জীবনে কখনো শো অফ করিনি

করেছে Rubayea Binte Masud Bashory

রাইসিন গাজী। পাকিস্তানের পেশোয়ারে তার জন্ম। তখন অবশ্য দেশভাগ হয়নি। জীবনের অনেক কিছু তিনি তার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে বন্দী করেছেন। মানবিক মানুষ হিসেবে রাইসিন গাজী বিবেকের কাছে অনেক হিসাব-নিকাশ এখনো মেলাতে পারেননি। তিনি পেশাগত জীবনে একজন শিক্ষক। তার গল্প উঠে এল রোদসীর নারী দিবস সংখ্যায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুরাইয়া নাজনীন

 

জীবন নিয়ে বলুন-

রাইসিন গাজী- তখন সময়টা ১৯৭৫ সাল। আমার পড়াশোনা ভারতেশ্বরী হোমস থেকে। আমি ওখান থেকেই এসএসসি পাস করি। তারপর কাজ আমাকে তাড়া করে ফেরে জীবনের প্রয়োজনে। আমি একটি এনজিওতে চাকরি নিই। তার দু-তিন বছরের মাথায় আমার সন্তান হলো। কিন্তু জীবনটা ঠিক থমকে গেল। শ্বশুরবাড়ির দিক থেকে আমাকে কোনো সহযোগিতা করা হলো না। কিন্তু পড়াশোনাটা চালিয়ে গেলাম। আমার মেয়ের যখন ছয় বছর বয়স, তখন আমি আলাদা হয়ে গেলাম। ওই তখন থেকেই আমাদের একা পথচলা। আমি সে সময় নারায়ণগঞ্জ গার্লস হাই স্কুলে শিক্ষক হিসেবে নিজের নাম লেখালাম। আমার বয়স তখন ২২ বছর। একা মেয়েকে নিয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে আমাকে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হলো। আমি হাঁপিয়ে উঠছিলাম। পরে ধানমন্ডিতে আমার বোনের বাসায় চলে গেলাম, আর ওখান থেকেই প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জ গিয়ে শিক্ষকতা করতাম। তখন পরিবহন সুবিধা ততটা ভালো ছিল না। তাই আর ওটা নিয়মিত করতে পারিনি। কিন্তু ঘরে বসেই আমি শুরু করলাম স্টুডেন্ট পড়ানো। প্রচুর পরিমাণ স্টুডেন্ট হয়ে গেল কদিনেই। শুধু ইংলিশ পড়াতাম। যেহেতু আমার হাতেখড়ি পাকিস্তানের স্কুলে, তাই ইংরেজির উচ্চারণসহ সবকিছু খুব ভালো রপ্ত ছিল।

পাওয়া না পাওয়ার গল্পগুলো জানতে চাই

রাইসিন গাজী : আমি অতি ক্ষুদ্র একজন মানুষ। তবে কারও বিপদে আমি ঘুমিয়ে থেকেছি তেমন রেকর্ড নেই। এই যে যখন রোহিঙ্গা আসা শুরু হলো, তখন আমি একাই ছুটে গেছি দেখতে যে কী অবস্থা ওখানে। খুব সামান্য পরিমাণ সাহায্য নিয়ে গিয়েছিলাম। যেতেই তা নেই হয়ে গিয়েছিল। আমি তখন হোটেলের লাউঞ্জে বসে ভাবছি কী করা যায়। ভাবতে ভাবতে একজন ফ্রেঞ্চ লেডি সেখানে এলেন। হাসি দিয়ে আমার সঙ্গে মতবিনিময় হলো। দু-একটা কথা বলতে বলতে তিনি বললেন আমাদের সঙ্গে কাজ করবেন? আমি খুবই অবাক হই। বললাম কী করতে হবে? তিনি বললেন কিছুই না, আপনি দোভাষীর কাজ করবেন। আমি এদিক-ওদিক না ভেবে রাজি হয়ে গেলাম। অনেকটা দিন তাদের সঙ্গে কাজ করা হয়েছিল। আমাকে অনেক ইউরো মুদ্রায় সম্মানী দিয়েছিল। কিন্তু সে সময় প্রয়োজনটা আমার থেকে রোহিঙ্গাদের বেশি ছিল, তাই পুরোটাই আমি ওদের দিয়ে আসি। এর থেকে আমি যে আত্মতৃপ্তি পেয়েছি, কোটি টাকাতেও তার হিসাব করা যাবে না।

শুরুতে করোনার সময় নিয়ে কথা হচ্ছিল, সে সম্পর্কে জানতে চাই

রাইসিন গাজী : যখন করোনা বলে কোনো একটি মহামারি পুরো বিশ্বে ছেয়ে গেল, তখন সবাই আতঙ্কে। সুরক্ষাসামগ্রীগুলো গায়েব হতে থাকল বাজার থেকে। আমার চিন্তা সব সময়, মানুষের জন্য কিছু করব, আমার যা কিছু আছে তার থেকেই কিছু করতে হবে। আমি মাস্ক দেওয়া শুরু করলাম। প্রায় ৯০ হাজার পিস মাস্ক দিলাম, লেবার থেকে শুরু করে পুলিশ, পথচারী সবাইকে। তবে কয়েক দিন দেওয়ার পর লক্ষ্য করলাম ওদের খাবার দরকার। তখন চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, তেল দেওয়া শুরু করলাম। কয়েক দিন যাওয়ার পর আমিও কুলিয়ে উঠতে পারছিলাম না। পরে শুধু চাল আর ডাল দিয়ে দীর্ঘদিন চালিয়েছি। আবার দেখলাম মানুষের বিপদের সীমা-পরিসীমা নেই। কারও কারও আর্থিক সহযোগিতা এত প্রয়োজন তাদের পাশে দাঁড়ালাম। দূরের নানা জেলা থেকে আমার কাছে এসেছে সাহায্যের জন্য। কয়েকটি পরিবারকে ভ্যান কিনে দিলাম। পরে দেখা গেল পুলিশে মেইন রাস্তায় ভ্যান চালাতে দিচ্ছে না। পরে আমি তাদের বললাম আপনারা আলু, পেঁয়াজের ব্যবসা করেন। তখন আবার টাকা দিলাম ব্যবসার জন্য, তারা একপর্যায়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলো। একটা সময় বলল আমাদের আর সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আমরা এখন চলতে পারি। এ কথা শুনে আমার মনটা প্রাপ্তিতে ভরে গেল।

ব্যক্তিগতভাবে আপনি অনেক সমাজসেবামূলক কাজ করেছেন, করছেন কিন্তু কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হননি কেন?

রাইসিন গাজী : আমি যতটুকু করেছি, নিজের বিবেক থেকে করেছি। একজন মানুষ হিসেবে যতটুকু আমার দায়িত্ব বলে মনে হয়েছে এবং হয় সেই জায়গা থেকেই আমি কাজ করি। জীবনে যত কাজ করেছি তার প্রমাণ কিংবা ছবি রাখা হলে তা আজ একটা ঘরে জায়গা ধরত না, কিন্তু আমি কোনো দিন কোনো ছবি তুলে রাখিনি। মানুষের পাশে দাঁড়ালে মনের যে আত্মতৃপ্তি, ওটাই আমি অনুভব করি আর ওটাই আমার সব থেকে পড় পাওয়া। সংগঠনের ব্যানারে কাজ করলে তখন আলাদা হিসাব-নিকাশ চলে আসে। কিন্তু ওসবে আমি কখনো যেতে চাইনি। আমার স্বল্প আয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি যতটুকু পারি, ততটুকুই আমার প্রাপ্তি। এখনো রাত-বিরাতে কারও কোনো প্রয়োজন হলে ঠিক আমার বাসাটাতেই সবাই নক করে। এটা আমার অর্জন বলে আমি মনে করি।

আপনার সন্তানকে নিয়ে অনেক যুদ্ধজীবন পার করতে হয়েছে, বলবেন কি কিছু তা নিয়ে?

রাইসিন গাজী : আমি মনে করি, আমার মেয়ে পৃথিবীর সেরা সন্তান। ও ঠিক আমার মতো করেই ভাবে। আমি ওকে নারী হিসেবে মানুষ করিনি, ওকে একজন মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছি। ওর যতখানি ইচ্ছা ঠিক ততখানি আমি পূরণ করেছি। তবে ও আমাকে খুব বোঝে। আমার মেয়ের নাম মিনান। ওর গল্প বলতে গেলে হয়তো সময় ফুরাবে না। মিনান এখন একজন নারী স্কেটার। সে স্কেটিংয়ের ক্লাব পরিচালনা করে। অনেক ছোট ছোট শিশুকে স্কেটিং করা শেখায়। ছোট্ট একটি জুতা দিয়ে যে আকাশ ছোঁয়া যায়, মিনান তা প্রমাণ করেছে। আমাদের পরিবারে তিনজন সদস্য মিনান, আমি ও তার স্বামী। অনেক সহযোগী মানসিকতার মানুষ মিনানের স্বামী। আমরা যেকোনো কাজ করার আগে তিনজন মিলে মিটিং করি। তারপর সেটা খুব সুন্দর ও সহজভাবে তা পরিচালনা করি। এভাবেই জীবন চলছে তো বেশ।

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

two × three =