নারী উদ্যোক্তা গড়ার কারিগর নাজমা মাসুদ

করেছে Sabiha Zaman

দেখতে দেখতে অনেক বছর কেটে গেল। আমার স্বপ্নেরা এখন ডানা মেলছে। আমার ছেলেমেয়েরা সুন্দর সুন্দর পরামর্শ দেয়, খুব ভালো লাগে তখন। চারপাশে আমি খারাপের থেকে ভালো মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি বেশি। বলছিলেন নাজমা মাসুদ। তিনি নারী উদ্যোক্তা গড়ার কারিগর। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। জন্মের পরই মা-বাবাকে হারিয়ে জীবনযুদ্ধে টিকে থেকে জয়ী হয়েছেন। সেই গল্পই করলেন রোদসীর সঙ্গে। কথোপকথনে সুরাইয়া নাজনীন

জন্মের পরেই বাবা-মাকে হারানো
তখন আমার বয়স তিন মাস। মায়ের কোল সবচেয়ে মধুর। মায়ের কোলে মমতায় লেপ্টে ছিলাম। অমানিশা নেমেছিল সেদিন। একটা গুলির শব্দ আমার জীবন পাল্টে দিল মুহূর্তেই। আমি হামাগুড়ি খেতে খেতে আমার মায়ের রক্তের বন্যায় ভাসছিলাম। ঘরে জমিয়ে রাখা লবণের বস্তা গলে লাল সমুদ্র হলো বিস্তীর্ণ উঠোন। মুহূর্তে নিস্তব্ধ পুরো পৃথিবী। আমি হলাম মা-হারা। কয়েক মাস পরে বাবাকেও হারালাম। তখন হলাম এতিম! জীবনযুদ্ধে নাম লেখালাম তিন মাস বয়স থেকেই। বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বুলেটের শব্দে। ভাগ্যের কী নির্মম খেলা, হানাদার বাহিনীর ফাঁক গলে বেঁচে গেলাম আমি পারুল। পারুল থেকে শুরু হলো নাজমা মাসুদ হয়ে ওঠার গল্প।

স্বপ্নের কিনারায়
কলেজে পড়াকালে আসা-যাওয়া করতাম আড়ং-এর পাশ দিয়ে। আড়ংয়ের কাজ দেখে স্বপ্ন দেখতাম। তখনই ভাবতাম, ভালো ভালো কাজ করতে হবে। ভালো কাজ করতে পারলেই আমি আড়ংয়ে কাজ করতে পারব। তাই নিজেকে তৈরি করে নিয়েছিলাম সেভাবেই। আড়ংয়ের আউটলেটে সাজানো সুদৃশ্য নকশাসংবলিত সামগ্রী আমাকে আকৃষ্ট করত। বাড়িতে ফিরেই লেগে পড়তাম পছন্দসই জিনিস তৈরি করতে। আর এ ব্যাপারে সার্বক্ষণিক সাহায্য করতেন বড় বুবু। সুযোগ খুঁজতাম কখন আড়ংয়ে লোক নেয়। ডিগ্রি পরীক্ষা দেওয়ার সময় আমি আড়ংয়ে চাকরির আবেদনপত্র দিয়ে রেখেছিলাম। যেদিন ডিগ্রি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়, সেদিনই আমি আড়ংয়ে চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে পাই। আর আমার এই খুশির প্রথম অংশীদার ছিল বড় বুবু। আমার কাজ পাওয়ার খবর শোনামাত্র তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন যেন তিনি এই সময়টার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।

ডিজাইনার থেকে ‘নন্দিনী ফ্যাশন হাউস’
আড়ংয়ে কাজ করার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাটা এবার কাজে লাগাতে হবে। আমি কাপড় শুধু রং করাতাম না, তার ওপর ডিজাইন করে নানাভাবে আকর্ষণীয় করে তুলতাম। আস্তে আস্তে বিক্রি বাড়তে শুরু করল। যত নতুন ডিজাইন, ততই বিক্রি। আমার নিজের করা এই নতুন নতুন ডিজাইনের কামিজ-কুর্তা বিক্রি হতো দেদার। নাম দিলাম ‘নন্দিনী ফ্যাশন হাউস’। দ্রুত আমার গড়ে তোলা সেই নন্দিনী ফ্যাশন রমণীদের আগ্রহের জায়গাটা লুফে নিল। প্রতিষ্ঠানের ‘নন্দিনী’ নামটি রেখেছিলেন আমার স্বামী মাসুদ হাসান। জীবনে ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে যতবারই ধাক্কা খেয়েছি, আমার স্বামী বারবার সহযোগিতার হাতটি বাড়িয়ে দিয়েছেন।

শুধু দেশ নয়, বিদেশেও তৈরি করছি নারী উদ্যোক্তা
শুধু এই দেশে নয়; কানাডা, আমেরিকা ও হংকংয়ে নারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি করছি আমি। আমার নিজের ডিজাইন করা পোশাক এখন ওই সব দেশে প্রদর্শিত হচ্ছে বিভিন্ন মেলায় ও সেমিনারে। উইমেন্স এমপাওয়ারমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে মেলা করেছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্যোক্তারা তাদের হাতে তৈরি সালোয়ার-কামিজ, জামদানি শাড়ি, নকশিকাঁথা, চাদর, পাঞ্জাবি, ফতুয়া এসব মেলায় প্রদর্শন করেন। এ ছাড়া কাশ্মীরি কাপড়, ব্যাগ এবং বিভিন্ন ডিজাইনের গয়না ও হ্যান্ডিক্রাফট ক্রেতাদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়।

কারও দোয়া যখন শক্তি হয়ে ধরা দেয়
আমার উইমেন্স এমপাওয়ারমেন্ট অর্গানাইজেশনের নারীরা যখন করোনা পরিস্থিতি একটু একটু করে কাটিয়ে উঠছে, তখন আমরা পূর্বাচল লেডিস ক্লাবে বসন্ত এবং ভ্যালেন্টাইনসের মেলার আয়োজনের সুযোগ পাই। আমি ওখানকার ডোনার মেম্বার। পূর্বাচল লেডিস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট সৈয়দা ফেরদৌসী আলম নীলা, তিনি আমার বড় বোনের মতো। তবে বোনের মতো বললে ভুল হবে, তিনি আমার বোনই। তিনি যেভাবে আমাকে এবং আমার সংগঠনের জন্য দোয়া করেছেন, এটা আমার শক্তি হয়ে কাজে লাগছে, লাগবে।

প্রাপ্তি যখন সাহসের জায়গা তৈরি করে দেয়
উইমেনস এমপাওয়ারমেন্ট অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দীর্ঘ দিন দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের অসহায় কর্মক্ষম নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে মেলা করার সুযোগ পেয়েছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে উদ্যোক্তারা তাদের হাতের তৈরি সালোয়ার-কামিজ, জামদানি শাড়ি, নকশিকাঁথা, চাদর, পাঞ্জাবি, ফতুয়া মেলায় প্রদর্শন করেন। এ ছাড়া কাশ্মীরি কাপড়-ব্যাগ এবং বিভিন্ন ডিজাইনের গয়না ও হ্যান্ডিক্রাফট ক্রেতাদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো আয়োজিত ২৪তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা- ২০১৯-এ উইমেনস এমপাওয়ারমেন্ট অর্গানাইজেশনের পক্ষে স্টল বরাদ্দ পাই। এ ছাড়া ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত  India Trade Expo Ges AIT,  Bangkok   আমন্ত্রিত Capacity Building of Bangladeshi Women Micro-Enterprenur   প্রোগ্রামে আমি অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাই।
আমি যখন প্রথম মাইডাসে সদস্য হিসেবে যুক্ত হই, তখন তার বয়স অনেক কম। ধীরে ধীরে নিজের জায়গাটা তৈরি করে নিয়েছি।
এখন একাধারে মাইডাস মিনিমার্টের উত্তরা ও গুলশান শাখার পরিচালক, ওয়াইসের বোর্ড অব মেম্বার, বাংলাদেশ ফেডারেশনের বোর্ড অব মেম্বার, উইমেন এন্ট্রাপ্রেনিউর অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সদস্য, উইমা পল্লী রিসোর্টের পরিচালক। এ ছাড়া আমি এমপাওয়ারমেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি এনজিও চালাচ্ছি। ওয়ান পেপার অ্যান্ড প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের দেখাশোনা করছি এবং স্টেপ ওয়ান গ্রুপের ডিএমডি হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। নন্দিনী ফ্যাশন হাউসের একক কর্ণধার হিসেবেও কাজ করছি। ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে আনন্দভুবন ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার প্রথম পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ হয়েছে।

নারীকণ্ঠ ফাউন্ডেশন থেকে সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ২০০৭ সালে বেগম রোকেয়া শাইনিং পার্সোনালিটি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হয়েছি। পাক্ষিক ম্যাগাজিন ‘অনন্যা’র পক্ষ থেকে ২০০৯ সালে বিভিন্ন শাখায় মোট ২১টি পুরস্কার জিতে বেস্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। ওই একই বছরে সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে অনন্যা ঈদ ফ্যাশন পুরস্কার, মাদার তেরেসা পদক, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ স্মৃতি সম্মাননা পুরস্কার, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী স্মৃতি পুরস্কার জিততে সক্ষম হয়েছি। ২০০৯ সালে ওরেন্ডা কমিউনিকেশন ‘উইমেন পার্সোনালিটি অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়। পরে ২০১১ সালে আমার হাতে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’ তুলে দেয় জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন ফর চাইল্ড ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশন। সম্প্রতি আমি নভীনস এরোমা স্বাধীনতা পদক ২০১৯ অর্জন করি।

ইচ্ছাগুলো সাফল্যের সিঁড়ি
যশোরে আমি একটি স্কুল তৈরি করেছি অসহায় বাচ্চাদের জন্য। করোনা পরিস্থিতিতে সব সেক্টরের ওপরেই ধস নেমেছে। তাই আমরা পরিস্থিতি সামলে একটু একটু করে সামনে এগোনোর চেষ্টা করছি। কিছুদিন আগেই নওগাঁয় ২৫০ জন নারীকে ট্রেনিং করিয়েছি এবং ভীষণ সাড়া পেয়েছি। তারা নিজেরা কিছু করার সাহস পাচ্ছে। আমি ঢাকা শহরের বৃদ্ধাশ্রম ঘুরেছি আর দেখেছি বাবা-মায়ের জীবন্ত মৃত্যু। তাদের চোখের পানি শুকিয়ে স্বপ্নের মরুভূমি তৈরি হয়েছে। আমি তাদের দেখে সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটা বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করব। সেটা ঠিক বৃদ্ধাশ্রম হবে না। হবে বাবা-মায়ের আনন্দভূমি। যেখানে বাড়ির মতো অবয়ব থাকবে। যার যার প্রতিভা সেখানে বিকশিত হবে। আনন্দঘন অবসরযাপনের ব্যবস্থা থাকবে। মনকে সুস্থ রাখার ব্যবস্থা থাকবে প্রতিনিয়ত। আল্লাহ পাশে থাকলে আমি আমার এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। ইতিমধ্যে জায়গা দেখার কাজ শুরু হয়ে গেছে।

বেকারত্ব চিরতরে মুছে দেওয়ার প্রত্যাশায়
বাংলাদেশের বেকারত্ব সমস্যা চিরতরে মুছে দেওয়ার প্রত্যাশায় আমি সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে মানুষের মনের গহিনে প্রবেশের চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত থাকতে সর্বদা তৎপর থাকি। আমি তখনই নিজেকে সফল ভাবি, যখন একজন নারী তার অসহায়ত্বের বেড়াজাল ছিন্ন করে নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে এবং সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। আমার সফলতাই হলো নারীর জীবিকায়ন। যেদিন দেখব এই বাংলাদেশে নারীরা তাদের যোগ্য মর্যাদা পাচ্ছে, পাচ্ছে তাদের নিজস্ব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মাথা উঁচু করে বাঁচার পথ খুঁজে পাচ্ছে, সেদিনই ভাবব আমি একজন সফল উদ্যোক্তা।

আমি চাই আগামী প্রজন্ম সুখী ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়তে সদা তৎপর থাকুক। আমি স্বপ্ন দেখি সেই সব নিপীড়িত-অসহায় নারীকে নিয়ে, যারা ভবিষ্যতের বাংলাদেশে নিজেদের একটি সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে পারবে। নারী আর পুরুষের বৈষম্য দূর হবে। নারী-পুরুষ ভেদাভেদ দূর হয়ে সবাই সমাজে মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে।

ছবি: ওমর ফারুক টিটু

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

fourteen + 15 =