নারীর ওপরে ভাষার আধিপত্য

করেছে Rodoshee

লেখাঃ কাজল দাশ : ভাষা মানুষের ভাব প্রকাশের বাহন। মানুষ মাত্রই আমরা কোনো না কোনো ভাষাতেই কথা বলি। আমাদের ভাষা বাংলা অথবা ইংরেজি। হিন্দি অথবা গুজরাটি বা মারাঠি। এই ভাষাই মানুষের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার যা দিয়ে সে বংশপরম্পরায় জ্ঞানকে প্রবাহিত করেছে। কিন্তু এই ভাষার ভেতর দিয়েই ঠিকে আছে পুরুষাধিপত্য। এই ভাষা দিয়ে যখন নারীকে বর্ণনা করা হয় তখন তার ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হয় একধরনের হীনমানসিকতা। বাংলা ভাষাতেই এই ভাষার আধিপত্য রয়েছে বিস্তর। আমরা যে প্রচলিত বাংলা ভাষায় কথা বলি তা সেটা আঞ্চলিক হোক আর সাধু ভাষাই হোক, সেখানেও রন্ধ্রে রন্ধ্রে ভাষার ব্যবহারের মাধ্যমে নারীকে হেয় করা বা তাকে অধস্তন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রভূত নিদর্শন লক্ষ করা যায়।

ভাষার এই ব্যবহার সমাজে নারীকে যতটা তির্যক করে কথা বলে কিংবা যতটা কোমল হিসেবে নারীকে উপস্থাপন করে, এটি দেখা যায় না পুরুষের ক্ষেত্রেও। ভাষা নারীকে কীভাবে অধস্তন করে রেখেছে এটি বাংলা ভাষার স্ত্রীবাচক শব্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেখা যায়। আমাদের প্রচলিত বাংলায় আমরা নারীকে যেসব শব্দ দিয়ে গালি দেই সেগুলো সব কয়টাই পুরুষতান্ত্রিক শব্দ। শুধু গালিবাচক শব্দ দিয়েই নয়, নারীর ওপরে আধিপত্য তৈরি করার জন্য প্রতিনিয়ত নানা রকমের শব্দের উৎপত্তি হচ্ছে সমাজে অহরহ! এই শব্দগুলো নির্দেশ করছে নারী আর পুরুষের শক্তিমত্তাকে, তাদের ব্যক্তিত্বকে, একটি শব্দ দিয়েই আমরা নারীর দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেতে পারি অনায়াসে। ভাষা যে শব্দের জাল বিস্তার করেছে সেখানে কীভাবে নারীকে নির্মাণ করছে এই বিষয়টি ভাষার রাজনীতিকে খুব প্রতিফলিত হচ্ছে।
পুরুষসুলভ! নারীসুলভ!

বন্ধুদের আড্ডায় ছেলেরা কাউকে ‘হাফ লেডিস’ বলা মানেই ওই ছেলেটিকে অপমান করা। কোনো ছেলে যদি একটু মেয়েদের মতো আবেগ প্রকাশ করে অথবা মেয়েদের মতো করে অনুভূতি প্রকাশ করে তাকে অন্য ছেলেরা একটু অসম্মান করে দেখে। এই যে অনুভূতি প্রকাশের কারণে কোনো ছেলেকে হেয় করে দেখার বিষয় এটি এসেছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণে। আমাদের চিন্তাকাঠামো এমনভাবে গঠিত হয়ে আছে যে মেয়েদের মতো ছেলেকে আবেগ প্রকাশ করা যাবে না বা মেয়েরা যেভাবে সংবেদী আচরণ করে পুরুষ সেটি করতে পারবে না। আবার কোনো নারী যদি পুরুষের শক্তি প্রদর্শন করে, আচার-আচরণে কাঠিন্য দেখায় তাকেও আমরা নিতে পারি না। ডানপিটে ছেলে হলে ভালো আর সাহসী শোনায় কিন্তু মেয়ে হলে শোনাও খারাপ। এভাবে নারী ও পুরুষের জন্য আমরা এমন করে জেন্ডার বিভাজিত শব্দকে ভাগ করেছি যা প্রত্যক্ষভাবে নারীকে পিছিয়ে রাখছে। নারীরা কোমল হবে, তারা সবাইকে কেয়ার করবে, সে একটু আঘাতে ভেঙে পড়বে এসব ধারণা আমরা কতগুলো শব্দ দিয়েই প্রতিষ্ঠিত করেছি। যদিও শব্দ দিয়ে প্রকাশ করছি বা সিগনিফাইং করছি কিন্তু তার পেছনের বস্তুগত ভিত্তি রয়েছে। আমরা শিশুদের ক্ষেত্রে খুব সচেতনভাবেই বলে থাকি ‘এটা ছেলেরা করে না’, ‘ওটা মেয়েরা করে না’। এভাবে তাদের মধ্যে একটি বিভাজিত ধারণা গড়ে ওঠে, যা দিয়ে তারা পরস্পর থেকে আলাদা হয় এবং ক্ষমতা কর্তৃত্বের দিক থেকে ছোটবেলা থেকে কেন্দ্রে আর প্রান্তে অবস্থান করে।

সব গালিই নারীকে ইঙ্গিত করে!
পাড়ার মোড়ে মোড়ে এখন যত আড্ডা হচ্ছে, একটি কমন গালি এখন ব্যবহৃত হয় ‘মাদারচোৎ’। শাব্দিক অর্থে এই গালিটি দ্বারা বোঝানো হচ্ছে ‘মায়ের সঙ্গে যৌন ক্রিয়া’। একে অপরের পিঠ চাপড়ে দিয়ে দেদার এখন এই গালি দিয়েই যাচ্ছে। শুধু নারী নয়, একজন মাকে আইডেন্টিটি হিসেবে এই গালিটি খুবই অপমানজনক হলেও খুব সহজে এটির সামাজিকীকরণ ঘটে গেছে। কেউ কোনো মনস্তাত্ত্বিক বাধা অনুভব করছে না এই গালি দিতে একে অপরকে। এই যে একটি গালির সহজীকরণ হলো এটার কারণ কী? কারণ হলো-আমাদের প্রচলিত গালির নারীকেন্দ্রিকতা। একটি গালি দিয়ে কাউকে চূড়ান্ত অপমান করার জন্য তার সবচেয়ে তীর্যক প্রয়োগ হলো এখানে নারীকে সংযুক্ত করা, অথবা চূড়ান্ত রসিকতা করার দরকার হলে নারীকে দিয়ে স্থুল হাস্যরস সৃষ্টি করা। আমাদের প্রয়োগকৃত ভাষায় খুব সহজে এভাবে আমরা নারীকে গালি দিয়ে সম্বোধন করার কারণ হলো আমাদের চিন্তার পুরুষাধিক্য যা যুগ যুগ ধরে পুরুষের চেয়ে নারীর অবস্থান মর্যাদাগত দিক থেকে রেখে চিন্তা করার কারণে তৈরি হয়েছে। সে জন্য আমাদের পক্ষে মাদারচোৎ বলা সহজ ও কানেক্টিং হলেও ফাদারচোৎ ততটা নয়।


গালির স্ত্রীলিঙ্গ আছে পুংলিঙ্গ নেই!

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত কিছু নারীকেন্দ্রিক গালি যেমন- খানকি, ছিনাল, বেশ্যা, মাগি, রক্ষিতা, পতিতা, ভ্রষ্টা, কুলটা, ব্যাভিচারিণী, এগুলো এখনো সমান প্রচলিত। এ ছাড়া কামিনী, ভামীনি, মহিলা, অঙ্গনা, ভার্যা, রমণী, ললনা এই যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে, এসবের কোনো পুরুষবাচকতা নেই। নারীকে গালি দেওয়া শব্দের পুরুষবাচকতা না থাকার একটি বড় কারণ হলো এসব গালি সমাজে খুবই প্রত্যক্ষভাবে পুরুষেরাই প্রচলিত করেছে। পুরুষেরা যেসব নারীকে যৌনসেবার জন্য বন্দি করে রাখে এসব নারীকে রক্ষিতা বলা হচ্ছে অথচ যে পুরুষ নারীকে বন্দি করে রক্ষীতা বানাচ্ছে তাকে কিছু বলা হচ্ছে। অধিকন্তু যে পুরুষ নারীকে যৌনতার জন্য বন্দি করে রেখেছে তাকে মহিমান্বিত করা হয়েছে। যেসব রাজা আর বাদশাহের হারেমে হাজার হাজার রমণী থাকেন তারা সে সময় খুব সমাদৃত হতো। একইভাবে এই যে ‘বেশ্যা’ শব্দ বলে গালি দেওয়া হচ্ছে সেখানেও তার বিপরীত কোনো পুরুষবাচক শব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। দেহকেন্দ্রিক নারীর বহুগামিতাকে বেশ্যা বা ছিনাল বলে গালি দেওয়া হলেও পুরুষকে সেভাবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে না। সমাজে অর্থনৈতিক কারণে কর্তৃত্ব পুরুষের হাতে থাকায় নারীকে কেনাবেচার প্রচলন তাদের হাত দিয়েই প্রসারিত হয় এবং এই ক্ষমতার জন্যই নারীকে নানাভাবে প্রান্তিকীকরণ করা সম্ভব হয়েছে। যেহেতু নারীকে সম্পত্তি হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে এবং এর মধ্যে নারীর যৌনতার একটি বিনিময়মূল্য সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে জন্য তাকে লক্ষ্য করেই এই গালির উৎপত্তি হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি একটু বিপরীত বিষয় লক্ষ করি তাহলে গালি দেওয়ার সঙ্গে ক্ষমতাকাঠামোর সম্পর্কটা আরও ভালো করে দেখতে পাই। যদি কোনো যৌনসক্ষম পুরুষকে ‘নপুংসক’ বলে গালি দেওয়া হয় তাহলে এই ছেলের জন্য এটি একটি চূড়ান্ত অপমান। যদিও কারও যৌন অক্ষমতা একটি বিশেষ শারীরিক সমস্যা হওয়ায় এটি গালি অর্থে বিবেচ্য হওয়া অমার্জনীয় অপরাধ। কিন্তু কোনো ছেলেকে এটি বলা মানে তাকে শেষ অপমানটাই করা বোঝায়। এ কথায় শোনার পর যে কোনো পুরুষেরাই খুবই তীব্র ও শক্ত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এই প্রতিক্রিয়া শুধু যৌনক্রিয়ার শক্তিমত্তার কারণে আসে তা নয়, এটা হলো সমাজের প্রিভিলেজড পুরুষের ক্ষমতা। যে কারণে সে মনে করেই যে এই গালিটা এটা কোনোভাবেই তাকে দেওয়া যাবে না। কিন্তু বিপরীতে আমরা দেখি যে, হাজার হাজার শব্দ চয়ন করে নারীকে গালি দেওয়া হচ্ছে রোজ। এবং দীর্ঘকাল ধরে নারীদের আমরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে পিছিয়ে রেখে এসব গালিকে কাঠামোবদ্ধ করে সমাজে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি।

পুরুষের জন্য কোনো সতীত্বের ধারণা নেই!
পিতৃতান্ত্রিক সভ্যতার শুরু থেকেই পুরুষতন্ত্র নারীর ওপরে যে মহার্ঘ্য চাপিয়ে দিয়েছে সেটির নাম সতীত্ব। নারীকে পুরাণে সৎ হিসেবে দেখতে গিয়ে বলা হয়েছে ‘সতী’ নারী। মহাভারতের দ্রৌপদী আর রামায়ণের সীতা। এদের সতী-সাধ্বী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে। রামায়ণে সীতার সঙ্গে বনবাসে যাওয়া রাম কিংবা তার সহোদর লক্ষণকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়নি। দিতে হয়েছে সীতাকে। মধ্যযুগের স্বামীরা যখন যুদ্ধে বা বাণিজ্যে যেত তখন তারা স্ত্রীকে কোমরে চেস্টিটি বেল্ট পরিয়ে যেত যাতে তার সতীত্ব বহাল থাকে। এই পরীক্ষার কারণই ছিল স্বামীর বাইরে আর কোনো পুরুষের সঙ্গে সীতার বা ওইসব স্ত্রীর যৌন সম্পর্কে নিয়ে নিশ্চিত হওয়া। বিবাহিত নারীর জন্য সতীত্বের ধারণা ছাড়াও কুমারী নারীদের ক্ষেত্রেও এই সতীত্বের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাকে আখ্যায়িত করা হয়েছে অক্ষত যোনি হিসেবে। একইভাবে কোনো নারী যদি বিধবাও হয়ে থাকে তাহলে তার ওপরেও যৌন আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যেভাবে ইতিহাসে নারীর ওপর সতীত্ব চাপানো হয়েছে পুরুষের ক্ষেত্রে সেটি ঘটেনি। এর কারণ হচ্ছে নারীকে দেখার যৌন দৃষ্টিভঙ্গি। পুরুষের একাধিক যৌন সম্পর্ককে সমাজে দেখা হয়েছে নারীর ক্ষেত্রে তা ছিল না ফলে বংশ বা পরিবারের ঐতিহ্য রক্ষার ক্ষেত্রে একমাত্র নারীর সতীত্ব প্রমাণ করাটাই মুখ্য হিসেবে বিবেচ্য হয়েছে; পুরুষের নয়।

প্রমীলা ক্রিকেট দল বা নারী ফুটবল দল!
যে সময়ে এসে আমাদের বৈষম্যমূলক ভাষার রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসার কথা সেই সময়ে আমরা খুব নিত্য নতুন লিঙ্গ নির্দেশক শব্দ তৈরি করেই চলছি। তার উৎকৃষ্ট একটি উদাহরণ হলো খেলোয়াড়দের নারী বা পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত করা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে খেলাধুলা পুরোপুরিই একটি শারীরিক ক্রিয়া হলেও নারীদের আলাদা করে চিহ্নিত করা হচ্ছে। যেহেতু এটি একটি শক্তিমত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় ফলে নারীকে পুরুষের চেয়ে দুর্বল হিসেবে ভাবার যে মানসিকতা কাজ করে সেখান থেকেই এভাবে তাদের চিহ্নিত করা হয়। আমাদের পূর্ব থেকে কাঠামোবদ্ধ মানসিক চিন্তায় যেহেতু কাজ করে যে নারীরা অধঃস্তিত বা নারীরা পুরুষের মতো ভারী কাজ করতে পারবে না, সে জন্য ক্রিকেট বা ফুটবল একটি পরিশ্রমের খেলা হওয়ার কারণে তাদের আগে ‘প্রমীলা’ শব্দ জুড়ে দিই। এতে করে দর্শকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি ধারণা দিয়ে দেওয়া হয় যে খেলাটিতে পুরুষ প্রাধান্যের একটি ব্যাপার রয়েছে। নতুন করে এসব খেলাধুলায় নারীকে এভাবে সিগনিফাইং করার আগেও এই সমাজে নারীদের জন্য যেসব খেলাধুলার প্রচলন ছিল, সেগুলোও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। আমাদের স্কুল-কলেজে ছেলেরা যেখানে হাইজাম্প, লংজাম্প প্রতিযোগিতা হতো, সেখানে মেয়েদের জন্য চালু ছিল বালিশ খেলা, চেয়ার দখল, কানামাছি এই জাতীয় খেলাগুলো আক্ষরিক অর্থেই নারীর দুর্বলতাগুলোকে প্রতিফলিত করে। খেলাধুলার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি যে একটি পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা তার ফারাকটা ধরা পড়বে যদি আমরা উদাহরণটা এভাবেই দিই যে, যে দুর্বলতার কারণে মেয়েদের ফুটবল দলকে প্রমীলা বলা হচ্ছে এই দুর্বলতা পুরুষ দলেরও হতে পারে। উন্নত দেশের এগিয়ে থাকা কোনো নারী ফুটবল দলের সঙ্গে যদি আমাদের পুরুষদের খেলতে দেওয়া হয় তাহলে এরাও তাদের কাছে দুর্বল হিসেবে হারতে পারে অনায়াসেই। ফলে যে শক্তিমত্তা দিয়ে নারীকে মাপা হচ্ছে এটি পুরুষের ক্ষেত্রেও হতে পারে।

পূর্বপুরুষ হলেও পূর্বনারী নেই!

ঐতিহাসিকভাবে পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে প্রজাতি রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে নারীরা। অথচ সমাজে প্রতিষ্ঠিত ধারণা হলো আমরা পূর্বপুরুষের বংশধর। এই যে ‘পূর্ব পুরুষ’ বলা হচ্ছে এটিও নারীর ওপরে ভাষার রাজনীতি যা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে নারীকে অপসারণের মাধ্যমে। সমাজে যখন থেকে উৎপাদনের মালিকানা পুরুষের হাতে নিহিত হয়েছে এবং তাকে বংশের পরিচয় নির্ধারণের জন্য গৃহবন্দি করা হয়েছে তখন থেকে এই শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। তখন থেকেই সমাজে ‘ভার্যা’ শব্দের উৎপত্তি ঘটেছে। শাস্ত্রে বলা হয়েছে ‘পুত্রার্ত্রে ক্রিয়তে ভার্যা’। অর্থাৎ পুত্রের জন্য স্ত্রীকে গ্রহণ করার কথা বলে হচ্ছে সেদিক থেকে স্ত্রী হলো সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র মাত্র।

ভাষার বিভেদ রেখা ও জেন্ডার স্টেরিওটাইপিং
সমাজে ভাষার বিভেদের ফলে জেন্ডার স্টেরিওটাইপিং জন্ম হয়েছে। আমরা যখন ‘স্যার’ এবং ‘ম্যাডাম’ এই শব্দ দুটি উচ্চারণ করি, তখন স্বাভাবিকভাবেই নারী ও পুরুষকে আলাদা করি। ভাষা আমাদের স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে ব্যক্তিটা কে হচ্ছেন। এই স্টেরিওটাইপিংয়ের বিষয়টি আমাদের প্রতিটি নারী ও পুরুষবাচকতা বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি শিশুর জন্মের পর থেকে আমরা প্রতিটি শব্দ ব্যবহারে বুঝিয়ে দিই কে ছেলে হয়ে বড় হচ্ছে আর কে মেয়ে হয়ে বড় হচ্ছে। এমনকি নামের সঙ্গে মি. এবং মিসেস. শব্দ ব্যবহারের যে প্রচলন লক্ষ করা যায়, সেখানেও শব্দ দিয়ে নারী ও পুরুষের পৃথকীকরণের বিষয়টি স্পষ্ট। মিসেস বললে একজন বিবাহিত নারীর যে আইডেন্টিটি ফুটে ওঠে সেটি মি. বলা শব্দের সঙ্গে তেমন পরিলক্ষিত হয় না। শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে এই পৃথকীকরণটাই ভাষার আধিপত্য বিস্তার।

 

ধর্ষিতা ও মিডিয়ার ধারাভাষ্য
পত্রিকায় ধর্ষণের শিরোনাম হয় এই রকম- পালাক্রমে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, জোরপূর্বক ধর্ষণ, রাতভর ধর্ষণ, নির্জন স্থানে ধর্ষণ, একা পেয়ে ধর্ষণ, কিশোরী ধর্ষণ, তরুণী ধর্ষণ, যুবতী ধর্ষণ, কুমারী, সুন্দরী ধর্ষণ…যখন এক ধর্ষণ বোঝাতে শব্দের বিশেষণগত মাত্রা ভিন্ন ভিন্নভাবে বোঝানো হয় তখন কোন নারীকে কেবল ওই পুরুষই আর একা ধর্ষণ করে না বরং তাকে সেই সঙ্গে পুরো পুরুষতন্ত্র ধারা ধর্ষণ করার সুযোগ করে দেয় আরেক পুরুষতান্ত্রিক ভাষা, শব্দ ও মিডিয়া। যখন জোরপূর্বক ধর্ষণ বলা হয় তখন কিন্তু এটাই প্রতিভাত হয় যে নারীকে জোর করে ধর্ষণ করা যায়। যখন নির্জন স্থানে ধর্ষণ বলা হয়, তখন মনে করা হয় নির্জন স্থানে গেলেই নারী শ্বাপদ-সংকুল, তার সেখানে যাওয়া নিষেধ। যখন একা পেয়ে ধর্ষণ বলা হয় তখন বোঝায় নারীকে একা হলেই ধর্ষিত হতে হবে। সুন্দরী-যুবতী, কুমারী- এই শব্দগুলো তো এক কথায় ভাষাগত রাজনীতিতে ধর্ষণের জন্য টানটান উত্তেজনা ছড়িয়ে দেয়। এখানে সংবাদ বা সাংবাদিক কী মনে করে লিখেছে সেটা বিষয় নয়, বিষয় হলো ব্যবহৃত শব্দ কি দ্যোতনা ছড়িয়েছে। এই যে সিগনিফায়ার সে কি সিগনিফাইং করছে। সে কী বোঝাচ্ছে এটাই আসল। প্রতিটা শব্দের ক্ষেত্রেই কিন্তু ধর্ষণ মাত্রাগত তারতম্য ছড়িয়েছে। এবং এর কোনোটাই ধর্ষিতার পক্ষে যায় না। বিষয়টা এমন যে, এক পুরুষ ধর্ষণ করে আনন্দ পায় আর আরেক পুরুষ ধর্ষণের খবর লিখে, খবর পড়ে বিবমিষায় ভোগে সুখ পায়। এই সুখ প্যাথলজিক্যাল রোগের মতো। প্যাথলজিক্যাল রোগ যেমন সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে, এটাও তেমনি। কোনো এক রাউজানের পুরুষ সুখ করলে তেঁতুলিয়ার আরেক পুরুষের মনে সেই সুখ ছড়িয়ে পড়ে। পুরুষাঙ্গের সুখের অনুভূতি বড়ই বিচিত্র। ভাষার রাজনীতি এমনই যে সে একজন ধর্ষিত নারীকেও অপদস্থ করে।

শব্দ সন্ত্রাস ও বদলে যাওয়া নারীর ভাষা

শব্দের ওপরে যে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য সেটি সেটি নিয়ে নারীবাদী চিন্তকেরা ব্যাপক সোচ্চার। বিশেষ করে উত্তরাধুনিক নারীবাদীরা নারীকে যে ভাষায় বয়ান করা হয় তারা সেটার পক্ষে। হেলেন সিসু, লুইস ইরিগারে আর জুলিয়া ক্রিস্টিভা নামের তিনজন নারীবাদী এই চিন্তার উদগাতা। যদিও আরেক চিন্তাবিদ জুডিথ বাটলার এই নারীর ওপর আরোপিত ভাষা ও তার ব্যবহার নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। এই চিন্তাবিদেরাই সর্বপ্রথম ভাষার রাজনীতিকে আমাদের সামনে নিয়ে আসেন। তারা দেখান যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ক্ষমতাকাঠামো যেভাবে পুরুষের হাত ধরে এগিয়েছি, ঠিক সেভাবেই তারা নারীকে ভাষা দিয়ে বর্ণিত করেছে। তারা মনে করেন, পূর্বে লিখিত সব কয়টি গ্রন্থের পুনঃপাঠ করা দরকার এবং শব্দের ভেতর দিয়ে যেভাবে নারীকে খোলস বন্দি করা হয়েছে সেটা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। এই বের হয়ে আসার কাজটা করার জন্য তারা নারীদের নিজস্ব একটি ভাষা অধিগ্রহণ করতে বলেন যা দিয়ে প্রতিটা শব্দ দ্বারা পুরুষের সমকক্ষতা তৈরি হতে পারে। তারা বলতে চান শব্দের দ্বারা শুধু যেভাবে নারীরে নিষ্ক্রিয়তাকে তুলে ধরা হয় একইভাবে সেটি দিয়ে পুরুষের দুর্বলতাকে প্রকাশ করতে হবে। প্রকাশ করতে হবে তাদের সক্রিয়তাকেও। তারা এই আলোচনা থেকে যে বিষয়টি চিহ্নিত করতে চান সেটি হলো শব্দের একটি নিরপেক্ষ বিভাজন অথবা উভয়মুখী বিভাজন। যা দিয়ে নারী-পুরুষ উভয়েই একটি সমতাসূচক ক্ষমতাকাঠামোতে বিরাজ থাকবে।

শব্দ সন্ত্রাসের বিপরীতে জেন্ডার নিরপেক্ষ ভাষা
ভাষার এই রাজনীতি নিয়ে বিস্তর আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের কাছে এখন সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে উঠেছে এটি। শব্দ ব্যবহারের নিরপেক্ষতা। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা এই শুদ্ধি অভিযান চালু করেছে। ইনক্লুসিভ বা জেন্ডার বা নিরপেক্ষ শব্দ দিয়ে ইতিমধ্যে নারীর ওপরে ভাষার রাজনীতির বিরুদ্ধে একধরনের প্রচারণা কার্যকর হচ্ছে। সেখানে he এবং she শব্দের মাঝামাঝি বোঝাতে xe শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। মূলত বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ দ্বারা ব্যবহৃত শব্দের ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে আছে। এসব বিষয় এখন আমাদের দেশেও প্রচলিত হচ্ছে। পুলিশ ম্যান না বলে পুলিশ অফিসার বলা, চেয়ারম্যান না বলে চেয়ারপারসন বা সভা প্রধান ব্যবহার করার যথেষ্ট প্রচলন আমাদের সর্বক্ষেত্রে যেমন চালু হচ্ছে, তেমনি বিপরীত দিকে ঢালাওভাবে ব্যবহার করা ‘নগর পিতা’র মতো শব্দেরও। গণমাধ্যমে জেন্ডার সংবেদনশীল শব্দের ব্যবহার ক্রমে বাড়লেও নারীকেন্দ্রিক শব্দ ব্যবহারের তির্যকতা কমেনি। খুব সমন্বিত পদ্ধতি দিয়ে যদি স্কুল থেকে এই লিঙ্গ নিরপেক্ষ শব্দের ব্যবহার বন্ধ করার মতো উদ্যোগ নেওয়া যায় তাহলে অন্তত আমরা শব্দের ব্যবহারের দ্বারা যথেষ্ট নিরপেক্ষতা তৈরি করতে পারব। যদিও মূলগতভাবে নারীর সঙ্গে পুরুষের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বগত জায়গায় সমতা তৈরি না হলে এই ভাষার রাজনীতির কাঠামো ভাঙা যাবে না, তবু এই নিরপেক্ষ ভাষার ব্যবহার আমাদের আশা দেখাতে পারে।

রোদসী/আরএস

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

one × 4 =