ধর্ষণের প্রধান দরজা পর্নোগ্রাফি

করেছে Sabiha Zaman

সুরাইয়া নাজনীন

সাময়িক আনন্দ খুঁজতে মানুষের হাতে হাতে মুঠোফোন। আচরণে লুকোছাপা ভাব, তবে চেহারায় কখনো কখনো অপরাধবোধ। কেউ কেউ মনে করে জীবনের নিখাদ আনন্দ বুঝি মুঠোফোনের এই স্ক্রিনে। এসব গুমোট আচরণের অন্ধকার অধ্যায় হলো পর্নোগ্রাফি। যা একটু একটু করে শেষ করছে মানুষের জীবন। বেড়ে চলেছে ধর্ষণ। ইন্টারনেটের অর্ধেকটাই শেষ হচ্ছে এসব ব্যবহারকারীর জন্য। ইতিমধ্যে সরকার ২২ হাজার পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধ করেছে। তবে সাইট বন্ধ করেও পর্নো দেখা কি বন্ধ হচ্ছে? এ বিষয় নিয়ে রোদসীর সঙ্গে কথা বললেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার-

মানসিকতা কি বদলাচ্ছে?
প্রতিদিন বাড়ছে ধর্ষণের হার। তবে ‘পর্নোগ্রাফি’ এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। সে জন্য সরকার যথাযথ উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এরপরও কি ব্যবহারকারীরা থেমে আছে? এই প্রশ্নে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, যুগ যুগ ধরে ‘পর্নোগ্রাফি’ চলে আসছে। তবে হ্যাঁ, এখন তার ধরন বদলেছে। আমরা যেভাবে সম্ভব, যতটুকু সম্ভব উদ্যোগ নিয়েছি, সব সময় তৎপর এ বিষয়ে। কিন্তু মানুষের স্বভাব আর মানসিকতার পরিবর্তন না হলে যতই আমরা সচেতন হই, এটা কখনো থামানো যাবে না।

ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার

 

তাহলে বিকল্প পন্থা ভিপিএন বন্ধ করতে কেন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না?
মোস্তাফা জব্বার বলেন, দেখেন, কোনো অভিভাবক যদি তার সন্তানকে সঠিকভাবে মানুষ করতে না পারে, তাহলে সরকারকে দোষ দিয়ে কী লাভ। রাষ্ট্র ততটুকুই করতে পারে, যতটুকু তার আয়ত্তে আছে। ভিপিএন বন্ধ করলে দেশের অর্থনীতির বারোটা বেজে যাবে। আমাদের তো সব বিষয় মাথায় নিয়ে চলতে হয়। তাই আমি বারবার বলি, বলতে চাই, আগে নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে। নিজে বদলালে দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে।

ধর্ষণ বাড়ার প্রধান কারণ পর্নোগ্রাফি
দেশে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে পর্নোগ্রাফি বড় কারণ বলে মন্তব্য করেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি আরও বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ দুনিয়ায় যেকোনো ক্ষেত্রে বিচরণ এখন অনেক সহজ হওয়ায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে আমাদের কিশোর-তরুণেরা নানাভাবে পর্নো সাইট থেকে শুরু করে সব জায়গায় প্রবেশ করতে পারে। যদিও সরকার অনেকগুলো পর্নো সাইট বন্ধ করে রেখেছে, কিন্তু অন্য কোনো সাইটের মাধ্যমে সেগুলোতে প্রবেশ করতে পারে। সেখানে অন্য বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম আছে, যা আমাদের দেশের মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যেগুলো আমাদের ছেলেমেয়েরা দেখে থাকে এবং সেগুলো দেখে তারা প্রভাবিত হয়।
তবে আইন কঠোর করলেই সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হবে না। আমি মনে করি, আইন কঠোর করে বা আইন প্রয়োগ করে এটি থেকে মুক্ত করা সহজ কাজ নয়। এটির জন্য আমাদের মনোজগতের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

পর্নোগ্রাফি যখন ট্রেন্ডি
যদি একটু পেছনে তাকাই, ২০১৯ সালে শুধু ফ্রি পর্নোগ্রাফি সাইটগুলোতেই মানুষ ভিজিট করেছে ৪২ বিলিয়ন বার বা ৪ হাজার ২০০ কোটি বার। এই সংখ্যা থেকেই ধারণা করা যায় যে পর্নোগ্রাফি আসক্তি কতটা বিস্তৃত। মানুষ পর্নোগ্রাফি দেখে আনন্দ লাভের আশায়, ভালোলাগার জন্য। কিন্তু এই আসক্তি, এই ভালোলাগার পেছনে যে কালো একটি দিক রয়েছে, সেটা সম্পর্কে কয়জন চিন্তা করি? পর্নোগ্রাফির খারাপ প্রভাব আমাদের জীবনে, আমাদের সমাজে কীভাবে পড়ছে, সে বিষয়ে বললেন সেক্স মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সুষমা রেজা। তিনি বলেন, শুনলে হয়তো অনেকে অবাক হবেন, পর্নোগ্রাফি এখন রীতিমতো ট্রেন্ড হয়ে উঠেছে। কে কত আপডেট, এ নিয়ে চলছে প্রতিযোগিতা। শুধু ছেলেরাই নয়, এ জগতে বিচরণ করছে মেয়েরাও। ৩০ শতাংশ মেয়ে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত।

বাস্তব জীবনে যেমন প্রভাব
পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত ব্যক্তিরা বাস্তব জীবনে ভয়াবহ প্রভাব বিস্তার করে। তারা সব সময় ভাবে কিংবা ভাবতে শুরু করে তার পার্টনার ঠিক ওই রকমই হবে, যে রকমটা পর্নোগ্রাফিতে দেখায়। কিন্তু তারা বুঝতে চায় না ওইটা নিতান্তই অভিনয়, এমনটাই বললেন ডা. সুষমা রেজা। তখন সঙ্গীর প্রতি হতাশামূলক মনোভাব তৈরি হয়। সঙ্গীকে আর ভালো লাগে না। বিকল্প খুঁজতে থাকে। এর পরেই শুরু হয় পরিবারে ভাঙন। অজান্তেই নিজের প্রতি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। তখন ভয়াবহ অন্যায় করতেও সময় লাগে না। ধীরে ধীরে নিজের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।

বাস্তব চিত্র
আসক্তি থেকে মুক্তি পেতে নিকি ব্রায়ান্ট এখন যোগব্যায়াম ও মেডিটেশনের আশ্রয় নিয়েছেন। ‘সেক্স বা যৌন সম্পর্কের বিষয়ে আমার যেসব ধারণা ছিল, পর্নোগ্রাফির কারণে সেসব বিকৃত হয়ে গেছে।’ বলছিলেন ২৫ বছর বয়সী নিকি ব্রায়ান্ট। তিনি কার্ডিফে একটি জিমের ম্যানেজার। তিনি জানান, শিশু বয়সেই তার পর্নোগ্রাফি দেখা শুরু হয়েছিল। নিকি বলেছেন, পর্নোগ্রাফি দেখার কারণে পরবর্তী জীবনে সেক্স সম্পর্কে তার মধ্যে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে নিজের শরীর সম্পর্কে তার যে অনুভূতি ছিল, সেটাও ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে। শুধু নিকি একা নন, তার মতো এ রকম আরও অনেকেই পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হওয়ার পর তাদের জীবনের ওপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। যুক্তরাজ্যে শিশুদের নিয়ে কাজ করে এ রকম একটি দাতব্য সংস্থা প্ল্যান ইউকে এবং ইনস্টিটিউট অব সাইকোসেক্সুয়াল মেডিসিন শিশুদের ওপর পর্নোগ্রাফির এই প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, পর্নোগ্রাফি দেখার ফলে পওে কী ধরনের বিপদ হতে পারে, সে বিষয়ে স্কুলে পড়ানো উচিত। যুক্তরাজ্যে ওয়েলসের, নিকি ব্রায়ান্ট যে অঞ্চলের, সেখানকার স্থানীয় সরকার বলেছে, কীভাবে পর্নোগ্রাফির মতো বিষয়কে স্কুলের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তারা এখন সেই উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।

গুরুত্বের তালিকায় সেক্স এডুকেশন
দেশে এখনো সেক্স এডুকেশন নিয়ে ততটা আলোচনা নেই। তবে দেশের বাইরে এর গুরুত্ব খুব বেড়েছে। সারা ব্রিটেনে ২০১৯ সালে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী লোকজনের ওপর চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৭ শতাংশ নারী বলেছে যে জরিপের আগের মাসে তারা পর্নোগ্রাফি দেখেছে। তবে তাদের বেশির ভাগই বলেছে, পর্নোগ্রাফিতে যে সেক্স দেখানো হয়, তার সঙ্গে বাস্তব জীবনের সেক্সের কোনো সম্পর্ক নেই। ‘পর্নোগ্রাফির ব্যাপারে প্রশ্ন করতে গিয়ে ভয় পাওয়া চলবে না। তারা কী দেখে, কতটুকু দেখে এবং কখন তারা দেখে এসব জানা দরকার। এ বিষয়ে আমাদের অনেক শিক্ষার প্রয়োজন। বিশেষ করে যৌনশিক্ষা এবং সেখানে পর্নোগ্রাফিকেও অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। সম্পর্ক কিংবা নারী ও পুরুষের ক্ষমতায়নের ওপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়ে, এসব বিষয়ে জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ বলা হচ্ছে, ২০২২ সাল থেকে ওয়েলসের পাঠ্যসূচিতে এসব বিষয় অনেক গুরুত্ব পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ইউকের রোজ ক্যাল্ডওয়েল বলেছেন, স্কুলের পাঠ্যসূচিতে পর্নোগ্রাফিকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে সেটি হবে বড় ধরনের অগ্রগতি। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ যৌনতা ও সম্পর্কের জন্য এই শিক্ষা তাদের প্রস্তুত করবে। শিক্ষকদেরও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে।’

ছবি: ইন্টারনেট

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

eighteen + 12 =