নতুন করে পাবো বলে

করেছে Rodoshee Magazine

তোমাকে পেলাম, পুরোপুরি কি পেলাম? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অমীমাংসিত কোনো উত্তরে পৌঁছে যাব কিন্তু সমাধান মিলবে না। কেননা, ভালোবাসা, বন্ধন, বন্ধুত্ব এই শব্দগুলোর সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে যুক্তিহীনতা শব্দটি। ভালোবাসায় আছে আবেগ, আছে বাস্তবতা। চেতন মনে অবচেতনকে প্রাধান্য দিয়ে কেঁদে ভাসানো আছে, আর কখনো কখনো একজনে প্রধান করে তোলার জন্য অনেক কিছুকে তুচ্ছ করার প্রবণতাও আছে। কিন্তু মানুষ বয়সের বিচারে বিভিন্ন স্তরে অবস্থান করে। তার মন আর শরীরের চাহিদা পাল্টে যায়, পাল্টে যায় প্রিয়জনের নাম। একেক স্তরে প্রধান হয়ে ওঠে একেকজন।

শুধু ঘর বাঁধব বলে

ভালো লাগা, ভালোবাসা হয়ে গেলে সামনে থাকে দুজনে মিলে একটি ঘর বাঁধার পরিকল্পনা। এই মানুষটিই প্রথমত ভালো লাগার মানুষ হিসেবে হৃদয়ে প্রবেশ করে। দৈনন্দিন চিন্তাচেতনা পাল্টে দেয়। ভালোবাসার মানুষটিকে ভালোবাসার কথা বলার জন্য উদ্্গ্রীব হয়ে পড়া তারপর যখন প্রেম হয়ে যায় রাগে-অনুরাগে কেটে যায় সময়। লেনদেন হয় হৃদয়ের। কে যে কার সময় নিয়ে যায় কে রাখে তার খবর। একটু দাবিদাওয়া-হঠাৎ দেখা, তারপর একদিন রিকশার হুড তুলে গুনগুন করে সঞ্জীব চৌধুরীর গান গেয়ে ওঠা ‘রিকশা কেন আস্তে চলে না…’। সময় চলতে থাকে, বদলে যায় চাওয়া। একদিন বলে বসা ‘এই তোমার চোখে আইলাইনার দিলে ভালো লাগে না’ তারপর? তারপর আর কী! গল্পটা বলেই দিই।

সামিরা আহমেদ (ছদ্মনাম) একটি করপোরেট অফিসে চাকরি করে। সাজতে ভালোবাসে, বিশেষ করে চোখ সাজানো তার পছন্দ। কিন্তু প্রেমে পড়ার পর, সব ভালোবাসা যাকে ঘিরে আবর্তিত হয় তার চোখের সাজ মোটেও পছন্দ না। সামিরা জানায়, ফয়সাল (সামিরার প্রেমিক) চোখ সাজানো পছন্দ করে না। তাই সাজের ধরন পাল্টে গেল সামিরার। শুধু তাই নয়, প্রতিদিন অফিস টাইমের বাইরে কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে দেখা করছে, বন্ধুতালিকায় কারা আছে এসবই জানাতে হয় ফয়সালকে। এভাবেই একটি নামের আড়ালে আরও অনেক প্রিয় নাম ধূসর হয়ে আসে। আর ধীরে ধীরে সামনে আসে ঘর বাঁধার স্বপ্নটাও। একজন আরেকজনকে জানতে জানতে একসময় আলোচনায় চলে আসে দুজনের পরিবারের সদস্যরা। আর দিন দিন জীবনযাপনে চলতে থাকে যোজন-বিয়োজন।

সম্পর্কের এই যে আকাশ এখানে মাঝে মাঝে রোদ ওঠে, কালো মেঘ হয়। ছেয়ে যায় সব সুন্দর। আবার কোনো একটি মুহূর্তের পাওয়া হঠাৎ পাওয়া স্বর্গ হয়ে যায়। সব কোলাহল ছাপিয়ে চোখে চোখ রাখার পর যে অনুভূতি তা ভাসিয়ে আনে দূরের অনেক কিছু, আবার ভাসিয়ে নিয়ে যায় কাছের অনেক কিছুকেও।

ঘরের স্বপ্নটি যখন একটু একটু করে বাস্তবায়নের দিকে যেতে থাকে, সামনে চলে আসে আয়-ব্যয়ের হিসাব। লবণ আর তেলের হিসাব, সন্তান আর সম্পত্তির হিসাব। একেকটি জায়গায় প্রিয়জনের চেহারাটা ভিন্ন ভিন্ন রূপে দেখা দিতে থাকে।

তুমি কি আমায় আগের মতো বাসো ভালো?

একসময় খুব করে ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্নটা পূরণ নাও হতে পারে। সবার হয় না। যেমন হয়নি মারিয়ার। হঠাৎ বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল তার। মারিয়া ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে চলে যেতে পারেনি। অথচ ছেলেটি চেয়েছিল, হাত ধরে নিয়ে যেতে। জীবনসংসার একসঙ্গে কাটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ছেলেটা। সবে এইচএসসি পেরিয়ে আসা মারিয়ার বিয়ে হয়ে যায় এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে। মারিয়ার পড়ালেখা বিয়ের পরেও চলেছে। সে মাস্টার্স শেষ করে শিক্ষকতা করছে। মারিয়া জানায় তার কাছে নাকি মনে হয়, আশরাফুল (মারিয়ার প্রেমিক) যত দূরে চলে গেছে তত দূরে চলে গেছে সুখ। মারিয়ার বিয়ে হয়ে যাওয়ার দুই বছর পরও আশরাফুল বিভিন্নভাবে মারিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু মারিয়া যোগাযোগ রাখেনি। একসময় আশরাফুলও আর যোগাযোগের চেষ্টা করে না। এই যে দুই পক্ষের কাছ থেকে আসা না এই হলো দূরত্ব। এই দূরত্বজুড়ে মারিয়া এখন আশরাফুলের উপস্থিতি বুঝতে পারে। আশরাফুল সব সময় চাইত মারিয়া শিক্ষকতা পেশায় আসুক। মারিয়া শিক্ষকতা পেশায় আসার পর আশরাফুলকে জানাতে চেয়েছে ‘তুমি যা চেয়েছিলে, এই দেখো আজ তাই হলো।’

হ্যাঁ, ফোনে কথা বলার চেষ্টা করেছিল সে। হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গে ওপর প্রান্ত থেকে কলটি কাটা পড়ে যায়। দ্বিতীয়বার কল না করে কেঁদে ভাসিয়েছে মারিয়া। তার ভালোবাসার অপর নাম হয়ে উঠেছে শিক্ষকতা। তবু, তবু মারিয়া জানতে চায়, আশরাফুল কি তাকে আগের মতো ভালোবাসে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মারিয়ার কোনো অ্যাকাউন্ট ছিল না। সম্প্রতি একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছে সে, মাঝেমধ্যে আশরাফুলের ফেসবুক আইডি সার্চ দিয়ে দেখে, কোন পোস্টের নিচে লাইক-কমেন্ট করে না। আশরাফুলকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টও পাঠায় না। কিন্তু আশরাফুল ফেসবুকে কোনো রাগ-অভিমানের পোস্ট দিলে কিংবা কোনো কবিতার লাইন শেয়ার করলে মারিয়া আজও মনে করে এগুলো কেবল তাকে নিয়েই।

হয়তো তাই, অথবা মোটেও তা নয়।

বন্ধু কী খবর বল

জাতি-ধর্ম, বর্ণ সব সবকিছুই অপ্রধান হয়ে ওঠে যে সম্পর্কটির সঙ্গে তা হলো বন্ধুত্ব। বিশেষ করে কৈশোরের বন্ধুত্ব। শৈশব থেকে যৌবনে পদার্পণ করার এ সময়জুড়ে বিভিন্ন রকম শারীরিক পরিবর্তন ঘটে এবং আকস্মিক হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মানসিক আবেগের তীব্রতার উত্থান-পতন ঘটে থাকে। চিকিৎসকেরা বলেন, বয়ঃসন্ধিকালের পূর্বে নিষ্ক্রিয় থাকা হাইপোথ্যালামাস এ সময় হঠাৎ করে সক্রিয় হয়ে ওঠে। সাধারণত ডোপামিন, গ্লুটামেট ও সেরেটোনিন নামক নিউরোট্রান্সমিটার হরমোন এ আবেগীয় পরিবর্তনে প্রধান ভূমিকা রাখে।

এই সময়ে যাকে বন্ধু করে পাওয়া যায়, তার ছবি সারাজীবন সতেজ থাকে মনের গহিনে। বন্ধুর কারণে সময়ে সময়ে সুখী আর স্বপ্নবাজ হয়ে ওঠার স্মৃতি জমা হয়। ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস ডেটাবেস গবেষণায় দেখা গেছে, যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কারণে মানুষ সুখী হয়। এত সেই সম্পর্ক যাতে, ¯েœহ, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সততা, পরার্থপরতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া আর সমবেদনার সহাবস্থান আছে। একে অপরের সঙ্গ দেওয়া, সুখে-দুঃখে পরিবর্তনে আস্থা রাখা, অনুভূতি প্রকাশ সব হয় ভয় ছাড়াই। বন্ধুর কাছে ভুল করা যায় বারবার। কৈশোরের বন্ধুটি থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার উপলক্ষ তৈরি হয় মেধা, পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তন প্রভৃতি কারণে। তারপর বদলে যেতে যেতে বহুদূর। সমাজ-পরিবারের কৃত্রিম-অকৃত্রিম বাস্তবতায় হাঁপিয়ে ওঠা হৃদয় মাঝেমধ্যে মন চলে যায় তার মনের কাছে। মানুষ অনেক সময় যে কথাটি আর কারও সঙ্গে শেয়ার করতে পারে না, সেই কথাটি বন্ধুর সঙ্গে নাহোক তার প্রতিকৃতি মনে মনে ভেবে তাকে সেই গল্প শোনায়। আর মাঝে মাঝে বলে ওঠে বন্ধু, কী খবর বল।

১৯৭৫ সালে বিগেলো এবং লা গাপিয়া একটি গবেষণায় দেখান যে, ভালো বন্ধু পাওয়ার জন্য সন্তান ক্রমবর্ধমান জটিল জীবন অতিবাহিত করে।

কেউ কেউ বন্ধুর সঙ্গে পাওয়ার জন্য পরিবারের বাধার মুখে পড়ে। নিষেধ অমান্য করায় শাস্তির মুখোমুখি হয়। এমনও তো হয় যে, প্রিয় বন্ধু যে বিভাগে পড়বে কোনো কিছু না ভেবে তার বিভাগে যোগ দিয়ে দেয় কেউ কেউ। কী হয় না? হতে পারে নিজেও করেছো এমন। তারপর সেই বন্ধুটিই একদিন এ পথে যেতে যেতে উচ্চশিক্ষার ছক আঁকে একে অন্যকে একই কলেজে পড়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কেউ একজন যখন ছিটকে পড়ে অঘোষিতভাবে শুরু হয় দূরত্ব। কে যে কাকে পেছনে ফেলে গেল, তাই একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। তাই বলে ক্ষণে ক্ষণে যে মনে পড়ে না তা কিন্তু নয়!

ভালোবাসার অন্য মানে

ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ অনেক সময় অনেক রকমে হয়। তবে বিপত্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতে পারে প্রকাশ যখন হয় অন্য ভাষায়। একটা ঘটনা বলেই ফেলি, শুধু একটিমাত্র কথার জন্য দীর্ঘ বিচ্ছেদ তৈরি হয় পলা আর লিমনের। পলা বলেন, ‘লিমনকে যেদিন ভালোবাসার কথা বলেছি, আসলে ভালোবাসতাম তার আগে থেকেই। আচরণে মনে হতো সেও একইভাবে ভালোবাসে। আমাদের ভালোবাসার মধ্যে অস্থিরতার কমতি ছিল না কিন্তু প্রকাশ করার ভাষা ছিল ভিন্ন। হঠাৎ করে দেখা করা, কথা বলা, পাশাপাশি হেঁটে কিছুদূর যাওয়া এই ছিল সব। ওর ছোট বোন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল, আমি জানতাম না। দুই দিন আমি ওর সঙ্গে কোনো রকম যোগাযোগ করতে পারছিলাম না আর তাতে যে অস্থিরতায় আমি ভুগছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমি বুঝতে পারছিলাম আশপাশের লোকজনের সঙ্গে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্বাভাবিক আচরণ করতে পারছিলাম। দুই দিন পর লিমনের সঙ্গে যখন আমার কথা হয়, ও আমি ওকে টঙ-দোকানে চা খাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। আসলে আমি ওকে না দেখে থাকতে পারছিলাম না। ও শুধু বলেছিল ‘আজ না’। এ কথা শুনে অভিমানে আমার শরীর কাঁপছিল। আমি ওকে হঠাৎই কল দেই, বুঝতে পারছিলাম ও কথা বাড়াতে চাইছে না। আবার কিছু সময় পর আমি ওকে কল দেই, আর ওর সাবেক প্রেমিকাকে নিয়ে কথা বলতে শুরু করি। কিন্তু আমি বোঝাতে ব্যর্থ হই কেন এত কথা বলা। আমাদের দুজনের মধ্যে বেশ কিছুদিন কথা বলা বন্ধ থাকে। তারপর এক বৃষ্টিবিকেলে লিমনের কল পাই। লিমন আমাকে তুমি সম্বোধন করে কিন্তু হঠাৎ বলে, চা খাবি, আয় চলে আয়। আমি বুঝলাম ওর রাগ পড়েছে। কিছু সময় অঝোরে কাঁদলাম। আমার যে কেমন লেগেছিল তখন তা আমি ওকে আজও বলতে পারিনি।

এখানে প্রসঙ্গ হয়ে যায়, মনোবিজ্ঞানের সংজ্ঞা, আবেগ মানুষের মস্তিষ্কের একধরনের সংকেত পদ্ধতি। আমাদের যদি কিছু ভালো না লাগে, তাহলে আমরা রেগে যাই। না হলে আমাদের মনে ভয় অথবা ঘৃণার সঞ্চার হয়। মন খারাপ হয়। কিছু ভালো লাগলে আমরা খুশি হই। এই সংকেতগুলো আমাদের মস্তিষ্ক আগে অনুধাবন করে। সংকেত পেয়ে আমরা আমাদের যুক্তি, অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিই কী করব। সুতরাং, আবেগের জায়গা থেকে বেশির ভাগ মানুষের অবস্থানই কিন্তু এক।

তবু একজন আরেকজনের থেকে আলাদা, খুব আলাদা। একই গন্তব্যে যেতে যেতেও তারা আলাদা কারণে হাঁটতে থাকে।

যৌনতা বনাম ব্যক্তিগত আবেগ

মনোবিজ্ঞানী চার্লস লিন্ডহোমের সংজ্ঞানুযায়ী প্রেম হলো ‘একটি প্রবল আকর্ষণ যা কোনো যৌন-আবেদনময় দৃষ্টিকোণ হতে কাউকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরে এবং যাতে তা ভবিষ্যতে দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার মনোবাসনাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।’ আর এই বাসনা চরিতার্থ হয় দাম্পত্যে। কিন্তু যৌন-আবেদনের থেকে সব সময় অধিক গুরুত্ব থাকে ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতিতে। সব আছে যে সংসারে সেই সংসারেও কেউ কেউ খুঁজে পায় না আত্মার ঠাঁই। যৌন চাহিদা যদি একটি গন্তব্য হয় সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতেও প্রয়োজন হয় পারস্পরিক আবেগ লেনদেন। আবেগহীন যৌনতা ধর্ষণের নামান্তর! কিন্তু ব্যক্তিভেদে আবেগ ভিন্ন।

নার্গিস আক্তার (ছদ্মনাম) প্রেম করে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু আবেগ আর যৌনতার কাছে ভিন্ন ভিন্নভাবে হেরে যাওয়া আর জিতে যাওয়ার গল্পও আছে তার। এই দুইকে একত্রে পাওয়া হয় না, হয় বলেই আমি বারবার তার প্রেমিকা হয়ে উঠি। বলছিলেন নার্গিস। তিনি আরও বলেন, একজনকে বারবার ভালোবেসে বিভিন্ন রকমে পেয়েছি, তবু শূন্যতা কাটে না!

মানুষের মন হয়তো এমনই। অথবা যা না পাওয়া সেগুলোকে বেশি প্রাধান্য দিতে দিতে মানুষ আরও আরও সৌন্দর্য যোগ করে সম্পর্কে অথবা হেরে যেতে থাকে দিনকে দিন।

কিছুই দিও না শুধু থাকো

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তি ধরে যদি বলি, পাওয়া কাকে বলে যে মানুষ জানে না সে ছোঁয়াকেই পাওয়া মনে করে। আবার কোনো কোনো ভালোবাসা এই সংজ্ঞাকে অতিক্রম করে যায়। ভালোবাসার একটা পর্যায়ের নাম প্লেটোনিক ভালোবাসা বা বায়বীয় ভালোবাসা হলো সেই শুদ্ধতম ভালোবাসা, যাতে কামনা-বাসনার কোনো স্থান নেই।

এ শব্দটির উৎপত্তি মূলত প্লেটোর প্লেটোনিজম মতবাদ থেকে, যাতে বলা হয় এমন প্রকার ভালোবাসার কথা যাতে প্রেমিক-প্রেমিকা ভালোবাসার সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রবেশ করবে কিন্তু শরীর নামক বস্তুটি থাকবে অনুপস্থিত। হ্যাঁ, এমন প্রেমে হাবুডুবু খায় অনেকেই। প্রেমের জন্য ক্ষয়ে যাওয়া সব সময় দৃষ্টিগোচর নাও হতে পারে। যে প্রেমে শরীর বিষয়টি অনুপস্থিত অথচ প্রেমের স্বাদ বা রস আস্বাদন করা যায় ষোলো আনা, এমন প্রেমই একমাত্র প্লেটোনিক প্রেম বা বায়বীয় ভালোবাসা হিসেবে পরিগণিত হবে।

পাভেল রহমান (ছদ্মনাম) একজন চিত্রশিল্পী। স্ত্রীবিয়োগের পর একমাত্র সন্তানকে নিয়ে তার সংসার। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি যখন একা হয়ে পড়েন, সেই থেকেই প্রতিদিন সকালে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তার ঘরের কলিংবেল বেজে ওঠে। বলছিলেন পাভেল রহমান। তিনি আরও বলেন, ওই কলিংবেল যিনি বাজান, তিনি একজন নারী। কলিংবেল দেওয়ার পর পাভেল দরজা খুলতেই তার দিকে একটি প্লেট বাড়িয়ে দেন তিনি। ওতে বাবা আর ছেলের জন্য সকালের নাশতা থাকে। পাভেল রহমান প্রথম ভেবেছিলেন তিন-চার অথবা এক সপ্তাহের মধ্যেই হয়তো তার নাশতা দেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু না বিগত দুই বছরের একদিনও তিনি নাশতা দেওয়া বন্ধ রাখেননি। এমনকি তার প্রবাসী হাজবেন্ড দুই মাসের ছুটিতে বাসায় আসার পরেও না। পাভেল নাশতা নিতে অস্বীকৃতি জানালেও দরজার সামনে থেকে সরে যান না তিনি। কিন্তু পুরো মুখটি কোনো দিন দেখতে পারেননি পাভেল। পাভেল জানেন, ওই নারী একজন ধার্মিক মহিলা। মাঝে মাঝেই খুব সকালে তার ঘর থেকে কোরআন তিলাওয়াতের শব্দ ভেসে আসে যদিও চৌকাঠ পেরিয়ে কোনো দিন পাভেলের ঘরে প্রবেশ করেননি তিনি।

দ্বিতীয় বিয়ে করেননি পাভেল। একবার ভালোবাসা দিবসে ছোট্ট একটা ফটোফ্রেম কিনে নিয়ে ওই নারীর দরজায় কড়া নাড়েন পাভেল, দরজা অল্প একটু খুলে দিয়ে শুধু বলেন, আপনি চলে যান। কেউ দেখলে…। পাভেল আর কিছু বলেননি, ফিরে চলে আসেন। বলা যায়, এ ভালোবাসা কামগন্ধহীন। কেবলই নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া। দেওয়ার পরিবর্তে তিনি নেননি কিছুই। এই নিষ্কাম প্রেম, এই প্রেম দুহাত ভরে শুধু দিয়ে যায়, নেয় না কিছুই। কি পরিণতি হয়েছিল পাভেলের প্রেমের তা আমার জানা নেই পাঠক। এও জানি না যে, দুই জনই তো ভাড়া বাসায় থাকেন, একদিন না একদিন তাদের বাসার দূরত্ব বেড়ে যাবে, কী হবে তখন!

তবে কি প্রেমিকের শরীরের গন্ধই প্রেমিকাকে মোহিত করার জন্য কখনো কখনো যথেষ্ট। এমন ভালোবাসার নাম প্লেটোনিক ভালোবাসা।

প্রত্যাখ্যাত ভালোবাসা

নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক আর্ট অ্যারন বলেন, ‘যেকোনো বিষয়ে আপনার প্রথমবারের অভিজ্ঞতা অন্য সময়ের চেয়ে বেশি ভালো মনে থাকে। সম্ভবত প্রথমবার কোনো কাজ করার সময় কিছুটা ভীতি, কিছুটা উত্তেজনা কাজ করে সে জন্য। প্রথম, দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় যাই বলি না কেন, প্রেমে পড়ার বিষয়টিও অনেকটা তাই। প্রেমে থাকে ভীতি আর প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা। প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, সে নিয়েও সংশয়েও কমতি থাকে না। উদ্বেগ হচ্ছে প্রেমের সবচেয়ে বড় অংশ। তা সত্ত্বেও একদিন প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়ে যায়। কিন্তু উত্তর সব সময় মনের মতো হয় না। কেউ কেউ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার স্বাদ পেয়ে যায়। ভালোবাসার প্রতি অন্য রকম অনুভূতির জন্ম হয়। হতে পারে তা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার মতোও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সম্পর্কসমূহের সূচনাপর্বে প্রেমের অনুভূতি অধিকতর দৃঢ়ভাবে কাজ করে। তখন এর সঙ্গে এমন এক অনিশ্চয়তা এবং দুশ্চিন্তা অনুভূত হয় যে এ ভালোবাসা হয়তো আর কখনো ফিরে নাও আসতে পারে।

রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কবিতা ধরে যদি বলি, ‘ভুল ভেঙে গেলে ডাক দিও, আমি মৃত্যুর আলিঙ্গন ফেলে আত্মমগ্ন আগুন ললাটের সৌমতায় তোমার লিখে দেব একখানা প্রিয় নাম ভালোবাসা’ এই আকুতিটুকু অনেকের হৃদয়ে গুম হয়ে যায়, ব্যথা ছড়ায়, সুগন্ধ ছড়ায়; বেঁচে থাকার কারণ হয়ে থাকে, আর অনন্ত অপেক্ষাও শুরু হয় এমন অনুরাগে।

এই যে একজন আরেকজনকে ভালোবাসা, এর পেছনে বিজ্ঞানভিত্তিক কারণ ৫টি। ১. আবেগের মানসিক বা আত্মনিষ্ঠ অনুভূতি। ২. শারীরিক উত্তেজনা। ৩. শারীরবৃত্তীয় ভিত্তি। ৪. মৌখিক, ভাষাগত এবং অঙ্গ সঞ্চালনমূলক বহিঃপ্রকাশ। ৫. সংশ্লিষ্ট প্রেষণামূলক অবস্থা।

কোনো কোনো প্রেমিক বা প্রেমিকার কথা হয়তো এমনই হবে, আমি তোমাকে ভালো না বেসে থাকতে পারি না বলে ভালোবাসি।

লেখা : স্বরলিপি

ছবি : সংগৃহীত

রোদসী/আরএস

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 × one =