ডায়াবেটিক ফুটঃ সচেতনতা বাড়াতে হবে

করেছে Shaila Hasan

শায়লা জাহান

আজকাল ডায়াবেটিস রোগ এতটাই কমন যা কোন বয়সের দোহাই মানে না। এই রোগ নিয়ে কমবেশি সবাই জ্ঞাত থাকলেও এর দ্বারা সৃষ্ট অন্যান্য শারীরিক সমস্যা নিয়ে আমাদের তেমন ভ্রূক্ষেপ নেই। কিন্তু এই নিরব ঘাতক চোখ, পা, কিডনী’র উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। আর এমনই এক আতংকের নাম হল ডায়াবেটিক ফুট।

ডায়াবেটিস এমন এক রোগ যেখানে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা খুব বেশি থাকে। আমাদের নিত্যদিনের খাওয়া খাবার থেকে এই গ্লুকোজ আসে যা, শরীরের কোষের শক্তির জন্য প্রয়োজন। ইনসুলিন নামক হরমোন কোষে গ্লুকোজ প্রবেশ করতে সাহায্য করে। টাইপ ১ ডায়াবেটিসের সাথে, শরীর ইনসুলিন তৈরি করেনা। টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সাথে শরীর ভালোভাবে ইনসুলিন তৈরি বা ব্যবহার করেনা। পর্যাপ্ত ইনসুলিন ছাড়া, গ্লুকোজ স্বাভাবিকের মতো দ্রুত কোষে প্রবেশ করতে পারেনা। আর এতে রক্তে গ্লুকোজ তৈরি হয় এবং উচ্চ রক্তে শর্করার মাত্রা সৃষ্টি করে। এখন প্রশ্ন হল ডায়াবেটিস কিভাবে পায়ের সমস্যা করে? দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস থাকার দরুন রক্তে শর্করার উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পায়ের স্নায়ু এবং রক্তনালীগুলোর ক্ষতি করে। স্নায়ুর ক্ষতি, যাকে ডাইয়াবেটিক নিউরোপ্যাথি বলে। এতে পায়ের অসাড়তা, ঝনঝন, ব্যথা বা অনুভূতি হ্রাস করে দিতে পারে। আর এই অনুভূতি হ্রাসের দরুন পায়ে কখনো কাটা, ফোস্কা বা ক্ষত হলেও তা বোঝাই যাবেনা। ফলশ্রুতিতে ক্ষত সংক্রমিত হতে পারে। একটি সংক্রমণ এবং দূর্বল রক্ত প্রবাহ, যা গ্যাংগ্রিন হওয়ার কারন হতে পারে। এই গ্যাংগ্রিন বা আলসার যদি চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো না হয়, তাহলে এর তখন একটাই সমাধান; অঙ্গচ্ছেদ। পৃথিবীতে যত রোগীর পা কাটা লাগে তাঁর মধ্যে ৮৪% হল ডায়াবেটিক পা।

কাদের ঝুঁকি বেশি

-বয়স ৪০ এর বেশি যাদের

-অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস বা যারা এটি নিয়ন্ত্রনে সচেতন নন

-উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চ কোলেস্টেরল আছে যাদের

-করোনারি আর্টারি ডিজিজ, স্ট্রোকের ইতিহাস আছে যাদের

প্রতিকারের উপায়

ডায়াবেটিস থাকলে এবং এ থেকে পা রক্ষা করার সর্বোত্তম উপায় হল প্রতিদিন রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রন করা। এটি স্নায়ু এবং রক্তনালীর ক্ষতিকে আরও খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করবে। পরবর্তী ধাপ হল পায়ের ত্বককে সুস্থ রাখা। যার মধ্যে অন্তর্ভূক্ত-

প্রতিদিন পা চেক করা

জুতার ঘর্ষনের দ্বারা সৃষ্ট হতে পারে এমন আঁচিল বা দাগ সহ যে কোন ধরনের কাটা , লালভাব এবং যেকোন ধরনের পরিবর্তন খেয়াল রাখতে হবে। শুধুমাত্র পায়ের উপরিভাগ নয় পায়ের নিচের অংশগুলোও ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে।

প্রতিদিন পা ধৌত করা

কিছুটা উষ্ণ পানি এবং সাবান দিয়ে পা পরিষ্কার করতে হবে। তবে আগে পা ভিজিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই, এতে ত্বককে আরো শুষ্ক করে দিতে পারে। পা ধুয়ে শুকানোর পরে আঙুলের মধ্যে ট্যালকম পাউডার বা কর্নস্টাচ ব্যবহার করা যেতে পারে। এরা আর্দ্রতা শোষণ করতে পারে। আর যদি লোশন ব্যবহার করতে হয় তবে তা পায়ের আঙুলের মধ্যে লাগানো যাবেনা।

ক্লিপার দিয়ে নখ কাটা

ক্লিপার বা নেইলকাটার দিয়ে পায়ের নখ কাটতে হবে। অনেক সময় পায়ের নখ পুরু হয়ে যায় বা ত্বকে বাঁকা হয়ে বসে যায় এবং তা যদি নিজে নিজে কাটতে সমস্যা হয় তবে এক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞর দ্বারস্থ হলে ভালো হবে।

উপযুক্ত জুতা পরিধান করা

হাঁটার সময় সবসময় পা রক্ষা করার জন্য উপযুক্ত জুতা এবং মোজা বা চপ্পল ব্যবহার করতে হবে। বাইরে এবং ঘরের ভেতরেও জুতা পরে থাকতে হবে। তবে জুতাটি হতে হবে মসৃণ এবং তা যেন ভালোভাবে পায়ের সাথে ফিট হয়।

তাপ এবং ঠান্ডা থেকে রক্ষা

উন্মুক্ত ত্বকে সানস্কিন ব্যবহার করা ভালো এবং কখনো সমুদ্রের ধারে কাছে গেলে খালি পায়ে হাঁটা যাবেনা। ঠান্ডা আবহাওয়ায় হিটার বা ফায়ারপ্লেসে পা গরম করার পরিবর্তে মোজা পরা উত্তম।

পায়ে রক্ত প্রবাহ ঠিক থাকা

হাটু মুড়ে না বসাই উত্তম। বসতে হলে পা উপরে রাখতে হবে। অধিকক্ষন বসে থাকতে হলে পায়ের আঙুলগুলো নাড়াতে হবে। টাইট মোজা পরা যাবেনা।

হেলথ কেয়ার ভিজিট করা

মাঝে মাঝে পা চেক আপের জন্য বিশেষজ্ঞদের কাছে ঘুরে আসা ভাল।

মনে রাখতে হবে যে, ব্লাড সুগার যদি নিয়ন্ত্রন করা যায় এবং প্রতিদিন পায়ের যত্ন নেয়া যায় তবে তাই হবে ডায়াবেটিক পায়ের গুরুতর সমস্যা প্রতিরোধ করার সেরা পদক্ষেপ।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

nineteen − one =