‘নারীকে দায়িত্ব দিতে এখনো সংকোচ দেখা যায়’

করেছে Suraiya Naznin

নারীদের ক্যারিয়ারে ভালো করার জন্য অবশ্যই প্রতিবন্ধকতা আছে। কারণ, কেউ নারী বললেই আগে চুপসে যান। আমার জন্যও এ চ্যালেঞ্জ আছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আমাকে পছন্দ করে নিয়েছে। তারপরও আমাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। নারীকে দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংকোচ দেখা যায়। বলছিলেন ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়রা আজম। গ্রন্থনা করেছেন- সুরাইয়া নাজনীন

 

জীবনের শুরুর গল্পটি জানতে চাই

হুমায়রা আজম : পুরান ঢাকায় জন্ম হলেও একদম ছোটবেলাটা আমার কাটে পশ্চিম পাকিস্তানের ইসলামাবাদে। বাবা সেখানে শিক্ষকতা করতেন। সেখান থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন বাবা সৈয়দ আলী আজম। আমার ম্যাট্রিক পরীক্ষার পরপরই বাবা মারা যান। জীবনের কঠিন সময়টা শুরু হয় তখন থেকেই। মা আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে কঠোর নিয়মে মানুষ করেন। আমাদের ছোট থেকে টিউশনি করতে হয়েছে, কষ্ট করতে হয়েছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল শেষে সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজে পড়াশোনা করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হই ১৯৮২ সালে।

আন্দোলনের কারণে ১৯৮৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হই। ১৯৯০ সালে এএনজেড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু করি। এএনজেড ব্যাংকে সাড়ে ছয় বছর ছিলাম। আমরা পাঁচজন একসঙ্গে যোগদান করেছিলাম। শাখা ব্যাংকিং দিয়ে শুরু করি। কয়েক মাসের মধ্যে চলে যায় করপোরেট ব্যাংকিংয়ে। ১৯৯৬-এ এইচএসবিসি বাংলাদেশে করপোরেট ব্যাংকিং দিয়ে কাজ শুরু করি। বাংলাদেশে এইচএসবিসি ব্যাংকের অফশোর লাইসেন্স, এডি লাইসেন্স, ওদের সফট লঞ্চিং সবকিছু প্রতিষ্ঠা হয়েছে আমার হাত দিয়ে। এইচএসবিসি থেকে ২০০২ সালে গেলাম স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে। সেখানে গ্রুপ স্পেশালিস্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের হেড ছিলাম। সাত বছর এই বিদেশি ব্যাংকে কাজ করেছি।

আমি ছিলাম এখানকার ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রথম নারী সদস্য। পরে ওখানে ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনের প্রধান হই। আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসিতে গেলাম ২০০৯-এর এপ্রিলে। সেখানকার প্রথম নারী এমডি ছিলাম। সে সময়ে বাংলাদেশের কোনো ব্যাংকে নারী এমডি ছিলেন না। আসলে নিজেকে কখনো পুরুষ বা নারী হিসেবে ভাবিনি। নিজের সক্ষমতার ওপরই বেশি জোর দিয়েছি।

যখন আইপিডিসিতে যাই, ওদের আর্থিক অবস্থা ভয়াবহ অবস্থায় ছিল। আমি পুরো ১০০ শতাংশ মূলধন পুনরুদ্ধার করেছি। প্রতিষ্ঠানটি ভালো জায়গায় রেখে এসেছি। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংক এশিয়ায় গেলাম প্রধান ঝুঁকি পরিপালন কর্মকর্তা হয়ে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেখানে কাজ করেছি। জীবনে সব জায়গাতেই আমি সফলভাবেই কাজ করেছি। অনেক কোম্পানিকে ঘুরে দাঁড় করিয়েছি। ২০১৮ সালের মার্চে ট্রাস্ট ব্যাংকে প্রধান ঝুঁকি পরিপালন কর্মকর্তা হিসেবে এসেছি। এখন এমডি হিসেবে ট্রাস্ট ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করছি।

 

 

হুমায়রা আজম

সংগ্রামের জোয়ারে নারীর উঠে আসাটা কতটুকু চ্যালেঞ্জের?

হুমায়রা আজম : নারীদের ক্যারিয়ারে ভালো করার জন্য অবশ্যই প্রতিবন্ধকতা আছে। কারণ, কেউ নারী বললেই আগেই চুপসে যান। আমার জন্যও এ চ্যালেঞ্জ আছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আমাকে পছন্দ করে নিয়েছে। তারপরও আমাকেও সংগ্রাম করতে হয়েছে। নারীকে দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংকোচ দেখা যায়। পরিবারকে সাহায্য করতে হবে। নারীদেরও নিজেদের উদ্যোগ থাকতে হবে, আন্তরিকতা থাকতে হবে। তাহলেই সফল হওয়া যাবে। নারী পারবে, এটা মেনে নেওয়ার মানসিক প্রতিবন্ধকতা আছে সমাজে। তবে এত দিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, নারীরা ফাঁকি দেন কম। যারা দায়িত্বশীল, তারা দায়িত্ব নিয়েই কাজ করেন।

 

উন্নত দেশ গড়তে নারী জাগরণ কতটুকু দরকার

হুমায়রা আজম : নারী শক্তির প্রতীক-নারী উন্নয়নের প্রতীক। কিš‘ বাস্তব সত্য হচ্ছে এখনো পৃথিবীর পিছিয়ে থাকা এবং পিছিয়ে রাখা মানুষের মূল অংশটি হচ্ছে নারী। কোনো দেশের উন্নয়নের জন্য নারীর জাগরণ ও ক্ষমতায়ন একটি চাবিকাঠি। সে জন্য সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। নারীর অংশগ্রহণ বাড়ালেই শুধু চলবে না, নেতৃত্বের পর্যায়ে নারীকে আসতে হবে। পরিমাণগত ও গুণগত উভয় দিক থেকেই নারীর জাগরণ প্রয়োজন। নারীর উন্নয়নের পথে একটি বাধা তাদের দুর্বল মানসিকতা। তাই নারীর জাগরণের জন্য তাদের নিজেদের আগে এগিয়ে আসতে হবে। নারী জাগরণ শুধু নারীর জন্য দরকার নয়, একটা সমৃদ্ধ সুখী সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য দরকার। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে কখনোই সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনায় নারীর যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

 

এবার নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিলিভ ইকুয়াল। আপনার কি মনে হয় আমাদের দেশে এটা হয়?
হুমায়রা আজম : গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের নারীদের ক্ষমতায়নে ব্যাপক অগ্রগতি ঘটলেও এ কথা বললে ভুল হবে না যে বিদ্যমান সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতিনীতি, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং অগণতান্ত্রিক আচার-আচরণের কারণে সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য চলে গেছে। সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করতে মেধার ওপর জোর দিতে হবে। কারণ, এটা ম্যারিটোক্রেসি বা গুণতন্ত্র হওয়া উচিত। সোজাভাবে বললে, যোগ্যতার পরিচয় যেমন দেওয়া লাগবে, তেমনি কাজে পরিশ্রমী হতে হবে। মেধা, পরিশ্রম সবকিছুর সমন্বয় এবং চ্যালেঞ্জ গ্রহণ, জায়গায় বসে নিজের কাজ ঠিকমতো করা, যারা এগুলো করতে রাজি আছে তারাই ভালো করবে ও স্বাভাবিকভাবে নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর হবে আর নইলে হবে না।

 

জীবনের প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে শিক্ষাগুলো কেমন ছিল, যা এখনো কাজে লাগে?
হুমায়রা আজম : সব মানুষকে প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়। সেটা সব জায়গাতেই। করপোরেট রাজনীতি নারী-পুরুষের জন্য আলাদা কিছু নয়, সেটা সবার জন্যই সমান। আপনি সহজ-সরল হলে, অনেক কাজ করলে তাদের জন্য মাঝেমাঝে কাজে অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। এ ছাড়া যারা কাজে ফাঁকি দেয়, তারা আপনার বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করে থাকে সচরাচর। এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা কমবেশি সবারই হয় বা হয়েছে। আমি নিজের দায়িত্বকে প্রাধান্য দিয়েছি, তাই জীবনে সব জায়গাতেই আমি সফলভাবে কাজ করেছি। কখনো কোনো কাজে পিছপা হইনি, নিজেকে কখনো নারী বা পুরুষ ভাবিনি, নিজের সক্ষমতাকে জোর দিয়েছি। আজকের প্রাপ্তিটা আসলে সেই কাজেরই ধারাবাহিক সফলতা।

 

একজন নারীর টিকে থাকতে কী থাকা জরুরি
হুমায়রা আজম : নারীদের নিজেদের উন্নতি নিজেদেরই করতে হবে, পড়াশোনা করতে হবে, নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। নিজেদের কাজ ও জীবনের ভারসাম্য নিজেদের ঠিক করতে হবে। বাড়ি থেকে তাদের সাপোর্টটা পেতে হবে। মূলত সবকিছু তাদের নিজেদেরই ঠিক করে নিতে হবে। যদি তারা নিজেরা ঠিক করে নিতে পারেন, তাহলে স্বাভাবিকভাবে তারা স্ব স্ব উন্নয়নে এগিয়ে যেতে পারবেন। অবশ্য একটা ব্যাপার আছে, প্রতিষ্ঠানকেও আরও নমনীয় হতে হবে, অনেক সময় দেখা যায় তারা নারী হলেই তারা পিছপা হয়। তা, সবকিছুই ভারসাম্য করে কাজ করতে হবে। পরিবার থেকে যেমন সাপোর্ট পেতে হবে, তেমনি চ্যালেঞ্জ নিতেও প্রস্তুত থাকতে হবে।

 

যারা সামনে আসতে চায়, তাদের অনুপ্রেরণার জন্য কী বলতে চান?
হুমায়রা আজম : পরামর্শ তো আসলে কিছু না, সবাইকে কাজটা শিখতে হবে আর জানার আগ্রহ থাকতে হবে। যেটা আমি দেখি বাস্তবে, কারও যেমন শেখার আগ্রহ নেই, তেমনি কাজেরও আগ্রহও নেই। ক্যারিয়ার গড়তে হলে যেমন পরিশ্রম করতে হবে, তেমনি শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। সফলতার পথে এগিয়ে যেতে কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে। কাজে ফাঁকি দেওয়া যাবে না। পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। এ প্রতিযোগিতাপূর্ণ সময়ে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করাটা জরুরি। সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে হলে অবিরাম যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্মতৎপরতা বাড়াতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক সুযোগ কাজে লাগানোর মানসিকতা থাকতে হবে। আসলে যত কথাই বলি, পরিবার থেকে যদি অনুপ্রেরণা ও সমর্থন না দেওয়া হয়, তাহলে ব্যাপারটা অসম্ভব।

 

ঘরে-বাইরে কীভাবে ম্যানেজ করেন?
হুমায়রা আজম : কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের মাঝে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। আমি অবশ্যই বলব এটি একটি চ্যালেঞ্জ, যার জন্য ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ও ইতিবাচক মানসিকতা প্রয়োজন। আমার ক্ষেত্রে আমার পরিবার আমাকে ভীষণভাবে সাপোর্ট দিয়েছে। বিশেষ করে আমার জীবনসঙ্গী ও প্রিয় বন্ধু আমার স্বামী এরশাদুল হক খন্দকার আমাকে সাপোর্ট না দিলে আমার ক্যারিয়ার অসম্ভব ছিল। আমার ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে আসাই হচ্ছে আমার স্বামীর জন্য।

 

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

six + ten =