ওয়েডিং ডেস্টিনেশন

করেছে Sabiha Zaman

গোলাম কিবরিয়া:  বিয়ে মানেই প্রতিটি মানুষের কাছে বিশেষ কিছু। তাই এ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে সবারই চেষ্টা থাকে বিশেষ কিছু করার। যুগে যুগে মানুষের জীবনাচারে যেমন বৈচিত্র্য আসে, তেমনি পরিবর্তন আসে সামাজিক বিভিন্ন আয়োজনের ট্রেন্ডেও। আবার পুরোনো অনেক ট্রেন্ড নতুন রঙে নতুন ঢঙে হাজির হয়। বিয়ের আয়োজনের পালেও তাই লেগেছে নতুন হাওয়া। বিয়ের নতুন ট্রেন্ড ডেস্টিনেশন ওয়েডিং। যদিও এ ট্রেন্ড একেবারেই নতুন নয়। এ যেন পুরোনোকে নতুন রঙে হাওয়া দেওয়া।
আদি যুগ থেকেই বিয়ের আয়োজন মানেই ছিল খোলা আকাশের নিচে আশপাশে রঙিন কাগজ টানিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে বিয়ের আয়োজন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা পরিবর্তন এলেও নতুন করে ভিন্ন রূপে এ ট্রেন্ড জনপ্রিয় হতে চলেছে। যান্ত্রিক জীবন থেকে একটু দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে প্রিয়জনদের নিয়ে ডেস্টিনেশন ওয়েডিং আয়োজন স্মরণীয় করে তোলে মুহূর্তগুলো। ধীরে ধীরে মানুষের কাছে ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের জনপ্রিয়তা বেড়েই যাচ্ছে।
বিভিন্ন সেলিব্রিটি প্রায়ই নিজেদের বিয়ের জন্য ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের আয়োজন করছে। কারণ, খোলা আকাশের নিচে খোলামেলা একটা ভেন্যু যতটা সুন্দর করে সাজানো যায়, বদ্ধ ছাদের নিচে ততটা সুন্দর করে সাজানো যায় না। ডেস্টিনেশন ওয়েডিং ইউরোপ-আমেরিকায় অনেক আগে থেকেই জনপ্রিয়। নিজেদের চেনা শহরের বাইরে গিয়ে সমুদ্র, পাহাড় বা জঙ্গলঘেরা প্রকৃতির মধ্যে আয়োজন হচ্ছে বিয়ে। এ ছাড়া কোনো ঐতিহাসিক স্থান বা রিসোর্ট ভাড়া নিয়েও ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করার চল এবার দেশের মধ্যে বেড়েছে।
নিজের মনমতো সবকিছু করা যায় ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ে। সবকিছুই অনেক ইউনিক আর গর্জিয়াস করা যায়। তাই তোমার স্বপ্নের বিয়ের আয়োজনটাকে সবার থেকে একটু আলাদা রাখতে, সবকিছুতে কিছুটা ভিন্নতা আনতে ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের আয়োজন করতেই পারো।
প্রিয় পাঠক, এখন ভাবছ সবই তো বুঝলাম কিন্তু ডেস্টিনেশন ওয়েডিংটা করব কোথায়?

পছন্দের তালিকায় রিসোর্ট
ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের জন্য পছন্দের তালিকায় প্রথমেই রাখতে পারো শহরের কাছাকাছি পছন্দের কোনো রিসোর্টে। প্রতিনিয়তই একের পর এক গড়ে উঠছে নান্দনিক রিসোর্ট। অনিন্দ্যসুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় এসব রিসোর্টে। শহরের যান্ত্রিক কোলাহল থেকে অতিথিদের শান্তি খুঁজে দেওয়াই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। বিয়ের দিন সকালে অথবা আগের দিন নিমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে আগে থেকে ঠিক করে রাখা গাড়ি চলে যাবে রিসোর্টে। সেখানে বিয়ের সব আয়োজনের দায়িত্ব কোনো দক্ষ ওয়েডিং প্ল্যানারকে দিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারো। ঢাকার কাছে গাজীপুরে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট আছে, যেখানে অনায়াসে মনমতো বিয়ের আয়োজন করা যেতে পারে। অবশ্যই এ ক্ষেত্রে আগে থেকে বুকিং দিয়ে রাখতে হবে। ঢাকার আশপাশে ও ঢাকার বাইরে এমন কিছু নান্দনিক রিসোর্ট হলো :
ছুটি রিসোর্ট জয়দেবপুর, পদ্মা রিসোর্ট মুন্সিগঞ্জ, মাওয়া রিসোর্ট মুন্সিগঞ্জ, যমুনা রিসোর্ট টাঙ্গাইল, এলেঙ্গা রিসোর্ট টাঙ্গাইল, সায়রা গার্ডেন রিসোর্ট নারায়ণগঞ্জ, হেরিটেজ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা নরসিংদী, সাইরু হিল রিসোর্ট, অরুনিমা রিসোর্ট নড়াইল, ভাওয়াল রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা গাজীপুর, জল জঙ্গলের কাব্য পূবাইল, আরশিনগর হলিডে রিসোর্ট, মেঘবাড়ি হলিডে রিসোর্ট বান্দরবান, সাহেববাড়ি রিসোর্ট গাজীপুর, সীগাল রিসোর্ট ও পিকনিক স্পট গাজীপুর, গ্রীন ভিউ রিসোর্ট মৈনারটেক, পাকশী রিসোর্ট পাবনাসহ রয়েছে অসংখ্য রিসোর্ট। রিসোর্ট ছাড়াও বড় তারকা হোটেল ও বাংলোবাড়ি ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের ভেন্যু হতে পারে।

পাহাড় নয়তো সমুদ্রে
কী ভাবছ? বিয়ে করতে পাহাড় বা সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে হবে! নাহ পাঠক, এমন কিছুই নয়। বিয়ে আয়োজনকে আরেকটু ভিন্ন রূপ দিতে তুমিও চাইলে ঢাকার বাইরে পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক স্থান কিংবা সমুদ্রের কাছাকাছি কোনো স্থানকে বেছে নিতে পারো। কক্সবাজার কিংবা সেন্ট মার্টিনে অসংখ্য নান্দনিক সাজে সজ্জিত রিসোর্ট কটেজ রয়েছে। নারিকেল জিঞ্জিরা খ্যাত সেন্ট মার্টিনের পশ্চিম বিচে মানুষের আনাগোনা কম থাকে। পর্যটক সমাগম কম হওয়ায় ফাঁকা জায়গাজুড়ে সাজাতে পারো বিয়ের আসর। তালিকায় আরও রাখতে পারো কুয়াকাটা সৈকত ও কক্সবাজারে শামলাপুর সৈকত। চাইলেই অতিথিদের নিয়ে মনমতো আয়োজন সেরে নিতে পারো, সেখানে অবস্থিত রিসোর্ট বা কটেজে। বান্দরবানের নীলগিরি, নীলাচল ও রাঙামাটির কাপ্তাই লেক হতে পারে পাহাড়ঘেরা সবুজের মধ্যে তোমার ওয়েডিং ডেস্টিনেশন। ভাবো তো একবার, তোমার বিয়ের আয়োজন হচ্ছে পাহাড়ঘেরা কোনো পরিবেশে নয়তো সমুদ্রের পাশে। এ যেন স্বপ্নের জগতেই হারিয়ে যাওয়া।

ঘন অরণ্যে
ভালোবাসায় পরিপূর্ণ জীবন শুরু হবে সবুজে ঘেরা ঘন অরণ্যে। পাখির কলরবের মাঝে জঙ্গল সেজে উঠবে তোমার বিয়ের জন্য। নওগাঁর আলতাদীঘি, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পরিকল্পনা করতে পারে বিয়ের। দিনের বেলা সুন্দরবনের লঞ্চেও হতে পারে বিয়ের অনুষ্ঠান। তবে বনের পশুপাখিকে বিরক্ত না করেই বিয়ের অনুষ্ঠান করা শ্রেয়।


ভিলেজ ওয়েডিং
চাইলে নিজ গ্রামের বাড়িতেও বেশ ধুমধাম করে ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের আয়োজন করা যেতে পারে। বছরের পর বছর পড়ে থাকা ফাঁকা বাড়িটা আলোকসজ্জা আর আতশবাজিতে মেতে উঠবে। গ্রামের শেওলাধরা পুকুরঘাটে গায়েহলুদের ছোট্ট আসর বসবে। অনেকের নিজ গ্রামের বাড়িতে তেমন জায়গা না-ও থাকতে পারে। তবে তাতেও চিন্তা নেই। জয়রামপুর কৃষি পর্যটন গ্রাম, চারিপাড়া পর্যটন গ্রামসহ ইকো ট্যুরিজমের আওতায় দেশের বিভিন্ন জেলায় অনেক পর্যটন গ্রাম গড়ে উঠেছে। সেসব গ্রামে হতে পারে তোমার ওয়েডিং ডেস্টিনেশন। খোলামেলা উঠানে শীতলপাটিতে বসে সূচনা হবে নতুন এক অধ্যায়। ছবির মতো সুন্দর এ মুহূর্তগুলো বাকি জীবন স্মৃতির পাতায় অক্ষয় হয়ে থাকবে।

থাকো নির্ভার
ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ের পরিকল্পনা খুব সহজ কথা নয়। অনুষ্ঠান অনুযায়ী ভেন্যু, খাবারের মেন্যু ঠিক করা, বর-কনের পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের পোশাক কেনা, নিমন্ত্রণপত্র ছাপানো, স্টেজ সাজানো, তত্ত্ব গোছানো, ছবি ভিডিও আরও কত-কী! যারা একটু সুন্দরভাবে এসব করতে চাও অথচ নিজেদের অত সময় নেই, তারা ভেন্যু ঠিক করে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট আর ওয়েডিং প্ল্যানারের সাহায্য নিতে পারো। এ ছাড়া ভ্রমণ, রিসোর্ট বুকিং, টিকেটিংয়ে সহায়তা নিতে পারো ট্যুর অপারেটর অথবা অনলাইন ট্রাভেল গ্রুপগুলোর কাছ থেকে।

বাজেট নিয়ে ভাবনা?
বাড়ি তৈরি, গাড়ি ক্রয়, ব্যবসার জন্যসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে অনেক ধরনের ঋণ দেয় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো। তবে এসব ছাড়াও এখন বিয়ে করার জন্য ঋণ দিচ্ছে অনেক ব্যাংক। এ ধরনের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি সবার আগে বিবেচনা করা হয়। বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে ব্যাংকগুরো বিয়ের জন্য লোন সুবিধা দিয়ে থাকে।
শুরু হয়ে গেছে বিয়ের মৌসুম। তাই জীবনসঙ্গীকে নিয়ে আর দেরি না করে পছন্দসই ওয়েডিং ডেস্টিনেশন খুঁজে নাও। নতুন পথচলা হোক আনন্দের, শুভকামনা।

ছবি: সজীব মিয়া ও নুসরাত জাহান রিজভি 

 

 

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

14 + 6 =