দাম্পত্যজীবন হারিয়ে গেছে?

করেছে Sabiha Zaman

নতুন শিশুর আগমনে একটি পরিবারে বয়ে যায় আনন্দের ধারা। তাকে নিয়ে সবাই আনন্দে মেতে ওঠে। সকাল থেকে রাত সে কী খাবে, কখন ঘুমাবে, কখন গোসল করবে এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকে নতুন মা। নিজের যত্নের কথা বেমালুম ভুলে বসে। তার ওপর শিশুর কোনো অসুখ হলে তো কথাই নেই। সারা রাত সন্তানের মাথার পাশেই কেটে যায় মা-বাবার। নতুন নতুন বাবা-মা হওয়ার পর তাই অনেক দম্পতির ভেতরে দূরত্ব তৈরি হয়।

সন্তানের যত্ন-আত্তি করতে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে চলে আসে স্থবিরতা। নিয়মিত শারীরিক সম্পর্ক হওয়াটা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয়ে ওঠে না। আবার একসঙ্গে সময় কাটানোও হয়ে ওঠে না। যার ফলে দুজনের বোঝাপড়ার ভেতরেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। নতুন শিশুকে লালন-পালন করার মধ্যেই নিজেদের জন্য সময় বের করে নিতে হয়। বা”চা হওয়ার পর দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক রাখার কিছু টিপস দেখে নিতে পারো এখানে।

 

স্বামীর সহযোগিতা
দাম্পত্যজীবন কখনো একার চেষ্টায় সুন্দর হয় না। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের চেষ্টায় একটি দাম্পত্যজীবন হতে পারে অনাবিল আনন্দের। দুজনেই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়। নয়তো শুধু ঝামেলাই বাড়ে। বাচ্চা হওয়ার পর একজন নারীর জীবন হুট করে বদলে যায়, অনেক বড় এক দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে পথ চলতে হয় তার। কোনো মা যদি শুধু গৃহিণীও হয়ে থাকে, তবু তার সময় হয় না নিজের দিকে একটু তাকানোর। বাচ্চার বাবা সেটা না বুঝলে তৈরি হয় মনকষাকষি। স্বামী সারা দিন বাইরে কাজ করে এসে যদি মনে করে তার স্ত্রী সারা দিন ঘরেই ছিল, তাই তার কোনো পরিশ্রম হয়নি তাহলে তা নতুন মায়ের প্রতি অন্যায় আচরণ হয়ে যায়।

মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর পরিচর্যা আসলে একা করাটাও অনেক কঠিন। এসব ক্ষেত্রে তাই স্বামীর সহযোগিতা খুব বেশি আশা করে নারীরা। বা”চা হওয়ার পর এমনিতেই অনেকের মন খারাপ থাকে শরীরের পরিবর্তন আর জীবনযাপনের পরিবর্তনের কারণে। সে সময় স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া যে কোনো সহযোগিতা মায়েদের জন্য টনিকের মতো কাজ করে। আর স্বামী সহযোগিতা না করলে নতুন মায়ের মন খারাপ হয়ে যায়। আর সে থেকেই দাম্পত্যজীবনে ছেদ ঘটে। বাচ্চা হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক শুধু নারী-পুরুষের ভেতরকার সম্পর্ক থাকে না। তাদের মাঝখানে থাকে একজন শিশু, যার ভালো-মন্দের দায়িত্ব তার মা-বাবার ওপর নির্ভর করছে।

 

একজন মা যদি দেখে তার বাচ্চার বাবার তার দিকে বা নতুন শিশুর দিকে তেমন মনোযোগ নেই, তাহলে সেটার প্রভাব স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ওপরেও পড়বে। বাচ্চার কিছু ছোট ছোট কাজ এ সময় বাবা করে দিলে মায়ের যেমন একটু বাড়তি সময় মেলে, তেমনি মায়ের ভালোও লাগে এই ভেবে যে তার স্বামী তাদের কেয়ার করে। আমাদের দেশের অনেক নতুন বাবা এ ব্যাপারটা বুঝতে পারে না যে, নতুন শিশুর সঙ্গে তার দাম্পত্য সম্পর্কও জড়িয়ে আছে।

অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কারণে স্ত্রীকেও দোষারোপ করে কেউ কেউ। এমনটি যেন না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এবং বাচ্চার বাবা এ ব্যাপারটি না বুঝলে নিজে অথবা বয়স্ক এবং অভিজ্ঞ কারও মাধ্যমে তাকে তার নতুন দায়িত্বগুলো বোঝাতে হবে। মায়ের শরীর-মন ভালো না থাকলে সে যেমন বা”চাকে সুন্দর শৈশব উপহার দিতে পারবে না, তেমনি দাম্পত্য সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হবে। তাই এ ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বলে সুন্দর দাম্পত্য নিশ্চিত করতে হবে।

 

মেনে নেওয়ার মানসিকতা
কিছু ব্যাপার আছে প্রাকৃতিক। যা চাইলেই মানুষ এড়াতে পারে না। বাচ্চা হওয়ার পর নারী শরীরে কিছু পরিবর্তন আসে। এ নিয়ে অনেকে এত মন খারাপ করে বা লজ্জা পায়। স্বামীর সঙ্গে ঠিক মতো মিশতে পারে না। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, মা হওয়ার মতো একটি বড়  পরিবর্তনের কারণে অনেক কিছুই আর আগের মতো থাকবে না, এটা মেনে নিতে হবে। যেমন আগের মতো চাইলেই স্বামী-স্ত্রী কোনো ঝামেলা ছাড়াই একসঙ্গে সময় কাটাতে পারবে না। এ সময় সবার আগে শিশুকেই গুরুত্ব দেওয়াটাই যুক্তিযুক্ত। বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিড করানো এবং বাচ্চার যত্নের কারণে রাত জেগে অনেক নারী এ সময় শারীরিকভাবে মিলিত হতে অনাগ্রহ বোধ করে। অবসাদ থাকে তখন দেহজুড়ে।

 

এতে অস্থির হওয়া যাওয়ার কিছু নেই। আবার সবকিছু আগের মতোই হয়ে যাবে। এ বিষয়গুলো মেনে নেওয়ার পাশাপাশি হাল ছেড়ে দিলেও কিন্তু চলবে না। নিজের  যত্ন নেওয়ার চেষ্টা রাখতে হবে নিজের মাঝে। সব সময় যদি ভাবতে থাকো আমার দাম্পত্য সম্পর্ক বুঝি হারিয়েই যাচ্ছে, তাহলে কিন্তু এই ভাবনাটাই তোমাকে চালিত করতে থাকবে। এ সময়টা অল্প কিছুদিনের। ধৈর্য ধরে দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে।

‘নিজের’ জন্য আলাদা সময়
দাম্পত্য জীবনে সুখ পেতে চাইলে নিজের দিকেই আগে মনোযোগ দিতে হবে। স্বামীর সঙ্গে সময় কাটানোর আগে নিজের সঙ্গে কিছু সময় কাটানো নিয়ে ভাবো। নিজের শারীরিক বা মানসিক উন্নতির জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় ইয়োগা করা। পারলে ইয়োগা ক্লাসে যোগ দাও। এতে আত্মবিশ্বাস, মনোযোগ, মানসিক স্থবিরতা লাভ করতে পারবে। আর সেই সঙ্গে ফিরে পেতে পারবে আগের শরীর। সাঁতারও অবসাদ কাটাতে খুব সাহায্য করবে। ঘর থেকে বেরোতে এ সময় অনেক ক্লান্তি কাজ করে। সে ক্ষেত্রে পাল্টে ফেলো পোশাকের ডিজাইন। এমন কোনো পোশাক নির্বাচন করো, যা খুব সহজেই চট করে পরে বাইরে চলে যাওয়া যায়। সকালের দিকে এমন কোনো কিছুতে সময় দিতে চাইলে স্বামীর সাহায্য চাও, যেন সে সময়টা বা”চার দেখাশোনা করতে পারে।

‘নিজেদের’ জন্য আলাদা কিছু সময়
বা”চা হওয়ার পর পরিকল্পনা ছাড়া দাম্পত্য সম্পর্কের উন্নতি সম্ভব নয়। নিজেদের জন্য আলাদা করে সময় বের করতে চাইলে সেটার জন্য একটি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সপ্তাহের এক দিন স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে সুন্দর সময় কাটানোর জন্য আগেই সময় ঠিক করে রাখো। হতে পারে সেটা ছুটির দিনের আগের রাত। কারণ, তাতে পরদিন সকালে একটু দেরিতে ঘুম ভাঙলেও সমস্যা নেই। রাতের খাবারের পর একসঙ্গে কোনো মুভি দেখতে পারো অথবা স্রেফ গল্প করেই কাটাতে পারো সময়। সব সময় যে বাচ্চাকে নিয়েই কথা বলতে হবে, তা কিন্তু নয়। এ সময়টা শুধু নিজেদের ব্যাপারে কথা বলো বা যা ভালো লাগে। মোট কথা, মনের জানালাটা খুলে দাও সঙ্গীর সামনে। মা হলেও তুমি একজন ব্যক্তি। তোমার অনুভূতি, তোমার দৃষ্টিভঙ্গি তোমার আবেগ যা তোমার দাম্পত্য জীবনের সুরে মিশে গেছে সেগুলো প্রকাশ করো। দাম্পত্য জীবন নতুন করে ট্র্যাকে আসতে সময় লাগবে না!

 

শারীরিক সম্পর্ক
বাচ্চা হওয়ার পর শিশুর যত্ন এবং তার উপস্থিতি কারণে অনেক দম্পতিই শারীরিক মিলন থেকে বিরত থাকে। আবার অনেক নারী শারীরিকভাবে চাহিদাও কম বোধ করতে পারে, যেহেতু ক্লান্তি কাজ করে শরীরে। তবে সুন্দর দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শারীরিক মিলনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। শিশুকে নিয়ে যে বিছানায় ঘুমানো হয়, শারীরিক মিলনের সময় সে বিছানা ব্যবহার না করাই ভালো। এতে অস্বস্তির ব্যাপারটা থাকবে না। আবার শিশুকে একা ঘরে রেখে পাশের ঘরে গেলেও মায়ের মনোযোগ শিশুর ঘরের দিকেই থাকবে। এ জন্য একটা এক্সট্রা ম্যাট্রেস ব্যবহার করতে পারো ফ্লোরে। যেন প্রয়োজনের সময় সেটা ব্যবহার করা যায়। নিয়মিত বা স্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়াও জরুরি। দুধ, ডিম বা মাংসজাত প্রোটিন এ সময় নারীর শারীরিক চাহিদা তৈরিতে সাহায্য করে।

লেখা : সোনিয়া জামান

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

19 − five =