নিরাপত্তাহীনতায় কাটে প্রতিটি দিন : দিনা আমিন

করেছে Rodoshee Magazine

ফিলিস্তিনের নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে যুদ্ধবিধ্বস্ত ধুলো ওঠা ভাঙা দালানের ছবি আর তরুণদের হাতে মারণাস্ত্র। কিন্তু ফিলিস্তিনি তরুণ-তরুণীরা নিজের কথা বিশ্বকে জানাতে অস্ত্রের বদলে হাতে তুলে নিয়েছে ক্যামেরার মতো শক্তিশালী অস্ত্র। আজ আমরা জানব তেমনি এক তরুণীর কিছু কথা। যিনি এ বছর জানুয়ারিতে এসেছিলেন ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের চলচ্চিত্র রাইজ আপ নিয়ে। এই উদীয়মান চলচ্চিত্রকারের নাম দিনা আমিন। জন্ম ফিলিস্তিনের পবিত্র নগরী জেরুজালেমে। শৈশব কেটেছে ফিলিস্তিনের রামাল্লায়, সতেরো বছর বয়সে চলচ্চিত্রের ওপর বিএ (অনার্স) করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যে পাড়ি দেওয়ার আগ পর্যন্ত স্কুলজীবনও কেটেছে এই রামাল্লাতেই। বর্তমান পরিচিতি, তিনি একজন চলচ্চিত্রকার। চলচ্চিত্রের ওপর গ্র্যাজুয়েশন করেছেন যুক্তরাজ্যের কিংস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কর্মক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণ করেছেন চলচ্চিত্র বিষয়ক বিভিন্ন প্রকল্পে। শিক্ষানবিশ চলচ্চিত্র প্রযোজক সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন যুক্তরাজ্যের ফ্লাইফিল্মে, যা তার জীবনের একটি অমূল্য অর্জন। গ্র্যাজুয়েশন শেষে ইন্টার্নশিপ করেছেন ইতালির ট্রেন্টোতে অরোরাভিশন ফিল্ম প্রোডাকশন কোম্পানিতে। দিনা আমিনের সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন  মুর্শিদা জামান।  এবং ভাষান্তর সহযোগী রিয়াসাত হাসান জ্যোতি।

১. এই যে আজকে আপনি চলচ্চিত্র তৈরি করছেন, প্রথমেই জানতে চাইব এর পেছনে আপনার প্রেরণা কী ছিল?

– প্রথমেই ধন্যবাদ জানাই রোদসীকে এবং আপনাকে, একজন নবীন চলচ্চিত্রকার হিসেবে আমার সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন সে জন্য। আসলে বিষয়টি ঠিক এ রকম, যখন থেকে আমি শর্ট ফিল্ম বানাতে শুরু করি ঠিক তখন থেকেই আমার মনে ইচ্ছে তৈরি হয় যে আমি একজন চলচ্চিত্রকার হব। যখন আমি কৈশোরে পা রাখলাম তখন থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি আমার এক প্রকার গভীর আসক্তি ছিল, এবং যখন বড় হলাম আমি বুঝতে পারলাম আমি যা হতে চাই তা শুধুই হতে পারব যখন আমার অভিজ্ঞতার সঞ্চয় বাড়বে। আর ঠিক যখন আমি সঞ্চয়টুকু গড়ে নেব সে সময় আমার ইচ্ছে আছে একজন চলচিত্র পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার। তাই বলতে পারি প্রেরণার বিষয়টুকু এ রকম যে আমাকে আমার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।

২. আপনি বর্তমানে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানাচ্ছেন, বিভিন্ন ধরনের কাহিনির বিন্যাসের মধ্য দিয়ে আপনাকে যেতে হচ্ছে। জানতে চাইব, আপনার বানানো স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের কাহিনির ধারণাগুলো কীভাবে পেয়েছেন?

– একদিন আমি আর আমার বন্ধু মিলে গল্প করছিলাম, হঠাৎ করেই সেই বন্ধুটি ফিলিস্তিনে আমাদের দৈনন্দিন জীবনাচারণ নিয়ে জানতে চায়। তখন আমি তাকে আমাদের গুপ্ত জীবন সম্পর্কে বলি এবং আমরা দুজনেই সম্মত হই এ বিষয়ে আমরা একটি চলচ্চিত্র বানাব।পরিকল্পনামাফিক আমরা আমাদের কাজও শুরু করি। কিন্তু আমরা যখন ফিলিস্তিনে শুটিং করছিলাম, খুব সহজেই একটি কঠিন বিষয় অনুধাবন করলাম। আর সেটি ছিল ইসরায়েলি দখলদারির কারণে সমূহ বিপদের আর এর পুরোটার মুখোমুখি হতে হতো ফিলিস্তিনের নাগরিকদের, সে একজন অভিনেতা হোক কিংবা সাধারণ একজন খেটে খাওয়া মানুষ। সবার জীবনটাই একইরকমভাবে নিরাপত্তাহীনতার মাঝে কাটে প্রতিটি দিন।

৩. স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছেন, নিশ্চয়ই বড় পরিসরেও কাজ করবেন, আপনার আগামীর যে কাজগুলো আসবে জানতে চাইব সে সম্পর্কে?

– আগামীর কাজ বলতে আমি মনে করি দুচোখে আমি যা দেখব এবং তার মাঝ থেকে আমার মনের দৃষ্টিকোণে যে বিষয়টি আঘাত করবে সেটি নিয়ে কাজ করা। আর বর্তমানে ফিলিস্তিন টিভি চ্যানেলের জন্য নতুন একটি ইংলিশ ধারাবাহিক নিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি আরও কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্র বানাচ্ছি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা ফিলিস্তিনের নাগরিকদের নিয়ে যারা নিজ নিজ স্থানে সফল এবং সম্মানিত জীবনযাপন করছেন, আর এর মাধ্যমে আমি চিত্রিত করতে চাইছি এবং সবার সামনে তুলে ধরতে চাইছি যে ফিলিস্তিনের নাগরিকেরা পরিবর্তনের জন্য কীভাবে নিজেদের অনুপ্রাণিত করে থাকেন।

৪. একজন সফল চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার জন্য আপনি কি মনে করেন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে?

– খুব ভালো একটি প্রশ্ন করেছেন। আমি খোলাসা করেই বলি তবে, এ ক্ষেত্রে আমার বিশ্বাস আপনাকে অবশ্যই প্রাথমিক কাজগুলো ভালোভাবে শিখতে হবে। আর সফল হওয়ার জন্য আপনার যে কোনো যোগ্যতার সনদ থাকতে হবে তা কিন্তু মুখ্য নয়। অভিজ্ঞতার বিষয়টি এখানে খুবই প্রয়োজন। প্রয়োজন আছে দক্ষতারও। এ জন্য আপনাকে শুরু করতে হবে একদম নিচের কাজ থেকে, যেখানে আপনি শিখতে পারবেন অনেক কিছুই। আর কাজগুলো কতটা দ্রুত আয়ত্ন’ করে নিতে পারবেন এ বিষয়টিই আপনার হয়ে কথা বলবে।

৫. একজন চলচ্চিত্র পরিচালকের নাম বলুন যিনি আপনার জন্য অনুপ্রেরণার রোলমডেল হিসেবে ঠাঁই পেয়েছেন আপনার অন্তরে?

– একজন চলচ্চিত্র পরিচালক আছেন যার প্রশংসা আমি সব সময়েই করে থাকি, এলিয়া সুলেইমান। তিনি ফিলিস্তিনের একজন সফল চলচ্চিত্র পরিচালক, যিনি তার সৃজনশীল চলচ্চিত্রের জন্য প্রচুর সুনাম কুড়িয়েছেন এবং দর্শকপ্রিয়তাও পেয়েছেন। এখানে একটা কথা বলার আছে, সেটি হলো নিজের চলচ্চিত্রগুলোর ক্ষেত্রে আমার কাজগুলো যে নিজস্ব ভঙ্গিমার হবে তাতে সন্দেহ নেই। তবে কখনো যদি কারও কাজ অনুসরণ করতে হয়ে তবে আমি এলিয়া সুলেইমানের কাজগুলোকে অনুসরণ করব। আর এর পেছনে খুব সাধারণ একটি বিষয় লুকিয়ে আছে সেটি হলো, ওনার কাজগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে করা। যেখান থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।

৬. এ বছর জানুয়ারিতে আপনি বাংলাদেশে এসেছিলেন ষোড়শ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে, সেই সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন অষ্টম ঢাকা সিনে ওয়ার্কশপেও। সে সময়ে আপনার অভিজ্ঞতা নিয়ে কিছু বলুন।

– এখানে প্রথমেই ধন্যবাদ জানাতে হয় ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজকদের যারা আমাকে এই কর্মশালায় অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। ধন্যবাদ অরোরাভিশনকেও যারা আমার এই কর্মশালায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন। আরও ধন্যবাদ জানাতে হয় আইএফসিএবি এবং পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউটকে যারা এখানে কর্মশালার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেছে। আর যার নাম না বললেই নয়, আমার কোর্স ডিরেক্টর অভিদিও সালাজার (আবদ-আল-লতিফ) যিনি লস অ্যাঞ্জেলেস, ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা; একজন অভিজ্ঞ চলচ্চিত্র পরিচালক, লেখক, গায়ক এবং সর্বোপরি একজন সফল শিক্ষক। যার হাত ধরে মাত্র দুটি দিনেই আমি অনেক কিছু জানতে পেরেছি, যা আমার ভবিষ্যতের পাথেয় হয়ে থাকবে।

যাই হোক মূল কথায় ফিরে আসি। যখন প্রথম জানতে পারি যে আমাকে বাংলাদেশ নামক একটি দেশে যেতে হবে যেখানকার মানুষেরা খুবই আন্তরিক এবং দেশটি একটি সবুজ দেশ হিসেবে পরিচিত, সে সময় ভেতরে ভেতরে খুব শিহরণ বোধ করেছিলাম। আমাকে মোটেও হতাশ হতে হয়নি, বরং আমি আমার প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে পেরেছি। আর যে কথাগুলো বলতেই হবে তা হলো একজন ভালো চলচ্চিত্র পরিচালক হওয়ার জন্য যে চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয় সে বিষয়টি বিবেচনায় এনে যদি ভাবা হয় তবে কর্মশালাটি আমার জন্য খুবই লাভজনক ছিল। খুব অল্প সময় হাতে নিয়ে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র বানাতে হয়েছিল কর্মশালার জন্য। আর সেটিই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দুদিনের মধ্যেই চিত্র ধারণের কাজ শেষ করেছিলাম, কিন্তু সম্পাদনার কাজটি আমাকে সবার শেষে করতে হয়েছিল। আমি সবার থেকে কিছুটা পিছিয়েও ছিলাম বটে, কারণ আমি বাংলাদেশে এসেছিলাম সবার পরে। তারপরও আমার কাজটুকু আমি সবার সামনে সফলতার সামনে উপস্থাপন করতে পেরেছিলাম। এই দেশটিতে আমি আবারও ফিরে আসতে চাই। আমার সদ্য হওয়া এদেশীয় এক বন্ধু আমাকে জীবনানন্দ দাশ নামে একজন কবির একটি কবিতার কয়েকটি লাইন অনুবাদ করে শুনিয়েছিল, সেই কবিতার লাইনগুলো আমাকে ভেতরে ভেতরে খুব আলোড়িত করেছিল। মাঝে মাঝেই সেই কবিতাটির প্রথম লাইনটি মনে পড়ে…আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে…

রোদসী /এনপি

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

12 + 16 =