নারীর ইচ্ছাই বাধা পেরোনোর শক্তি : শেখ নওশীন ইসলাম

করেছে Sabiha Zaman

কোনো বাধাই নারীদের আটকে রাখতে পারে না। নারীর ইচ্ছাই তার বাধা পেরোনোর শক্তি। স্বপ্ন নারীকে জীবনে পথচলার সাহস জোগায়। ডাক্তার শেখ নওশীন ইসলাম তার যাত্রা নিয়ে কথা বলেন রোদসীর সঙ্গে। কথা বলে লিখেছেন সাবিহা জামান

ডাক্তারি পেশায় আসার গল্প
আমি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে ২০১৫-তে এমবিবিএস শেষ করে ডাক্তারি পেশায় আসি। আমার বাবা-মা দুজনই ডাক্তার। তাদের দেখেই মূলত ছোটবেলায় ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা জাগে। ছোটবেলায় আমার মা আমাকে হাসপাতালে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। তখন আমি আম্মুকে বলতাম তুমি বড় রোগীদের দেখবে আর আমি ছোটদের। ডাক্তারি পেশায় সরাসরি মানুষের সেবা করার সুযোগ রয়েছে। আর এর সঙ্গে বাবা-মায়ের দেখানো পথেই এই পেশায় আসা। বাবা-মা আমাকে অনেক সাহস জুগিয়েছেন।
ডাক্তারি পেশায় টিকে থাকার লড়াই
প্রতিটি পেশাতেই টিকে থাকতে লড়াই করতে হয়। আর তুমি যদি নারী হও, তবে লড়াইটা আরও জটিল। ২০১৯ সালের শেষের দিকে গ্রামীণফোন ডিজিটাল হেলথ সার্ভিসের সঙ্গে যুক্ত হই। এর কিছুদিন পরেই করোনা আসে। শুরুর দিকে আমাদের অফিসে গিয়েই কাজ করতে হতো। সে সময় আমাদের অফিসে গিয়েই রোগীদের ফোন দিয়ে সেবা দিতে হতো। সে সময় অনেক রোগী আমাদের কাছে ফোন দিত। এদের বেশির ভাগ করোনা আতঙ্কগ্রস্ত থাকত। তারা বুঝত না কী করতে হবে, এমনকি তারা ভয়ে বাসার বাইরে গিয়ে সেবা নিতেও ভয় পেত। সে সময় ফোন থেকেই তাদের সেবা দিতে হতো। কিন্তু শুরুতে হোম অফিস না হওয়ায় প্রতিদিন অফিসে যাওয়া এবং বাসায় ফেরা নিয়ে আমাদেরও দুশ্চিন্তা হতো। কারণ বাসায় ভাইরাস নিয়ে ফিরছি কি না। এর মধ্যে আমার পরিবারের সদস্য যখন আক্রান্ত হয়, তখন সব মিলিয়ে কাজ করাটাও চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করব এটা আমার কাজ, এভাবে ভাবলে টিকে থাকা সম্ভব।

যারা আসতে চায় এ পেশায়
অনেকের স্বপ্ন যে সে ডাক্তারি পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করবে। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে যে এ পেশায় অনেক পরিশ্রম করতে হয় এবং একজন রোগী কিন্তু খুব অসহায়। তার অবস্থা বোঝাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে সেবা করতে হবে, এটা আমার দায়িত্ব। আমার পরিবারের লোক অসুস্থ হলে আমি যেভাবে সেবা দেব, একজন ডাক্তার হিসেবে রোগীকেও কিন্তু সেভাবেই সেবা করার মানসিকতা রাখতে হবে। মানুষকে সেবা করার মানসিকতা নিয়েই কিন্তু এ পেশায় আসতে হবে।

মূল্যায়নের জায়গা
আমাদের সমাজ অনেক এগিয়েছে। কিন্তু এখনো নারীরা অবহেলিত। ডাক্তার হিসেবে যখন কাজ শুরু করি, সরকারি হাসপাতালে কাজ করতাম, তখন দেখতাম যে নারী ডাক্তারকে কেউ মূল্যায়ন করে না। এমনকি ডাক্তার হিসেবে মানতে চায় না। রোগী ও রোগীর আত্মীয়স্বজন আমাদের সম্মান দিয়ে কথাও বলত না। এমনও অনেক দেখেছি যে আমার মেইল ক্লাসমেটকে স্যার বা ডাক্তার বলে সম্বোধন করলেও আমাকে আপা বা সিস্টার বলছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অনেকে ভাবতে পারে না, একজন নারী বড় ডাক্তার হতে পারে।
আবার অনেকেই মনে করে, নারী ডাক্তার মানেই হয়তো গাইনোকোলজিস্ট। কিন্তু বাস্তবে অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন নারীরা মেডিসিন থেকে শুরু করে অর্থোপেডিক সার্জন, সব সেক্টরেই কাজ করছে। যে পেশাতেই নারীরা যাক না কেন, যদি আমাদের সমাজে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয় যে আমরা পরিবারের কাঠামো এমন করব, যাতে একজন নারী যেকোনো পেশায় যেতে পারে। পরিবার থেকেই সমাজের পরিবর্তন করা সম্ভব। কারণ, কথা দিয়ে একজন মানুষকে চাইলে দমানোও যায়। তাই মানসিক শক্তি ছোটবেলা থেকে দিলে সে যে পেশাতেই যাক, এগিয়ে যাবেই। ঘর থেকেই পরিবর্তন আনতে হবে। অনেক প্রাইভেট হাসপাতালে নারী ডাক্তার বেশি নিয়োগ দেওয়া হয় না। এ মানসিকতার পরিবর্তন আনতে হবে।

করোনাকালে কর্মজীবী নারীর অবস্থান
আমাদের নারীরা এমনিতেই অনেক লড়াই করে। এই করোনায় অনেক নারীই কঠিন সময় পার করেছে। আমাদের অনেক ফোন আসত কর্মজীবী নারীদের কাছ থেকে। তারা জানতে চাইত যে আমরা বাইরে যাই কাজে, আমার বাচ্চা আমার কাছে আসতে চাচ্ছে, কীভাবে কী করলে সমস্যা এড়ানো যাবে। অনেক নারী চাকরি হারিয়েছে, অনেকেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছে আবার অনলাইনভিত্তিক কাজের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। করোনায় অনেক নারী উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। পজিটিভ-নেগেটিভ দুই দিক রয়েছে।

কমার্শিয়াল ডাক্তার
সব পেশাতেই ভালো-খারাপ দুই ধরনের লোক থাকে। আমাদের ডাক্তারি পেশাতেও রয়েছে, এটা ঠিক। তবে এর ভেতরে কিছু বিষয় রয়েছে। যেমন সরকারি হাসপাতালগুলোতে খুব কম খরচে একজন রোগী অনেক ভালো সেবা পায়। কারণ, এখানে সব খরচ দিচ্ছে সরকার। কিন্তু একটি প্রাইভেট হাসপাতাল কিন্তু কাজ করে আয় করার জন্য। তাদের আয় থেকেই ডাক্তারদের বেতন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য খরচ করে। তাই খরচটা বেশি এটা কিন্তু নিয়ম, এটার জন্য কিন্তু ডাক্তার দায়ী নয়। বাইরের দেশে সিস্টেম রয়েছে যে সবার হেলথ ইনস্যুরেন্স করতে হবে, যাতে সে অসুস্থ হলে সরকার খরচ বহন করে এবং এর জন্য বছর শেষে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কেটে রাখবে। আমাদের দেশে যত দিন এই সিস্টেম চালু না হবে, তত দিন এই ব্লেম ইস্যু থেকে যাবে ডাক্তারদের নিয়ে।

নারী যাত্রায়
একজন নারী যে পেশায় থাকুক না কেন তাকে নিজেকে তৈরি করতে হবে, নিজের যত্ন নিতে তবে। কারণ, যখন একজন নারী নিজের যত্ন নেয় না, ঠিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করে না, তখন সে কীভাবে লড়াই করবে। নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হতে হবে। অনেক নারী পরিবার ও সন্তানের খেয়াল রাখতে গিয়ে নিজের যত্ন নেয় না। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও যত্নবান হতে হবে। আমার উপদেশ থাকবে নারীদের প্রতি যে নিজের যত্ন নাও, আর একজন অন্যজনকে সাহায্য করো। কারণ যে জাতির নারী শক্তিশালী, সে জাতি উন্নতির চূড়ায় যেতে পারে।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

12 − two =