পদোন্নতিতে বিড়ম্বনা

করেছে Rodoshee

শুরুতে একটি পরিস্থিতি কল্পনা করো। যেমন চাওয়া তেমনই পাওয়া-এমন একটি চাকরি রয়েছে তোমার। একই সঙ্গে ভালোবাসো এ রকম একটি প্রকল্পের সঙ্গে সম্প্রতি যুক্ত হয়েছ। কাব্য করে বলা যায়, সোনায় সোহাগা কপাল তোমার। সংগত কারণে খুব উচ্ছ্বসিত তুমি কর্মস্থল নিয়ে। তাই মনের আনন্দে কাজের চাপ সামলে চলেছ নিপুণভাবে। সুচারুরূপে সেরে ফেলছ অর্পিত সব দায়িত্ব। এর স্বীকৃতিস্বরূপ ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানের অন্যতম সেরা কর্মীতেও পরিণত হয়েছ। তবে স্বীকৃতি কি শেষ আছে? অর্থাৎ আরও পুরস্কার তোমার প্রাপ্য। প্রতিষ্ঠানটি তাদের ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপক’ হিসেবে তোমাকে যোগ্য মনে করছে। উচ্চ বেতন ও সামাজিক স্বীকৃতির কারণে পদটি গ্রহণও করলে।
এ পর্যন্ত সব ঠিক আছে…যতক্ষণ না নিজেকে যোগ্য নেতা মনে করছ। কিন্তু ইতিমধ্যে বড্ড দেরি হয়ে গেছে, পদটি তোমার পছন্দ হয়েছে আর এখন নিজের সুখ্যাতি ধ্বংসের পথে রয়েছে। কথায় আছে, সুযোগ হাতছাড়া করা সবচেয়ে খারাপ। অর্থাৎ সুযোগ ধরে রাখাই সঠিক যোগ্যতা। দক্ষ ও যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অনেকে যা হেলায় হারায়। আর এ কারণে অনেকের পদোন্নতিতে বিড়ম্বনা দেখা দেয়। আসো এবার মূল বিষয়ে প্রবেশ করি।

দ্য পিটার প্রিন্সিপাল
১৯৬৯ সালে ড. লরেন্স পিটার ও রেমন্ড হাল ‘দ্য পিটার প্রিন্সিপাল’ বইটি প্রকাশ করে। এ বইয়ে তারা দেখিয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানের নিম্নতম থেকে উচ্চতম পর্যায়ে অযোগ্যতার ভিত্তিতেও অনেক কর্মী প্রমোশন পেয়ে থাকে। লেখকদ্বয়ের মতে, এমন ব্যক্তিদের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জিং কিছু কাজ দিয়ে তাদের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। আসলে অনেক সংস্থা যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে এমন অনেক কর্মীকে দক্ষ করতে চায়, ছাঁটাইয়ের পরিবর্তে। এ জন্য নিয়োগদাতারা এমন কর্মী প্রথমে খুঁজে বের করেন। পরে তাদের একের পর এক কাজ দিয়ে যাচাই করা হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান এমন কাজের জন্য তাদের পুরস্কৃত করে থাকে। সেটা হতে পারে আর্থিক উন্নয়ন কিংবা পদোন্নতি। পিটারের ভাষায়, একজন কর্মীর অধিক কাজের জন্য জোটে এই সম্মান। সচরাচর দেখা যায়, এই সম্মানী এসেছে দায়িত্বের বাইরের ভিন্ন কোনো কাজ থেকে। কাজেই যোগ্য হলেই যে পদোন্নতি হবে-এমন আশা করা ঠিক নয় সব ক্ষেত্রে।

সামঞ্জস্য
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা স্নাতক ডিগ্রিধারীদের অনেকে তাদের জ্ঞানের স্তরকে সমাজের কাজে প্রয়োগ করে। আবার অনেকে এই জ্ঞানের স্তরকে প্রয়োগ করে কর্মজীবনে সফল হওয়ার চেষ্টা করে। দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষেরা মূলত যোগ্যতায় কোনো ঘাটতি থাকলে তা কাজের মাধ্যমে পুষিয়ে নেয়। অন্তত চেষ্টা চালিয়ে যায়। সংগত কারণে ওপরে ওঠার সিঁড়ি তাদের জন্য অবারিত থাকে।
প্রমোশন। একটি বড়সড় পুরস্কার-এ রকম ভাবতেই অনেকে অভ্যস্ত। তাই খুব স্বাভাবিকভাবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমাদের তাড়িয়ে বেড়ায় অহর্নিশ। অথচ এই পদে আসীন হতে আমাদের যে প্রশিক্ষণ দরকার, নিদেনপক্ষে স্বাভাবিক দক্ষতা দরকার কিংবা পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে তা মনে করি না। এমনকি নিরলস কাজ করে যেতে হবে, তাও আমলে নিই না। বরং ভান করি, ছোটখাটো ত্রুটিবিচ্যুতি এ আর এমন কী! হতেই পারে। চালাক শ্রেণিরও আছে অনেকে। তারা নিয়োগ দাতাদের ভুলত্রুটি নিয়ে গসিপ করতে অভ্যস্ত। এ বিষয়গুলো প্রমোশনের পথে অন্তরায়।
অবশ্য পদোন্নতির সঙ্গে বেতন-ভাতা বৃদ্ধিও সম্পর্কযুক্ত। অনেক সময় বেতন-ভাতাদি বৃদ্ধি ব্যক্তিবিশেষের যোগ্যতার চেয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখে। ধরো, একটি প্রতিষ্ঠানে একজন চমৎকার কপিরাইটার রয়েছে। তার বেতন অতি দ্রুত নাও বাড়তে পারে। ওই একই প্রতিষ্ঠানের একজন ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরের বেলায় ঘটতে পারে এর বিপরীত চিত্র- জ্যামিতিক হারে বাড়তে পারে তার বেতন। সুতরাং সহজেই বোধগম্য, আগপাছ চিন্তা না করেই কোনো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে ধরতে চায় অনেকে। যেমন মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় দক্ষ না হয়েও তুমি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক হতে চাইলে। পারবে কি সামলাতে? সত্যি বলতে কি, অনেকেই দক্ষ না হয়ে পদটি নিতে চাইবে। কেননা এটাই আমাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আর এটাই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে খারাপ সিদ্ধান্ত হবে। অনেকে বলতে পারে, ঝুঁকি নিতে হয়। ঠিক আছে। ঝুঁকি নাও। কিন্তু কাজটি সম্পর্কে ধারণাও তো রাখতে হবে। আমরা ভুলে যাই, নিপুণ হাতে কাজ করা আর দল সামলানো সমান নয়। দলগত সাফল্য এক বিশাল বিষয়। একজন দক্ষ কর্মী যে একটি দল সামলাতে সিদ্ধহস্ত-এমন মনে করা ঠিক নয়। একই সঙ্গে দলনেতা হিসেবে নিজেকে আহামরি হিসেবে প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের সীমানা বুঝতে হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার যেন না হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। নতুবা শেষ পর্যায়ে দেখা যাবে, ব্যক্তির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ
হলফ করে বলা যায়, দ্য পিটার প্রিন্সিপাল সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের চাহিদা পূরণ করবে না। কেননা প্রতিটি মানুষ স্বতন্ত্র। প্রত্যেকেরই ভিন্ন আশা, প্রত্যাশা, চাহিদা রয়েছে। প্রত্যেক কর্মীরই নিজ স্বাভাবিক শক্তিমত্তা রয়েছে। নিয়োগকারীকে এটা খুঁজে বের করার মানসিকতা থাকতে হবে। এর ওপর নির্ভর করে কর্মীদের কাজের জন্য পুরস্কৃত করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মীদের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কর্মীর সামর্থ্য বিবেচনায় রেখে তার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগও দিতে হবে। ভুল হলে তাদের শোধরানোর সুযোগ দিতে হবে। লেখক মার্কাস বাকিংহামের তার অনেক বইয়ে কর্মীদের সামর্থ্য যাচাই ও ত্রুটিবিচ্যুতি সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, কর্মীর ভুলভ্রান্তি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করার মধ্যেই নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের উৎকর্ষ। এর মানে দাঁড়ায়, পুরস্কৃত করার পদ্ধতি এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন একজন সেরা কর্মীকে প্রমোশন না দিয়েও মর্যাদাসম্পন্ন বেতন দেওয়া যায়। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় দক্ষ এমন মানুষকে বাছাই করো। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পায় বিকল্প মেধা। অবশ্য হতাশ হওয়ার কিছু নেই, তুমিও নিজেকে ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাও। তুমি পারবে। তবে এ জন্য কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক হতে হবে। প্রশিক্ষণ ও মেধা এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে তোমার। সংস্থা ও কর্মীর চিন্তা এক হলেই কেটে যাবে পদোন্নতির বিড়ম্বনা।
আমরা সবাই চাই খুশি থাকতে, সুখী হতে। আমরা সব সময়ই চেষ্টা করি জীবন প্রণালির মান বাড়াতে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে আসীন হওয়া এবং ক্ষমতাকেই যদি সফলতার চাবিকাঠি হিসেবে ধরে নিই, তবে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে। অধরা রয়ে যাবে সুখী হওয়া। এভাবে চলতে থাকলে একসময় অফিসে নিজেকে এলিয়েন হিসেবে আবিষ্কার করবে। ফল হিসেবে কাজে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা ঘনীভূত হতে থাকবে। এমনকি চাকরি হারানোর ভয়ও কুরে কুরে খেতে পারে। এমন কোনো প্রতিষ্ঠান বাছাই করো, যেখানে তোমার প্রিয় কাজ করতে পারবে। এ জন্য পুরস্কৃত হবে এবং প্রয়োজনে প্রমোশনকে না বলতে পারবে। অন্যথায়, বর্তমান চাকরি তোমাকে ও তোমার আশপাশের মানুষকে দুর্বিষহ করে তুলবে।
আরও একটি গল্প দিয়ে শেষ করি। রাজধানীর বাইরের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা এক যুবক রাজধানীর একটি প্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি লেভেলে চাকরি পেয়েছে। এটা তার জন্য ভালো সুযোগ। কাজটি তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ-এ বিষয়েই সে পড়ালেখা করেছে। বয়সও কম। বেতন তেমন না হলেও, অল্প সময়ের মধ্যে সে সিনিয়রদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে ফেলে। এমনকি অফিসের বাইরেও তাদের সঙ্গে সামাজিক মেলামেশা শুরু করে। সে তার বসকে পছন্দ করে। ছয় মাস পরে পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। না, তাকে বরখাস্ত করা হয়নি, পদোন্নতি হয়েছে তার! অথচ তার বন্ধুরা দীর্ঘদিন ধরে একই প্রতিষ্ঠানে একই পদে কাজ করছে-সে তাদের বস বনে গিয়েছে। একই সঙ্গে সে এখন থেকে নির্বাহী পরিচালক বরাবর রিপোর্ট করবে। মানে আগের সুপারভাইজারের সমকক্ষ সে এখন। বুঝতেই পারছ, এই পদোন্নতি তার ক্যারিয়ারের জন্য বিশাল টার্নিং পয়েন্ট কিন্তু কাজ নিয়ে তার সেই আগের সুখ উধাও হয়ে গেছে। সে একাকী হয়ে পড়ল। কাজের মধ্যে আর মজা খুঁজে পায় না। এটাও একধরনের বিড়ম্বনা, পদোন্নতির। বন্ধুদের মধ্যে যার পদোন্নতি হয়েছে তার জন্য, যার হয়নি তার জন্যও।

লেখা: রতন কুমার দাস

ছবি: সংগৃহীত

০ মন্তব্য করো
1

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

11 − nine =