে অংশ নেয়া
  • নিয়মানুযায়ী এইচপিভি টিকা নেয়া

অধ্যাপক পারভীন শাহিদা আখতার
মেডিকেল অন কোলজিস্ট,
শান্তি ক্যান্সার ফাউন্ডেশন
সাবেক বিভাগীয় প্রধান, জাতীয় ক্যান্সার গবেষনা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল।

ছবি :  রোদসী ও সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

twelve − twelve =