নূরজাহান বেগম-একজন কিংবদন্তির নাম

করেছে Rodoshee

বাংলার নারী জাগরণ ও সাহিত্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ নূরজাহান বেগম, বাংলার মানুষের কাছে এক চিরস্মরণীয় নাম। তার দেখা স্বপ্নের পথে টেনে এনেছিলেন অসংখ্য নারীকে। স্বাধীন চেতনার মন্ত্র তাদের তুলে দিয়েছিলেন আপন হাতে। দীক্ষা দিয়েছেন স্বপ্নচারী হওয়ার। পুরুষের পাশাপাশি নিজের মেধা-মননকে তুলে ধরার। সমাজ সংসারের চোখ রাঙানিকে পরোয়া না করে নিজেকে একজন সফল মানুষ হিসেবে মেলে ধরার। নারীদের ভেতর এই স্বপ্ন বুনে দিতে, নতুন দীক্ষায় দীক্ষিত করে তুলতে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে তাকে রাত-দিন। তবু কখনো ক্লান্ত হননি এই স্বপ্নপ্রাণ মানুষটি। বাংলার সমাজে নারী সাংবাদিকতার দ্বার প্রশ্বস্ত করায় তাঁর ভূমিকা অনন্য। মুক্তচিন্তার স্বাক্ষর রেখেছেন প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের নারী জাগরণ, সাংবাদিকতা ও সমাজকল্যাণে নূরজাহান নামের এই মানুষটির অবদান বিশাল। দেশভাগের পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ‘বেগম’ পত্রিকাকে চিন্তাশীল মেধাবী এই মানুষটি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিলেন নারীদের কথা বলার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে। তার সম্পাদনায় প্রায় ৬৬ বছর ধরে প্রকাশিত হয়ে আসছে স্বনামধন্য ‘বেগম’ পত্রিকাটি।

১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুরের চালিতাতলি গ্রামে তৎকালীন ‘সওগাত’ পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও তার স্ত্রী ফাতেমা বেগমের ঘর আলো করে জন্ম নেন নূরজাহান। নূরজাহান বেগমের শৈশব-কৈশোর কেটেছে চাঁদপুরেই, বাবা-মা এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে। ছয় বছর বয়সে হাঁটি হাঁটি পা পা করে প্রথম পা দেন বিদ্যালয়ের আঙিনায়, শুরু হয় তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন। নূরজাহানের প্রথম স্কুল ছিল সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল। তারপর বেলতলা উচ্চবিদ্যালয়ে চলে যান, সেখানে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর পঞ্চম শ্রেণিতে আবার আগের বিদ্যালয় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

Page_112

পড়াশোনায় তুখোড় মেধাবী ও মনোযোগী হওয়ায় নিয়মিত ভালো ফল লাভ করছিলেন পরীক্ষাগুলোতে আর শিক্ষক ও শুভানুধ্যায়ীদের চোখের মণি হয়ে উঠছিলেন দিন দিন। পিতা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের ইচ্ছায় অষ্টম শ্রেণি থেকে ম্যাট্রিক পর্যন্ত তিনি ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে ১৯৪২ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ছোট্ট নূরজাহান বাবার কোল ঘেঁষে থাকতেই ভালোবাসতেন। কিন্তু বাবা যে ভীষণ ব্যস্ত, সাংবাদিক বাবা সারাক্ষণই লেখালেখি ছোটাছুটি নিয়েই থাকতেন। নূরজাহানও ভালোবেসে ফেলেন বাবার কাজকর্ম। আর সেই কারণেই ধীরে ধীরে বাবার কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। বাবাকে সহযোগিতা করতে থাকেন। বাবার হাত ধরেই, বাবার অনুপ্রেরণাতেই সাংবাদিকতার পথে পা রাখেন। একই সঙ্গে তিনি আইএ ভর্তি হন কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে। তার আইএতে পড়ার বিষয় ছিল দর্শন, ইতিহাস ও ভূগোল। লেডি ব্রেবোর্ন থেকে ১৯৪৪ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে আইএ পাস করে বিএতে ভর্তি হন, সে সময়ই বাবার অনুপ্রেরণায় তার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন ‘সওগাত’ পত্রিকায়। একই কলেজ থেকে তারপর তিনি ১৯৪৬ সালে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন।

তৎকালীন সমাজ নারীদের জন্য খুব একটা বন্ধুভাবাপন্ন ছিল না। শিক্ষাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীদের সামনে ছিল নানা রকম বাধার দেয়াল। এই বাধার দেয়াল ভাঙার গান নিয়ে ‘সওগাত’ পত্রিকায় তখন বছরে একটি নারী সংখ্যা বের হতো। সেই সময়ের রক্ষণশীল সমাজে পত্রিকায় নারীদের ছবি ছাপা হওয়া ছিল খুবই দুষ্কর। সেই সমাজ পত্রিকায় নারীদের ছাপা হওয়াটা সহজে মেনে নিত না। নারীরা যেহেতু ঘর থেকে বের হতে পারতেন খুবই কম, ফলে তাদের লেখা সংগ্রহ করতে হতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে। এসব কাজে বাবাকে সাহায্য করতেন নূরজাহান, সঙ্গে থাকতেন বেগম সুফিয়া কামালও। একসময় তিনি ভেবে দেখলেন যে বছরে একটা নারী সংখ্যা বের করে নারীদের উন্নতি হবে না, নারীদের জন্য আলাদা একটি নিয়মিত পত্রিকা দরকার। সেই ভাবনা মাথায় রেখে বাবার উদ্যোগেই ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে প্রকাশিত হলো সাপ্তাহিক ‘বেগম’। সিদ্ধান্ত নিলেন, ‘বেগম’-এর প্রচ্ছদে নারীদের ছবিই প্রকাশ করা হবে। সেই ইচ্ছানুসারে প্রথম সংখ্যায় বেগম রোকেয়ার ছবি দিয়েই করেছিলেন ‘বেগম’ পত্রিকার প্রচ্ছদ।

hlPLaab2YJqx

সাপ্তাহিক ‘বেগম’-এর শুরুতে প্রধান সম্পাদক ছিলেন সুফিয়া কামাল, আর নূরজাহান বেগম ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। প্রথম চার মাস সুফিয়া কামাল সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব অর্পিত হয় নূরজাহান বেগমের হাতে। তখন নারী-লেখকের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। এরই মধ্যে ১৯৪৮ সালে ‘ঈদসংখ্যা বেগম’ প্রকাশিত হয়। এটি ছিল নারীদের বাংলা পত্রিকার প্রথম একটি ঈদসংখ্যা। তখনকার সময়ে নারীদের পক্ষে কথা বলা, মুক্তচিন্তার কথা বলা, নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কথা বলতে গেলে লোকে নানা কথা বলত। নারীর অগ্রগতিকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হতো। কিন্তু এসব কথাকে পাত্তা না দিয়ে ‘বেগম’ পত্রিকাটিকে তিনি এগিয়ে নিয়ে যান অমিত সাহসে ভর করে। তিনি জানতেন, বুঝতেন এই সব বাধা কেবলই নারীদের ঘরে বন্দী করে রাখার প্রয়াস। তাই তিনি মাথা নোয়াননি এসব বাধার কাছে। তিনি বেগমকে সঙ্গে করে নিজে এগিয়েছেন, এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছেন আরও অনেক মুক্ত হতে চাওয়া নারীদের। নারীমুক্তির পথে বাধা তৈরি করে নারীদের আটকানো যাবে না তা তখনকার সেই সমাজ ধীরে ধীরে ঠিকই বুঝতে পেরেছিল সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকার জনপ্রিয়তা দেখেই।

১৯৫০ সালে ‘বেগম’ পত্রিকার অফিস ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫০-এর দশকে এই ‘বেগম’ পত্রিকা তৎকালীন সমাজে শিক্ষিত মুসলিম নারী লেখকদের একটি বড় প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। ঢাকার প্রেক্ষাপটেও সে সময়ে  নারীদের জন্য একটি সচিত্র সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। এখানেও নূরজাহান বেগমকে প্রতিনিয়তই পার হতে হয়েছে হাজারো বাধার দেয়াল। ‘বেগম’ পত্রিকা শুধু নারীদের উদ্দেশ করে গোড়াপত্তন হলেও এর পাঠক শুধু নারীরাই ছিলেন না। ধীরে ধীরে এই পত্রিকা পুরুষদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তনেও রাখে অনন্য ভূমিকা। পত্রিকায় তৎকালীন সমাজে নারীদের অবস্থান,  শিক্ষা, চিন্তা, গৃহকর্মের কথা, ছবি, গল্প, কবিতা এবং তাদের নানান সমস্যার কথা উঠে আসত।

mg_4360-copy

ব্যক্তিজীবনে নূরজাহান বেগম সুখী ছিলেন বলেই সব সময় তিনি দাবি করে এসেছেন, স্বামী রোকনুজ্জামান খান, দুই কন্যা ফ্লোরা নাসরীন খান শাখী ও রীনা ইয়াসমিন খান মিতিকে নিয়েই ছিল তার সুখী পরিবার। তবে দেশ নিয়ে তার আক্ষেপ ছিল। মনের ভেতর কষ্ট ছিল। দেশের নানা অসংগতি তাকে পোড়াত। দেশ নিয়ে ছিল তার বুকভরা স্বপ্ন। সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘বেগম’কে নিয়ে ছিল বুকভরা গর্ব আর ভালোবাসা। নারীদের জন্য তার কণ্ঠ ছিল সর্বদা বলীয়ান। সাম্প্রতিক সময়ের সমাজের নেতিবাচক দিক নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করতেন। নারী নির্যাতন ও যৌতুকের কথা উঠলেই তিনি বলতেন, ‘নারী নির্যাতন তো বেড়ে গেছে, এগুলো প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী গোষ্ঠীর চক্রান্ত। যৌতুক এখনো চলছে। অথচ ধর্মীয় নেতারা কোনো দিন বলেননি, এটা ভালো না। এটা হারাম। সাধারণ লোকেরা লেখাপড়া জানে না, মৌলভি সাহেব যা বলে তা-ই তারা মেনে নেন অন্ধবিশ্বাসে। ওরা আধুনিক ও মানবিক বিষয়গুলো বলে না। বরং বলে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে দাও।’ সেই সময়ে ও রকমভাবে আধুনিক ভাবনা ভাবতে পেরেছিলেন বলেই বর্তমান প্রজন্মের নারী সাংবাদিকদের পথ মসৃণ হয়েছে। অনেক নারীই আজ নিজেকে সফল সাংবাদিক হিসেবে সমাজে জায়গা করে নিয়েছেন। এসবই সম্ভব হয়েছে কেবল নূরজাহান বেগমের মুক্ত ভাবনা আর বন্ধুর পথ পেরিয়ে অক্লান্ত পথ চলার জোরে।

২৩ মে ২০১৬ এই দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী, মুক্ত ভাবনার, দেশপ্রেমিক মানুষটি আমাদের ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন না ফেরার দেশে আর রেখে গেছেন তার আদর্শ। ‘বেগম’ পত্রিকায় তার লিপিবদ্ধ পাঁচটি যুগের পাতায় পাতায় রচিত হয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি, সৃজনশীলতার স্বাক্ষর আর পুঞ্জিভূত প্রতিবাদের ভাষা। তার চিন্তাচেতনা ও সাহস বিস্তার লাভ করেছে এ দেশের হাজার নারীর মানসে। তারই দেখানো পথে, তারই হাত ধরে এই সমাজের নারীরা একটু একটু করে সাংবাদিকতায় এসেছেন সাহসে ভর করে। তারই দেখানো পথে নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন অগ্রসর নারী হিসেবে। নারী নয় শুধু, একজন মানুষ হিসেবেও। নূরজাহান বেগম কেবল একটি নামই নয়। এই নামটি একটি কিংবদন্তি আমাদের জন্য, এই উপমহাদেশের জন্য। নূরজাহান বেগম বেঁচে থাকুন হাজার বছর ধরে নারী প্রগতির চেতনার পাতায়।

লেখা : অলকানন্দা রায়

ছবি : সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

14 + 5 =