দেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রীর গল্প

করেছে Rodoshee

 

লেখা : অহ নওরোজ

সাম্প্রতিক সময়ে নারী জাগরণের অগ্রদূত হয়ে যারা নতুন পথের সন্ধান করেছেন, তাদের মধ্যে সাইদা খানম অন্যতম। কারণ, তিনিই এ দেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী। এ পর্যন্ত তিনি ছবি তুলেছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, ইন্দিরা গান্ধী, রানি এলিজাবেথ, মাদার তেরেসা, মার্শাল টিটো, উত্তমকুমার, অড্রে হেপবার্ন, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জিয়াউর রহমান, মওলানা ভাসানী, বেগম সুফিয়া কামাল, মৈত্রেয়ী দেবী, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আশাপূর্ণা দেবীসহ আরও অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির। তবে তিনি শুধু একজন আলোকচিত্রীই নন, একাধারে তিনি সমাজসেবী ও সুসাহিত্যিকও। সময়ের এই জীবন্ত কিংবদন্তিকে নিয়ে এই সংখ্যার বিশেষ ফিচার।

১৯৩৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর নানার বাড়ি পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন সাইদা খানম। তার পৈতৃক ভিটা ফরিদপুরের ভাঙ্গায়। বাবা আবদুস সামাদ খান এবং মা নাছিমা খাতুনের সুযোগ্য কন্যা সাইদা খানম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৮ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন। এ ছাড়া ১৯৭২ সালে পুনরায় লাইব্রেরি সায়েন্সে স্নাতকোত্তর করেন। চার বোন, তিন ভাইয়ের মধ্যে সাইদা খানম ছিলেন সবার ছোট। তাদের মধ্যে তার ছবি তোলার ব্যাপারে সবচেয়ে সাহায্য করেছিলেন মেজ বোন হামিদা খানম। ছবি তোলার প্রতি আগ্রহ দেখে আমেরিকা থেকে তিনি একটি রোলিকড ক্যামেরা এনে দিয়েছিলেন।

আলোকচিত্রী হিসেবে সাইদা খানমের যাত্রা শুরু হয় বেশ তরুণ বয়সেই। মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই ছবি তোলার প্রতি তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সালটা ১৯৪৯, সে বছরই প্রথম ছবি তোলেন তিনি। তবে এর আগে থেকেই ছবি তোলার প্রতি গভীর অনুরাগ জন্মে তার।

আলোকচিত্রী হিসেবে সাইদা খানমের মূল যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৬ সালে ‘বেগম’ পত্রিকার মাধ্যমে। কাজ করার প্রথম দিকে তিনি তার কাজ দিয়ে বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। তাদের বাসায় কাজ করতেন একজন সুন্দরী বালিকা। সে সময় মেজ বোনের কিনে দেওয়া ক্যামেরাটা ছিল তার কাছে। একদিন তিনি কাজের মেয়েকে কাছে ডেকে তার মাথায় পানি ঢেলে তারপর তার একটি ছবি তুললেন। সদ্যস্নাত স বালিকার স্নিগ্ধ রূপ ফুটে উঠল ছবিতে। এরপর ‘বেগম’ পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায় ছবিটি ছাপা হয়। ছবিটি দেখে এলাকার সবাই বিভিন্ন ধরনের বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। বিশেষ করে কোনো নারী যে আলোকচিত্রী হতে পারে, সেটা তাদের ধারণার মধ্যেই ছিল না। যদিও বাড়ির বড়দের চেষ্টায় অনেক আলোচনার পর মানুষের সমালোচনার বাক্য কিছুটা রোধ করা গিয়েছিল, কিন্তু সাইদা খানম কোনোভাবেই দমে যাননি। তিনি বরং তার কাজের প্রতি আরও উৎসাহী হয়ে ওঠেন।

সাইদা খানম বাংলাদেশের আলোকচিত্র শিল্পীদের মধ্যে অন্যতম প্রধান একটি নাম। তিনি তার ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ছিলেন প্রচারবিমুখ। যে কারণে প্রথম দিকে তেমনভাবে পরিচিতি পাননি। তিনি শুধু এ দেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রীই নন, তিনি এ দেশের প্রথম মহিলা আলোকচিত্রশিল্পী, যিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
প্রথম থেকেই আলোকচিত্রকে পেশা হিসেবে গ্রহণের জন্য সামাজিক কারণে তাকে বিভিন্ন সময় নানা বাধাবিপত্তি পাড়ি দিতে হয়েছে। সে সময় তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন খালা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, বড় বোন অধ্যক্ষ হামিদা খানম, মহসিনা আলীসহ আরও অনেকে। এ ছাড়া তাকে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন এ দেশের নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন ও ‘বেগম’ পত্রিকার সম্পাদক নূরজাহান।

সাইদা খানমের এক ভিন্নমাত্রার ব্যক্তি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান ছিল সে সময়ে ঢাকার সবচেয়ে জনপ্রিয় স্টুডিও ‘জায়েদী স্টুডিও’র মালিক জায়েদী সাহেবের। সাইদা খানম যখন আলোকচিত্রীর পেশা গ্রহণ করেন, তখন এ দেশে ছবি তোলার স্টুডিওর সংখ্যা খুবই কম ছিল। পুরো রাজধানী ঘুরে দুটি স্টুডিওর খোঁজ পাওয়া যেত। স্টুডিও দুটির মধ্যে এই ‘জায়েদী স্টুডিও’ই ছিল ঢাকা শহরের সবচেয়ে পরিচিত স্টুডিও। এই স্টুডিওর মালিক জায়েদী সাহেব সাইদা খানমের ফটো কম্পোজিশন সম্পর্কে স্পষ্ট ধ্যানধারণা দিয়েছেন। এ ছাড়া তিনি সাইদা খানমকে ছবি তোলার বিষয়ে প্রচুর বই পড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তিনি আমেরিকা, জার্মানির ফটোগ্রাফি ম্যাগাজিন রাখতেন। এগুলো দেখেই ছবি তুলতে গিয়ে অ্যাপারচার এবং এক্সপোজার সম্পর্কে ভালো ধারণা পান সাইদা খানম। সাইদা খানম বলেন, ‘জায়েদী সাহেবই আমার ফটোগ্রাফির প্রথম শিক্ষক’। যদিও এরপর আর কারও কাছে সেভাবে ক্যামেরাবিষয়ক শিক্ষা গ্রহণ করতে যাননি তিনি। সব মিলিয়ে একজন আদর্শ আলোকচিত্রী হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সাইদা খানমের পেছনে জায়েদী সাহেবের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

কর্মজীবনে বেশ কিছুকাল পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে দূরে ছিলেন তিনি। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন। তবে আলোকচিত্রী সাংবাদিক হিসেবেই তিনি কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। সে সময় দুটি জাপানি পত্রিকাসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার তোলা আলোকচিত্র মুদ্রিত হয়েছিল।

নিজের কাজের পাশাপাশি সাইদা খানম বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদান করে আলোকচিত্রে বাংলাদেশেকে তুলে ধরেন। তিনি সর্বপ্রথম ১৯৫৬ সালে আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। এরপর জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, পাকিস্তান, সাইপ্রাস, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে তার ছবি প্রদর্শিত হয়। শুধু বিদেশে নয়, ঢাকাতেও তিনি কয়েকবার একক ও দলীয় প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন। সাইদা খানম ১৯৭৩ সালে কলকাতায় ‘অল ইন্ডিয়া ফটো জার্নালিজম কনফারেন্সে’ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করে প্রচুর প্রশংসিত হন। ১৯৮২ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ এশিয়ান গেমসে তিনি ‘বেগম’ পত্রিকার প্রতিনিধিত্ব করেন। সত্যজিৎ রায়ের বিভিন্ন সময়ে তোলা ছবি নিয়ে তিনবার আয়োজন করেন একক প্রদর্শনীর। এতে অতিথি হিসেবে ছিলেন দেশি-বিদেশি শিল্পীরা। শুধু তা-ই নয়, নিজের তোলা মাদার তেরেসার ছবির প্রদর্শনী করার আয়োজন করেও দেশে-বিদেশে প্রচুর প্রশংসিত হয়েছিলেন সাইদা খানম। তিনি ২০০০ সালে দৃক লাইব্রেরিতে ‘শান্তিনিকেতন ও কনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়’ শীর্ষক একটি প্রদর্শনী করেন।

নিজের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সাইদা খানম বিভিন্ন সময়ে জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একাধিক সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৫৬ সালে জার্মানিতে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড কোলন লাভ করেন। ১৯৬০ সালে ‘অল পাকিস্তান ফটো প্রতিযোগিতা’য় প্রথম স্থান লাভ করেন। এ ছাড়া ১৯৮০ সালে সাইপ্রাসে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ ফটো প্রতিযোগিতায় সার্টিফিকেট লাভ করেন।

তিনি প্রায়ই ‘চিত্রালী’ পত্রিকার জন্য ছবি তুলতে কলকাতায় যেতেন। ১৯৬২ সালে এই পত্রিকার সুবাদে বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ছবি তুলে সমাদৃত হন সাইদা খানম। তিনি বলেন, ‘মাঝেমাঝেই আমি চিত্রালীর জন্য ছবি তুলতে যেতাম কলকাতায়। সে সময়ে অনেকের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ হয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পাহাড়ি সান্যাল, উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন প্রমুখ। সময়টা ষাটের দশকের মাঝামাঝি। আর মধ্যে অনেকবারই ভেবেছি সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার ব্যাপারে। কিন্তু সেভাবে সময় সুযোগ হয়নি। একবার পত্রিকা থেকেই আমাকে বলা হলো সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে কাজ করতে। আমি একদিন গেলাম তার বাড়িতে। এটি ছিল লেক টেম্পল রোডে অবস্থিত। একবার ভাবলাম চলে যাই, তিনি হয়তো ব্যস্ত আছেন, বিরক্ত হতে পারেন। আবার কী মনে করে গেলাম তার বাসায়, তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি কী চাই? সে সময়টাতে অল্প সময় হয়েছে তিনি “কাঞ্চনজঙ্ঘা” সিনেমাটি শেষ করেছেন। ওই সিনেমাটি নিয়েই আমি কথা বললাম। তারপর কথায় কথায় আমি একফাঁকে তার কাছে ছবি তোলার অনুমতি চাইলাম। তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন। পরে শুনেছিলাম, তিনি আমার ছবি তোলার প্রশংসা করেছিলেন।’

তিনি পৃথিবীখ্যাত তিন চন্দ্রমানব নিল আর্মস্ট্রং, এডুইন অলড্রিনস জুনিয়র এবং মাইকেল কলিন্সের ছবিও তুলে গোটা ভারতবর্ষে প্রচুর প্রশংসিত হয়েছিলেন।

সারাজীবন শিল্পের সঙ্গে একান্তে কাটাতে চেয়েছেন সাইদা খানম। হয়তো তাই বিবাহবন্ধনেও আবদ্ধ হননি তিনি। তিনি শুধুই একজন আলোকচিত্রী নন, তিনি একজন বিশিষ্ট সমাজসেবী, নারী জাগরণের পথিকৃৎ এবং সুসাহিত্যিক। তার লেখা উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ধুলোমাটি’, ‘স্মৃতির পথ বেয়ে’, ‘আমার চোখে সত্যজিৎ রায়’, ‘আলোকচিত্রী সাইদা খানমের উপন্যাসত্রয়ী’ ইত্যাদি। বিভিন্ন গল্পের সংকলন ‘ধুলোমুঠি’ প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে। এ ছাড়া ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় আলোকচিত্রের গ্রন্থ ‘আমার চোখে সত্যজিৎ রায়’।

সাইদা খানম বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি ও বাংলাদেশ মহিলা সমিতির একজন সদস্য। এ ছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি এবং ইউএনএবির আজীবন সদস্য। যুক্ত রয়েছেন দেশের অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ লেখিকা সংঘের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করে চলছেন।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

10 − three =