নারীর অসাম্প্রদায়িক মনন

করেছে Rodoshee

লেখা : দিব্যদ্যুতি সরকার

বাঙালির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে যত প্রকারের হঠকারী জাতিদাঙ্গা হয়েছে, তার সবই মূলত পুরুষের কীর্তি। নারী কখনো এই অসভ্যতার সঙ্গী হয়নি। বরং তারা এর শিকারে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময়ে বহু তরুণ স্বপ্ন দেখেছে কোন পাড়ার কাকে ধর্ষণ করে সে তার যৌনসাধ পূরণ করবে! কিন্তু বাঙালি নারী এই নষ্টামিতে কখনো অংশ নেয়নি।

সম্প্রতি আমার এক ছাত্রী আমাকে খুব অভিনব একটি ব্যাপার ধরিয়ে দিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে যে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছে, সেটি তখন সবার মুখে মুখে। পক্ষ-বিপক্ষ-নিরপেক্ষ নানা রকম বিতর্ক ও আলোচনা তখন চলছে। সাংবাদিকেরা আর রাজনীতিবিদেরা শুধু যে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তা-ই নয়, ফেসবুকেও তখন বিপুল ঝগড়া চলছে। এই বিপুল বিতর্ক আর ঝগড়াঝাটির মাঝে ছাত্রীটি বলল, স্যার, খেয়াল করলে দেখবেন নাসিরনগরে হামলায় কোনো নারী জড়িত নেই। ফেসবুক আর ইউটিউবের কল্যাণে ওই হামলার কিছু ভিডিও তখন বাতাসে ঘুরছে। কিন্তু আশ্চর্য, সত্যি সেখানে কোনো নারী হামলাকারী নেই।

বাঙালির যেমন অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য রয়েছে, রয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও হামলারও ঐতিহ্য। সেসব ঘটনা নিয়ে বইপত্রও লেখা হয়েছে। সেখানে খুনোখুনির অনেক ছবিও পাওয়া যায়। সেসবের অনেকগুলো দেখে ও পড়ে সত্যিই অবাক ও মুগ্ধ হয়ে গেছি। না, বাঙালি নারী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা হামলা কোনোটায় অংশ নেয় না। মনে হতে পারে, মেয়েদের বুঝি গায়ের জোর কম, তাই মারামারির মধ্যে যায় না। কিন্তু আসল ব্যাপারটি তা নয়। মারামারি আর দাঙ্গা লাগানোর জন্য যতটুকু গায়ের জোর লাগে, তার চেয়ে ঢের গায়ের জোর মেয়েদের আছে। প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি শ্রমজীবীদের প্রায় অর্ধেকই নারী। যুগ যুগ ধরে তারা মাঠে কাজ করেছে, মাছ ধরেছে, খেলাধুলা করেছে, মারামারি-খুনোখুনিও করেছে। এতকাল যেসব কাজকে লোকে নিতান্ত পুরুষের কাজ বলে ভাবত, সেসব কাজেও আজকাল নারীরা এসে পুরুষদের তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের মেয়েরা যেভাবে ফুটবল খেলছে, তাতে সবাই বুঝে গেছে যে বাংলাদেশের ফুটবল ভবিষ্যৎও নারীদের হাতে। সুতরাং গায়ের জোরের তত্ত্ব এখন অর্থহীন।
বেশ আগে দেখা একটা ঘটনার কথা বলি। খুলনা শহরের মধ্যে একটি স্থানে বাড়ির কাজ চলছিল। তখন নির্মাণকাজে এখনকার মতো ক্রেনের ব্যবহার ছিল না। সিমেন্ট, বালু আর খোয়া নিচে একটা খোলা চত্বরে মেশানো হচ্ছিল আর সেখান থেকে মাথায় করে সেই কংক্রিটের মিশ্রণ তিনতলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। মাথায় করে নিয়ে যাওয়া এই শ্রমিকদের অধিকাংশই ছিল মহিলা। কোমরে শাড়ি শক্ত করে পেঁচিয়ে তারা কংক্রিটভর্তি কড়াই নিয়ে একবার তিনতলায় যাচ্ছে, আবার নেমে আসছে। এর মধ্যে হঠাৎ কী একটা কারণে তাদের মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়। চিৎকার-চেঁচামেচির মধ্যে হঠাৎ শুনলাম একটি গোঙানির শব্দ। ছুটে গিয়ে দেখি, একজন নারী শ্রমিক অপর একজন পুরুষ শ্রমিককে চিত করে ফেলে দিয়ে গলা চেপে ধরেছে। বেচারা দম ছাড়তে পারছে না। ওঠার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। অগত্যা নিচে পড়ে গোঁ গোঁ করছে। শেষমেশ আরও তিন-চারজন মহিলা শ্রমিক ছুটে গিয়ে শক্তি প্রয়োগ করে ওই পুরুষ শ্রমিকটিকে রক্ষা করে। এটা একটা উদাহরণ; এ রকম হাজার উদাহরণ দেওয়া যায়। শক্তি মেয়েদেরও ঢের আছে। ঘরে ও বাইরে মিলিয়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কাজ করে নারীরা। ইদানীং বাইরেরও হাজার কাজ তারা দাপটের সঙ্গ করছে। ফলে মেয়েদের গায়ের জোর কম বলে মারামারি করে না, সে ভাবনা যুক্তিতে টেকে না। অথচ বাঙালির কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বা হামলায় নারী জড়িত হয়নি। এ সত্যিই অভিনব ব্যাপার।

আজকাল ফেসবুক আসায় ঘরে বসেও একরকম দাঙ্গা দাঙ্গা খেলা যায়। প্রাণ খুলে গালাগাল করতে তো আর গায়ের জোর লাগে না। নাসিরনগর হামলা নিয়েও সেসব যথেষ্ট হয়েছে। বলতে গেলে ঘরে ঘরে তখন সাম্প্রদায়িক দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল। যার চৌদ্দ পুরুষ কখনো নাসিরনগর দেখেনি, সেও ঘরে বসে ফেসবুকে অন্য ধর্মের লোককে নিয়ে অসাধারণ নোংরা ভাষায় গালি দিচ্ছিল। সেটা পড়ে আবার আরেকজন ততোধিক জঘন্য ভাষায় পাল্টা গালি দিচ্ছে। মনে হচ্ছিল সারা দেশে এখন অশ্লীল ভাষা আর গালিগালাজের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস চলছে। সারা দেশের আবহাওয়ায় এভাবে কিছুদিন তীব্র একটা সাম্প্রদায়িক দুর্গন্ধ বয়ে যায়। এভাবে কিছুদিন সবাই পরস্পরকে ঘৃণা করা আর গালি দেবার অত্যন্ত জরুরি নাগরিক দায়িত্বটি সম্পন্ন করে এখন যার যার কাজে মন দিয়েছে। এখানেও দেখলাম, ফেসবুকের এই মুখ খারাপ করে গালি দেবার লড়াইয়ে নারীরা অনুপস্থিত। সেই ছাত্রীটি বলল, সে কয়েক দিন ধরে খুব মন দিয়ে শত শত ফেসবুকের স্ট্যাটাস আর মন্তব্য পড়েছে। সেখান থেকে সে সিদ্ধান্তে এসেছে, বাঙালি নারীরা পুরুষের তুলনায় বহু বহু গুণ দায়িত্বশীল ও সভ্য। কারণ, নারীদের ফেসবুক স্ট্যাটাস আর মন্তব্যে সাম্প্রদায়িক মনোভাব তেমন দেখা যায়নি।

মনে পড়ল নাসিরনগরে হামলার পরে ঢাকা থেকে ছুটে গিয়েছিলেন সুলতানা কামাল। তার সংগঠনই প্রথম এই হামলায় অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে হাইকোর্টে রিট করে। দাঙ্গায় নারীরা না থাকলেও সারা দেশে যত প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে, তার প্রায় সর্বত্রই নারীরা অংশ নিয়েছে। সেসবের বহু ছবি ও ভিডিও এখনো ওয়েবে রয়েছে। ফেসবুকে ধর্ম নিয়ে অবমাননাকর স্ট্যাটাস তৈরির ষড়যন্ত্রের কাজটিও যেমন কোনো নারী করেনি, কিংবা উগ্র সাম্প্রদায়িক সমাবেশ বা হামলাও কোনো নারী করেনি।

বাঙালিদের মারামারি করার অনেক ইতিহাস আছে। বিশেষ করে যখন থেকে তারা হিন্দু ও মুসলমান এই দুটো শ্রেণিতে আলাদা হয়ে গেছে। বাঙালির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে যত প্রকারের হঠকারী জাতিদাঙ্গা হয়েছে, তার সবই মূলত পুরুষের কীর্তি। নারী কখনো এই অসভ্যতার সঙ্গী হয়নি। বরং তারা এর শিকারে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সময়ে বহু তরুণ স্বপ্ন দেখেছে কোন পাড়ার কাকে ধর্ষণ করে সে তার যৌনসাধ পূরণ করবে। কিন্তু বাঙালি নারী এই নষ্টামিতে কখনো অংশ নেয়নি।

বাঙালি নারীর রয়েছে সহজাত কিছু অসাধারণ মানবিক বৈশিষ্ট্য। যেমন সে খুব পরিশ্রমী, যেমন সে অপেক্ষাকৃত অভোগী স্বভাবের ও সংস্কৃতিপ্রিয়; যেমন সে অসাম্প্রদায়িক ও পরধর্মসহিষ্ণু। সত্যি বলতে কী, সার্থক মানুষ হয়ে উঠতে গেলে মানুষ যেসব গুণের সাধনা করে, বাঙালি নারীর মধ্যে এমনিতেই তার অনেক কিছু রয়েছে। এর ব্যতিক্রম নেই, তা বলছি না; কিন্তু ব্যতিক্রম বলেই তা উদাহরণ নয়। বলতে দ্বিধা নেই, বাঙালি নারীর কাছে নতজানু হয়ে বাঙালি পুরুষকে অসাম্প্রদায়িকতার পাঠ নিতে হবে, পাঠ নিতে হবে বহুত্ববাদী সমাজের। হয়তো ভবিষ্যতের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ নির্মাণের সবচেয়ে বিশ্বস্ত নির্মাতা হবে বাঙালি নারী; পুরুষকে তখন নারীর সহযোগীর ভূমিকা নিয়েই ধন্য হতে হবে।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

three × 2 =