পঁচিশে তুমি

করেছে Rodoshee

প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাট চুকানো হয়ে গেছে। সময় এখন জীবনের নতুন আঙিনায় প্রবেশের। এই সময়েই পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে ‘এখন অন্তত বিয়েটা করে ফেল’ কথাটি এটি শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছ তুমি। কখনো বিরক্তি, কখনো চাপ আবার কখনো ভুগছ সিদ্ধান্তহীনতায়। কী করা উচিত, কী উচিত নয় তা নিয়ে তোমার নিজের মধ্যেই যেন চলছে অন্তর্দ্বন্দ্ব। পঁচিশের বিড়ম্বনা কি তোমায় কোণঠাসা করে ফেলছে? তবে জেনে রেখো, আত্মবিশ্বাস এবং সাহস থাকলে কখনোই হারবে না তুমি। লিখেছেন লিহান লিমা।

ক্যারিয়ার না বিয়ে?
সদ্য পড়াশোনা শেষ করে তুমি যখন নিজের স্বপ্নকে বাস্তবের লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করছ, ঠিক তখনই তোমার চারপাশে সামাজিক নিয়মকানুনের বেড়াজাল। একা আর কত পথ চলবে, এমন প্রশ্ন তোমাকে বিদ্ধ করে প্রতিনিয়ত। জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার জন্য পরিবারের কাছ থেকে আসা চাপ তোমাকে যেন গোলকধাঁধার মধ্যে ফেলছে। এই সময় বিয়ে না করলে কি খুব বেশি দেরি হবে, নাকি বিয়ে করলে ক্যারিয়ার শেষ হবে এমন দ্ব›দ্ব তোমার মনে জাগাটাই স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে নিজের বিশ্বাসকে ধরে রাখো। গুরুত্ব দাও তোমার এত দিনের স্বপ্ন ও পরিশ্রমকে। ক্যারিয়ার নাকি বিয়ে। যদি দুটির মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয়, তবে নিজের চাওয়ার ক্ষেত্রে কখনোই আপস করো না যেন। তুমি তোমার জীবনকে যেভাবে সাজাতে চাও, সেটিই বেছে নাও। সেটি কী হবে সেই সিদ্ধান্ত শুধুই তোমার। কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘মনে রেখো, আজকের দিনটিই তোমার ভবিষ্যৎ, যা নিয়ে তুমি গতকাল চিন্তিত ছিলে।’

সমন্বয় দুটোতেই
এ বয়সে সাজানো-গোছানো সংসারের স্বপ্ন, ভালো জীবনসঙ্গীর স্বপ্ন, নতুন একটি সম্পর্ককে উপভোগের স্বপ্ন, ছোট্ট একটি নীড়ের স্বপ্ন তরুণী মন ছুঁয়ে যায়। একই সঙ্গে থাকে নিজের ক্যারিয়ারকে যোগ্যতার শীর্ষে পৌঁছে দেওয়ার বাসনা। এ ক্ষেত্রে যদি মনোবল হয় অটুট, লক্ষ্যে থাকে স্থির, তবে দুইয়ে দুইয়ে চার মেলানোটা কঠিন নয়। যদি তোমার সিদ্ধান্ত হয় বিয়ে তবে কোনো পরিস্থিতিকে বাধা-বিবেচনা করে পিছিয়ে না এসে দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে এগিয়ে যাও। এ ক্ষেত্রে যদি তুমি চাকরিজীবী হও তবে বিয়ের আগেই নতুন পরিবারকে তোমার কর্মপরিবেশের কথা খুলে বল। তারাও জানবে তাদের পরিবারের নতুন সদস্যটি একজন চাকরিজীবী ও স্বাবলম্বী। তারা কখনোই তোমাকে গৃহিণী হিসেবে দেখবে না। বলিউডে কারিনা কাপুর, সোনম কাপুর, ঐশ্বরিয়া রাই ও আনুশকা শর্মার মতো নায়িকারা ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা অবস্থায় বিয়ে করেছেন। বিয়ের পর তোমার ক্যারিয়ার থেমে থাকবে, নাকি এগিয়ে যাবে তা তুমিই নির্ধারণ করবে। যদি তুমি নিজের অর্জনকে সম্মান করো তবে অন্যরাও তা করতে বাধ্য। তবে যদি বিয়ের পর ক্যারিয়ার শুরু করার চিন্তা থাকে ভেবে দেখো প্রতিটি বাধা সম্পর্কে। সংসারজীবনে প্রবেশের পর তুমি নতুন করে ক্যারিয়ার শুরু করতে পারবে কি না, তা নিয়ে শক্ত যুক্তি দাঁড় করাও। যাকে তুমি জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিচ্ছ, সে নারীর অধিকারকে সম্মান করে কি না তা নিশ্চিত হয়ে নাও। যদি আত্মবিশ্বাসী হও তবে তুমি অবশ্যই পারবে। নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কখনোই আপস করতে নেই, এ ক্ষেত্রে নিজের প্রত্যয়ী অবস্থানকে জিইয়ে রাখতে হবে।

একা থাকার সিদ্ধান্ত
‘চোখে চোখ আজ চাহিতে পার না;
হাতে রুলি, পায়ে মল,
মাথার ঘোমটা ছুড়ে ফেল নারী,
ভেঙে ফেল ও শিকল।
যে ঘোমটা তোমা করিয়াছে ভীরু
ওড়াও সে আবরণ,
দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন
যেথা যত আবরণ।’
পড়াশোনা শেষ, চাকরিতে প্রবেশের পর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেবে তাও নয়, আপাতত একাই পথ চলতে চাও তুমি। কিন্তু পরিবারকে বোঝাবে কী করে। কিংবা ‘বিয়ে করব না’ স্থির করলেও মনের অজান্তেই আশঙ্কা উঁকি দিচ্ছে। এই সমাজে নারীর একা চলার পথে বাধা অনেক। কিন্তু সব বাধা মোকাবেলা করে নারীর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চিত্রও কম নয়। মাতৃত্বের মতোই বিয়ে জীবনের অন্যতম একটি পছন্দ, অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, অবিবাহিত ব্যক্তিদের নিজের ওপর আস্থা বেশি থাকে ও বিবাহিতদের চেয়ে তাদের মানসিক সুযোগও বেশি। অবিবাহিতরা সাধারণত বেশি ফিট হয় ও তারা ব্যক্তিসত্তার অগ্রগতিতেও বেশি সক্ষম। এ ক্ষেত্রে একা থাকার সিদ্ধান্ত মানেই কিন্তু একা চলা নয়। ২০১৫ সালে সমাজবিজ্ঞানী নাতালিয়া সারকিসিয়ান ও নওমি গার্স্টেলের বিবাহিত ও অবিবাহিতদের ওপর চালানো গবেষণায় উঠে এসেছে, অবিবাহিতদের সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক অনেক শক্তিশালী ও সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে সহযোগিতা দেওয়া ও পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সহজলভ্য। তাই যদি তুমি আত্মবিশ্বাসী সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকো, তবে নিজের মতের প্রতি হও শ্রদ্ধাশীল।

সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়া
তোমার দেরিতে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত পরিবারের ও কাছের মানুষদের ভালো লাগুক আর না-ই লাগুগ, নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রেখো। নিজের লক্ষ্যে, পরিকল্পনা ও ক্যারিয়ার ভাবনা তাদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করো। সমাজের নিয়মনীতি, পরিবারের চাপ, বন্ধুবান্ধবের বিয়ে কিংবা বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে হুটহাট বিয়ের সিদ্ধান্ত নয়, নিজের সাফল্যকে বাস্তবের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে কাজ করাটাই হবে বুদ্ধিমানের। বিয়ের সিদ্ধান্ত হোক তখনই যখন তুমি মানসিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত। উপভোগ করো সাফল্যের পথে নিজের পথচলাকে। পরিবার যাতে তোমাকে বোঝা না ভাবে সে জন্য নিজেকে যোগ্য ও স্বাবলম্বী করে তোলো। অস্কারজয়ী অভিনেত্রী জেনিফার লরেন্সের মতে, ‘ব্যক্তিজীবনে আমার পছন্দই চ‚ড়ান্ত। আমার পছন্দের বিপরীতে যা-ই হোক তা আমি কখনোই চাই না। এমন কিছু বিরক্তিকর কারণ আমরা সবাই স্বাধীন।’

মানসিক প্রস্তুতি?
বিয়ে, ক্যারিয়ার কিংবা একা পথচলা সিদ্ধান্ত যা-ই হোক প্রতিটি মুহূর্তের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় থাকুক মানসিক প্রস্তুতি। মানসিক চাপ মোকাবেলার অন্যতম উপায় আত্মবিশ্বাস ও সাহস। এটি যে কোনো বাধা মোকাবেলা করতে পারে। নিয়মিত ব্যায়াম, ধ্যান তোমাকে দেবে স্বস্তি। প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় তোমাকে রাখবে উৎফুল্ল। তাই এখনো বিয়ে করছ না কেন, বয়স বেড়ে যাচ্ছে, কেন বাচ্চা নিচ্ছ না এ ধরনের প্রশ্ন কিংবা মন্তব্যে ঠান্ডা মাথায় দিতে হবে উত্তর। যত কাছের মানুষই হোক, যেভাবেই নিক না কেন উত্তরে যা সত্য তাই বলা উচিত। বিব্রত কিংবা ভেঙে পড়া নয়, মানসিকভাবে দৃঢ় থেকে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। প্রশ্নকর্তা বা মন্তব্যকারীকে বুঝিয়ে দাও বিষয়গুলো তোমার একান্তই ব্যক্তিগত। কে কী ভাবল, কী মনে করল তা নিয়ে দুশ্চিন্তা নয়, চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও পরিস্থিতি সামলে নেওয়াটাই বুদ্ধিমত্তার কাজ।

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

2 × 5 =