নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি হোক ইতিবাচক

করেছে Tania Akter

দেশসেরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটিতে শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রথম সারির সংবাদ পাঠিকা হিসেবেও রয়েছে সুনাম। নারী উদ্যোক্তাদের দিচ্ছেন প্রশিক্ষণসহ গুরুত্বপূর্ণ সব কাজই একাগ্রচিত্তে করে যাচ্ছেন ফারজানা নাহিদ। সমাজে নারীর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে সর্বক্ষেত্রেই জয়লাভ করা যায়, এমনটাই বিশ্বাস করেন তিনি। এবারের রোদসীর বিশ্ব নারী দিবসের বিশেষ আয়োজনে তার সঙ্গে আলাপচারিতায় ছিলেন তানিয়া আক্তার

শুভ্র সাজে ফারজানা নাহিদ

শৈশবে কী হতে চেয়েছিলেন?
ফারজানা নাহিদ : কখনোই জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করিনি। জীবনে চলার পথে প্রতিটি ধাপেই মনোযোগ আর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছি। এখনো নিখুঁত জীবনের আশায় না থেকে জীবন যেভাবেই ধরা দিক না কেন, সেই অসম্পূর্ণতাকে নিজের মেধা আর দক্ষতায় পরিপূর্ণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

 

শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় নিয়োজিত হয়ে কেমন অনুভূতি হয়?
ফারজানা নাহিদ : ভীষণ ভালোলাগার একটি পেশা শিক্ষকতা। নিজের মেধা, দক্ষতা আর জীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতাগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারার আনন্দ অতুলনীয়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং ও ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগে চার বছর ধরে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছি। প্রতিবছরই নতুন নতুন মুখ শ্রেণিকক্ষ আলোকিত করে। তাদের শুধু পড়ানোর সঙ্গেই আমি জড়িত নই। তাদের জীবনচলার পথকে আরও সুগম করতে বছর দুয়েক নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি স্টার্টআপ নেক্সটের (এনএসইউএসএন) পরিচালক হিসেবে কাজও করেছি। কারণ, এই তরুণ মুখগুলোই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের শ্রেণিকক্ষের বাইরেও অনেক শিখতে হবে। সেই সুবিধা দিতেই স্টার্টআপের সঠিক ধারণা প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করেছি। এখনো নিয়মিত তাদের পেশাগত এবং ব্যক্তিগত নানা বিষয়ে কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে পরামর্শ দিয়ে থাকি। সরাসরি শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো সমাধানের অনুভূতি অন্য রকম। তাই এই পেশার প্রতি বেশ ভালোলাগা কাজ করে।

প্রশিক্ষক ফারজানা নাহিদ

 

শিক্ষক কিংবা সংবাদ পাঠিকা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে কোন বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হয়?

ফারজানা নাহিদ : শিক্ষকতা এমন একটি দায়িত্ব, প্রথমেই এটাকে ভালোবাসতে শিখতে হবে। পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকে নিতে চাইলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভালো শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতে হবে। এর পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানে দক্ষ হতে হবে। শিক্ষার্থীদের নানা রকম বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের উত্তর দেওয়ার মতো ধারণা থাকলে সেই শিক্ষকের প্রতি আস্থা বাড়ে। ধৈর্য নিয়ে শিক্ষার্থীর কথা বা প্রশ্ন শোনার গুণ থাকতে হবে। নতুন প্রজন্মের জীবনযাপনের বিষয়েও ধারণা রাখতে হবে। আর নিয়মিত শিখে যেতে হবে। কারণ, প্রতিবছরই বিশ্ব বদলাচ্ছে। শিক্ষকতা পেশায় গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ এবং বানানের প্রতি সচেতন থাকা। যারা শিক্ষকতায় আসতে চায়, তাদের এই বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকতার মতোই সংবাদ পাঠিকার জায়গাটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। আমি ছাত্রাবস্থাতেই অর্থাৎ ২০০৪ সালে সংবাদ পাঠিকা হিসেবে সংবাদ চ্যানেল এনটিভিতে যোগ দিয়েছি। জ্যেষ্ঠ সংবাদ পাঠিকা হিসেবে এখনো কাজ করে যাচ্ছি এনটিভিতেই। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আমাকে এটাই শেখায় যে এই পেশায় আসতে হলে অবশ্যই বাচনভঙ্গি ভালো হতে হবে। বানান ও উচ্চারণ আয়ত্তে রাখতে হবে। সংবাদ উপস্থাপনের স্বকীয়তা তৈরি করতে হলে নিয়মিত সংবাদ দেখতে হবে। প্রতিনিয়ত বিশ্ব সম্পর্কে জানতে হবে। আত্মবিশ্বাস আর সাহসের সঙ্গে অনুভূতি সামলে নিয়ে সংবাদ উপস্থাপনের অভ্যাস তৈরি করতে হবে।

সংবাদ পাঠের সময়

জীবনে কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন?
ফারজানা নাহিদ : জীবনে কাজ করতে গিয়ে সামাজিকভাবে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হইনি। কারণ, আমার পারিবারিক আবহ বেশ অনুকূলে ছিল। তবে প্রাকৃতিকভাবে কিছু প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। আমার বাবা এবং জীবনচলার সঙ্গীকে হারিয়েছি অকালেই। আমার জীবনের অনুপ্রেরণা ছিলেন সেই দুজন। সেই প্রিয় মানুষদের সঙ্গ জীবনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমাদের একমাত্র মেয়েটি এখনো ছোট। বাবার ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমিই তার বাবা এবং মা। এই একা অভিভাবকত্ব বেশ কঠিন। তবু জীবনের বাঁকে বাঁকে কিছু বদল তো থাকেই। সেগুলো মেনে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি।

ফারজানা নাহিদ 

বিশ্ব নারী দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য বিলিভ ইকুয়াল। আমাদের সমাজে নারী-পুরুষের সমতার বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই

ফারজানা নাহিদ : নারী-পুরুষের সমতার ব্যাপারটি আসলে বিশ্বাসের বিষয়। কারণ, প্রথমত নারীরা মানুষ। আর মানুষ হিসেবে সমান সুযোগ অবশ্যই একজন নারীর থাকা উচিত। লিঙ্গবৈষম্য করার বিষয়টি জেন্ডারভিত্তিক নয়, এটি মানসিকতাভিত্তিক। এই মানসিকতায় নারী ও পুরুষ উভয়েই হতে পারে।  নারীদের দুর্বল মনে করার কোনোই কারণ নেই। যদি নারীরা মানসিকভাবে দুর্বল হতো, তাহলে সংসার, চাকরি সব ধরনের কাজ গুছিয়ে করাটা সম্ভব হতো না। আর নারীদের শারীরিক গঠনও দুর্বল মনে করার কোনো কারণ নেই। শারীরিকভাবে দুর্বল হলে গর্ভধারণের মতো জটিল প্রক্রিয়া, মাতৃত্ব অর্থাৎ প্রজনন প্রক্রিয়া সামলানো সম্ভব হতো না। কখনই  আমরা পুরুষের ওপরে নয়, বরং সঙ্গে দাঁড়ানোর সুযোগ চাই। আমরা যদিও নিজের দক্ষতা দিয়ে পাশাপাশি দাঁড়াতে পারব কিন্তু প্রথমেই আমাদের অবহেলিত করা হয় নারী হয়ে জন্ম নেওয়ার কারণে। ফলে আমরা সেই সুযোগটাই হারাচ্ছি যুগ যুগ ধরে। তাই সমতার লড়াইয়ে প্রথমে মানসিকতা পরির্বতন করে নারীকে মানুষ হিসেবে যে সুযোগগুলো রয়েছে, সেগুলো দিতে হবে।

সিটিআলো ওমেন এন্টারপ্রেনিয়োর সার্টিফিকেশন প্রোগ্রামে মডিউল ডিজাইনার ও ট্রেইনার হিসেবে ক্রেস্ট গ্রহন

 

সমাজে টিকে থাকার জন্য নারীদের কোন বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার

ফারজানা নাহিদ : নারীদের সমাজে টিকে থাকতে হলে প্রথমেই স্বাবলম্বী হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অর্থনৈতিক মুক্তি নারীর জন্য অনেক দুয়ার খুলে দেয়। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়াটাও জরুরি। কারণ, আত্মবিশ্বাস না থাকলে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব হবে না। এই আত্মবিশ্বাসের জায়গাটি নারীর নিজেরই তৈরি করতে হবে। কেউ এসে সে জায়গাটি তৈরি করে দেবে, সেটি প্রত্যাশা করাও ঠিক নয়। আর সেই জায়গাটি তৈরি হবে শিক্ষাগত যোগ্যতায়। কারণ, শিক্ষাগত যোগ্যতার কারণে জীবন ও জীবিকার পথ অনেক সুগম হয়ে ওঠে। তাই আত্মবিশ্বাস আর শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব। আর অর্থনৈতিক মুক্তি নারীকে সমাজে ভালো অবস্থানে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালযের প্রাঙ্গনে ফারজানা নাহিদ

নারীর প্রতি কেমন দৃষ্টিভঙ্গি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে মনে করেন?

ফারজানা নাহিদ : নারীদের স্বাভাবিক মানুষের মতো চলা এবং বলার স্বাধীনতা দিলেই সমাজ এগিয়ে যাবে। এর জন্য বিশেষ দিবস, বাসে নারী আসনসংখ্যা ইত্যাদি থাকা ঠিক নয়। এগুলো নারীর চলার পথকে আরও সংকুচিত করে ফেলে বলে আমার মনে হয়। নারীকে বাসে বসতে না দিয়ে বরং তাকে মানসিক বা যৌন নিপীড়ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অফিস বা বাসায় পুরুষের পাশাপাশি সব কাজে সমান অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। নারীদের মানুষ হিসেবে দেখার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। নারীদের মানুষ হিসেবে দেখার বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। আর নারীর প্রতি প্রতিদিনের এ স্বাভাবিক আচরণই ধীরে ধীরে সমাজকে বদলে দেবে।

সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ
ফারজানা নাহিদ : আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

three × 4 =