দুজনই কর্মজীবী

করেছে Sabiha Zaman

সুরাইয়া ইসলাম মুন্নি:

সময়ের পরিবর্তনে কর্মজীবী বাবার পাশাপাশি কর্মজীবী মায়ের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাবাদের মতো মায়েরাও পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজ করছেন। মা-বাবা দুজনে ঘরের বাইরে কাজ করায় সন্তানেরা একা হয়ে পড়েছে। মা-বাবা কাজে থাকার সময়টুকুতে শিশুরা পরিবারের অন্যান্য সদস্য বা কাজের মানুষ বা ডে কেয়ার সেন্টারে অবস্থান করে। সন্তানকে সঠিকভাবে লালনপালনে কর্মজীবী মা-বাবারা কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারেন, তা নিয়েই আজকের আলোচনাÑ

কর্মজীবী বাবা-মায়ের সন্তান পালনে ইতিবাচক দিকগুলো : মা-বাবা দুজন কর্মজীবী হলে সে ক্ষেত্রে শিশুর বিকাশে বেশ কিছু ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

১. মা-বাবা দুজনই কর্মজীবী হলে তাদের জীবনযাত্রার মান তুলনামূলক উন্নত হয়। ১৯৮১ সালে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিত বইয়ে গ্যারি বেকার লিখেছিলেন, ‘মা-বাবা দুজনই উপার্জন করলে তারা সন্তানের পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা বা পারিপার্শ্বিক নিরাপত্তায় তুলনামূলক বেশি টাকা খরচ করতে পারেন।’

২. কর্মজীবী মা-বাবা দুজনেই ঘরের বাইরে যান। তাই দুজনই তাদের ঘরের বাইরের বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা সন্তানের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন, যা সন্তানকে জীবন সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পেতে সাহায্য করে।

৩. মা-বাবা কাজের জন্য বেশির ভাগ সময় বাইরে থাকায় তাদের সন্তানের সঙ্গে কম সময় ব্যয় করেন, এই বিষয়টি সন্তানকে সময়ের মূল্য সম্পর্কে ধারণা দেয়।

৪. মা-বাবারা বেশির ভাগ সময় ঘরের বাইরে থাকায় তাদের সন্তানেরা খুব কম বয়সেই স্বনির্ভর হয়। মা-বাবার অনুপস্থিতিতে সন্তানেরা নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে শেখে, যা পরে তাদের আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে।

 

৫. কর্মজীবী মা-বাবার সন্তানেরা ছোটবেলা থেকে দেখে তাদের মা-বাবা মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে একই সঙ্গে ব্যক্তিজীবন ও কর্মজীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছে। এর ফলে সন্তানেরা মা-বাবাকে দেখে জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে যায়।

কর্মজীবী মা-বাবার সন্তান পালনে নেতিবাচক দিকগুলো : মা-বাবা দুজন কর্মজীবী হলে সে ক্ষেত্রে শিশুর বিকাশে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

১. শিশুকে যে ডে কেয়ার বা মানুষের (হতে পারে কোনো আত্মীয় বা কাজের মানুষ) কাছে রেখে মা-বাবা চাকরি করতে যান, সেই ডে কেয়ার বা মানুষটি শিশুকে যথেষ্ট পরিমাণ সময় দেবে কি না এবং শিশুর জন্য তারা কতটুকু নিরাপদ, তা নিয়ে মা-বাবাকে সবসময় তুলনামূলক বেশি দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

২. যেহেতু শিশুরা মা-বাবা ছাড়া অন্য কোনো কেয়ারগিভার বা ডে কেয়ারে দিনের বেশির ভাগ সময় কাটায়, তাই শিশুরা অস্থিরতায় ভোগে এবং নিজেদের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে পারে না। মা-বাবা শিশুর সঙ্গে কম সময় কাটালে শিশুরা তুলনামূলক বেশি জেদি ও আক্রমণাত্মক হয়ে থাকে।

৩. যখন মা-বাবা দুজনই বেশির ভাগ সময় বাসার বাইরে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন এবং সন্তানের সঙ্গে খুবই কম সময় কাটান, তখন মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের মমতাময় সম্পর্ক তৈরি হতে পারে না। এর ফলে সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের দূরত্বও বাড়তে থাকে।

৪. ২০০৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, মা-বাবা দুজনই চাকরি করার কারণে শিশুরা তাদের পরিবার ছাড়া দিনের বেশির ভাগ সময় একা কাটায়, এতে এসব শিশুর স্কুলের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে বেশি অংশগ্রহণ করে।

৫. যেসব মা-বাবা অফিসের কাজের চাপে থাকেন, তারা তাদের অনেক কাজই সময়মতো শেষ করতে পারেন না। যার প্রভাব পরিবারের অন্য সদস্যদের, বিশেষ করে সন্তানের ওপরেও পড়তে পারে।

সন্তান লালনপালনে কর্মজীবী মা-বাবার জন্য পরামর্শ :

১. প্রতিদিন সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম বা গুণগত সময় দাও। সন্তান যে কাজগুলো করতে বা খেলতে পছন্দ করে, তার সঙ্গে সেই কাজগুলো করো বা খেলো। যেমন একসঙ্গে ঘরের কাজ করতে পারো, ছবি আঁকতে পারো, বোর্ড গেম খেলতে পারো, ছুটির দিনে সন্তানকে নিয়ে ঘুরতে যাও, সন্তানকে বই পড়ে শোনাও, ইত্যাদি। সন্তানের পছন্দের কাজগুলো করার সময় সন্তানকে পুরোপুরি মনোযোগ দাও এবং তার সঙ্গে কাজ নিয়ে আলোচনা করো।

২. কোয়ালিটি টাইমের অংশ হিসেবে সন্তানের সঙ্গে ঘরের বাইরের বিভিন্ন কাজে অংশ নাও। যেমন একসঙ্গে নামাজ পড়া, বাজারে যাওয়া, শপিংয়ে যাওয়া, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করা ইত্যাদি।

৩. সন্তানকে উৎসাহিত করতে তার বিভিন্ন গুণের প্রশংসা করো। এ ছাড়া সন্তানের কাছে তুমি যে ধরনের আচরণ আশা করো, তা করামাত্রই সুনির্দিষ্টভাবে তার প্রশংসা করো। যেমন তুমি খুবই সুন্দরভাবে তোমার খেলনা গুছিয়ে রেখেছ, তুমি লক্ষ্মী ছেলে-মেয়ের মতো তোমার প্লেটের খাবার শেষ করেছ, তুমি নিখুঁতভাবে হোমওয়ার্ক শেষ করেছ, ইত্যাদি!

 

৫. সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করো। সন্তানকে নিয়ে আত্মীয় বা পরিচিতদের বাসায় যাও এবং তাদের বাসায় দাওয়াত করো। এতে সন্তানের সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।

৬. সন্তান সারা দিন কী কী কাজ করছে এবং এ কাজগুলো তার কাছে কেমন লেগেছে, তা জেনে নাও।

৭. সন্তানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের মনোমালিন্য হলে একসঙ্গে আলোচনা করে তা সমাধানের চেষ্টা করো। এ আলোচনায় সন্তানকে তার মতামত দেওয়ার সুযোগ দাও। পাশাপাশি সন্তানকে স্পষ্টভাবে বলো তার কোন আচরণগুলো গ্রহণযোগ্য এবং কোন আচরণগুলো গ্রহণযোগ্য নয়। সন্তানের সঙ্গে কথা বলার সময় তাকে জানাও সে তোমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

৮. সন্তানের সঙ্গে অধিক মতবিরোধ বা আচরণের হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে (চুপচাপ হয়ে যাওয়া, অস্থির হওয়া, খাদ্যাভ্যাস বা ঘুমের পরিবর্তন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফলাফলের অবনতি ইত্যাদি) দেখা দিলে অবশ্যই একজন সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হও।
৯. সন্তানের বন্ধুবান্ধব এবং তাদের অভিভাবকদের ঠিকানা ও ফোন নম্বর সংগ্রহে রাখো। তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখো।

যা করবে না :

১. সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় সব ধরনের টেকনোলজি বা ডিভাইস ব্যবহার থেকে বিরত থাকো। সন্তানকে যখন সময় দেবে, তখন মোবাইলে গেম খেলা, ভিডিও দেখা, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বা টিভির দিকে তাকিয়ে থাকা থেকে বিরত থাকো। সম্পূর্ণ মনোযোগ তোমার সন্তানকে দাও।

২. অনেক সময় কর্মজীবী মা-বাবা সন্তানকে সময় না দেওয়ার অপরাধবোধ থেকে সন্তান যা চায়, সঙ্গে সঙ্গে তা দেওয়ার চেষ্টা করেন। যেমন দামি খেলনা, টাকা, দামি ইলেকট্রনিক ডিভাইস, ঘরের বাইরে থাকার অনুমতি ইত্যাদি। এ রকম পরিস্থিতিতে সন্তানকে ‘না’ বলো। পাশাপাশি কী কারণে তাকে এসব জিনিস দেওয়া হচ্ছে না, তা-ও তাকে জানাও।

৩. সন্তানকে মারধর করা ও বকাঝকা করা থেকে বিরত থাকো। মনে রাখবে, মারধর ও বকাঝকা করলে সন্তানের সঙ্গে তোমার সুসম্পর্ক নষ্ট হবে, সম্পর্কের দূরত্ব বাড়বে।

কর্মজীবী মা-বাবা একই সঙ্গে কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, শিশুর মনঃসামাজিক বিকাশ অনেকাংশে নির্ভর করে মা-বাবার কর্মজীবনের সন্তুষ্টি, চাপ মোকাবিলা করার দক্ষতা ও তাদের শারীরিক সুস্থতার ওপরে। সন্তান ও নিজের যত্ন নাও। সন্তানের পাশে থেকে তার বিকাশে সহায়তা করো।

 

 

 

 

 

 

 

 

সুরাইয়া ইসলাম মুন্নি
সাইকোলজিস্ট

 

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 + 5 =