‘জয় বাংলা’র সুলুকসন্ধান

করেছে Wazedur Rahman

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ‘জয় বাংলা’ নিছক একটি স্লোগানই নয়। বাঙালি জাতির প্রগতিশীল রাজনৈতিক ইতিহাস। ‘জয় বাংলা’ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বা মানচিত্র সৃষ্টির মর্মমূলে বিপ্লবী চেতনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ জাগ্রতকরণের মহাপ্রয়াসী, সীমাহীন সাহসের প্রেরণা ও রক্তাক্ত ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেও সর্বজন সমাদৃত। অপশক্তির গুটি কয়েক অনুচরের ভিন্নমত ভিন্নপথ। পাকিস্তানি ঘৃণ্য-ঘাতক সেনাদের নির্মম নির্যাতন, অন্যায়, অত্যাচার ও শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ, প্রতিরোধ ও ঐক্যের উদাত্ত আহ্বানের সংগ্র্রামী সংকেত ‘জয় বাংলা’, যা শোষিত-বঞ্চিত মানুষের শোণিত ধারায় অদৃশ্য আগ্নেয়গিরির লেলিহানশিখা হয়ে জ্বলে উঠত। যেকোনো অপারেশন কিংবা পাকসেনাদের দুর্গে মরণপণ আঘাত হেনে জয়ের মহোল্লাসে অপ্রতিরোধ্য মুক্তিসেনা ও মুক্তিকামী মানুষের ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’।

সম্ভ্রমহারা বোনের বোবাকান্না, সন্তানহারা মায়ের অসহায় আর্তনাদ, বৃদ্ধ বাবার প্রার্থনা আর মৃত্যুপথযাত্রী মুক্তিসেনার প্রতিবাদী উচ্চারণ ‘জয় বাংলা’। স্বদেশপ্রেমিকের সম্মুখগতি, দুর্বলচিত্তের অতলান্তিক গভীরে বিপ্লবী চেতনাজাগানিয়া এই জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’র উৎস ও উৎপত্তি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ গীতিকবিতা থেকে। বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘জয় বাংলা’ শব্দযুগল কাজী নজরুল ইসলামের ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ গীতিকবিতার ২৭তম পঙক্তির প্রথমাংশ থেকে নির্বাচন করেছেন। সাম্যের কবি নজরুল ইসলাম ৫৪তম পঙক্তিতে এ কবিতাটির সার্থক সমাপ্তিরেখা টেনেছেন। শিকড়সন্ধানী গবেষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী ও পাঠককুলের অনুকূল আস্থা সমবৃদ্ধির অণুপ্রাসে নিম্নে ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতার কিছু লাইন তুলে ধরা হলো :

পূর্ণ অভিনন্দন
কাজী নজরুল ইসলাম

এসো অষ্টমী-পূর্ণচন্দ্র! এসো পূর্ণিমা-পূর্ণচাঁদ!
ভেদ করি পুন বন্ধ কারার অন্ধকারের পাষাণফাঁদ!
এসো অনাগত নব-প্রলয়ের মহাসেনাপতি মহামহিম!
এসো অক্ষত মোহান্ধ-ধৃতরাষ্ট্র-মুক্ত-লৌহ-ভীম!
…………………………………………….

ওগো অতীতের আজো-ধূমায়িত আগ্নেয়গিরি ধূম্রশিখ!
না-আসা-দিনের অতিথি তরুণ তব পানে চেয়ে নির্নিমিখ।
জয় বাংলার পূর্ণচন্দ্র, জয় জয় আদি-অন্তরীণ,
জয় যুগে-যুগে-আসা-সেনাপতি, জয় প্রাণ আদি-অন্তহীন!
স্বাগত ফরিদপুরের ফরিদ, মাদারীপুরের মর্দবীর,
বাংলা মায়ের বুকের মানিক, মিলন পদ্মা-ভাগীরথীর!

[মাদারীপুর শান্তি সেনাবাহিনীর প্রধান অধ্যক্ষ পূর্ণচন্দ্র দাস মহাশয়ের কারামুক্তি উপলক্ষে ছোট হাতে শ্রী কালিপদ রায় চৌধুরীর অনুরোধে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতাটি রচনা করেন।]

‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতার বিভিন্ন পঙক্তিতে সুপরিকল্পিত বাক্যবিন্যাসে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ফরিদপুরের ফরিদ এবং মাদারীপুরের মর্দবীর ৮ বার উল্লেখ করেছেন। জয় শব্দটি উল্লেখ রয়েছে ২ বার, আর ‘জয় বাংলা’ উল্লেখ করেছেন ১ বার। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের বর্ণনায় ইতিপূর্বে বাংলা সাহিত্যে কোথাও ‘জয় বাংলা’ শব্দটি এভাবে ব্যবহার করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু যখন ‘জয় বাংলা’ শব্দযুগল তার ঐতিহাসিক ভাষণে উচ্চারণ করলেন, তখন থেকেই এটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে।

এ প্রসঙ্গে আরও বিস্তৃত তথ্য জানা যায় শামসুজ্জামান খানের ‘বাংলাদেশের উদ্ভব ও জয় বাংলা’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে। ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতাটি রচনার নেপথ্যে রয়েছে বেশ কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা। কাজী নজরুল ইসলাম এ কবিতাটি লিখেছেন কালিপদ রায়চৌধুরী বহরমপুর কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায়। নজরুল ইসলাম ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতাটি স্বহস্তে লিখে পাউরুটির ভেতরে ভরে পাঠিয়েছিলেন ব্রিটিশ বিপ্লবী নেতা কালিপদ রায়চৌধুরীর নিকট। মাদারীপুরের কৃতী সন্তান এবং অন্যতম ব্রিটিশবিরোধী নেতা পূর্ণচন্দ্র দাসকে নজরুল ইসলাম নিবেদন করেছিলেন এ কবিতাটি। উল্লেখ্য, তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ৮ জন বিপ্লবী নেতার মধ্যে ৬ জনই ছিলেন মাদারীপুরের কৃতী সন্তান।

বহরমপুর কারাগারের একটি অনুষ্ঠানে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও পূর্ণচন্দ্র দাসের সঙ্গে কালিপদ রায়চৌধুরী সারা দিন একসঙ্গে থাকার সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রতীক্ষার পালা শেষে একসময় পূর্ণচন্দ্র দাস কারামুক্ত হলেন। তাকে মাদারীপুরে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করা হয়। তখন কালিপদ রায়চৌধুরী নজরুল ইসলামকে একটি কবিতা লিখতে অনুরোধ করেন। এদিকে কালিপদ রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র মামলা খারিজ হলে মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকেন, এক সকালে নাশতার চা-পাউরুটি খেতে গিয়ে পাউরুটির ভেতরে ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ শিরোনামে নজরুলের স্বহস্তে লিখিত কবিতাটি দেখতে পান। কবিতাটি হস্তগত হলে কালিপদ রায়চৌধুরী নীরব আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠেন। এদিকে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।

কিন্তু চিন্তায় পড়ে গেলেন এই কবিতা নিয়ে তিনি কী করে কারাগার থেকে বের হবেন। যদি কারা কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়েন, কবিতা তো রেখে দেবেই, কবিতার জন্য পরিণামে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাও হতে পারে। বিপ্লবীরা কেউ কখনো কারা নির্যাতন ভয় করেন না, কিন্তু কবিতাটি কেমন করে রক্ষা করবেন। পূর্ণচন্দ্রের অভ্যর্থনা সভায় কবিতাটি পাঠ করা হবে। কালিপদ রায়চৌধুরী তার স্মৃতিচারণায় লিখেছেন ‘কবি আমার অনুরোধ রেখেছেন’ মন আনন্দে ভরে উঠল। জেল থেকে বেরোনোর সময় পাছে জেল কর্তৃপক্ষ গেট তল্লাশি করে সেটা রেখে দেয়, সেই ভয়ে বারবার পড়ে কবিতাটি মুখস্থ করে ফেললাম। ঠিক মনে আছে কি না পরীক্ষার জন্য বারবার তা মনে মনে আবৃত্তি করি।

অবশেষে কবিতাটি বারবার স্মরণ করতে করতেই একদিন জেল থেকে বের হলাম।’ কালিপদ রায়চৌধুরী জেল থেকে মুক্তি পেয়ে প্রথমে বহরমপুর কংগ্রেস অফিসে গিয়ে কবিতাটি স্মৃতি থেকে কাগজে লিখে রাখেন। তিনি উক্ত কবিতার একটি কপি ডাকযোগে মাদারীপুর পাঠিয়ে দেন, আরেকটি কপি নিয়ে কালিপদ রায়চৌধুরী মাদারীপুরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। পূর্ণচন্দ্র দাস কারামুক্ত হওয়ায় মাদারীপুরে তার জন্য যে অভ্যর্থনাসভার আয়োজন হয়, সেখানে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতাটি পাঠ করা হয়।

কাজী নজরুল ইসলাম এ কবিতাটিকে গীতিকবিতা হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। গীতিকবিতা অথবা কবিতা যা-ই হোক না কেন, এই রচনা থেকে আহরিত হয়েছে আমাদের জাতীয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’। জয় বাংলা রচনার প্রেরণা ছিল বিপ্লবী বীর কালিপদ রায়চৌধুরীর অনুরোধ। যা এখন বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হিসেবে ইতিহাস থেকে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃত। আ স ম আবদুর রবের একটি সাক্ষাৎকার পাঠে জানা যায়, ১৯৭০ সালের ৭ জুন ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত বিশাল জনসভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবারের মতো ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি উচ্চারণ করেছিলেন। এরপর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে ঐতিহাসিক ভাষণও তিনি সমাপ্ত করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ দিয়ে। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ যে ভাষণটি এখন বিশ্ব প্রামাণ্য দলিল হিসেবে জাতিসংঘের ইউনেসকো কর্তৃক স্বীকৃত।

মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ‘কিশোর মুক্তিযোদ্ধা কোষ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঙালির প্রেরণার উৎস। সফল অপারেশন শেষে বা যুদ্ধজয়ের পর অবধারিতভাবে মুক্তিযোদ্ধারা চিৎকার করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে জয় উদ্্যাপন করত। ১৯৭১ সালের শুরু থেকে বর্ষীয়ান জননেতা মাওলানা ভাসানী ‘স্বাধীন বাংলা জিন্দাবাদ’ ‘আজাদ বাংলা জিন্দাবাদ’ প্রভৃতি স্লোগান ব্যবহার করতেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদানের পর থেকে জনসভায়, মুক্তির মিছিলে এবং বিভিন্ন প্রচারণায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটির বহুল প্রচার হতে থাকে। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেছিলেন, পাঠের শেষে তিনিও ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে বিভিন্ন সময়ে ‘জয় বাংলা’ ব্যবহার করা হতো। তখন বেতারকেন্দ্রে স্বাক্ষর সঙ্গীত ছিল ‘জয় বাংলা’ বাংলার জয়, স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে ১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের প্রথম বেতার ভাষণটি শেষ করেছিলেন ‘জয় বাংলা ‘জয় স্বাধীন বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর শুরু হয় ইতিহাস বিকৃতির ষড়যন্ত্র। সেই দুর্দিনেও আওয়ামী লীগই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে তৃণমূল পর্যায়ে বাঁচিয়ে রেখেছে, যা উচ্চারণের উদ্দেশ্য পাকিস্তানের প্রতি ধিক্কার। কবি নজরুল ইসলাম রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘ভাঙার গান’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায় বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম ‘জয় বাংলা’ শব্দটির উৎপত্তি ঘটে। ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে শিক্ষা দিবস (মার্চ ১৭) যৌথভাবে পালনের জন্য তিন দিনের এক কর্মসূচি প্রণয়নের সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত সভায় তৎকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আফতাব আহমেদ ও হেলালুর রহমান চিশতী ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি সর্বপ্রথম উচ্চারণ করেন।

২০১১ সালে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনার ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আন্তর্জাতিক নজরুল সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি নজরুল ইসলামের কবিতা থেকে নেওয়া। ২০১৫ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৬তম জন্মবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে আবারও উল্লেখ করেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের সময় যে “জয় বাংলা” স্লোগান দিতাম, সেটি কবি নজরুলের একটি কবিতা থেকে বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন।’ ১৯৭০ সালের ৭ জুনের সমাবেশে শেখ মুজিবকে গার্ড অব অনার দিতে ছাত্রলীগ ‘জয় বাংলা বাহিনী’ গঠন করে। ১৯৬৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি থেকে ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ দেশব্যাপী পতাকা উত্তোলন, জয় বাংলার এই ক্রমবিকাশ হলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র অভ্যুদয়ের ইতিহাস।

১৯৭০ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটি প্রথম জনসমক্ষে ধ্বনিত হয়। ওই সভামঞ্চের ব্যাকগ্রাউন্ডে দেবদারু পাতা দিয়ে ‘জয় বাংলা’ লেখা ছিল। ১১ জানুয়ারি পল্টনের সমাবেশে নন্দিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান মঞ্চে এলে কে এম ওবায়দুর রহমান মাইক ছেড়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে গেলে সিরাজুল আলম খান মাইকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানান। শেখ মুজিবুর রহমান সিরাজুল আলম খানের ওই সম্ভাষণ গ্রহণ করেন। শেখ মুজিবুর রহমানের এই সম্মতিই ছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের জাতীয় স্বীকৃতির গ্রিন সিগন্যাল। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে স্লোগানটির অবিসংবাদী হওয়ার যাত্রা শুরু হয়। অনেকের মতে, ওই মঞ্চেই শেখ মুজিব প্রথম ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন। তবে অধিকাংশের মত, শেখ মুজিব প্রথম ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি উচ্চারণ করেন ৭ জুন রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে। সেই থেকে মিছিলে-মিটিংয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের জয়।

১৯৭০ সালের ৭ জুনের সমাবেশে শেখ মুজিবকে গার্ড অব অনার দিতে ছাত্রলীগ গঠন করে ‘জয় বাংলা বাহিনী’। বাহিনীর জন্য তৈরি করা হয় লাল-সবুজের একটি পতাকা। সিরাজুল আলম খানের নির্দেশে ও যৌথ পরিকল্পনায় পতাকা তৈরি করেন আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, কাজী আরেফ আহমেদ, মার্শাল মনি ও হাসানুল হক ইনু। বাহিনীর অধিনায়ক করা হয় আ স ম আবদুর রবকে, উপপ্রধান ছিলেন কামরুল আলম খান খসরু। সমাবেশে ‘জয় বাংলা বাহিনী’র কুচকাওয়াজ ও গার্ড অব অনার শেষে আবদুর রব শেখ মুজিবের হাতে পতাকা তুলে দেন। এরপর ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রেসকোর্সের আরেক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে তার ভাষণ সমাপ্ত করেন।

১৫ ফেব্রুয়ারি এই পতাকা নিয়ে রাজপথে কুচকাওয়াজ করে ‘জয় বাংলা’ বাহিনী। জয় বাংলা বাহিনীর এ পতাকাই জাতীয় পতাকা হিসেবে ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণে প্রথম উত্তোলন করেন আ স ম আবদুর রব। একই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে ‘আমার সোনার বাংলা’কে জাতীয় সংগীত স্থির করেন সিরাজুল আলম খান ও শেখ ফজলুল হক মণি। পরের দিন ৩ মার্চ পল্টনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় শেখ মুজিবের উপস্থিতিতে শাজাহান সিরাজ পাঠ করেন জয় বাংলার ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ (সূত্র : জয় বাংলা, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের ঘোষণা ও কর্মসূচি)।

ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার ওই ইশতেহারে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান ঘোষণা করা হয়। ২৩ মার্চ সারা দেশে উত্তোলিত হয় ‘জয় বাংলার পতাকা’ (পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসের বিপরীতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রতিরোধ দিবস)। ইতিমধ্যে যা অবিসংবাদী হয়ে উঠেছে জাতীয় পতাকা হিসেবে। ওই দিন পল্টনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের চার নেতা আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখনকে সামরিক অভিবাদন জানায় ‘জয় বাংলা বাহিনী’। ময়দানে পিস্তল থেকে গুলি ছুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলন করেন হাসানুল হক ইনু ও কামরুল আলম খান খসরু। এরপর ধানমন্ডিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গার্ড অব অনার দিয়ে পুনরায় তার হাতে পতাকা তুলে দেন আ স ম আবদুর রব। ওই দিন শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে প্রথম পতাকা উত্তোলিত হয়, সংসদের নিরঙ্কুশ বিজয়ী দলের প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে রবের বেঁধে দেওয়া জয় বাংলার পতাকা উড়িয়ে বঙ্গবন্ধু গণভবনে যান।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায় ব্যবহৃত ‘জয় বাংলা’ এভাবেই স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। এর মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে ইতিহাসের সমুজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে আছেন ‘মাদারীপুরের মর্দবীর’, ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী নেতা পূর্ণচন্দ্র দাস। ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতায় নজরুল ইসলাম তাকে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসার শীর্ষস্থান দিয়েছেন। ১৯৩৭ সালে মাদারীপুর মহকুমার বর্তমান রাজৈর উপজেলার সমাজ ইশিবপুর গ্রামের বাসিন্দা পূর্ণচন্দ্র দাসের বাড়িতেও নজরুল ইসলাম অতিথি হয়ে গিয়েছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম মাদারীপুরবাসীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন, মাদারীপুরবাসীকে ভালোবেসেই তার ‘সন্ধ্যা’ কাব্যগ্রন্থ উৎসর্গ করেছেন।

নজরুল ইসলাম বাংলাদেশে এসে সৃষ্টি করেছেন তার অমর সৃষ্টিসম্ভার। তিনি বৃহত্তর ফরিদপুরে এসেছিলেন ৮ বার। এর মধ্যে ফরিদপুরে ৬ বার, মাদারীপুর এসেছিলেন ২ বার। নজরুল ইসলাম ১৯২৫ সালের ১ মে প্রথম মূলত ফরিদপুরে আসেন কংগ্রেসের প্রাদেশিক সম্মেলনে যোগ দিতে। ফরিদপুরের টেপাখোলায় অনুষ্ঠিত হয় অলবেঙ্গল কংগ্রেস কনফারেন্স। ৪ জনের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে নজরুল ইসলাম ফরিদপুরে আসার পর পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের আমন্ত্রণে নজরুল ইসলাম তার অম্বিকাপুর বাড়িতে যান।

১৯২৬ সালের ৩ নভেম্বরে নজরুল ইসলাম তার নিজের নির্বাচনী প্রচারের কাজে ফরিদপুরে আসেন। ১৯২৮ সালে ফরিদপুর এসে তিনি জসীমউদ্দীনের বাড়িতেই উঠেছিলেন। তিনি কবি হুমায়ুন কবীরের কোমরপুরের বাড়িতেও গিয়েছিলেন। জেলা ছাত্র সম্মেলনে ১৯৩৬ সালের ২৭ জানুয়ারি কাজী নজরুল ইসলাম সভাপতির আসন অলংকৃত করতে ফরিদপুর এসেছিলেন। শেষবারের মতো ১৯৪১ সালের ১২ আগস্ট ফরিদপুর জেলা মুসলিম ছাত্রসংগঠনের সম্মেলনে যোগ দিতে নজরুল ইসলাম ফরিদপুর এসেছিলেন।

১৯২৬ সালের ১০ মার্চ নজরুল ইসলাম মাদারীপুর এসেছিলেন নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশনে যোগদান করতে। ওই সম্মেলনে কুমিল্লা থেকে এসেছিলেন রাজনৈতিক নেতা বসন্ত কুমার মজুমদার এবং তার স্ত্রী নারীনেত্রী হেমাপ্রভা মজুমদার। নজরুল ইসলাম তাৎক্ষণিকভাবে হেমাপ্রভাকে নিয়ে একটি গান রচনা করেন ‘কোন অতীতের আঁধার ভেদিয়া’ এ গানটি তিনি গেয়েও শোনান। মাদারীপুর শহর তখন ছিল বর্তমান রাস্তি ইউনিয়নের লক্ষ্মীগঞ্জে। তখন হাটবাজার, কোর্ট-কাচারী, হাসপাতাল, জেলখানা, অফিস-আদালত সবকিছু রাস্তির লক্ষ্মীগঞ্জে ছিল।

মৎস্যজীবীদের টহলঘরটিও ওখানেই ছিল, যেখানে নিখিল বঙ্গীয় ও আসাম প্রদেশীয় মৎস্যজীবী সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, একসময় আড়িয়াল খাঁ নদীর গর্ভে সেই সব জনপদ বিলীন হয়ে যায়। ১৯৩৭ সালে দ্বিতীয়বার নজরুল ইসলাম মাদারীপুরে আসেন। তখন তিনি উঠেছিলেন মহিষেরচর নিবাসী অ্যাডভোকেট আবুল ফজল মিয়ার বাড়িতে। তিনি সেখানে দুই দিন ছিলেন। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম মাদারীপুরে এসে এই মাটি ও মানুষের ভালোবাসায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। বিপ্লবী চেতনায় মাদারীপুরের অগ্নিযুগে সশস্ত্র বিপ্লবীদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এই মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন সমাজ ইশিবপুরের অগ্নিপুরুষ পূর্ণচন্দ্র দাস, প্রণবানন্দজী মহারাজ (বিনোদ দাস), প্রমোদ দাসগুপ্ত, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন রায়, সন্তোষ দত্ত, হরিপদ চক্রবর্তী ও হরিপদ দাসের মতো বিপ্লবী নেতা। পূর্ণচন্দ্র দাসের বিপ্লবী চেতনায় নজরুল ইসলাম ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতাটি লিখেছেন।

২০১৫ সাল থেকে ‘ইয়াং বাংলা’ আয়োজন করে আসছে ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’। দেশের তরুণসমাজের কাছে ‘তোমার জয় বাংলা কী?’ এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করছে। অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে। স্বীকৃতির অদম্য বাসনা নিয়ে সমাজ সম্ভাবনার স্বর্ণালি সৈকত ছুঁয়ে দিতে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ‘ইয়াং বাংলা’র ব্যাপক কর্মকাণ্ড। বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধান ও সম্ভাবনা নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কাজ করছে যেসব তরুণ, তাদের ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়।

যুবসমাজের উজ্জ্বল স্বপ্নগুলোকে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা এবং তাদের সাফল্যের লুকিয়ে থাকা ‘জয় বাংলা’র গল্পগুলো সবার সামনে উপস্থাপন করাই ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’-এর মূল লক্ষ্য। ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড-২০১৮’ বিজয়ীদের মধ্যে এবার যেসব ক্ষেত্রে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়েছে : জেন্ডার, দক্ষতা উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন, সাংস্কৃতিক আন্দোলন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন, জনসচেতনতামূলক উদ্যোগসহ অন্যান্য সামাজিক উন্নয়ন।

২০১৮ সালে মাদারীপুরে সর্বপ্রথম উদ্্যাপিত হলো ‘জয় বাংলা’ উৎসব। জয় বাংলা উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এমপির কালজয়ী এ মহান উদ্যোগ ‘জয় বাংলা’ উৎসব ইতিহাসের মাইলফলক হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে ‘জয় বাংলা’ উৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলা মায়ের কৃতী সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা, দেশবরেণ্য কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সব স্তরের আলোকিত মানুষকে বিশেষ অবদানের জন্য ‘জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করার প্রস্তাব অসংগত হবে না হয়তো। বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বপ্রথম মাদারীপুরে ‘জয় বাংলা’ উৎসব ২০১৮ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ উপলক্ষে মাদারীপুর জয় বাংলা উৎসব প্রকাশনা ‘বাঙালির অহংকার’ শিরোনামে মাননীয় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণীসংবলিত স্মরণিকা প্রকাশিত হয়েছে।

 

লেখা: মিলন সব্যসাচী 
ছবি: সংগ্রহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

nine + 12 =