টিনএজ প্যারেন্টিং

করেছে Sabiha Zaman

মনিকা পারভীন প্রীতি: আমাদের দেশের একটা কমন প্রবলেম টিনএজ প্যারেন্টিং। ১৩ থেকে ১৯ বছরের ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাবা-মায়েদের অভিযোগের যেন শেষ নেই। এটা শোনে না, কথা শোনে না, সারা দিন মোবাইলে পড়ে থাকে, সারারাত জেগে টিভি দেখে, পড়ালেখায় মন নেই, বাড়িঘর গুছিয়ে রাখে না, মায়ের কথা শোনে না, বাবার কথা শোনে না, আত্মীয়দের সঙ্গে বেয়াদবি, বড়দের সালাম দেয় না, বন্ধুবান্ধব ছাড়া কিছু বোঝে না এমন সব হাজারও অভিযোগ।
যে বাচ্চাকে তুমি ছোটবেলা থেকেই হাতে তুলে খাইয়ে দেওয়ার অভ্যাস করেছ। তার সব কাজ তুমি করে দিয়েছ। তার পড়ার সময় পাশে বসে থেকে তাকে পড়িয়েছ। তার নিজের কাজ কখনো নিজেকে করতে দাওনি বা শেখাওনি। সেই বাচ্চার কাছ থেকে তুমি কীভাবে আশা করো যে সে ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সে এসে সে একজন দায়িত্ববান টিনএজার হয়ে যাবে। এবং সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এটা কিন্তু বাচ্চাদের কোনো দোষ নয়। কিছু মা-বাবা অতিরিক্ত আদর কিংবা তাদের ভালোবাসাটা অতিরিক্তভাবে প্রকাশ করতে গিয়ে কখন যে বাচ্চাকে দায়িত্বহীন করে বড় করে ফেলে, তারা নিজেরাও বোঝে না। এবং এই সব বাবা-মাই বাচ্চাগুলো যখন বড় হয় তখনই বাচ্চাদের ওপর দোষ দেয়, ছোট ছিল তখন আমার সব কথা শুনত, কিন্তু বড় হয়ে এখন একটাও কথা শোনে না। এ রকম বিভিন্ন সমস্যার কারণে মা-বাবা এবং সন্তানের ভেতরে একটা মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়। এবং মানসিক দূরত্ব থেকে দেখা যায় যে বেশির ভাগ টিনএজারের বাইরের দিকে তাদের আকর্ষণ বেড়ে যায় এবং তারা অনেক সময় অনেক ধরনের খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে। কারণ তারা বাড়িতে যখন থাকে, তখন দেখা যায় যে মা-বাবার কাছ থেকে বকা, মার আর খারাপ ব্যবহার ছাড়া আর কোনো কিছুই পায় না। তখন তাদের কাছে মনে হয় যে তার বাইরের জগৎটা অনেক বেশি আনন্দের, বাইরের বন্ধুরা তাকে বেশি বোঝে। বাইরের বন্ধুরাই তার ভালো চায়। এ কারণে তারা বাইরের জগৎকে তাদের নিজের জগৎ হিসেবে ভাবতে শুরু করে। সেখানে কখন কী ধরনের ঘটনা ঘটে যেতে পারে আমরা মা-বাবারা কখনোই সেই নিশ্চয়তা বা গ্যারান্টি দিতে পারি না। আমাদের সমাজে ভুল প্যারেন্টিংয়ের ফলাফল হিসেবে আমরা দেখতে পাই কিশোর গ্যাংয়ের প্রাদুর্ভাব, উগ্রপন্থী বা জঙ্গিবাদে জড়িত অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা, মাদকের ব্যবহার, চুরি, ছিনতাই, কিডন্যাপিং, ধর্ষণ আরও অনেক কিছু। তৈরি হয় পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় সমস্যার।

 

দুই বছর বয়স থেকে আমরা যদি বাচ্চাকে শেখাই কোনটা কখন, কীভাবে করতে হবে, তাহলে বাচ্চা দায়িত্ববান হিসেবে বড় হবে ছোট থেকেই। বাচ্চা নিজের কাজ কখন কোনটা করতে হবে, সে তার মাথায় সেট করে ফেলবে। এতে উপকার হয় কার? বাচ্চার এবং বাবা-মার।
কিশোর বয়স বা ১৩ থেকে ১৯ বছর তোমার সন্তানকে নিশ্চিত করে যে সন্তান হাইস্কুলের পর তার পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে যাচ্ছে। তুমি সম্ভবত লক্ষ করবে যে তোমার কিশোর অনেক দিক দিয়ে বেশ স্বাধীন। তবে এটি এমন একটি সময়, যখন তুমি লক্ষ করবে যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার উন্নতি প্রয়োজন।
যখন তুমি লক্ষ করো যে তোমার কিশোর নির্দিষ্ট বিষয়ে স্ট্রাগল করছে, তখন তাকে নতুন জীবন দক্ষতা শেখাও। এবং তাকে দায়িত্বশীল এবং স্বাধীন হওয়ার অভ্যাস হওয়ার জন্য পর্যপ্ত সুযোগ দাও। এ সময় স্বাস্থ্যকর অভ্যাসের দিকে মনোযোগ দিলে তোমার কিশোরকে ভবিষ্যতে নিজে সব বিষয়ে যত্ন নিতে আর স্ট্রাগল করতে হবে না।

শারীরিক অ্যাকটিভিটি

এটা বলা হয়ে থাকে যে কিশোর -কিশোরীদের প্রতিদিন ৬০ মিনিট শারীরিক অ্যাকটিভিটি করা উচিত। অ্যারোবিক ব্যায়াম কিংবা ইয়োগা (যোগব্যায়াম) এসবের ভেতর অন্যতম। এ ছাড়া কিন্তু পেশি তৈরির ব্যায়াম, যেমন শক্তি প্রশিক্ষণ এবং হাড় গঠনের ব্যায়াম, যেমন জাম্পিং, সুস্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
যদি তোমার কিশোর সন্তানের খেলাধুলায় যোগ দিতে আগ্রহী না হয়, তাহলে তাকে জোর করবে না। তাকে এমন কিছু খুঁজে পেতে সাহায্য করো যা সে সত্যিই করতে চায়। দৈনন্দিন হাঁটা বা সাইকেল চালাতে যাওয়া বা সাঁতার একটি ভালো ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি হতে পারে, যা তিনি একটি দলীয় খেলার চেয়ে বেশি তারা উপভোগ করে।
এমনকি যদি তোমার কিশোর-কিশোরীরা খেলাধুলায় না-ও থাকে, তবে এমন অনেক অ্যাকটিভিটি রয়েছে, যা তাকে গতিশীল করতে পারে। তুমি শারীরিক অ্যাকটিভিটিকে পারিবারিক অ্যাকটিভিটিতে পরিণত করতে পারো। রাতের খাবারের পরে সন্ধ্যায় হাঁটতে যাও একসঙ্গে। সপ্তাহে একদিন সবাই মিলে বাড়ি পরিষ্কার, ছাদে কাজ করা বা বাগান করা হতে পারে ভালো কাজগুলোর একটি।
তোমার কিশোর সন্তানের স্ক্রিন বা পর্দার সময় সীমিত করো এবং তাকে বাইরে সময় কাটানোর জন্য উৎসাহিত করো। তার শরীরকে সুস্থ রাখার গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলো এবং সে অন্যদের জন্য যে ভালো রোল মডেল হতে পারে, তাতে উৎসাহিত করো। সন্তানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এক দিনে হবে না। ধৈর্য ধরে অনেক দিন ধরে করতে হবে। ওর বিশ্বাস অর্জন করতে হবে, যেন নির্দ্বিধায় সব কথা মা-বাবাকে বলতে পারে। কোয়ালিটি টাইম সন্তানের সঙ্গে কাটানো খুব জরুরি, যা আজকাল মা-বাবারা একদমই করে না। অতিরিক্ত শাসন, সব কথাতেই না বলাটা বাচ্চাদের পছন্দ নয়। তাই যা ওর জন্য খারাপ, যা তুমি বুঝছ কিন্তু বাচ্চা বুঝছে না, সেটা সরাসরি নিষেধ না করে অন্যভাবে বলো। অপশন তৈরি করো। তার ভেতর থেকে বেছে নিতে ওর আগ্রহ তৈরির চেষ্টা করো। সম্ভব হলে ভ্যাকেশনে নিয়ে যাও। মা-বাবা-সন্তান সবাই মিলে খোলামেলা আলোচনা করো। একসঙ্গে সিনেমা দেখো, গান শোনো, ছবি আঁকো, মজার কোনো রেসিপি ট্রাই করো। প্রতিদিন কোনো না কোনো অ্যাকটিভিটি করো বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে। বাচ্চা যখন নিজেকে পরিবারের থেকে দূরে দেখতে পায়, তখন সে অন্যদিকে মনোযোগ দেয়।

T

কারণ পরিবারের কাছে তার গুরুত্ব নেই মনে করে। তখন বাইরের জগৎটাই তার আপন হয়ে যায়। কথায় কথায় অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে তুলনা দেওয়া বন্ধ করো। এর বাচ্চা এমন তুমি কেন তার মতো নয়। এ রকম অনেক তুলনা করা বাচ্চাদের মানসিকতা নষ্ট করে দেয়। তোমার বাচ্চা যা ভালো পারে, তাতেই তাকে আরও বেশি উৎসাহ দাও। কথায় কথায় মুখ খারাপ, চিল্লাচিল্লি করাটা অনেকেরই অভ্যাস। এসবই বাচ্চাদের জন্য নেগেটিভ ইস্যু হিসেবে কাজ করে। বাচ্চার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক না থাকলে সে বাচ্চার কোনো সমস্যাই সমাধান করতে পারবে না। মারামারি, বকা, বন্দি করে রাখা এসবে সমস্যা বাড়ে বৈকি কমে না। টিনএজে মা-বাবা যদি বন্ধুসুলভ না হয়, বাচ্চা সহজেই বাইরের জগতের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। যা তার জন্য সব সময় ভালো না-ও হতে পারে। এ কারণে অনেক অল্প বয়সী বাচ্চাদের ড্রাগ এডিকশন, জঙ্গিবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়া, কিশোর গ্যাংয়ের মতো কালচারে জড়িয়ে পড়ে এবং যার ফল ভয়ংকর। মনে রাখা খুব জরুরি তোমার মা-বাবা তোমাকে হয়তো কঠিন শাসনে বড় করেছে এবং তুমি আজ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত বলে তুমি ভাবলেও। তোমার শৈশব আর এখনকার বাচ্চাদের শৈশব একদম ভিন্ন। পরিবেশ, সামাজিক ব্যবস্থা সব পাল্টে গেছে। তাই তুমি তোমার মা-বাবার শাসনের ধরনটা মেনে নিয়েই সবকিছু করেছ বলে তোমার বাচ্চাও তোমার মতো সব মেনে নেবে। এ ধারণা নিয়ে চলা ভুল। পাল্টে ফেলো এমন চিন্তাচেতনা।
সন্তানকে শেখাও ছেলেমেয়ে সবাই মানুষ। সবারই সমান সম্মান প্রাপ্য। সব ধর্ম ও বর্ণের সবাই সমান এবং সমান মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রাখে।
সে যখন বাইরে যায়, তখন সে নিজেকে শুধু নয়, তার পরিবারকেও উপস্থাপন করে তার সব আচার-আচরণে। কারণ একটি বাচ্চা যা কিছু শেখে, তার ৯০ শতাংশ শেখে তার পরিবার থেকে। তাই বাচ্চার বিরূপ আচরণের কারণে স্কুল বা তার বন্ধুদের দোষ আগে না দিয়ে নিজেদের পর্যবেক্ষণ করো কেন তোমার বাচ্চা এমন হলো।

 


সব সময় বাচ্চার যেকোনো কথা মনোযোগ দিয়ে শোনো। এতে সে বুঝবে তার পরিবার তার কথার গুরুত্ব দেয়। তার প্রতিটি কষ্টে সহমর্মিতা দেখাও, যাতে সে কখনো নিজেকে একা বোধ না করে। টিজ করে কথা বলার অভ্যাস একদম বাদ দাও। এই যেমন কী যে তোমাদের জেনারেশন বুঝি না বাবা কথায় কথায় ডিপ্রেশন, যা তোমার গায়ের রং একটু রূপচর্চা টর্চা করো, এত খাওয়ায় তা-ও মাথায় এক ছটাক বুদ্ধি নেই, এত জাংক ফুড খাবা আর মোটা হবা এই তোমার কাজ, সারা দিন মোবাইলে ঢুকে থাকোÑ এ ধরনের অনেক কথা আমাদের টিন বাচ্চারা শোনে প্রায় প্রতিদিনই। বডি শেইমিং, ক্যারেক্টার শেমিং, এডুকেশন শেমিং তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এবং তা শুরুই হয় পরিবার থেকে। তারপর আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী এদের কাছ থেকে অনেক নেগেটিভিটির ভেতর বড় হচ্ছে আমাদের বাচ্চারা। এগুলো থামানো ভীষণ জরুরি। এ সময় ম-বাবার পজিটিভ ভাইব ভীষণ প্রয়োজন একজন টিনএজার বাচ্চার। তাকে আশ্বাস দেওয়া যে এত নেগেটিভিটির ভেতরেও আমরা তোমার সঙ্গে আছি পাশে আছি। এই আশ্বাসটুকু তাকে যে আত্মবিশ্বাস দেবে তা সারা জীবনের জন্য তাকে বিভিন্ন বৈরিতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে আত্মবিশ্বাস দেবে। নিজেকে একা ভাববে না।
সারাক্ষণ একটা কিশোর বয়সী সন্তানের দোষ না ধরে আমরা যদি একটু ভেবেচিন্তে নিজেদের প্রতিদিনকার অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করি। আদিম চিন্তা দূর করে নতুন পথে নতুন আঙ্গিকে প্যারেন্টিংকে নিয়ে যেতে পারি। তবে প্যারেন্টিংয়ের মতো মধুর আর কিছু হতেই পারবে না। তুমি তোমার সন্তানকে বোঝো তোমার সন্তান অবশ্যই তোমাকে বুঝবে।


মনিকা পারভীন প্রীতি
প্যারেন্টস ট্রেনিং টিচার
ওমেন উইদাউট বর্ডার্স

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

four × 3 =