‘নিজের অধিকার নিজে বুঝে নাও’

করেছে Rubayea Binte Masud Bashory

 

নারী জাগরণ মানেই হলো নিজের অধিকার নিজেকে বুঝে নেওয়া। আগে বুঝতে হবে আমার অধিকারটা কী? তারপর আসবে মূল্যায়নের জায়গা। নিজের জায়গাটি শক্ত করতে না পারলে কেউ সেই মূল্যায়নটা দিতে আসবে না। তাই সেই জায়গাটিও নিজেকে তৈরি করে নিতে হবে। সেটা ঘরে হোক আর বাইরে। বললেন আবুল খায়ের গ্রুপের ব্র্যান্ড অ্যান্ড রিসার্চের কনসালট্যান্ট তাসনিম করিম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুরাইয়া নাজনীন

জীবনের শুরুটা কীভাবে?

তাসনিম করিম : আমার বেড়ে ওঠা ঢাকাতেই। তবে বাবা ব্যাংকার হওয়ায় পরিবারের সাথে বিভিন্ন জায়গাতেই থাকতে হয়েছে। ঢাকাতেই আমার পড়াশোনা। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই বি এ থেকে এম বি এ শেষ করি। তখনকার সময়ে আই বি এ তে নারীর সংখ্যা তেমন চোখে পড়ার মতো ছিলো না। পড়াশোনার মাঝেই আমার বিয়ে হয়। এম বি এ শেষ করে আমি লন্ডনে যাই, আমার হাজবেন্ড তখন সেখানে এম আর সি পি করছেন। সেখানে গিয়ে আমি কো-অপারটিভ বিজনেস ম্যানেজমেন্ট এর উপর পড়ালেখা করি। পড়ালেখা শেষে আমরা দুজনেই দেশে ফিরে আসি এবং চট্টগ্রাম স্যাটেল করি। আমি কিছুদিনের জন্য ইস্পাহানিতে জয়েন করি। এর পর তৎকালীন রেকিট এন্ড কোলম্যান এ ব্র্যান্ড ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করি। মার্কেটিং শেখার শুরুটা মূলত রেকিট থেকেই। এর পর লিভার ব্রাদার্স এ মার্কেট রিসার্চ ম্যানেজার এ জয়েন করি। লিভার ব্রাদার্স এ আমার প্রচুর শেখার সুযোগ ছিলো। এরই মধ্যে লিভার ব্রাদার্স ঢাকায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নিলো। যেহেতু আমার মেয়ে বেশ ছোট ছিলো, আমি তখন ঢাকায় আসিনি। কারণ, আমার কাছে আমার ফ্যামিলি প্রায়োরিটি ছিলো। এরপর কিছুদিনের জন্য কানাডায় ছিলাম, আমার ছোট মেয়ে সেখানেই হয়। এই সময় আমার ক্যারিয়ারের প্রায় এক বছর গ্যাপ ছিলো। তারপর আবার দেশে ফেরা, আমার হাজবেন্ড নিজেই একটি অলাভজনক হাসপাতালের সাথে জড়িত ছিলো। ইনফ্যাক্ট পরিবারের সবাই জড়িত। এই প্রজেক্টটি একটি ডাচ্ ফান্ডের তত্বাবধানে চলছিলো। ওই সময়ে আমি এই প্রজেক্টার সাথে জড়িত হয়ে পড়ি। এই সময়টা আমার গ্রামের নারীদের খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। তখনই আমি লক্ষ্য করেছিলাম গ্রামের নারীদের মধ্যে কিছুটা হলেও নারীর ক্ষমতায়ন জাগ্রত হচ্ছিলো।

আবুল খায়ের গ্রুপে জয়েন করার গল্পটি জানতে চাই

তাসনিম করিম : আমি হসপিটালে কাজ করতে করতে আবুল খায়ের গ্রুপে কাজ করার সুযোগ আসে। যেহেতু আমার পক্ষে ফুলটাইম সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছিলো না, তাই আমি কনসালটেন্ট হিসেবে যোগদান করি। সেই শুরু তারপর আস্তে আস্তে দায়িত্ব বাড়তে থাকলো। পরে আমি ফুড ডিভিশনের ব্রান্ড এন্ড রিসার্চ (মার্কেটিং) এ দায়িত্ব পালন করেছি। সবকিছু মিলিয়ে আবুল খায়ের গ্রুপ নারীবান্ধব একটি প্রতিষ্ঠান বলা চলে। যেটা না বললেই নয়, যখন আমি এখানে জয়েন করি তখন এই কোম্পানিতে আমি একাই নারী। সবকিছু সামলিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়াটা সহজ ছিলো না, যদি এই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্ট আমাকে পুরোপুরি সাপোর্ট না করতো।

আপনি এই পর্যন্ত আসতে কতটা চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে?

তাসনিম করিম: চ্যালেঞ্জ তো অবশ্যই ছিলো। একে তো নারী তার উপর আমি কাজ করেছিলাম মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। মাল্টিন্যাশনাল এবং দেশীয় কোম্পানির মধ্যে কাজের ধারা ভিন্ন। আমি বলবো দেশিয় কোম্পানিতে চ্যালেঞ্জটা অনেক বেশি। কিন্তুু নিজেকে একবার প্রুফ করতে পারলে আস্থা অর্জন করাটা অনেক সহজ।

কাজের ক্ষেত্রে জেন্ডার কি প্রভাব ফেলে?

তাসনিম করিম: কাজের ক্ষেত্রে আমি নিজে যদি ক্যাপাবল হই তাহলে জেন্ডার কোনো ব্যাপার নয়। ক্যারিয়ার করতে চাইলে চ্যালেঞ্জ নিতেই হবে। এখানে জরুরী বিষয়টা হলো নিজেকে প্রস্তুত করা এবং কনফিডেন্ট থাকা।

নারী জাগরণের সংঞ্জা কি আপনার কাছে?

তাসনিম করিম: নারীর নিজেকে বুঝতে হবে তার অধিকার। তারপর আসবে তার মূল্যায়নের জায়গা। সেজন্য নারীর নিজের প্রস্তুতি নিজেকেই নিতে হবে। এখানে কেউ তাকে এটা করে দিবে না। সে ঘরে হোক আর বাহিরে হোক।

ব্যালেন্সটা কতটুকু জরুরী?

তাসনিম করিম: আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট এখনো বলে, নারীদের জন্য ব্যালেন্স করাটা অত্যন্ত জরুরী। একটা পর্যায় সবার প্রধান প্রত্যাশার জায়গায় এটা হয়ে যায়, যে নারীকে কি কি দায়িত্ব নিতে হবে। বিয়ের আগে মেয়েদের দায়িত্ব তেমন কিছুই থাকে না। দায়িত্ব, ব্যালেন্স সবকিছু শুরু হয় বিয়ের পর থেকেই। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া। পুরো সংসারের দায়িত্ব একটু একটু করে বুঝে নেওয়া। তারপর আাসে সন্তান হওয়ার একটি চ্যাপ্টার। নারী জীবনের এই অধ্যায়গুলো একটি থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে সবকিছু ম্যানেজ করে চলতে পারাটাই একেক জনের গুণাবলী। প্রত্যেকটি সেক্টরেই প্রায়োরিটি সেট করে নিতে হবে। এখানে ব্যালেন্স করাটা খুবই জরুরী। আমি বার বার বলতে চাই আগে নিজেকে প্রস্তুত করো, ক্যাপাবল হও সবক্ষেত্রে।

নারীর জন্য সময়ের ফ্লেক্সিবিলিটি

তাসনিম করিম: মেয়েদের ক্ষেত্রে সময়ের ফ্লেক্সিবিলিটিটা বাড়লে তাদের কাজের প্রোডাক্টিভিটি ভালো হয়। এই ক্ষেত্রে আমি বলবো আমি যথেষ্ট ভাগ্যবান।

পারিবারিক সহযোগিতা

তাসনিম করিম: এটা সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আমি বলবো। পারিবারিক সহযোগিতা না থাকলে একজন নারী শত মেধাবী হলেও সে কাজের জায়গাটা ধরে রাখতে পারে না। তাই পরিবার যদি নারীকে নারী হিসেবে না ভেবে একজন মানুষ হিসেবে তার প্রতি আন্তরিক হয় তবে নারীর উঠে আসাটা খুব সহজ।

নারীর প্রতি গৎবাধা দৃষ্টিভঙ্গির কি পরিবর্তন হয়েছে?

তাসনিম করিম: শহরগুলোতে অনেকটাই পরিবর্তন হতে দেখা যাচ্ছে। নারী নিজের কাজ নিজে করা শিখেছে। বড় বড় সমস্যা মোকাবেলা করার সাহসও অর্জন করছে নারীরা। তবে গ্রামাঞ্চলে এখনো পরিবর্তন দরকার। এই পরিবর্তনের সামিল সবাইকেই হতে হবে।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

sixteen − 6 =