ফিল্মি দুনিয়া ওটিটিতে

করেছে Sabiha Zaman

সুরাইয়া নাজনীন

স্মার্টফোন যেন গোটা দুনিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। ঘরে বসেই আমরা পেয়ে যাচ্ছি বিনোদনের সব অনুষঙ্গ। আগের দিনগুলোতে এসব ছিল ভাবনার বাইরে। বর্তমানে আরেক চমক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। এটা ডিজিটাল দুনিয়ার ওয়েব বিপ্লব বটে!কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য ওয়েব ফিল্ম, ওয়েব সিরিজ তৈরির আলোচনা ছিল না। সে চিত্র পাল্টে যাচ্ছে ক্রমেই। জীবন্ত হয়ে উঠছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ওয়েব ফিল্ম কিংবা ওয়েব সিরিজ।

ডিজিটাল যুগে সবাই ধাবিত হচ্ছে। বিশিষ্ট নির্মাতারাও ঝুঁকছেন এই সংস্কৃতিতে। এবার প্রথমবার ওয়েব ফিল্ম নির্মাণ করতে যাচ্ছেন চয়নিকা চৌধুরী। ওয়েব ফিল্মটির নাম ‘অন্তরালে’। চয়নিকা চৌধুরীর প্রথম সিনেমাতেও পরীমনি ছিলেন নায়িকা। ওয়েব ফিল্মটির গল্প লিখেছেন পান্থ শাহরিয়ার।
পরীমনির সঙ্গে কাজ করা প্রসঙ্গে চয়নিকা চৌধুরী জানান, ‘আমার প্রথম চলচ্চিত্রে পরীমনি ছিলেন। মজার বিষয় হলো প্রথম ওয়েব ফিল্মেও তিনি থাকছেন। তিনি দেখতে সুন্দর, নাচ জানেন, অভিনয় পারেন। তার চেয়েও বড় বিষয়, তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা খুবই ভালো। আমাদের সম্পর্কটা এত সুন্দর যে হাসিখুশির মধ্য দিয়েই কাজটা শেষ করতে পারব। কোনো ব্রেক নিতে হবে না।’
এই ফিল্মে পরীমনিকে দেখা যাবে একটি হিন্দু পরিবারের বউ অর্পিতা চরিত্রে। ব্যবসায়ী স্বামীর সঙ্গে বিয়ের পরে বনেদি একটি পরিবারে বউ হিসেবে আসে অর্পিতা। স্ত্রীকে প্রচণ্ড ভালোবাসলেও ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় স্ত্রীকে সময় দিতে পারেন না অর্পিতার স্বামী। তবে হঠাৎ করেই মফস্বল শহর থেকে আসা মনা নামক ব্যক্তির আগমনে তাদের জীবনে শুরু হয় অন্য রকম নানা ধরনের ঘটনা। এর মধ্যে ঘটে একটি খুন। আর মধ্যবিত্ত সংসারজীবনে খুনের মতো ভয়ংকর একটা ঘটনা সংঘটিত হওয়ার পরে তাদের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে এবং এতে তাদের জীবনে কী কী পরিবর্তন আসে, সেসবই দেখা যাবে অন্তরালে।


তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত ওয়েব ফিল্মটিতে একটি গান রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এটা বাড়তেও পারে। তবে যে একটি গানের পরিকল্পনা রয়েছে, সেটি লিখেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত গীতিকার কবির বকুল এবং তাতে কণ্ঠ দেবেন কোনাল। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট নিবেদিত ও কাজী রিটন প্রযোজিত এ ওয়েব ফিল্মটি দেখা যাবে একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে।

বাংলাদেশে ওয়েব কালচার একটু দেরিতে হলেও এসেছে। কাজ করার দুর্দান্ত সুযোগ এখানে বললেন নির্মাতা হাবিব শাকিল। তিনি সম্প্রতি ‘কিস অব জুডাস’ নামে একটি ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করেছেন, যা একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে। শিল্পী, নির্মাতা এবং দর্শকের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম কতটুকু গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে? এ প্রশ্নে হাবিব শাকিল বলেন, নতুনের প্রতি পৃথিবীর সব মানুষেরই আগ্রহ বেশি থাকে। তাই ওয়েব সিরিজ কিংবা ওয়েব সংস্কৃতি মানুষ ধারণ করছেও খুব দ্রুত। তবে কাজের মান, কনটেন্ট, গল্পের ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভর করবে এই মাধ্যমে টিকে থাকার হিসাব। আশার কথা হলো মহামারিতে যখন সবকিছু স্থবির, আমরা তখন বিনোদনের নতুন দুয়ারের উন্মোচন করতে পেরেছি। আমি আমার নির্মিত ওয়েব সিরিজ “কিস অব জুডাস” নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী। এখন দর্শকেরা দেখে বলবেন কাজটি কেমন হলো। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বিঞ্জে এটি মুক্তি পেয়েছে।’

কথা হলো তানিম রহমান অংশুর সঙ্গে। তিনি একজন বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন পরিচালক এবং সম্পাদক। তিনি ‘ন ডরাই’ চলচ্চিত্র পরিচালনার জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি বর্তমান সময়ের ডিজিটাল বিপ্লব নিয়ে বলেন, ‘ওয়েব সিরিজ বলেন আর ওয়েব ফিল্ম, এখন কাজ করার স্বাধীনতা বেড়েছে। আগে কনটেন্টে ফিল্মি ভাবটা বেশি থাকত কিন্তু এখন জীবনবাদী গল্প বেশি আসছে, দর্শক এই ধরনের গল্পে বেশি ঝুঁকছেন। তবে বড় পর্দায় সিনেমার সঙ্গে ঘরে বসে সিনেমা দেখার তুলনা করা ভুল হবে। দুইটা দুই টেস্ট। যেহেতু চলছে লকডাউন, তাই বিনোদনের অভাব পূরণ করার প্রয়াস হতে পারে ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো।’

গত বছর ‘মানিহানি’, ‘আগস্ট ১৪’, ‘কুহক’, ‘শিকল’, ‘তাকদীর’সহ বেশ কিছু ওয়েব সিরিজ আলোচনা তৈরি করেছে। ক্রমেই নির্মাতা ও দর্শক, দুই ক্ষেত্রেই ওটিটি প্ল্যাটফর্মের দিকে আগ্রহ বাড়ছে। এরই মধ্যে নতুন বছরের জন্য ওয়েব ফিল্ম ও ওয়েব সিরিজের ঘোষণা দিয়েছে বাংলা ভাষার বেশ কিছু ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। ‘জানোয়ার’, ‘ইউটিউমার’, ‘ট্রল’, ‘ছক’, ‘ডার্ক নাইট’, ‘জিরো টলারেন্স’, ‘অমানুষ’, ‘মানি মেশিন’ নামে ওয়েব ফিল্মের কথা শোনা যাচ্ছে। ওয়েব সিরিজ আসছে ‘মরীচিকা’, ‘বিলাপ’, ‘মাফিয়া গ্যাং’, ‘জাল’, ‘পাফ ড্যাডি’, ‘স্পেশাল সেভেন’ ইত্যাদি।

দেশজুড়ে ইন্টারনেট যত প্রসারিত হবে, ওয়েব কনটেন্ট ব্যবসার দিগন্তও উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। সামনে কী ধরনের বিনোদন কনটেন্ট আসতে পারে, মানুষ কী ধরনের কনটেন্ট পছন্দ করতে পারে, মানুষ তা আঁচ করতে পারছে। আগামী দিনে ওটিটিতে ওয়েব ফিল্ম ও ওয়েব সিরিজের ভালো ব্যবসা হবে।
বিঞ্জ আনছে বেশ কিছু ওয়েব সিরিজ ও ওয়েব ফিল্ম। বড় ক্যানভাসেও কিছু প্রজেক্ট নিয়ে পরিকল্পনা চলছে। শিল্পী ও শিল্পের যেন বিকাশ ঘটে, সে চেষ্টা বজায় রাখতে চায় বিঞ্জ।

তবে ওয়েব ফিল্ম এখনো বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছায়নি। কিন্তু শোবিজ সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন, অচিরেই দর্শকদের বিরাট অংশ ওয়েব ফিল্ম দেখতে হুমড়ি খেয়ে পড়বে অনলাইনে। কারণ, তাদের প্রিয় নির্মাতাদের অনেকেই প্রচলিত সিনেমা হলের জন্য ছবি না বানিয়ে ঝুঁকে পড়েছেন ওয়েব ফিল্মের দিকে। তিনজন জনপ্রিয় পরিচালক ওয়েব ফিল্মে নিজেদের হাত পাকাতে এগিয়ে এসেছেন। যাদের প্রত্যেকের পরের ছবির জন্য ছিল দর্শকদের প্রতীক্ষা, সেই প্রতীক্ষাকে জিইয়ে রেখেও দর্শকদের খুশি করতে চলেছেন এই তিন পরিচালক। গিয়াসউদ্দিন সেলিম, শিহাব শাহিন এবং দীপঙ্কর দীপন আর রুপালি পর্দার জন্য ছবি করছেন না। তারা সবাই ছবি করছেন অনলাইনের জন্য। নাটক নয়, টেলিফিল্ম নয়, ওয়েব সিরিজও নয়; ওয়েব ফিল্ম বানাচ্ছেন তারা। যে গল্প তারা বলতেন সিনেমা হলে, সেই গল্পই তারা তুলে দিচ্ছেন অনলাইনে। তিন পরিচালককে বড় পর্দার মতোই সাদরে গ্রহণ করবেন কি না দর্শকেরা, তার ওপরেই নির্ভর করছে ওয়েব ফিল্মের ভবিষ্যৎ। যদিও এখন পর্যন্ত এই ধারার জনপ্রিয়তার সম্ভাবনা ষোলো আনা।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

fourteen + five =