পর্যটনে দুঃসময় পেরোনোর অনুপ্রেরণা

করেছে Sabiha Zaman

গোলাম কিবরিয়া
সবুজ প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়ার আকুতি মানুষের আদিকাল থেকেই। ঘুরে বেড়াতে সবাই ভালোবাসে। আর এই ঘুরে বেড়ানোকে কেন্দ্র করে সময়ের পালাবদলে এর মাঝে মানুষ খুঁজে নিয়েছে জীবিকা। সৃষ্টি হয়েছে এক শিল্প, আর তা হলো পর্যটন। ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পর্যটন শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী অবসরকালীন কর্মকাণ্ডে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। গত দেড় বছরে করোনার ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন সময় পর্যটন ছিল স্থবির। মানুষ ভ্রমণ করতে পারেনি। এতে ভ্রমণপিপাসু মানুষ অনুভব করেছে প্রাত্যহিক জীবনে একটু বেড়িয়ে আসা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু স্থবির হয়ে পড়ায় একই সঙ্গে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট সবাই হয়েছে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত।

গোলাম কিবরিয়া

দীর্ঘদিন পর শর্ত সাপেক্ষে ১৯ আগস্ট থেকে খুলেছে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। দুই ঈদেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বিনোদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ ছিল। ভ্রমণপিপাসুদের যাতায়াত ছিল নিষিদ্ধ। ক্ষতি পোষাতে আর পর্যটক আকৃষ্ট করতে নতুন করে সেজেছে বিভিন্ন পর্যটন স্পট। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজে ফিরছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে নতুন করে লোকবল বাড়ানোরও পরিকল্পনা রয়েছে।

২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবসকে সামনে রেখে টিয়াবের সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, ‘দীর্ঘ সাড়ে চার মাস পর বৃহস্পতিবার (১৯ আগস্ট) থেকে খুলেছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। করোনা মহামারিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটনশিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত সব উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছেন। আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পর্যটনের সঙ্গে জড়িত সব উদ্যোক্তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এ সময় বাংলাদেশ সরকারের পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেওয়ার এ সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই।’ তিনি এর সঙ্গে যোগ করেন, ‘একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, ৫০ শতাংশ আসন ব্যবহার এর শর্ত। পর্যটক যেন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন, সে বিষয়ে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। অধিক মুনাফার আশায় যেন আবার আমরা পর্যটনকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে না ঠেলে দিই। পর্যটক এবং এ সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী উভয়কেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তাহলেই পর্যটন আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। করোনা-আতঙ্কে দীর্ঘদিন ঘরবন্দী থাকার ফলে একধরনের অবসাদ মানুষকে ঘিরে ধরেছে। বিশেষ করে শিশুরা ঘরবন্দী থেকে অনেকটা বিমর্ষ। এর থেকে মুক্তি পেতে মানুষ ছুটছে সমুদ্র কিংবা পাহাড়ঘেরা প্রকৃতির কাছে।’ করনাকালীন লকডাউনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পর্যটন খাত। এ প্রসঙ্গে বদরুজ্জামান ভূঁইয়ার মতামত জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন বিপর্যয়ের সময়ে দেখা যায় বিভিন্ন শিল্পের সাথে জড়িতদের আর্থিক সহায়তা বা প্রণোদনা দেওয়া হয়। কিন্তু এই প্রথম পর্যটনশিল্পের সাথে জড়িতদের করোনা মহামারির ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার জন্য স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হয়েছে। পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেওয়া ও স্বল্প সুদে ঋণসহায়তার ফলে বর্তমানের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সহায়ক হবে।’

ডক্টর মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

 

লকডাউনে হওয়া ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন বুনছেন পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা ব্যবসায়ীরা। এ কারণে পর্যটক টানতে হোটেলগুলো ৩০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত কক্ষ ভাড়ায় ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। রয়েছে সর্ব বৃহৎ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। সবুজ পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় বান্দরবানের অপরূপ সব পাহাড় ঘুরে। আমাদের পুরো পার্বত্য অঞ্চলই অঘোষিত পর্যটনকেন্দ্র। এ ছাড়া আছে বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, কৃষি, মৎস্য শিকার, ধর্মীয় রীতিনীতি, আদিবাসী সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনকে ঘিরে পর্যটনের আলাদা আলাদা সম্ভাবনা। পর্যটনের অপার সম্ভাবনায় ভরা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে বিশেষ অবদান রেখে চলেছে পর্যটনশিল্প। কিন্তু পুরো পৃথিবীজুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাবে দেশের পর্যটনের টালমাটাল অবস্থা। পর্যটকের যাতায়াত কমায় প্রকৃতি ধীরে ধীরে পুরোনো রূপ ফিরে পেলেও পর্যটনে ছিল দুঃসময়। তবে সে দুঃসময়কেও পেছনে ফেলে সামনে এগোনোর প্রেরণা হয়ে কাজ করে যাচ্ছে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট অনেক মানুষ।

খবির উদ্দিন আহমেদ

করোনাকালে পর্যটনে বিধিনিষেধ প্রসঙ্গে রিসোর্ট ও অন্যান্য ট্যুরিস্ট স্পটের মধ্যকার পার্থক্যের কথা তুলে ধরে ট্যুরিজম রিসোর্ট ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ট্রিয়াব) সভাপতি খবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বেই বিভিন্ন সার্ভিসের মধ্য রিসোর্ট হচ্ছে পর্যটকদের সুস্বাস্থ্যের জন্য এক অনন্য স্থান। রিসোর্টগুলো, বিশেষ করে গ্রামীণ রিসোর্ট স্বাস্থ্যনিবাস হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ২০১৯ সালে প্রণীত বিধিমালায় রিসোর্টের ডেফিনেশন হচ্ছে, রিসোর্টগুলো সমুদ্র বা নদী বা হ্রদ বা বিল বা ঝিল বা দিঘি বা হাওর বা বাঁওড় বা ডোবা বা নালা বা খাল না পাহাড় বা বন বা জঙ্গল বা বাগানসহ উন্মুক্ত স্থানে হতে হবে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, রিসোর্টগুলো শহর থেকে দূরে গ্রামাঞ্চলে অবস্থিত। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রচুর পরিমাণ ফরমালিনমুক্ত শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস ঔষধি গুণাগুণসমৃদ্ধ খাবার, প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য পাওয়া যায়, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এ ছাড়া এখানে আয়ুর্বেদিক সবকিছু উৎপাদন হয়, যা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাস্থ্যবিধি মেনে অতিথিদের পরিবেশন করা হয়ে থাকে। সাধারণত কটেজগুলো একটা থেকে অন্যটির দূরত্ব অনেক বিস্তৃত। সুতরাং একজন গেস্ট থেকে অন্যজনের করোনা সংক্রমণের কোনো উপায় নেই। তবু এ ক্ষেত্রে কঠোরভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে অতিথিদের সেবা দেওয়া হতো এবং ১৯ তারিখের পর আরও কঠোরভাবেই দেওয়া হবে। যেসব পর্যটন কেন্দ্র বা স্থাপনায় উপচে পড়া ভিড় এবং বিনোদনের জন্য যেখানে সোশ্যাল ডিসট্যান্স মানা সম্ভব নয়, সেখানে একটা নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজ পর্যন্ত খোলা যেতে পারে। কিন্তু যেহেতু রিসোর্টে অন্যান্য বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রের মতো উপচে পড়া ভিড় হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকে না, তাই যেকোনো অবস্থায় পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ হলেও কোভিড পরিস্থিতির স্বার্থেই রিসোর্ট বন্ধ করা ঠিক হবে না বলে মনে করছি।’
পর্যটনে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারঘোষিত ঋণসুবিধা প্রসঙ্গে ট্রিয়াব সভাপতির অভিমত, ‘সরকারঘোষিত ঋণের সুবিধা আমরা এখনো পাইনি। যে কারণে এ খাতের লোকসান কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই সাথে আমি মনে করি পর্যটন-সংশ্লিষ্ট সকল ব্যবসায়ের ওপর ভ্যাট সাময়িক সময়ের জন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া উচিত।’

ইমরানুল আলম

বাংলাদেশে পর্যটনের যাত্রা অনেক আগে শুরু হলেও নানা প্রতিকূল অবস্থা পেরিয়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশার আলো ছড়াচ্ছে। দেশের পর্যটনে নতুন ধারা যুক্ত করেছে অনলাইনভিত্তিক ট্রাভেল গ্রুপগুলো। তরুণদের হাত ধরে পর্যটনের নতুন সম্ভাবনারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। আবার মানুষ ভ্রমণ করতে পারায় স্বস্তি প্রকাশ জানিয়ে অনলাইনভিক্তিক ট্রাভেল গ্রুপ ট্যুর গ্রুপ বিডি (টিজিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরানুল আলম বলেন, ‘বিগত কয়েক বছরে অপার সম্ভাবনাময় একটি সেক্টর হয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল পর্যটন। গত ৫ বছরে দেশে এবং বিদেশে পর্যটকের সংখ্যাও বেড়ে অনেক গুণ, যার সুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও পড়েছে অনেকটা। যদিও অনাকাক্সিক্ষত প্যানডেমিক সিচুয়েশনে এই সেক্টরের বেশ অনেকটাই ক্ষতি হয়েছে। তবে পর্যটন আবারও আগের রূপ ফিরে পেতে শুরু করবে আশা রাখি। বিগত ছয় থেকে সাত মাসে ঘরে থেকে আমরা প্রায় সকলেই আমাদের জীবনে ভ্রমণের গুরুত্ব কিছুটা হলেও টের পেয়েছি। শরীর এবং মনকে চাঙা রাখতে হলে ভ্রমণের বিকল্প খুব কমই খুঁজে পাওয়া যাবে, হয়তো সেভাবে পাওয়াও যাবে না। ভ্রমণের মাধ্যমে একদিকে আমরা যেমন নতুন অনেক জায়গা এবং অনেক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করি, অন্যদিকে মনও খুব স্নিগ্ধ একটা সময়ের মধ্য দিয়ে যায়। ফলে নিজেদের জীবনেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। মাদক, অবসাদ, হতাশাসহ অনেক কিছু থেকে মুক্ত রাখতে ভ্রমণ বেশ ভালো প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে।’
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ১ জানুয়ারি ১৯৭৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে। সেই থেকে এই দেশে যাত্রা শুরু হয় পর্যটনশিল্পের। বিগত এক দশকে পর্যটনের বিভিন্ন উন্নয়ন সবার মনে এ শিল্প নিয়ে আশার সঞ্চার জুগিয়েছে। সম্প্রতি কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরের পাড়ে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে পর্যটননগরী কক্সবাজারের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দেবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক আকর্ষণে কক্সবাজারে তিনটি পর্যটন পার্ক তৈরির পরিকল্পনা করেছে বর্তমান সরকার। প্রতিবছর এতে বাড়তি ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ তিনটি ট্যুরিজম পার্ক হলো সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, নাফ ট্যুরিজম পার্ক এবং সোনাদিয়া ইকো ট্যুরিজম পার্ক। পর্যটনশিল্পের গুণগত পরিবর্তন আনতে কক্সবাজার ও সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় ‘এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন’ গড়ে তোলার জন্য কাজ চলছে। দেশের এই এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোনগুলোতে প্রচুরসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা এ শিল্প-সংশ্লিষ্ট সবার জন্য ইতিবাচক খবর। বর্তমান সরকারের বেশ কিছু মেগা প্রকল্প পর্যটন প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। মেগা প্রকল্প হচ্ছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প, ঢাকায় মেট্রোরেল প্রকল্প, দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হয়ে ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প, পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প এবং সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প। বাংলাদেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের লক্ষ্যে ট্যুরিস্ট পুলিশ বড় ভূমিকা পালন করেছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর বিভাগের বিভিন্ন দর্শনীয় পর্যটন স্থানে পর্যটকদের নিরাপত্তা বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা হচ্ছে। ফলে ট্যুরিস্ট পুলিশ নিরাপত্তার পাশাপাশি পর্যটকদের কাছে আস্থার জায়গা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।

শহিদুল ইসলাম সাগর

স্বাস্থ্যবিধি ও পর্যটন সম্পর্কে নিজের অবস্থান জানিয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোরার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিইএ) চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম সাগরের অভিমত, ‘দীর্ঘ বিরতির পর এই মুহূর্তে কম মূল্যে ভালো সেবা দিয়ে অভ্যন্তরীণ পর্যটনে দেশের মানুষকে আকৃষ্ট করতে চাই। স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করব, বাংলাদেশ ট্যুরিজম এক্সপ্লোরার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিইএ) ৮৫০টি সদস্য প্রতিষ্ঠান। পর্যটকদের এ বিষয়ে আমরা সচেতন করব। স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা না গেলে পর্যটন কেন্দ্র খোলার সুফল তুলতে পারব না। আমরা বরাবরই বলি, বাংলাদেশে ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে মাত্র ২০ শতাংশ পর্যটক ভ্রমণ করেন। তাদের স্বাস্থ্যবিধি মানার বিষয়ে সচেতন করে ট্যুর অপারেটর। কিন্তু আলাদা ভ্রমণ করা পর্যটকদের সচেতন করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। পর্যটনশিল্পে জড়িত কর্মীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার দাবি জানাই।’ এর সঙ্গে যোগ করে তিনি জানান, ‘আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবসকে কেন্দ্র করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের উচিত ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা। মানুষকে ভ্রমণে উৎসাহিত করা। সেই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী দুই বছর কোনো নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে পর্যটন স্পটগুলো চালু রাখতে হবে।’
নতুন নতুন ভ্রমণ গন্তব্য করোনা-পরবর্তী সময়ে পর্যটনের পালে বাতাসের জোগান হয়ে উঠতে পারে। ভ্রমণপিপাসুদের অনেকেরই প্রথম পছন্দ সমুদ্র উপকূলে বেড়াতে যাওয়া। সাগরের সৈকত নাকি পাহাড়ের চূড়া এই দুটোর মধ্যে বেছে নিতে বললে অনেক ভ্রমণকারীই সন্দিহান হয়ে পড়েন। সাগরের সৈকত বলতে বহুকাল ধরেই কক্সবাজার ছিল একমাত্র গন্তব্য। সাম্প্রতিক কালে কুয়াকাটা সি বিচ, সমুদ্রস্নান ইত্যাদি নিয়ে কক্সবাজারের পাশে বিকল্প আকর্ষণ হিসেবে হাজির হয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বরিশাল বিভাগের দক্ষিণে এবং বৃহত্তর নোয়াখালীর দক্ষিণে মেঘনার অববাহিকায় এবং সেই সঙ্গে পায়রা, বিশখালী, আগুনমুখা ইত্যাদি নদীর মোহনায় আগেই ছিল অনেক দ্বীপ, সেই সঙ্গে গত ৫০-১০০ বছরে জেগেছে অনেক চর। এই চরগুলোতে একই সঙ্গে তৈরি হয়েছে অপরূপ বালুকাবেলা বা সি বিচ। সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে এসব সি বিচে, তা এসব দ্বীপকে করে তুলেছে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট। একই সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবে এবং বন বিভাগের প্রচেষ্টায় প্রতিটি চরেই গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বা উপকূলীয় শ্বাসমূল বন বা বাদাবন। একদিকে সমুদ্রসৈকত, অপর দিকে বাদাবন, আবার সেই বনে হরিণসহ নানা বন্য প্রাণীর বসবাস। এত সব সম্পদ নিয়ে ওই চরগুলো ক্রমেই পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো নিঝুম দ্বীপ, যা নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত ও চর কুকরিমুকরি, যা ভোলা জেলার দক্ষিণে চর ফ্যাশন উপজেলার অন্তর্গত। এ ছাড়া রয়েছে মনপুরা, যা ভোলা জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা এবং মৌডুবি, যা কুয়াকাটার পূর্ব দিকে, তৃতীয় সামুদ্রিক বন্দর পায়রা বন্দরের অপর পাশে, রাঙ্গাবালী উপজেলায় অবস্থিত। এই সব কটি স্পটেই রয়েছে সামুদ্রিক বালুকাবেলা। পাশেই রয়েছে বনজঙ্গল। চারটি জায়গাতেই রয়েছে ঢাকা থেকে লঞ্চে করে যাওয়ার ব্যবস্থা, যা আমাদের পর্যটনে নতুন গতি সঞ্চার করেছে।
সিলেটের চা-বাগান, জাফলং, রাতারগুল, জলাবন, হাকালুকি হাওর, লালাখাল, ভোলাগঞ্জ, বিছনাকান্দি, তামাবিল, মাধবকুণ্ডের জলপ্রপাত, পাহাড়, ঝরনা সব মিলিয়ে নানা বৈচিত্র্যের সম্ভার রয়েছে সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ সবুজ লীলাভূমি। ঐতিহ্যময় বাংলার সৌন্দর্য সুন্দরবন, বগুড়ার মহাস্থানগড়, দিনাজপুরের কান্তজির মন্দির, রামসাগরসহ সারা দেশের আকর্ষণীয় সব পর্যটনকেন্দ্রকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে হবে। পর্যটকদের সামনেও দেশকে চেনা-জানার একটি সুযোগ চলে এসেছে করোনা মহামারির কারণে। করোনাভাইরাস দেশীয় পর্যটকদের অভ্যন্তরীণ ট্যুরিজমের প্রতি আকৃষ্ট করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য দেশীয় পর্যটনশিল্পকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত করতে হবে। বাংলাদেশের গ্রামগুলো অনিন্দ্যসুন্দর। এ দেশের গ্রামগুলোকে কেন্দ্র করে অনায়াসেই গ্রামীণ পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব। তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ থাকা দরকার।
আঁধারঘেরা রাতের শেষে যেমন আশার আলো হয়ে ভোরের সূর্য ওঠে, তেমনি সবারই প্রত্যাশা করোনার সংকট কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিক হবে পৃথিবী। সবকিছু ফিরে পাবে পুরোনো রূপ। আবার মানুষ ভ্রমণ করবে পথ থেকে পথে, পাহাড়ে-সমুদ্রের প্রান্তরে। সুজলা-সুফলা-শস্য শ্যামলা প্রিয় মাতৃভূমির অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে বেরিয়ে পড়বে সবাই। এই অস্থির সময় পার করে দেশের পর্যটনশিল্প এগিয়ে যাক, এটাই প্রত্যাশা।

ছবি: ইন্টারনেট

০ মন্তব্য করো
0

You may also like

তোমার মন্তব্য লেখো

3 + four =